শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৭
শীর্ষ সংবাদ

চারু মজুমদারের জন্মদিনে শ্রদ্ধা

এখানে শেয়ার বোতাম

সৌভিক রেজা ::

মহামতি কমরেড লেনিন বলেছিলেন, ‘জনগণের প্রকৃত শিক্ষাকে তাদের নিজেদের স্বাধীন, রাজনৈতিক এবং বিপ্লবী সংগ্রাম থেকে কোনোভাবে পৃথক কর যায় না’। কেন যায় না—তার কারণ সম্পর্কে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘কেবল সংগ্রামই শিক্ষিত করে তোলে শোষিত শ্রেণিকে’।

২.

এই অমোঘ সত্যিটাকে ভারতবর্ষের নানা রঙের কমিউনিস্ট নামধারী পার্টিগুলো যখন সংসদীয় রাজনীতির অন্ধকার গলিতে ভুলতে বসেছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে কমরেড চারু মজুমদারের আবির্ভাব।

এটা মনে করবার কোনো কারণ নেই যে এই আবির্ভাব ছিলো হঠাৎ, অতর্কিত। এরও একটি ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে। ইতিহাসের সেই পথ বেয়ে এগিয়ে এসেছিলেন চারু মজুমদার।

৩.

চারু মজুমদারের শিক্ষাকে চেতনায় ধারণ করতে হলে তার সেই আটটি দলিলের কথা আমাদের বারবারই স্মরণে রাখতে হবে। এটা ছাড়া চারু মজুমদারের রাজনৈতিক দর্শনকে উপলব্ধি করা যাবে না। চারু মজুমদারের মহাপরিকল্পনার একটি অংশ ছিলো ভারতবর্ষে বিপ্লব সংঘটিত করা, সেই বিপ্লবে তিনি চেয়েছিলেন মেহনতি মানুষের অংশগ্রহণ আর তার চেহারাটা হবে সশস্ত্র। এটিও চারু মজুমদার পেয়েছিলেন তার ইতিহাসচেতনার অভিজ্ঞতা থেকে।

৪.

এই উপমহাদেশের কমিউনিস্টদের কর্তব্য স্থির করবার বিষয়ে চারু মজুমদার প্রথমেই জানিয়েছিলেন, ‘ভারতবর্ষের বিপ্লবের প্রধান ভিত্তি হচ্ছে কৃষি বিপ্লব’। এই কৃষি বিপ্লবকে সামনে রেখেই তিনি রাজনৈতিক কর্তব্যের পথ নির্ধারণ করতে চেয়েছিলেন। আর এর মাধ্যমেই কৃষক-শ্রমিক থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে উপযুক্ত রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে চেষ্টা চালিয়েছিলেন।

৫.

চারু মজুমদার বর্তমানের শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিতে গিয়ে অতীতের শিক্ষা আর অভিজ্ঞতাকে নানাভাবে কাজে লাগাতে চেয়েছিলে। এইভাবে অতীত আর বর্তমানের যৌথতায় তিনি ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন। এখানেই চারু মজুমদারের জ্ঞানকাণ্ডের পরিচয় মেলে। শুধু জ্ঞানকাণ্ডকেই নয়, তিনি এক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক কাণ্ডজ্ঞানকেও কাজে লাগিয়েছিলেন। আর তার ফলেই সংশোধনবাদকে চিহ্নিত করতে তার অসুবিধা হয়নি।

তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, সংশোধনবাদ হচ্ছে সেই জিনিস যা জনগণের বিপ্লবী চেতনাকে খণ্ডবিখণ্ড করে তাকে ‘মধ্যবিত্তসুলভ স্বপ্নবিলাসিতায়’ পরিণত করে। বিপ্লবের পথে নানা ধরনের ধুম্রজাল সৃষ্টি করে আসল পথের নিশানা মুছে ফেলতে চায়।

৬.

এসবের বিপরীতে দাঁড়িয়ে চারু মজুমদার এগিয়ে এসেছিলেন, তার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে, একত্রে একটি সঠিক বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার কাজে হাত লাগাতে। যে পার্টি সংশোধনবাদ-সাম্রাজ্যবাদের পরিপোষক অংশটিকে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে পরাজিত করার জন্যে, শাসক বুর্জোয়া শ্রেণিকে ধ্বংস করার জন্যে গ্রামে-গ্রামে সংগঠন গড়ে তুলবে।

আর এভাবেই তিনি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ তৈরি করে বলিষ্ঠভাবে বিপ্লবের লাল পতাকা উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

৭.

ভারতবর্ষের ইতিহাসে চারু মজুমদার হলেন সেই নেতা, যিনি সোচ্চার কণ্ঠে বলতে পেরেছিলেন, ‘কৃষি বিপ্লব আজকের এই মুহূর্তের কাজ। এ কাজ ফেলে রাখা যায় না এবং এ কাজ না করে কৃষকের কোনোই উপকার করা যায় না’।

কিন্তু তারও আগে আরেকটি কর্তব্যের কথা তিনি স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেননি, সেটা হচ্ছে, রাষ্ট্রশক্তিকে চূর্ণবিচূর্ণ করার মধ্যে দিয়ে তার চূড়ান্ত ধ্বংস সাধন করা। তিনি সঠিকভাবেই কর্মপন্থা নির্ধারণ করে বলতে পেরেছিলেন, ‘রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধ্বংস করার কাজ আজ কৃষক আন্দোলনের প্রথম ও প্রধানতম কাজ’। সেই কাজের শুরুতেই তাই চিনের ‘পিপলস্ ডেইলি’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে ৫ জুলাই ১৯৬৭ সালের সংখ্যায় উজ্জ্বলভাবে লেখা হয়েছিল, ‘প্রচণ্ড গর্জনে ভারতের বুকে ধ্বনিত হয়েছে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ।…ভারতীয় জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামের পক্ষে এটি এক প্রচণ্ড তাৎপর্যপূর্ণ বিকাশ’।

এটি শুধুই কথার কথা ছিলো না। বাস্তবেও আমার তার চেহারা দেখতে পেয়েছিলাম। বিরতিহীনভাবে সেই সংগ্রাম এখনও চলছে।

৮.

সেই কাজ সংঘটিত করবার মধ্যে দিয়ে তিনি ভারতবর্ষে সশস্ত্র কমিউনিস্ট বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। নানা কারণে সমাপ্তিটা দেখে যেতে পারেননি। তার মানে এটা নয় যে, তিনি ভুল করেছিলেন কিংবা ব্যর্থ হয়েছিলেন। বিপ্লবের ইতিহাসে ব্যর্থতা বলে কিছু নেই। প্রতিটি ব্যর্থ বিপ্লব ভবিষ্যতের নতুন বিপ্লবের সূচনাবিন্দু! এটা যদি মনে রাখি, তাহলে আমাদের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য হচ্ছে চারু মজুমদারের শিক্ষাকে ধারণ করে সামনের দিক এগিয়ে চলা। কেন না, বিপ্লবের রাস্তা সবসময়ই সামনে, পেছনের অন্ধকার অলিগলিতে নয়।

৯.

বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও গবেষক পুলক চন্দ সেই ১৯৭৭ সালে লিখেছিলেন, ‘ষাটের দশকের মাঝামাঝি বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ শোনা গিয়েছিল নকশালবাড়িতে। প্রধানত তারই প্রেরণায় ষাটের শেষ ও সত্তরের প্রথম কয়েক বছরে নতুন আন্দোলনের প্রবল তরঙ্গ উঠেছিল শহর ও গ্রামাঞ্চলে। শোনা গিয়েছিল সশস্ত্র কৃষিবিপ্লবের ধ্বনি’। সেই কথাটিকে আরো একটু সবিস্তারে নিয়ে গিয়ে পুলক চন্দো এও বলেছিলেন, ‘প্রাথমিকভাবে সত্তরের দশক যে গতানুগতিক কোনো দশক নয়, একটি সামগ্রিক বিদ্রোহের দশক, এ কথাটা অনস্বীকার্য’।

১০.

চারু মজুমদারের জন্মদিনে তাকে জানাই শ্রদ্ধা ও লাল সালাম! আমরা আপনাকে ভুলি নাই কমরেড! ভারতবর্ষের প্রতিটি বিপ্লবীর শরীরের শেষ রক্তবিন্দুর নাম—কমরেড চারু মজুমদার!

সৌভিক রেজা: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


এখানে শেয়ার বোতাম