শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৭
শীর্ষ সংবাদ

ভূয়া লকডাউন, ভূয়া প্রতিশ্রুতি, আসল রাষ্ট!

এখানে শেয়ার বোতাম

সজিব তুষার::

বিশ্বজুড়ে মহামারী করোনার প্রকোপে দেশে দেশে লকডাউনের ফলে বন্ধ হয়ে আছে জনসমাগম। দেশের বিত্তশালী তথা উচ্চবিত্তের ছুটির দিন। এদিকে কোনমতে ডাল-ভাত খেয়ে অভিশপ্ত দিনগুলো পার করছে মধ্যবিত্তরা; পত্র-পত্রিকার পাতায় পাতায় ধেয়ে আসছে নিম্নবিত্তদের রোনাজারি। এসব হিসেব কষতে কষতে লাপাত্তা-ই হয়ে আছে উদ্বাস্তুদের তালিকা। সরকার কিম্বা প্রচার মাধ্যমেরও চোখ যেন বন্ধ হয়ে যায় রাজধানীর ফুটপাত ও পার্কগুলোর সামনে আসলে। স্বাভাবিক(!) দিনগুলোতে ভিক্ষা-হকারী করে কোনমতে এক আধ বেলা খাবার- পেটে জুটলেও এমন মহামারীকালে আর কি উপায় থাকে পেটে পাথর বেঁধে রাখা ছাড়া।

কে ফেসবুকে কী লিখলও কে কার অনুভূতিতে আঘাত করলো এসব তদারকিই যেন ভোটের বিনিময়ে(!) পাওয়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নাগরিকদের একমাত্র মৌলিক অধিকার। মানে রাষ্ট্রের নজরের বাইরেই পড়ে রইলো একটা বিশাল জনসংখ্যার উদ্বাস্তু শ্রেণি। অশিক্ষিত-মূর্খ একটি শিশু যখন জাতীয় গণমাধ্যমের ক্যামেরার চোখে চোখ রেখে বলে দিল, “মন্ত্রী যে লকডাউন দিয়েছে এ ভূয়া লকডাউন। সামনে ঈদ। মানুষ খাবে কি?” এই প্রশ্ন যেন ইথার তরঙ্গে ভেসে আমাদের কানে নিয়ে আসলো অন্য এক ভাবনা; একটা জাতি শুনতে পেল – এই রাষ্ট্র ব্যর্থ; আমার ভরণপোষণের দায়িত্ব এই রাষ্ট্র নিতে পারেনা।

এখন যদি প্রশ্ন করা হয়, কেন এ রাষ্ট্র ব্যর্থ? এর উত্তর কি খুব কঠিন হয়ে যাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য? কোন বছরেই বা ব্যাংক-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্যে ঘাটতি বাজেটে সংকট দেখা দিয়েছে? গ্রামীনফোন, রবি, এয়ারটেলের ইনকাম ট্যাক্সের টাকা না নিয়েও অনায়াসে বড় বড় বাজেট উত্থাপিত তো হচ্ছেই। গতবছরের দরিদ্র – হতদরিদ্রদের জন্য দেওয়া ত্রাণের বাজেট অর্ধেক পরিমাণও তো বণ্টন হয়নি। সেই টাকা গুলোতো নিশ্চয়ই থাকার কথা ‘নগদ’ কর্তৃপক্ষের কাছে। নাকি এগুলোও সাবেক অর্থমন্ত্রীর কথার সেই ‘মামুলি বাত’ হয়ে উড়ে গেছে অন্য কারো খোঁয়াড়ে।

মহামারী প্রকোপ ঠেকাতে স্বাস্থ্যবিধি মাথায় রেখে লকডাউন দেওয়া নিঃসন্দেহে যৌক্তিক। কিন্তু পেটের লকডাউন দেওয়াও কি রাষ্ট্রে নাগরিক হওয়ার পূর্বশর্ত? একটা সরকারি অফিসের একদিনের চায়ের বিল দিয়ে অন্তত একটা তিন জনের পরিবার খেয়ে পরে স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচতে পারবে দু-এক বছর। কিম্বা রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটা বালিশে যে সাত হাজার টাকা বিল আসবে তা দিয়ে দুই মাসের শক্ত বাজার করতে পারবে অনায়াসে। বিশ্বের এক নম্বর ধনী দেশের তালিকাতেই তো আমাদের থাকার কথা, যেখানে একটা চা চামচ কেনা হয় হাজার টাকার বেশি দামে। তবুও এত ‘নেই-নেই’ কেন?

গুলিস্তান পার্কের কিছু পথ-শিশুদের সাথে আলাপ হলে জানা যায়, লকডাউনে তাদের ফুল, পানি, চা-পান বিক্রয় বন্ধ। পানি বিক্রেতা পথ-শিশু মোহাম্মদ খাজার সাথে গল্প করলে জানা যায়, আগে পানি বেঁচে বোতলে দু-এক টাকা পেত। সারাদিনে ৪০-৫০ টাকা রোজগার হলে পার্কে অবস্থিত ভাত বিক্রেতা খালাদের থেকে বলে টলে এক বেলা খেতে পারতো। এখন সেটা হচ্ছে না। মাঝে মাঝে কিছু সংগঠন এসে তাদেরকে এক বেলা খাইয়ে যায়। খাদ্যহীনতায় অনেকেই ইতোমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় চললে না খেয়েই মরতে হবে বলে জানায় মোহাম্মদ খাজা।

মন্ত্রী এমপিদের কথা আমলে নিলে বাংলাদেশ এখন সিংগাপুর কিম্বা মালয়েশিয়ার মতোই হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ওই সব দেশগুলো কি জানে তাদের দেশকে কিসের সাথে মিশিয়ে ফেলা হচ্ছে? অনেক চেষ্টা করেও এই হতভাগা পথ-শিশুদের চেহারার সাথে মালয়েশিয়ার কারো চেহারা মিলাতে পারি না। স্বাস্থ্যের কথাতো বাদই দিলাম। কিছুদিন আগে একজন শ্রমিকের বক্তব্য সারাদেশের মানুষের হৃদয়ে আঁচড় কেটে যায়, ‘ক্ষিদেয় মরার চেয়ে করোনায় মরি এটাই ভালো।’

শরীর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালানো যায়, ক্ষুধাতো স্বাস্থ্যবিধি কখনই মানবেনা। দেশের একটা সিংহভাগ নাগরিক নির্ভরশীল দৈনিক আয়ের উপর। লকডাউনের ফলে আয় রোজগারহীন হয়ে পড়েছে অনেকেই। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশের বৃহৎ শহরগুলোর পথে লুকা-ছুপির মাধ্যমে চলছে গুটিকয়েক রিক্সা-সিএনজি। এদিকে পুলিশের হাতে ধরা পড়লে খোয়া যাচ্ছে মূলধন বাহনটিও। দ্বিতীয় দফার এই লকডাউনের প্রথম দিনেই দেশের বিভিন্ন শহরে জব্দ করা হয়েছে কয়েক শত রিক্সা ও সিএনজি। প্রথম বারের লকডাউনে টুকটাক ত্রাণ পেলেও এবার পাচ্ছেন না কিছুই। বরিশালের রিক্সা শ্রমিকরা রিক্সা নিয়ে বিক্ষোভ করেছে ত্রাণের জন্য। মানুষের এই আহাজারিগুলো শোনার কে আছে এই রাষ্ট্রে। প্রধানমন্ত্রীতো দূরের কথা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ধারে কাছে যাওয়ার মত ব্যবস্থা নেই। এই উদ্বাস্তুরা- এই ঘামজীবী মানুষেরা যাবে কার কাছে!

এই রাষ্ট্রে একটা সংবিধান আছে। মৌলিক অধিকারের প্রতিশ্রুতিও লিখে রাখা আছে। ভোটের সময় বাড়ি বাড়ি গিয়ে, লিফলেট-ফেস্টুন জাঁকিয়ে প্রতিনিধিরা বলে আসেন, এই নির্বাচনে জয়ী হলে একটা মানুষও থাকবে না ভুখা। অথচ ‘৭১ থেকে দেখলেও এখন অব্ধি কত শত শত নির্বাচন হল; প্রতিনিধিরা সেকেন্ড হোম থার্ড হোম করলেন উন্নত বিশ্বে। কিন্তু এই উদ্বাস্তুরা তাদের ফার্স্ট হোমই নিশ্চিত করতে পারেনি আজও। নদীতে তলিয়ে যাওয়া বসত ভিটা চরে উঠলেও দখল করে নেয় অন্য কেউ। দিনশেষে নিজের শরীরেই থেকে যাচ্ছে পরজীবীর মত। অথচ উকুনও স্বয়ংসম্পূর্ণ তার বাস্তুসংস্থানে। কিন্তু আজও খাদ্য নিশ্চয়তা বিধান হয়নি দেশের এই মনুষ্য পরজীবীদের।

দেশ কি তাহলে খাদ্য সংকটাপন্ন দেশ সমূহের তালিকায়! তবে প্রধানমন্ত্রী যে বলেন, বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ(!) তা কি মিথ্যা! এদিকে দেশের সরকারি ওয়েবসাইটও বলছে একই কথা। ২০ এপ্রিল ২০২১ তারিখ পর্যন্ত খাদ্যশস্যের সরকারি মোট মজুদ ০৪.৬২ লক্ষ্য মেট্রিক টন। এর মধ্যে ০৩.১১লক্ষ্য মেট্রিক টন চাল এবং গম আছে ১.৫১ লক্ষ্য মেট্রিক টন। এ শুধু মজুদ-কৃত খাদ্যের হিসেব গেল। প্রতিবছর চা, পাট, চিংড়ি, আম, সূর্যমুখীসহ হাজারো অর্থকরী ফসল উৎপাদন হচ্ছে। এসবে চোখ বন্ধ করে রাখলেও এক পদ্মা সেতু নির্মাণে যেই পরিমাণ টাকা জালিয়াতি করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে; এগুলো থাকলেই আঠারো কোটি জনসংখ্যার কয়েক বছরের সুষম খাদ্যের যোগান হয়ে যেত অনায়াসে।

স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন বলেছিলেন-
‘খাদ্যের অভাবে পৃথিবীতে কখনো দুর্ভিক্ষ হয়নি, হয়েছে সুষম বণ্টনের অভাবে।’

এ কথাটা মাথায় রেখে দু মিনিট ভাবলেই পেয়ে যাবো এর সত্যতা। এবছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সমাজ সেবা পুরষ্কারে ভূষিত হওয়া স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শাহ আলম নিজের স্ত্রী-শেলকসহ আত্মীয়স্বজন প্রায় ২০ জনের নাম দিয়েছিলেন দুস্থ-হতদরিদ্রদের অর্থ ত্রাণের তালিকায়। এই হল একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সুষম বণ্টনের চিত্র। একজন রক্ষক যখন ভক্ষক হন তখন নিজেদেরকে সপে দেওয়া ছাড়া আর কি করার থাকে সাধারণ জনগণের।

এই যে এত এত ব্যর্থতা নিয়েও সরকার উন্নয়নের বুলি আওড়িয়েই চলেছেন। দেশবাসীকে ভাসিয়ে দিচ্ছেন উন্নয়নের জোয়ারে। একদিকে পদ্মাসেতু, একদিকে মেট্রোরেল, একদিকে পায়রা বিদ্যুৎ প্রকল্প। এত এত উন্নয়ন তবুও মানুষ একটা ভয়াবহ অনিশ্চয়তায় পড়ে আছে। আজ চাকা ঘুরেনই কাল হাড়িতে বসাবো কি! এমনসব সংশয় নিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও কাজ করতে প্রস্তুত অনেকেই।

প্রথম দফায় করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরলে সাধারণ মানুষ দীর্ঘ বন্দী জীবনের মুক্তির পর অতিরিক্ত পয়সা খরচ করেছেন জীবনযাপনে। স্বাভাবিকভাবে ভাবে থাকতে পারেন করোনার সেকেন্ড ওয়েভও আসতে পারে সামনে। ফলে সঞ্চয়ের চিন্তা মাথায় রাখতে পারেনি আর। যার ফলে দ্বিতীয় দফার লকডাউনের করুন পরিস্থিতিতে হতবিহবল হয়ে পড়েছে অনেকেই। এই দায় রাষ্ট্র কোনভাবেই এড়াতে পারে না। নাগরিকের খাদ্য নিশ্চয়তা না থাকলে এই পদ্মা সেতু এই মেট্রোরেলসহ ভুরি ভুরি উন্নয়ন দিয়ে করবে টা কি!

মানুষের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করে কোনও উন্নয়নই সাধারণ জনগণ মানবেনা। ইতিহাস বলে ক্ষুধার্ত পেট কোনও আইন কখনই মানেনি কখনও মানবেও না। ঠিক একই সূত্রে মানুষ তার পেটের দায়ে আইন ভাঙার ফন্দী ফিকির করছে; প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিচ্ছে। এদিকে রাষ্ট্র মানুষের খাদ্যের নিশ্চয়তা না দিয়ে লাঠি গুলি দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের উপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। চলতি মাসে চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে টার্গেট প্র্যাকটিসের মত গুলি করে কেড়ে নেওয়া হলও ৫ শ্রমিকের জান। তাদের দোষ কি ছিলও? নিজের পাওনা বেতনও কেউ চাইতে পারবেনা? সরকার যা ইচ্ছা আইন করবে যাকে ইচ্ছা খুশি করবে যাকে ইচ্ছা পাখির মত গুলি করে মেরে ফেলবে; এমনটা-তো হতে পারেনা। গণতন্ত্রের মুলা ঝুলিয়ে এমন স্বেচ্ছাচারিতা ফলাও না করে রাষ্ট্রের কাঠামো টাই বদলে দিলেও তো পারে। অন্তত মানুষ স্বেচ্ছা মৃত্যুতে উদ্ধত হবে না।

করোনার এই লকডাউন পরিস্থিতিতে দমন পীড়ন আইন দিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ না করে মানুষের খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধান করাই- হওয়া উচিৎ সরকারের মূল লক্ষ্য। ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে বেগবান করে পাড়ায় মহল্লায় ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম তৈরি করে সুষম বণ্টনের দিকে অগ্রসর হওয়া। অতিশীঘ্রই দুস্থ-দরিদ্র- মধ্যবিত্তের বিশেষ তালিকা করে অন্তত এক মাসের খাদ্যের যোগানে নিশ্চয়তা দিয়ে সারাদেশে কঠোর লকডাউন ঘোষণা দিলে সাধারণ মানুষ সহজেই তা মেনে নিতো। তার সাথে সাথে স্বাস্থ্যে মনোযোগ বাড়িয়ে পর্যাপ্ত আইসিইউ এবং করোনা টেস্টের মাধ্যমে সু-চিকিৎসার নিশ্চয়তা বিধান করা এখন সময়ের দাবী। চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, উৎপাদনসহ সব সেক্টরের মান-উন্নয়ন, পর্যাপ্ত জনবল এবং জনশক্তিতে মনোযোগ না বাড়ালে বৃহৎ সংকট করোনা-ই নয় স্বাভাবিক জ্বর-সর্দিতেই খোয়াতে হবে নাগরিক জীবন। এসব সংকট নিরসনে রাষ্ট্রের ব্যবসায়ী এবং ব্যক্তি-স্বার্থের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে নাগরিক-বান্ধব উদ্যোগ এবং নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা স্বীকার করে- রাষ্ট্রীয় স্বার্থে মনোযোগ দিতে হবে। অন্যথায় আসন্ন দিনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে শেক্সপিয়ারের লাইন-

“Something is rotten in the state of Denmark.(ডেনমার্কের স্থানে পড়ুন বাংলাদেশ)”।

লেখক : সাংবাদিক


এখানে শেয়ার বোতাম