"> রোকেয়া দিবসে বগুড়ায় সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের র‌্যালি-আলোচনা সভা
 

রোকেয়া দিবসে বগুড়ায় সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের র‌্যালি-আলোচনা সভা

Pronob paul 9:52 am সারা দেশ,
Home  »  সংগঠন সংবাদসারা দেশ   »   রোকেয়া দিবসে বগুড়ায় সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের র‌্যালি-আলোচনা সভা

বগুড়া প্রতিনিধি :: নারী জাগরণের পথিকৃৎ মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার ১৩৯তম জন্ম ও ৮৭তম মৃত্যু দিবস উপলক্ষে আজ ৯ ডিসেম্বর ২০১৯ বেলা সাড়ে ১১ টায় সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম বগুড়া জেলা শাখার উদ্যোগে শহরের প্রধান প্রধান সড়কে র‌্যালি শেষে সাতমাথায় সমাবেশ ও সংগঠন কার্যালয়ে আলোচনা সভা-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশ ও আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম জেলা সংগঠক রাধা রানী বর্মন, সভা পরিচালনা করেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট বগুড়া জেলা সংগাঠনিক সম্পাদক মুক্তা আক্তার মীম, সভায় আলোচনা করেন বাসদ বগুড়া জেলা সদস্য শ্যামল বর্মন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট জেলা সহ-সভাপতি পলাশ চন্দ্র বর্মন, সরকারি আজিজুল হক কলেজ শাখার সদস্যসচিব নিয়তি সরকার, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের জেলা সদস্য রেনু বালা, আকলিমা বেগম প্রমূখ।

আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্য রাধা রানী বর্মন বলেন- নারী জাগরণের পথিকৃৎ মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া এই উপমহাদেশের নারী শিক্ষা ও নারীমুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা আজও পরিপুর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। সময়ের পরিবর্তনে নারীকে ভিন্নভাবে চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ রাখা হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন দিন দিন বাড়ছে, সিনেমা ও বিজ্ঞাপনে নারীকে অশ্লীলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সম্পত্তিতে আজও নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নারী যে মানুষ হিসাবে সমাজে পুরুষের পাশাপাশি সমান ভুমিকা রাখতে পারেন এই পুজিঁবাদী ভোগবাদী মুনাফার সমাজব্যবস্থা তা অস্বীকার করে এবং নারীকে মানুষ হিসাবে মেনে নিতে চায় না। যে সমাজে অর্ধেক নারী সেখানে নারী মুক্তি ছাড়া সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই সমাজের অগ্রগতি ও নারীমুক্তির জন্য এই পুজিঁবাদী-ভোগবাদী সমাজ ভাঙ্গা এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নারী-পুরুষ সকলকে সমভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

আলোচনা সভায় অন্যন্য নেতৃবৃন্দ বলেন- বেগম রোকেয়া বাংলাদেশের নারীমুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ। সমাজে নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা, নারীর সামনে সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করার সাহস, যুক্তি ও আপন প্রত্যয় নিমার্ণের লক্ষ্যে আজীবন তিনি সংগ্রাম করেছেন লেখনী ধরেছেন, স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন, সংগঠন গড়ে তুলেছেন। বেগম রোকেয়া সমাজে নারীর যে অবস্থান দেখতে চেয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর ৮৬ বছর পরও আমরা তার কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারিনি। বাহ্যিকভাবে হয়তো অনেক পরিবর্তন হয়েছে বলে বোধ হবে; নারী এমনকি প্রধানমন্ত্রীও হচ্ছেন। কিন্তু সমাজ মননে যেন আরও অবক্ষয় ঘটে গেছে।

সারাদেশে নারী-শিশু ধর্ষণ-নির্যাতন-হত্যা এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দুই বছরের শিশুকন্যা বা ৬০ বছরের বৃদ্ধা যেকোন বয়সের নারী; হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান বা মুসলিম যেকোন ধর্মের নারী; পাহাড়ে বা সমতলে, ঘরে-পথে-স্কুলে-কারখানায় যেকোন স্থানে; দিনে বা রাতে যেকোন সময়ে বাংলাদেশে একজন নারী নির্যাতনের শিকার হতে পারেন। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, অপহরণ, বন্দি করে রেখে গণধর্ষণ, যৌতুকের জন্য নির্যাতন-হত্যা, বখাটেদের উৎপীড়ন, গণপরিবহনে যৌন হয়রানি, ইন্টারনেটে ব্লাকমেইলসহ ঘরে বাইরে নানা উৎপীড়ন, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে উৎকণ্ঠার বাইরে কোনো নারীর পক্ষে স্বাভাবিক জীবনযাপন কল্পনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও বাংলাদেশের আইনে নারী সমানাধিকার পান না। সম্পত্তির উত্তরাধিকার, বিবাহ, বিবাহ-বিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব অর্থাৎ পারিবারিক জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনে নারী বৈষম্যের শিকার হন। সমকাজে সমমজুরি আইনে থাকলেও; বাস্তবে প্রায় সমস্ত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারী, পুরুষের তুলনায় কম মজুরি পেয়ে থাকেন। এখনও সরকারি হিসাব মতেই ১০০ জনে ৫২ জন নারীর বাল্যবিবাহ হয়। নারীরা দিনে প্রায় ১৬ ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ৪৫ ধরনের কাজ করেন। পুরুষের তুলনায় নারীরা প্রায় সাড়ে ৩ গুণ কাজ বেশি করেন। কিন্তু নারীর গৃহস্থালির কাজের আর্থিক মূল্য এখনও জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী এখনও এমন যে সন্তান লালন-পালনসহ পারিবার ও ঘর-গৃহস্থালির কাজের দায়িত্ব নারীর। এলাকা ও কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সেন্টার, গণ-পরিবহনে নারীর নিরাপত্তাহীনতা, নারীদের জন্য জেলা-উপজেলায় হোস্টেলসহ রাষ্ট্রীয় প্রায় কোন আয়োজন না থাকায় কর্মক্ষম, শিক্ষিত অনেক নারীই কর্মক্ষেত্রে আসতে পারছেন না বা কর্মক্ষেত্র থেকে ঝরে পড়ছেন। একই দেশে এখানে দুই আইন বলবৎ; সরকারি চাকরিতে ৬ মাস সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি আর বেসরকারি চাকরিতে ৪ মাস সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটির নিয়ম বিদ্যমান রয়েছে। সেটাও অধিকাংশক্ষেত্রেই কেবল খাতা-কলমে; বাস্তবে শ্রমিক নারীরা গর্ভবতী হলে তার কপালে জোটে ছাঁটাই। এছাড়াও নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাষ্ট্রের তেমন কোন উদ্যোগ নেই। বিজ্ঞাপন, নাটক, সিনেমায় নারীকে পণ্যরূপে উপস্থাপন করা হয়। পর্নোগ্রাফি ও মাদক বন্ধে সরকারের কোন কার্যকর উদ্যোগ নেই। মহিয়সী নারীদের জীবন ও কর্ম, বিভিন্ন গণ-আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা পাঠ্যবইয়ে অন্তভূক্তকরণ বা রাষ্ট্র ও সমাজে তেমন মূল্যায়িত হয় না। অন্যদিকে ওয়াজ-মাহফিলে নারীকে নিয়ে অশ্লীল-কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া হয়। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও ফতোয়া দিয়ে নারীর উপর অত্যাচার করা হয়। এই নির্মম বাস্তবতা ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তনে, সমাজের সকল বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, নারীমুক্তির আন্দোলনে বেগম রোকেয়া আজও প্রেরণার উৎস। বেগম রোকেয়ার সেই আহ্বান ‘জাগো গো ভগিনী!’ কে ধারণ করে আসুন, সমস্ত শোষণ, নির্যাতন, অন্ধত্ব, কুসংস্কার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই; নারী-পুরুষের মিলিত সংগ্রাম গড়ে তুলি; মনুষ্যত্ব, সভ্যতা, স্বাধীনতা ও মানবতার দাবি আদায় করি এই আহ্বান জানান।