শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৭
শীর্ষ সংবাদ

আপনাদের হিসাব দ্যান!

এখানে শেয়ার বোতাম

মারজিয়া প্রভা ::

স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেসার বিষয়ে দুদক বলেছেন, তারা “সুনির্দিষ্ট” অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নিবেন। কিন্তু সেজন্য “যথেষ্ট ডকুমেন্টস” থাকতে হবে। অনলাইনের বিভিন্ন বার্তা থেকে আমরা দেখতে পেয়েছি, তার কানাডাসহ বাংলাদেশে নিজস্ব একাধিক বাড়ি, ভুমি এবং ব্যাংকে ব্যক্তি মালিকানায় প্রচুর অর্থ রয়েছে এমন তথ্য উঠে এসেছে। কিন্তু সেগুলো অবশ্যই “সুনির্দিষ্ট” না। জনগণের সন্দেহ। দীর্ঘদিন আমলাতান্ত্রিক শাসনামলে লুটপাট দেখতে দেখতে সন্দেহের ফলাফল এই বার্তা। তাই তাতে যথেষ্ঠ ডকুমেন্টস থাকার কথা না।

কিন্তু ধরেন নাগরিক হিসেবে আমি যদি যথেষ্ঠ ডকুমেন্টস সংগ্রহ করে দুদকে তফসিলভুক্ত অপরাধ হিসেবে অভিযোগ করতে চাই তবে আমি যেসব সংকট সামনে দেখছি সেইটা নিয়েই এই লেখাটা লিখছি।

১৯৭৯ সালে সরকারি কর্মচারীর বিধিমালাতে পরিস্কার উল্লেখ আছে, একজন সরকারী কর্মচারী, সে ক্যাডার বা নন ক্যাডার হোক, বা যেকোন পদে অধিষ্ঠিত হোক, তাকে চাকরির শুরুতেই নিজের এবং পরিবারের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব দিতে হবে। এবং প্রতি ৫ বছর পরে পরে সেই হিসাব বিবরণী হালনাগাদ করতে হবে। শুধু বিবরণী হালনাগাদ নয়, তা পর্যালোচনার নির্দেশনাও আছে। এবং সে কোন নতুন সম্পত্তি কিনতে চাইলে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে।

বাস্তবতা হচ্ছে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ তথা টিআইবির ২০১৯ এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী ১৯৭৯ থেকে ২oo৮ অব্ধি কোন সরকারি কর্মচারি কোন প্রকার সম্পত্তি এর হিসাব বিবরণী দেননি। তত্ত্বাবধায়ক শাসনামল ২oo৮ এ তাদের হিসাব বিবরণী দিতে হয়েছে। তারপর আওয়ামী শাসনের এই এক যুগের বেশি সময়ে তাদের অন্তত দুইবার হিসাব বিবরণী দেবার কথা বিধিমালা অনুযায়ী। তারা দেয়নি। নেওয়ার উদ্যোগও ছিল না। ২o১৫ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের উদ্যোগে ভুমি মন্ত্রানালয়ের কিছু কর্মচারীর হিসেব নেওয়া হয় কেবল। সে তথ্যও পর্যালোচনা করে জনগণের সামনে আসেনি।

২o১৯ এ জনপ্রশাসন মন্ত্রানালয় আবার উদ্যোগ নেয় সরকারি কর্মচারীদের হিসাব বিবরণী নেবার। সেইজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবার কথা কথা গণমাধ্যমে উঠে এলেও, সে কাজের কোন অগ্রগতি আমরা জানি না। আজ দুই বছর হলো। আমরা সরকারি কর্মচারীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির কোন তথ্য পাইনি।

এর মধ্যে টিআইবির উল্লেখিত গবেষণা দেখিয়েছে, বিধিমালার ভয়ে প্রচুর কর্মচারী নতুন সম্পত্তি অনুমোদনবিহীনভাবে কিনেছে। কিন্তু সেইটা নিজের নামে না। পরিবারের সদস্যদের নামে। যেমনঃ স্বামী, স্ত্রী কিংবা সন্তানাদির নামে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে সচিব, মন্ত্রীরা অভিযোগ করেছে যে, তারা আয়কর রিটার্ন দিচ্ছে। আবার হিসাব বিবরণী কেন দিবে? যারা আয়কর রিটার্ন দেন এবং কাজ করেন, জানেন সেখানে সত্যিকারের সম্পত্তির হিসাবের উল্লেখ কখনোই থাকে না। বরং প্রথম আলোর ২০২০ সালের ২৮ মার্চে প্রকাশিত “দেশে সোয়া দুই কোটি টাকার বেশি সম্পদ মাত্র ১৩ হাজার মানুষের” প্রতিবেদনে আমরা দেখি, ৮০ এর দশকে কেনা সম্পত্তির বিপরীতে যখন সরকারী কর্মচারীরা আয়কর রিটার্ন দেখান, তখন সরকারি কর্মচারীরা বর্তমান মুল্য না দেখিয়ে সেই ৮০ এর দশকের অর্থমুল্য দেখান। অথচ জমির দাম এই ত্রিশ বছরে তিন থেকে চারগুণ বেড়েছে। বর্তমান মুল্য উপ্সথাপন করলে সারচার্জ মুল্য দিতে তারা বাধ্য থাকত। কিন্তু আইনের মারপ্যাচে তাদের কোন সারচার্জ মুল্য দিতে হয়না। অর্থাৎ যে দাবি তারা করছে, আয়কর রিটার্ন থাকলে সম্পত্তির হিসাব দিতে হবে না, সেই দাবিটি সম্পূর্ণ অমুলক। কারণ আয়কর রিটার্নে তাদের জন্য বড় অংক টাকা চুরির “আইনি মারপ্যাচ” এর সুবিধা রয়েছে।

অত্যন্ত আশ্চর্যের যে, জনগণের টাকায় সরকারি কর্মচারী আমলাগণ জনগণের সার্ভিসে নিয়োজিত থেকে জনগণকে তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করে। জনগণের সন্দেহ আসাটা অমুলক নয়!

যদি একজন সাধারন নাগরিক হিসেবে, আমি কাজী জেবুন্নেসাসহ অন্য সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চাই, তবে তার তথ্য কোথায় পাবো? যথেষ্ট ডকুমেন্টস কোথায় পাবো?

জনগণের তথ্য অধিকার ব্যবহার করে আরটিআই ওয়েবসাইট থেকে সম্পত্তির হিসাব যদি চাই, তবে সেখানে সংকট কি কি? সরকারি এই ওয়েবসাইট নিজেই প্রকাশ করে রেখেছে যে, ২৫৮৯৩ টি আবেদনের বিপরীতে ওনারা মাত্র ১১১টি আবেদনের উত্তর দিয়েছে। মানে এক বিশাল সংখ্যক অভিযোগের কোন কুল কিনারা নেই। তথ্য পায়নি প্রায় ৯৯% আবেদনকারী। এই হচ্ছে জনগণের তথ্য অধিকার।
ধরেন যথেষ্ট তথ্য যদি আপনি পেয়েও গেলেন! তবুও কি অভিযোগ করতে পারবেন?

আমলাদের দুর্নীতি কোন গোপন ইস্যু নয়, এইটি বরং ওপেন সিক্রেট ইস্যু। কিন্তু এই ওপেন সিক্রেট ইস্যু নিয়ে যথেষ্ঠ প্রমাণাদিও যদি আপনি যোগাড় করতে পারেন, তবুও অভিযোগ করতে পারবেন না। কারণ অভিযোগের জন্য আপনাকে সরকারের অনুমতি নিতে হবে ফৌজদারি বিধি ১৮৯৮ অনুযায়ী। ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট বা কোনো সরকারি কর্মকর্তার কর্তব্য বা দায়িত্ব পালনে কৃত বা এ মর্মে দাবিকৃত কোনো কাজের জন্য সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো অপরাধ আমলে গ্রহণ করা যাবে না।

“সুনির্দিষ্ট অভিযোগ”, “যথেষ্ট প্রমাণ” এবং “সরকারের অনুমোদন” এই তিনটি বিষয় পূর্ণ করতে পারলেই কেবল আমলাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করা সম্ভব। নিয়মহীন শাসন ব্যবস্থায় এই “নিয়ম” মেনে অভিযোগ করা প্রায় অসম্ভব। আর তাই আমরা জানি, বাংলাদেশের বিশাল প্রাচুর্যের সম্পদের মালিক এই আমলারা হওয়া স্বত্তেও, সেই বিষয়ে আমাদের হাতে লিখিত অলিখিত অনেক তথ্য থাকলেও সেইগুলোকে কোন নাগরিকের পক্ষে “অভিযোগ” এ রুপান্তর করা সম্ভব নয়।

যে টাকায় কৃষকের ঘাম আছে, যে টাকায় গার্মেন্টস শ্রমিকের কাটা আঙ্গুলের রক্ত লেগে আছে, যে টাকায় হাজার হাজার পাটশ্রমিকের অভুক্ততা জড়িয়ে আছে, যে টাকায় আমার আপনার প্রতিদিনের শ্রম জড়িত, সেই টাকায় সরকারী কর্মচারী, আমলা এবং মন্ত্রীদের বিপুল প্রাচুর্য তৈরি হয়েছে। অথচ আমি আপনি কেউ এদের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারছি না। ক্ষমতাসীন সরকার এবং রাষ্ট্র তার আইন, প্রশাসন এমনভাবে তৈরি করে রেখেছে যেখানে নাগরিক হিসেবে আমাদের টাকা নিয়ে কি নয়ছয় হচ্ছে তা জানা বা জবাব চাওয়ার অধিকার আমাদের নাই!

এই মুহুর্তে কোন প্রকার তর্ক বিতর্ক ছাড়াই, সাধারণ নাগরিকের উচিত কাজী জেবুন্নেসা সহ স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের অন্যান্য কর্মচারী এবং সকল সরকারি কর্মচারীর স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব চাওয়া। কেবল হিসাব বিবরণী নয়, তার ধারাবাহিক পর্যালোচনা প্রকাশিত হতে হবে জনগণের সামনে। আমরা জানতে চাই, কিভাবে টাকার কুমীর হয়ে উঠছে এই আমলারা!

আমাদের একটাই কথা, হিসাব দ্যান।

লেখক: অনলাইন এক্টিভিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী


এখানে শেয়ার বোতাম