শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৭
শীর্ষ সংবাদ

মক্কায় মুহাম্মদের সাম্যবাদী বিপ্লব

এখানে শেয়ার বোতাম

মাসকাওয়াথ আহসান::

মুহাম্মদ (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) মক্কার ধনী পরিবারেই জন্মান। কিন্তু নানারকম ভাগ্য বিপর্যয় বা জীবনের গতিপ্রকৃতির মাঝে উনি শূণ্য থেকে শুরু করে আবার কঠোর পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে নিজের অর্থনৈতিক অবস্থাকে শক্তপোক্ত করেন। কিন্তু মক্কার অন্য এলিটদের মত বালিতে মুখ গুঁজে অসাম্যের বেদনাদায়ক বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারেননি মুহাম্মদ। তাই তো ধনী-গরীবের সীমাহীন ব্যবধান এবং অধিকার বঞ্চিত মানুষের ট্র্যাজেডী তাকে ঘরে থাকতে দেয়নি। এদের ভাগ্য পরিবর্তন ও ‘দাস’ থেকে মানুষের মর্যাদায় অধিষ্ঠানের ব্রত নিয়ে তিনি হেরা গুহায় যান সংসার ফেলে।

হেরাগুহায় তিনি সারাক্ষণ ভেবেছেন সুষম সমাজের কথা; এই স্বপ্নের শক্তি আর গভীর আত্মপ্রত্যয় উনার মাঝে যে অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে; তার আলোকায়ন বদলে দেয় মুহাম্মদের জীবনের গতিপ্রকৃতি। নতুন এক মুহাম্মদের পুনর্জন্ম ঘটে যেন; মুহাম্মদ হয়ে পড়েন সাম্যের ও সততার সমাজ নির্মাণের বার্তাবাহক।

মক্কায় উনার নবজাগরণের ডাক অল্প কিছু সংখ্যক তরুণকে আকৃষ্ট করে। মক্কার ব্যবসায়ী শ্রেণীটি মুহাম্মদের এই আলোর আহবানকে অগ্রাহ্য করে। প্রথমে তেমন গুরুত্বও দেয় না। এখনকার নব্যধণিক ফাঁপা শ্রেণীর মতই মনোজগত ছিলো সেসময়ের মক্কার ব্যবসায়ী সমাজে। অতি সম্পদসঞ্জাত অতি আত্মবিশ্বাসের রোগীরা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা মুহাম্মদের কথাবার্তা। কারণ মক্কার ব্যবসায়ীদের লোক ঠকিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভ্যাস যে বরাবরই রয়েছে। এই ফাঁপা চিন্তা ভাবনার কারণে ইয়েমেন-জর্ডানে যে সব সম্পদশালী উপ-সভ্যতার উত্থান ঘটেছিলো সেগুলোও মুখ থুবড়ে পড়েছিলো ক্রমশঃ।

মুহাম্মদ উনার অল্পসংখ্যক অনুসারীদের নিয়ে কাবা গৃহে নিয়মিত মুক্ত আলোচনা আয়োজন করতে থাকেন। কুরানের আয়াতের অন্তর্নিহিত অর্থ, রুপক, প্রতীক; এগুলো ব্যাখ্যা করতে থাকেন তরুণ অনুসারীদের সামনে। তারাও আলোচনায় অংশ নিতে থাকে। মুহাম্মদ একটি বিষয় উপলব্ধি করেছিলেন, সামাজিক অসাম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে তোরা ও বাইবেলে মানুষের মুক্তির সুর্নিদিষ্ট পথনির্দেশনা আছে। অথচ ইহুদী ধর্মের বার্তাবাহক মুসা ও খ্রীস্টিয় ধর্মের বার্তাবাহক যীশুর মৃত্যুর পর উনাদের সাম্য ও সুষম সমাজদর্শন থেকে বিচ্যুত হয়ে ইহুদী ও খ্রীস্টানরা ঝুঁকে পড়ে সম্পদের পাহাড় তৈরীতে এবং কোথাও কোথাও তারা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে। এই একই ঘটনা অবশ্য ঘটেছে মুহাম্মদের মৃত্যুর পরেও। জীবনের সাম্য দর্শনটিকে বেমালুম হত্যা করে ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করে কী নৃশংস কর্মকান্ড ঘটছে আমরা প্রতিদিন তা অবলোকন করছি।

মুহাম্মদ কাবাগৃহের চিন্তাসভায় কুরানের আয়াত থেকেই সবাইকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, এই যে ছেলে সন্তানকে সম্পদ ভাবা হয় আর মেয়ে সন্তানদের হত্যা করা হয়; এটা বিরাট সামাজিক অনাচার। ছেলে-মেয়ে উভয়েই মানুষ এবং তাদের সমান অধিকার। মুহাম্মদ উনার ব্যক্তিগত জীবনেই এটা চর্চা করেছেন। তার স্ত্রী খাদিজা ক্ষমতায়িত নারী ছিলেন। নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি মুহাম্মদ তার অনুসারীদের মনে স্পষ্ট করেন।
কাবা গৃহের আলোচনাচক্রে মুহাম্মদ কুরানের আয়াত ব্যাখ্যা করেই প্রশ্ন উত্থাপন করেন, মক্কায় মানুষে মানুষে এতো ভেদাভেদ কেন? শুধু ধনীরাই কী মানুষ! দরিদ্র দাস-ভিক্ষুক-অধিকার বঞ্চিত বিধবা নারী-প্রতিবন্ধী মানুষ এদের মর্যাদা কোথায়! এরা তো পদে পদে বঞ্চিত-নিপীড়িত। এটি চিন্তার আলোড়ন তৈরী করে তারুণ্যের মাঝে। তারা মক্কার স্থানে স্থানে এ নিয়ে আলোচনা শুরু করে। অধিকার বঞ্চিত মানুষেরা এবারে অংশ নিতে শুরু করে মুহাম্মদের আলোচনা চক্রে।

এ বিষয়টিও মক্কার ব্যবসায়ী দুষ্টচক্র ও ক্ষমতা কাঠামোর চোখ এড়িয়ে যায়। কাবাগৃহে সমাজ বিপ্লবের প্রস্তুতি চলছে তা তারা তখনো ঠাহর করতে পারেনি। মুহাম্মদ এও বলেন, তিনটি টটেম বা মূর্তি সাজিয়ে রেখে তাদের ঈশ্বরের কন্যার পরিচয় দিয়ে মক্কার তীর্থ ব্যবসা জমিয়েছে কাবাগৃহে।অথচ সমাজে নিয়মিত কন্যা-শিশু হত্যা চলছে। অন্যান্য অনাচারও অবর্ণনীয়। এদিকে প্রত্যেক বছর দূর-দূরান্ত থেকে তীর্থযাত্রীরা আসে মক্কায়; এই তিনটি মূর্তিকে ঘিরে গড়ে ওঠা আচারে অংশ নিতে। পরিবর্তে মক্কার ঠিকাদার ও তাদের ক্যাডাররা তাদের কাছে চাঁদা আদায় করে, চড়ামূল্যে খাদ্য ও পানি বিক্রী করে, থাকার জন্য তাঁবুর নীচে এক চিলতে জায়গা দিয়ে লুটে নিতো চড়াদাম। এই লুন্ঠনের সংস্কৃতির অবসানের ডাক দিলেন মুহাম্মদ।

এই খবরে প্রথম বিচলিত বোধ করে মক্কার ব্যবসায়ী-ঠিকাদার-ক্যাডাররা।এই প্রথম মুহাম্মদ তাদের কালো ক্ষমতার ব্যবসাটিকে চ্যালেঞ্জ করছেন। মক্কার ঠিকাদার ও তাদের পেশীবহুল ক্যাডাররা মুহাম্মদের বিরুদ্ধে নানারকম গুজব ছড়াতে চেষ্টা করে। কিন্তু মুহাম্মদের যে যৌক্তিক কথাবার্তা, সমাজ সংস্কারের আহবান; তাকে পাগলামী বা ষড়যন্ত্র বলে প্রমাণ করা অসম্ভব ছিলো।

মুহাম্মদ এরপর তার কাবাগৃহের আলোচনা সভায় নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেন। সেসময় আজকের মতোই সুবিধাভোগী শ্রেণীর লোকেরা তাদের পূর্বপুরুষের কবরটিকে মাজারে রুপান্তর করে তাকে তাদের এলিট পরিবারের গর্বের চিহ্ন হিসেবে উপস্থাপন করতো। মুহাম্মদ আলোচনা সভায় উপস্থিত সবাইকে বোঝান, একজন মানুষ মারা গেছে মানেই সে মহান ছিলো তাতো নয়। তার জীবনের ন্যায়-অন্যায়ের হিসাব হবে সৃষ্টিকর্তার চূড়ান্ত বিচারের দিনে। কেউ-ই এই বিচার এড়াতে পারেনা। কোন ব্যক্তি বা তার পূর্বপুরুষ যদি মানবতা বিরোধী অপরাধ করে থাকে তাতো ধরা পড়ে যাবে। তাই এখনই বংশ মর্যাদা নিয়ে এতো গর্ব করার বা পূর্বপুরুষের কবরকে মাজার বানিয়ে এই লোকদেখানো ভক্তি নাটকের তো প্রয়োজন নেই। এই ধণিক শ্রেণীর বংশ লতিকা তৈরীর কাজটি করতেন আবু বকর। এক অর্থে তিনি ছিলেন মক্কার ইতিহাসবিদ। তিনিও যখন মুহাম্মদের এই যুক্তিতে এবং ইসলামের দর্শনে আস্থা স্থাপন করলেন; তখন ধণিক শ্রেণী বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যায়।

এবার মুহাম্মদের ওপর চূড়ান্ত ক্ষেপে যায় মক্কার ক্ষমতা কাঠামো। তাকে নির্বাসিত করা অথবা হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে এগোয় সর্বগোত্রীয় কালোটাকা ও পেশী শক্তির মালিকেরা। কিন্তু মুহাম্মদ যে হাশিম গোত্রের সন্তান ছিলেন সেটিও যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিলো। আর সে সময় একটি গোত্রের কাউকে হত্যা করলে; সেই গোত্র যেভাবেই হোক ঘাতক গোত্রের কাউকে হত্যা করতো। এটাই ছিলো মক্কার ‘চোখের বদলে চোখ রীতি’। মুহাম্মদ অবশ্য উনার শ্রোতাদের বলতেন, প্রতিশোধ নয়, ক্ষমাই মানুষকে মহৎ করে। ক্ষমাই সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ। কিন্তু মুহাম্মদের চাচা তালেব এরি মাঝে তাকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছিলেন। মুহাম্মদের সব ভাবনার সঙ্গে হয়তো উনি একমত পোষণ করতেন না। কিন্তু চাচা তালেবের ছেলে আলীকে মুহাম্মদ যেরকম স্নেহ আর শিক্ষা দিয়ে বড় করে তুলছিলেন; তা থেকে হাশিম গোত্রের প্রধান হিসেবে মুহাম্মদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে উঠলেন তিনি। বিভিন্ন গোত্রের প্রধানেরা তালেবের সঙ্গে দেখা করতে এলো মুহাম্মদকে মক্কার বাইরে কোথাও পাঠিয়ে দেবার দাবী নিয়ে। অথবা তাকে হত্যার প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিতে থাকলো নানা গোত্রের ক্যাডাররা। আবু জাহেল এরকম উদ্ধত প্রস্তাব নিয়ে আসায় মুহাম্মদের চাচা জানিয়ে দিলেন উনি যে কোন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। হাশিম গোত্রের সবাইকে প্রস্তুত করতে শুরু করলেন সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবেলার জন্য।
এরপর আবু সূফিয়ান নামে আরেক গোত্র প্রতিনিধি এলো অদ্ভুত এক প্রস্তাব নিয়ে। উমারা নামের গোলগাল সুন্দর এক ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে বললো, আমাদের গোত্রের এই ছেলেটিকে নিন আর মুহাম্মাদকে আমাদের গোত্রে হস্তান্তর করুন। আবু তালেব বললেন, আমি এই উমারাকে সন্তান স্নেহেই রাখবো; আর আপনারা মুহাম্মদকে হত্যা করবেন; সে তো আমি জানি। মনে মনে এও ভাবলেন, শুধু দেখতে সুন্দর হলেই কী হয়; মুহাম্মদের মত জ্ঞান এবং বাগ্মিতা কিছুই উমারার নেই।

এরি মাঝে মক্কায় বাতসরিক তীর্থ-উতসবের সময়টি প্রায় এসে গেলো। মক্কার এই তীর্থ-ব্যবসার ঠিকাদাররা দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেলো। এই গণজমায়েতে বক্তৃতা দিয়ে মুহাম্মদ আরো প্রভাবশালী হয়ে উঠলে মক্কার লুটেরা সম্প্রদায়ের কু-ব্যবসার পেটে লাথি পড়বে যে। মক্কায় এই যে বিরুপ একটি পরিস্থিতি তৈরী হলো মুহাম্মদকে ঘিরে; এটি সমাজ সংস্কারে আগ্রহী একজন বিপ্লবীর নিয়তি। হয়তো এই বাধাটি না পেলে উনি মক্কার একজন স্থানীয় বুদ্ধিজীবী হিসেবেই থেকে যেতেন। বাধার পাহাড়-প্রাচীর ঠেলেই হয়তো একজন আলোকসন্ধানীকে সাম্যবাদের জাগরণের কাজটি করতে হয়। মক্কার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ও সর্বগোত্রীয় লুন্ঠক সম্প্রদায় দিকে দিকে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে আজে-বাজে সব গুজব ছড়াতে থাকে। লুন্ঠকদের ক্যাডাররা মক্কায় আগত তীর্থ যাত্রীদের তাঁবুতে গিয়ে গিয়ে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রসূত্র প্রচার করতে থাকে হলদে মুখে। এখন এই তীর্থযাত্রীরা প্রতিবছর মক্কায় আসে; যে নোংরা ক্যাডারগুলো চাঁদা নেয়; যে অসত ব্যবসায়ীরা উচ্চমূল্যে খাদ্য-পানি বিক্রী করে মুনাফার পাহাড় গড়ে; তাদের প্রতি পুঞ্জীভুত ঘৃণা এবং ক্ষোভতো স্বাভাবিকভাবেই ছিলো তীর্থ যাত্রীদের মাঝে। ফলে শাপে বর হয় এই মুহাম্মদ বিরোধী হলুদ প্রচারণায়। নানাদেশ থেকে আগত মানুষের মুহাম্মদের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। তার কথা শুনতে ইচ্ছা হয়। কারণ মক্কার বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষেরা তো বলছে, মুহাম্মদ সামাজিক সুবিচার চান; প্রত্যেকটি মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চান।

লেখক : সাংবাদিক, সাংবাদিকতা শিক্ষক

 


এখানে শেয়ার বোতাম