শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৭
শীর্ষ সংবাদ

বসুন্ধরার ভুমি দস্যুরা আমার স্বাক্ষর নয়, টিপসই নিয়েছিলো

এখানে শেয়ার বোতাম

সাবিনা শারমিন:: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স থেকে ব্যবস্থাপক, প্রশিক্ষণ পদ থেকে স্বেচ্ছায় চাকুরী ছেড়ে আসলেও সেখানে আমার প্রথম জব ছিলো ফ্লাইট সার্ভিস এর কেবিন ক্রু ! এই পেশাটি আমার ঊনিশ বছর বয়সের কিশোরী সময় কালের পেশা, যখন আমি ঢাবির প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলাম। ১৯৯৩ থেকে ২০০০ পর্যন্ত আমি সে পেশায় কর্মরত ছিলাম। সে সময় আমার এক দুলাভাইয়ের পরামর্শে সে জব থেকে সঞ্চিত অর্থ , দুই লক্ষ আশি হাজার টাকায় ১৯৯৬ সনে বাড্ডা বেড়াইত, কাঠালদিয়ায় সাড়ে চার শতাংশ ধানের জমি কিনি।

বৈষয়িক বিষয়ে তখন অতোটা আগ্রহ না থাকলেও আব্বা এবং দুলাভাইয়ের কথায় রাজী হয়ে জমি কিনে আমি আনন্দিতই ছিলাম। কারণ অনেকদিন পর পর সেখানে বেড়াতে যাওয়া হতো। জায়গাটি বাড্ডার মূল রাস্তা থেকে অনেক ভেতরে ছিলো। অনেকক্ষণ হাঁটতে হতো গ্রামের রাস্তা ধরে। তারপর আবার নৌকা নিতে হ’তো। দুলাভাইয়ের পরিচিত যে লোকের মাধ্যমে জমিটি কিনেছিলাম ,তার নাম ছিলো কামাল সাহেব। তার আপন ছোট ভাই সেখানে থাকতেন। ওখানে একটি কাঁচা মাটির বাড়িতে তিনি পরিবার নিয়ে থাকতেন। আমরা সেখানে গেলে সে বাসায় মাটির চুলোয় রান্না হতো। বেশ পিকনিক পিকনিক উৎসব উৎসব ভাব নিয়ে সেখানে যেতাম। নৌকায় চড়া, মাটির চুলার রান্না খাওয়া, ফেরার সময় পাঁচমিশালি তাজা মাছ , গাছের আধপাকা কলা, লাউ শাক, এসব নিয়ে বাড়ী ফেরা,বেশ অন্যরকম ব্যাপার ছিলো। আসলে সেই জমিটি আমার এক টুকরো আনন্দের নাম ছিলো। এক টুকরো ভালোবাসার নাম ছিলো। কিশোরী বয়সের রাত জাগা উপার্জন দিয়ে কেনা এক টুকরো জমি। সেই ৯৬ থেকে জমিটি আমার ছিলো। ২০০৬ সনে হঠাৎ দুলাভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পারি আমার সেই কাঠালদিয়ার জমিটুকু বসুন্ধরার কাছে হস্তান্তর করে দিতে হবে। ওরা সেখানে ওই জমিগুলো দিয়ে প্লট এর প্রজেক্ট করে বিক্রি করবে। না দিলে চারদিকে যখন ওরা মাটি দিয়ে ভরাট করবে, তখন আমার জমি তলিয়ে যাবে। আর জমি রাখতে চাইলে বসুন্ধরার খপ্পরেই পরে থাকতে হবে। অন্যথায় জমি নিজের করে রাখতে চাইলে বসুন্ধরার সাথে চ্যালেঞ্জ এ গিয়ে জমি রাখতে হবে।এই অবস্থায় আমার ছেলের বাবা চাননি আমি এ ঝামেলায় জড়াই। আর যাদের মাধ্যমে এই জমি কিনেছিলাম তারাও ওই একই কথাই আমাকে বলেছিলেন। তাই অগত্যা আমাকে বাধ্য হয়ে সেই জমিটি ছেড়ে দিতে হয়েছিলো। তবে তাতে আমার দুঃখবোধ হলেও আফসোস ছিলোনা। কিন্তু আফসোস হয়েছিলো অন্য একটি জায়গায়। চাকুরী আর লেখাপড়া একসাথে চালানো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এ পাশ করা এই সংগ্রামী আমাকে দিয়ে ওরা স্বাক্ষর নয় ,বাঁ হাতের আঙুলে নীল কালি দিয়ে টিপসই দিতে বাধ্য করেছিলো। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আমি না হয় সচ্ছল ছিলাম কিন্তু এরকম মানুষ সেখানে বেশী ছিলো যাদের সবেধন নীলমণি ছিলো ওই এক ঘন্ড জমিই। এরকম লাইন ধরা অসহায় দরিদ্র নারী পুরুষের জমি তারা আঙুল দিয়ে চিপে চিপে যাতা দিয়ে দিয়ে নিজের করে দখল নিয়েছে।

মনে পড়ে বেশ কিছু কালো বোরখা পরা বয়স্ক নারী তপ্ত দুপুরে লাইনে দীর্ঘক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে না পেরে রাস্তায় মাটির মধ্যে বসে কাঁদছিল আর জমির জন্য হাহাকার করছিলো। ওদের প্রাপ্ত টাকার পরিমানের কথা জানিনা ,তবে আমি ৯৬ সন থেকে ২০০৬ সন পর্যন্ত আমার থাকার পর দুই লক্ষ আশি হাজারের স্থলে পেয়েছিলাম এক লক্ষ ষাট হাজার টাকার একটি হালকা নীল রঙের চেক। এই হচ্ছে ভুমিদস্যু বসুন্ধরা ! যেই পঞ্চাশ লক্ষ টাকার কথা বার বার পুত্রধন বলছিলো, সেই টাকা তাদের নিজেদের কায়িক পরিশ্রম করা টাকা নয়। অসহায় মানুষের শেষ সম্বল কেড়ে নেয়ার টাকা ওগুলো।

মুনিয়া মেয়েটির অডিও রেকর্ডটি শুনে,মেয়েটির করুণ, ভয়ার্ত আর্তনাদ শুনে আজ এই কথাগুলো মনে পড়ে গেলো। যা স্মৃতির অতলে হারিয়ে গিয়েছিলো। মুনিয়ার সাথে কথোপকথনে যে কণ্ঠটি আমরা সকলে শুনলাম ,তা এই ভুমিদস্যু পুত্র আনভীর তা মানতে বিশ্বাস হলেও কেমন যেন অবিকল খলনায়ক দীপজল এর ডায়লগ এর মতো লাগছিলো। আফসোস , অন্যের সম্পদ লুট করে শত কোটি টাকার মালিক হওয়া যায়, কিন্তু শত কোটি টাকায় রুচীবোধ কেনা যায়না।

যে সমস্ত সাংবাদিক এদের বেতনভুক কর্মচারী ,তাদেরকে বলছি, ওই মেয়েটির স্থলে নিজের কন্যাকে বসিয়ে দেখুন, একবার ‘ওই খানকীর বাচ্চা খানকী ‘এই কথাগুলো শুনতে কেমন লাগতো ! এখন বলবেনতো ‘আমার মেয়ে অমন কখনোই হবেনা’ তাইতো? আচ্ছা,আপনারা কি জানেন আপনারা চিরজীবন বেঁচে থেকে মেয়েকে পাহারা দিতে পারবেন ? আপনার মৃত্যুর পর আপনার কন্যার এমন ভবিষ্যৎ হবেনা, এমন করুণ পরিণতি হবেনা একথা কিন্তু কেউ জানেনা তাইনা ?

ভাই, এই আপনারা আত্মহত্যার মোড়কে এই পরিকল্পিত উপায়ে হত্যা হয়ে যাওয়া মেয়েটির ছবিগুলো পত্রিকায় চাউর করে রক্ষিতা খেতাব দিয়ে আসামীর ছবি ঢেকে রাখছেন ? কিসের ভয় আপনাদের ?

লেখক : সাবেক ব্যবস্থাপক, বিমান এবং সোশাল এক্টিভিস্ট
(ফেইসবুক থেকে সংগৃহীত)


এখানে শেয়ার বোতাম