শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৭
শীর্ষ সংবাদ

“নিষিদ্ধ নিশিতা”: দ্বিতীয় পর্ব

এখানে শেয়ার বোতাম

ছায়েরা খুকু ::

প্রতিদিন লুকিয়ে দেখা করা, ঘুরতে যাওয়া, একান্তে সময় কাটানো এই সব আমার এত ভালো লাগতে লাগলো যেন কারো শরীরের আকর্ষণটা আমি ভুলে যেতে লাগলাম। মনের প্রাধান্যটা যেন বেশি হয়ে যেতে লাগলো আমার কাছে। এইভাবে এক বছর কাটালাম। এই ফাঁকে লক্ষ করলাম আমার মাঝে নোংরামিগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলো। মনের সব কলুষতা যেন পবিত্রতায় রুপ নিল। নিজেকে হালকা অনুভূত হতে লেগেছিলো।

অভীক আমাকে কোনোদিন নোংরা চোখে দেখতোনা বিধায় আমিও তাকে পবিত্রতার ছোঁয়ায় অনুভব করতে লাগলাম। অভীকের সাথে কাটানো প্রত্যেকটা মুহূর্ত আমার কাছে ছিল অন্যরকম। আমার এই পরিবর্তনগুলো একজন খুব গভীরভাবে খেয়াল করতো। সে আর কেউ নয় আমার একমাত্র শুভাকাঙ্ক্ষী আমার একমাত্র বোন আমার বড় আপু। আপু আমার সাথে অনেকদিন ধরে কথা বলেনা, আমি যখন ২য় বর্ষে পা বাড়ালাম তখন আপু আমাকে একদিন ডেকে বললো, “শুন নিশিতা যা করবি ভালো কিছু করার চেষ্টা করবি।“ আমি মনে মনে বললাম, “আপুরে আমি চেষ্টা করছি এবার তোকে ভালো কিছু উপহার দেওয়ার জন্য। “কিন্তু কথায় আছেনা ভালো সব সময় স্রোতের বিপরীত দিকে বহমান। আমার বেলায় ও তার ব্যতিক্রম হলনা।

আমিতো পাপী, মহাপাপী তাই বিধাতা ও আমার জন্য এক চরম শাস্তির ব্যবস্তা করলো। আমার নিজের তৈরি করা শত্রুগুলো সব ওঁত পেতে ছিল কিভাবে আমার ক্ষতি করা যায়। কারণ প্রত্যেকের যে আমাকে চায় তাই তারা সবাই অভীকের কান ভারী করতে লাগলো আমার নামে। তারপরো আমি অভীকের সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতাম। আমিতো জীবনে সত্যিকারের ভালোলাগা, ভালোবাসার ও প্রাণের প্রিয় মানুষ পেয়েছিলাম তাকে। তাকে আমি কোনোকিছুর বিনিময়ে হারাতে চাইনা। এভাবে আমি উচ্চ মাধ্যমিক দিলাম। পরবর্তীতে একটা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। চরম উৎকন্ঠার মাঝে অভীকের সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় থাকতাম সবসময়। কিন্তু অভীক সেতো কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। অভীক ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। সে তার পরিবার থেকে শিক্ষা পেয়েছে কোনো প্রেম নয়, বিয়ে করতে হলে করবে কোনো ভালো মেয়ে অর্থাৎ খোলস ওয়ালা। ভিতরেরটা যাই হোক খোলসটা তার ঠিক থাকতে হবে। কিন্তু অভীককেতো আমার শত্রুরা কান ভরিয়েছিলো আমি নষ্টা মেয়ে। আমাকে নিয়ে সংসার করা যাবেনা। আমি অস্পৃশ্য, আমাকে ছোঁয়াওতো পাপ। আমি জগতের সুখ নিতে পারিনা। এই সুখ নামক পাখিটি আমার জন্য নয়। একদিন অভীক এসে হঠাৎ আমাকে বললো, “নিশু, চল আমরা বিয়ে করে ফেলি। আমাদেরকে কেউ কোনদিন মেনে নিবেনা। তোমার পরিবারতো মোটেই না।“ কারণ আমি ছিলাম টাকাওয়ালার মেয়ে। আমিও রাজি হয়ে গেলাম কারণ আমি অভীককে বিশ্বাস করতাম আমার নিজের থেকেও বেশি। তাই আমিও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম কোনো কিছু না ভেবে। এক কাপড়ে ভার্সিটি থেকে বের হয়ে গেলাম অভীকের সাথে পাড়ি জানালাম অজানা উদ্দেশ্যে।

বাসা থেকে আমি বের হতে গেলে আমি আমার হিতাকাঙ্ক্ষী, আমার বড় আপনজন, যে আমাকে সবচাইতে বেশি ভালোবাসতো আমার আপু আমাকে সন্দেহ করতো। তাই ভার্সিটি থেকে বের হলাম এবং পাড়ি জমালাম বিপদের গুহায় যেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো নিত্য নৈমিত্তিক পৈশাচিক ঘটনার। অভীক যেন আমার চোখে দেখা নতুন এক অন্য পুরুষ। তার মনে পুষে রেখেছিল আমার জন্য বড় একটা ঘৃণার পাহাড়। আমার দেহটা ছিল তার জন্য এক বন্য হরিণীর। হায়েনারা যেমন বনে হরিণী পেলে খুশিতে মাতাল হয় তেমনি হয়েছিল অভীক। প্রতিদিন অমানবিক অত্যাচার আমার সহ্য করা ছাড়া আর উপায় ছিলনা। কারণ আমার ছিল তাই প্রাপ্য। আমি ছিলাম সেই রবার্ট ক্লাইভের মত। মায়ে তাড়ানো, বাপে খেদানো এক নারী। আমার গলায় ব্লেইড লাগানো ছাড়া উপায় ছিলোনা। এই অত্যাচারে শুধু অভীক সামিল ছিলোনা আমার পরিচিত কয়েকজনকেও হায়ার করে এনেছিল। আমাকে নিয়ে রাত্রে শুরু হতো তাদের আনন্দের আসর। একের পর এক পালা করে আমাকে নিয়ে আনন্দ করতো আর আমি ভাবতাম আমার তা প্রাপ্য। মনে মনে বলতাম, “আপুরে, আমাকে ক্ষমা করিস, আমি তোর ভালো বোন হতে পারলামনা। “এদিকে আমি উধাও হওয়ার পর আব্বুর হার্ট এটাক করলো আর আম্মুটাও যেন কেমন হয়ে গেল। আপু কোনদিকে সামাল দিবে কিছুই বুঝতে পারছিলোনা। আপু একটা ভালো চাকরীতে জয়েন করেছিল তখন। এভাবে চলতে লাগলো আমার দিনগুলো প্রায় পনেরো দিন পর আমার জীবনে আসলো আবার অশনি সংকেত, চোখ বাঁধা অবস্থায় গিয়ে পড়লাম নতুন এক জায়গায়। যখন চোখ খোলা হল নিজেকে আবিষ্কার করলাম সুন্দর একটা পরিপাটি অন্ধকার গুহায়, যেখানে চারদিক থেকে ভেসে আসছিল নানান ধরণের কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা। নারীর অশালীন সব হিসেবের কথা। এরপর থেকে আমি অভীককে আর দেখলাম না। এইখানে আসে নিত্য নতুন অভীক। তাদের মনোরঞ্জনে আমাকে থাকতে হয় ব্যস্ত। নিত্য নতুন ভাষায় আমি পারদর্শী। আমি চলি রোবটের মত। মনে মনে আব্বু, আম্মু, আপুর জন্য কান্না করতাম আর ভাবতাম আমার মত কুলাঙ্গার সন্তানরা কেন পৃথিবীতে জন্ম নেয়? কেন মা বাবা আমাদের এই পৃথিবীর মুখ দেখালেন? এই পৃথিবীর জৌলুসে, চাকচিক্যের মোহে পড়ে আমিতো তাদের গলা টিপে হত্যা করলাম।

এইভাবে চলতে লাগলো আমার দিনগুলো। একদিন আমার রুমে প্রবেশ করলো এক ব্যক্তি যিনি ঢোকার সাথে সাথেই আমার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলেন যেন আমি তার সামনে পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের এক আশ্চর্য। আমি তার সামনে হাত নেড়ে বললাম, “এই যে ধ্যানে আছেন নাকি? হুশে আসুন। বসুন। কি খাবেন? চা, শরবত? “কোনো উত্তর নেই। আমিতো দেখলাম উনি মাতালও নন। অতঃপর উনি হুশে আসলেন আর বললেন, “আমি কি দেখছি সুন্দরী না অপ্সরী? “আমি বললাম, “স্যার, মানবী, আমি মানবী। “উনি হেসে দিলেন, এই হাসি ছিল সত্যি স্বর্গীয়, নিষ্পাপ যেখানে অনায়াসে ডুব দেয়া যায়। উনি আমাকে বললেন, “তা সুন্দরী আমি কি আপনার নামটা জানতে পারি?
“জী জনাব। “
“তাহলে ছটপট বলে ফেল। আমারতো আর তর সইছেনা যে এমন সুন্দরী তার নাম না জানি কত সুন্দর। “
“নিশিতা। আমার নাম নিশিতা। “
“বাঃ! মিল আছে বটে। ওকে। আমি তাহলে তোমাকে নিশি বলেই ডাকবো। আজ থেকে আমরা বন্ধু কেমন?”
কেমন যেন আবার এক অজানা আশঙ্কায় আমার বুকটা ধক করে উঠলো। কেঁপে উঠতে লাগলো আমার সারা শরীর। উনি আমার অবস্থা বুঝতে পেরে আমাকে বললেন, “আমাকে শরবত দিবেনা। “
নিশিতা এবার হিহিহি করে হেসে উঠে আমার মুখ চেপে ধরে বলে উঠলো, “এরপর থেকে এই আহাম্মকটার সাথে আমার সখ্যতা বুঝলেন? “এইভাবে নিশিতা আর আমার মাঝে বন্ধুত্ব হয়ে উঠল।

আমি আফতাব ছিলাম শহরের এক ধনাঢ্য পরিবারের ছেলে। মা বাবার দ্বিতীয় সন্তান। বাবা শহরের নামকরা ব্যবসায়ী আর মা মহিলা সমিতির সভাপতি। বড় ভাই ব্যবসায় জড়িত আর আমি মাত্র লেখাপড়া শেষ করলাম। মা বাবার অনাদরে অবহেলায় বড় হওয়া বখে যাওয়া এক ধনীর দুলাল। বন্ধুদের সাথে থাকতে থাকতে আমার এই বদভ্যাস। প্রতিদিন আমি যেতে শুরু করলাম নিশিতার কাছে অনেক অনেক টাকা মহাজনকে দিয়ে। কি জন্য কিসের জন্য আমিও জানতাম না, সেও জানতোনা নিরবতায় কেটে যেত সময়ের পর সময়, ঘন্টার পর ঘন্টা। শুধু কাছে বসে থেকে তাকিয়ে থাকা ওর দিকে অপলক দৃষ্টিতে। আমি যেন মদের গ্লাস ধরতাম তার চোখের সামনে আর টুপ্টুপ করে যেন ওর চোখ থেকে পড়তো অমিয় ধারা। আমি তা নিয়ে গিলতাম ঢকঢক করে। এভাবে দিনের পর দিন মাসের পর মাস। তার রুমে আর কারো প্রবেশ নিষেধ। গল্প শুরু হলে যেন শেষ নেই। এইখানে ছিলনা কোনো নোংরামি। আসার সময় নিয়ে আসতাম তার জন্য কাপড় চোপড়, খানা পিনা।

চলবে……………


এখানে শেয়ার বোতাম