শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৭
শীর্ষ সংবাদ

তামাক: মৃত্যুর বিনিময়ে আয়!

এখানে শেয়ার বোতাম

আবু নাসের অনীক::

৩১ মে বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবস ২০২১। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘Commit to quit’ যার বাংলা ভাবার্থ- “আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি, জীবন বাঁচাতে তামাক ছাড়ি”। তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিশ্বের সর্বোচ্চ তামাকজাত পণ্য ব্যবহারকারী দশটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

গেøাবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭ অনুসারে, এদেশে ১৫ বছরের উর্ধ্বে ৩৫.৩% প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ তামাকজাত দ্রব্য (ধূমপান ও ধোঁয়াবিহীন) ব্যবহার করে যার মধ্যে ৪৬% পুরুষ এবং ২৫.২% মহিলা। বিভিন্ন পাবলিক প্লেসে ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান না করেও পরোক্ষভাবে ধূমপানের শিকার হচ্ছে বহু মানুষ। এই হার কর্মক্ষেত্রে ৪২.৭%, রেস্তোরায় ৪৯.৭%, সরকারি কার্যালয়ে ২১.৬%, হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ১২.৭% এবং পাবলিক পরিবহনে ৪৪%।

সারা বিশ্বে সমন্বিতভাবে তামাক নিয়ন্ত্রণ ও তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০০৩ সালের মে মাসে ৫৬ তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) চুক্তি অনুমোদিত হয়। বাংলাদেশ এই চুক্তির প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ এবং ২০০৪ সালে এ চুক্তিকে অনুসমর্থন করে। বাংলাদেশ সরকার এফসিটিসি’র আলোকে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫
(সংশোধিত ২০১৩) এবং ২০১৫ সালে এ সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করে।

৩০-৩১ জানুয়ারি, ২০১৬ ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘Summit on Achieving the Sustainable Development Goals’ শীর্ষক South Asian Speakers Summit এর সমাপনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাক মুক্ত করার ঘোষণা দেন। দেশের ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) এর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত লক্ষ্য-৩ অর্জনে আন্তর্জাতিক চুক্তি
এফসিটিসি’র বাস্তবায়ন ও তামাকজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় পদক্ষেপ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি হতে দেশের জনগণকে রক্ষার জন্য স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার মন্ত্রলালয়সহ সরকারের সকল মন্ত্রণালয়/ বিভাগ, বেসরকারি সংস্থা, মিডিয়া, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি’র সমন্বিত কার্যকর অংশগ্রহণ প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্থানীয়
সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধানসমূহ বাস্তবায়নকে আরো তরান্বিত করতে পারে।

তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে গতিশীল করার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্দেশিকা থাকা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় “স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা” প্রণয়ন করেছে এবং এর আলোকে সকল স্থানীয় সরকার
প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ নির্দেশিকা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের তামাক ব্যবহারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি হতে রক্ষা করবে।

দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন কোন ঘোষণা প্রদান করেন, তখন সেটি একজন ব্যক্তির ঘোষণা থেকে সরকারের ঘোষণায় পরিণত হয়। সেরকমভাবে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাক মুক্ত করার প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাটি সরকারের ঘোষণা হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এটি একটি মাইল ফলক ঘোষণা হিসাবে সমাদৃত হয়েছে।

তবে যেকোন একটি ঘোষণা এমনি এমনি বাস্তবায়ন হয় না। সেটি বাস্তবায়নের জন্য কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন হয়। রোড ম্যাপ ঠিক করতে হয়। যেটা অনুসরণের মাধ্যমে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়। যতো দ্রæত রোড ম্যাপ ও সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা করা হবে তত দ্রæত ঘোষণা বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হওয়া যাবে।

কিন্তু তামাক কোম্পানীগুলি প্রভাবশালী হবার কারণে রোড ম্যাপ প্রণয়ন ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তারা ভূমিকা রাখে। তাদের ভূমিকা গ্রহণের লক্ষ্য সরকারের দেশকে তামাক মুক্ত করার ঘোষণা বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করা। এজন্য তারা নানা রকম ষড়যন্ত্র-চক্রান্তে লিপ্ত হয়। এবং এর দ্বারা সরকারের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হয়, অনেক সময় সরকার স্ব-বিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তামাক কোম্পানী সরকারের অংশ এমন অনেক ব্যক্তিকে টার্গেট করে তাদেরকে বিভিন্ন অবৈধ সুযোগ দিয়ে ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে সরকারে সিদ্ধান্ত তাদের অনুকূলে নিতে প্রচেষ্টা চালায়। অনেক ক্ষেত্রে তারা সফলতাও অর্জন করে।

আগামী ০৩ জুন নতুন অর্থ বছরের বাজেট ঘোষণা হবে। বাজেটকে কেন্দ্র করে তামাক বিরোধী সংগঠনসমূহের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে করারোপের প্রস্তাবনা সরকারে কাছে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সরকার যে পদ্ধতিতে তামাকের উপর করারোপ করে তা চুড়ান্তভাবে তামাক কোম্পানীকেই লাভবান করে। এর মাধ্যমে তামাক সেবনকারী কমে আসার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়।

আমরা জানি, তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে উচ্চাহারে করারোপ একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত পদ্ধতি। যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রয়োগে ইতিমধ্যে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফলাফল বয়ে এনেছে। কিন্তু প্রতিবছর তামাক বিরোধী সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে বাজেটে প্রস্তাবনা তুলে করা হলেও তামাক কোম্পানীর প্রভাবে তা উপেক্ষিত হয়। যা সরকারের ঘোষণার সাথে কোনভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

সরকার এই খাত থেকে যা আয় করে তার চেয়ে ব্যয় বেশি। বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ‘The Economic Cost of Tobacco Use in Bangladesh: A Health Cost Approach’ শীর্ষক একটি যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তামাক ব্যবহারজনিত ২০১৮ সালে দেশে প্রায় ১ লক্ষ ২৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা ঐ বছরে মোট মৃত্যুর ১৩.৫%। একই বছরে ১৫ লক্ষ প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহারজনিত রোগে ভুগেছেন, প্রায় ৬১ হাজার শিশু পরোক্ষ ধূমপানের কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে।

এই গবেষণার তথ্যানুযায়ী, তামাক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্যখাতে মোট ব্যয়ের পরিমান ছিল ৮ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। যার ৭৬% খরচ মিটিয়েছে ব্যবহারকারীর পরিবার, ২৪% খরচ এসেছে জনস্বাস্থ্যখাতের বাজেট থেকে। তামাক ব্যবহার জনিত অসুস্থতা এবং এ কারণে অকাল মৃত্যুর ফলে বার্ষিক উৎপাদনশীলতা হ্রাসের পরিমান ছিল ২২ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে তামাক ব্যবহারের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমান
ছিল ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা।

২০১৮ সালে মূল্যের হিসাবে, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে বাংলাদেশের জিডিপিতে তামাক খাতের মোট অবদান ছিল ২২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই খাতে অর্থনৈতিক ব্যয় ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা থেকে ৭ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা কম। পরিসংখ্যানগত জায়গা থেকে তামাকের কারণে যে আয় হয় তার চেয়ে ব্যয় বেশি। অন্যদিকে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করছে তামাক ব্যবহারের ফলে। এটা চিন্তা করাও কঠিন যে, মানুষের মৃত্যুর বিনিময়ে আমরা আয় করছি। আবার যা আয় করছি তার জন্য উল্টো ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে।

একদিকে মৃত্যু, পঙ্গুত্ব অন্যদিকে ক্ষতিপূরণ। তাহলে কেনো, কোন যুক্তিতে আমরা বর্তমান জটিল কর কাঠামো সংশোধন না করে সুনির্দিষ্টভাবে উচ্চ হারে করারোপ করছি না? দেশের জনস্বাস্থ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে তামাক কোম্পানীর স্বার্থ রক্ষা করছি। বর্তমান করোনা মহামারীকালীন সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, তামাক ব্যবহারকারীরা অধিক হারে আক্রান্ত হচ্ছে এবং অন্যদের তুলনায় ১৪ গুণ মৃত্যু ঝুঁকি বেশি। করোনাকালীন সময়ে যখন অধিকাংশ ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত তখন তামাক কোম্পানীর ব্যবসা রমরমা। লকডাউনের মধ্যেও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সুবিধা নিয়ে ব্যবসা করে গেছে। প্রায় ৭০ বছর আগে (১৯৫৩ সালে) শিল্প মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা তালিকায় তামাককে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য হিসাবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ৭০ বছর
আগের পরিস্থিতি আর বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে যোজন যোজন ফারাক। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা হাল নাগাদ করে সিগারেট,বিড়িকে এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এখন সময়ের দাবী।

যে উৎপাদিত ফসল ব্যবহারের ফলে মৃত্যু হয়, মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পরিবেশ হুমকীর সম্মুখীন হয়, চাষের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারপরেও কোন বিবেচনায় তামাককে অর্থকরী ফসলের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়! এই অন্তর্ভূক্তি কী প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক নয়?? কারণ অর্থকরী ফসল হিসাবে তালিকাভূক্ত থাকলে সরকার সেই ফসল উৎপাদনে, বিপণনে অগ্রাধিকার দিবে এটা তো একজন পাগলেও বুঝবে!!

বাজেটের কর প্রস্তাবনায় প্রভাবিত করা, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য হিসাবে অন্তর্ভূক্ত রাখা, অর্থকরী ফসল হিসাবে চিহ্নিত করা, সরকারে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা, এগুলি কিভাবে সম্ভব হয়? সম্ভব হয়, কারণ বহুজাতিক তামাক কোম্পানিতে সরকারের ৯.৪৮% শেয়ার রয়েছে। বোর্ড অব ডিরেক্টরে সরকারের বর্তমান ও সাবেক একাধিক উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা প্রতিনিধি রয়েছে। যার কারণে সরকারের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে তাঁরা সরাসরি ভূমিকা পালন করে থাকে। এই বিষয়টিও ‘২০৪০ সালের মধ্যে তামাক মুক্ত বাংলাদেশ’গড়ার প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার সাথে সাংঘর্ষিক।

সরকারকে অবিলম্বে, দেশকে তামাক মুক্ত ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য যে বিষয়গুলি সাংঘর্ষিক ও স্ব-বিরোধী সেই জায়গা হতে সরে আসতে হবে। নিজেদের প্রত্যাহার করতে হবে। নতুবা যতোই রোড ম্যাপ ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক না কেনো তা ঘোষণা বাস্তবায়নে চুড়ান্তভাবে ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হবে। সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের যে ইতিবাচক অর্জন সেটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

আগামী প্রজন্মের জন্য তামাক মুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা আমার-আপনার সকলের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব সম্মিলিতভাবে পালনের মধ্যে দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

লেখক: উন্নয়ন কর্মী


এখানে শেয়ার বোতাম