শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:০৪ পূর্বাহ্ন


করোনাকালে জনগণের জীবিকা সংকট, সরকারের প্রবৃদ্ধির ফাঁকা বুলি

করোনাকালে জনগণের জীবিকা সংকট, সরকারের প্রবৃদ্ধির ফাঁকা বুলি

  • 47
    Shares

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন::

গতকাল ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ি সারা পৃথিবীতে ২ কোটি ৯০ লাখ মানুষের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর বাইরে আরো কোটি কোটি মানুষ যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। উপযুক্ত পরীক্ষা সুবিধার অভাবে তারা করোনা শনাক্ত হতে পারেনি। যারা করোনা শনাক্ত হয়েছে তাদের মধ্যে ৯ লাখ ১০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। আর করোনা উপসর্গ নিয়ে কত লাখ, হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে তার হিসাব নেই। কিউবা, ভিয়েতনাম, চীন, নিউজিল্যান্ড বাদ দিলে বাকী দেশগুলোর পুজিঁবাদী সরকারসমূহের নিষ্ঠুর নিস্পৃহতার শিকার সে দেশের মানুষরা। চীন ছাড়া অর্থনৈতিকভাবে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান দেশগুলোর এবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদন ব্যাপক হারে সংকুচিত হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে কর্মসংস্থানও ব্যাপক হারে সংকুচিত হয়েছে। তার মানে প্রলম্বিত এই করোনাকালে সারা পৃথিবীর মানুষের জীবন ও জীবিকা ভয়ংকর সংকটের মুখে পড়েছে।

গ্রুপ অব সেভেন বা জি-৭ পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির সাতটি রাষ্ট্র যারা বৈশ্বিক নীট সম্পদের ৫৮ শতাংশ এবং বৈশি^ক জিডিপি’র ৪৬ শতাংশের মালিক। কিন্তু এ করোনাকালে জি-৭ ভুক্ত দেশসমূহের গত বছর ২০১৯ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের তুলনায় ২০২০ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে জিডিপি-গ্রস ডোমেস্টিক প্রডাক্ট বা মোট দেশজ উৎপাদন ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থাৎ জিডিপি সংকুচিত হয়েছে যুক্তরাজ্যের (-)২১.৯ শতাংশ, ফ্রান্সের (-)১৮.৯ শতাংশ, ইতালীর (-)১৭.৭ শতাংশ, কানাডার (-)১৩ শতাংশ, জার্মানীর (-)১১.৩ শতাংশ, জাপানের (-)৯.৯ শতাংশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (-)৯.১ শতাংশ। অর্থাৎ করোনার অভিঘাতে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর প্রতিটির এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে উৎপাদন সংকুচিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বড় অর্থনীতির দেশ ভারতের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে জিডিপি’র সংকুচিত হয়েছে (-)২৩.৯ শতাংশ, রাশিয়ার (-)৮.৫ শতাংশ। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে জি-৭ এর বাইরে বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র চীনের প্রবৃদ্ধি ধনাত্মক ছিল, ৩.২ শতাংশ । যদিও করোনার জন্য ২০২০ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে চীনের জিডিপি সংকুচিত হয়েছিল (-)৬.৮ শতাংশ। অর্থাৎ করোনা মহাবিপর্যয়ের ফলে সারা পৃথিবীতে উৎপাদনে ঋণাত্মক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত করোনা সংক্রমণে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দেশ। করোনা পূর্বকালে সরকারি নীতির কারণে ধুকতে থাকা ভারতীয় অর্থনীতি করোনাকালে লকডাউনের ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ৩১ আগস্ট ভারতের জাতীয় পরিসংখ্যান কার্যালয় (এনওএস) থেকে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম অর্থাৎ এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে যে হিসাব দেয়া হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর ভারতের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) কমেছে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ। যা ১৯৮০ সালের পর দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি’র ক্ষেত্রে রেকর্ড সর্বোচ্চ সংকোচন। এনওএস-এর দেয়া হিসাব অনুযায়ী, অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ভোক্তা ব্যয় গত বছরের এপ্রিল-জুন সময়ের চেয়ে এ বছর ৩১ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। এ ছাড়া একই সময়ে মূলধন বিনিয়োগ কমেছে ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১৯ সালের একই সময়ে তুলনায় জিডিপির সবচেয়ে বড় অংশীদার সেবা খাত ৫৪ শতাংশ, উৎপাদন খাত ৩৯.৩ শতাংশ, নির্মাণ খাত ৫০.৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। তবে কৃষি খাতে গত বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.৪ শতাংশ। অবশ্য করোনার প্রকোপ শুরুর আগে থেকেই তথাকথিত নোটবন্দি, জিএসটির কারণে ভারতের অর্থনীতিতে শ্লথগতি চলছিল। অটোমোবাইল, উৎপাদন, সেবাখাত থেকে শুরু করে অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই ঘনিয়ে আসছিল অশনি সংকেত। করোনায় তা প্রকটতর হয়েছে।

কিন্ত সারা পৃথিবীর অর্থনীতির চেয়ে বিপরীত চিত্র আমাদের দেশের। ভারতের মত বাংলাদেশে প্রান্তিক ভিত্তিতে জিডিপি হিসাব করা হয় না। অর্থবছরের প্রথম ৮-৯ মাসের প্রাপ্ত তথ্যউপাত্তের ভিত্তিতে পুরো বছরে সাময়িক হিসাব করা হয়। শেষ তিন মাসের অর্থাৎ এপ্রিল-জুন নিয়ে চতুর্থ প্রান্তিকের হিসাবটি হয় অনুমাননির্ভর। ১০ আগস্ট বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ঘোষণা দিয়েছে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৫.২৪ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। স্থিরমূল্যে এই জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। আর মাথাপিছু আয় হয়েছে ২,০৬৪ ডলার। এ বছরের জুন মাসে প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস ২০২০ প্রতিবেদন ও আইএমএফের কান্ট্রি রিপোর্টে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ১.৬ শতাংশ ও ৩.৮ শতাংশে নেমে আসার আশংকা করা হয়েছিল। সারা পৃথিবীর মত এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বাংলাদেশে লকডাউন বা সর্বাত্মক সাধারণ ছুটি ছিল। অন্যদেশগুলোর মত বাংলাদেশেও অর্থনীতিতে স্থবিরতা ছিল। উন্নত দেশসমূহ এবং আমাদের প্রতিবেশী ভারতসহ প্রায় দেশে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে জিডিপি সংকুচিত হয়েছে সেখানে আমাদের ৫.২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাথমিক হিসাব নিয়ে ১৬ আগস্ট সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলে, ২০১৯-২০ অর্থবছর দেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়। সিপিডি এটিকে “একটা রাজনৈতিক সংখ্যা” মনে করে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে তার আগের অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকের তুলনায় বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে এ ধারনাকে চ্যালেঞ্জ করে সিপিডি বলে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন প্রান্তিকে একমাত্র প্রবাসী আয়ের খাত ছাড়া সব সূচক ঋণাত্মক। আর চতুর্থ প্রান্তিক ছিল করোনা মহাবিপর্যয়ের কারণে স্থবির। চতুর্থ প্রান্তিকের মহামারীকালে প্রবৃদ্ধির প্রশ্নই আসে না। সিপিডি বিবিএসের প্রকাশিত তথ্য থেকেই দেখিয়েছে অর্থনীতির প্রতিটি খাত সংকুচিত হয়েছে । ফলে ৫.২৪ শতাংশ প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধি বাস্তবসম্মত নয়।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মইনুল ইসলাম জিডিপি নিয়ে একটি দৈনিকে প্রকাশিত এক কলামে লিখেছেন- নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর তাণ্ডবে গত ১৭ মার্চ থেকে সাড়ে পাঁচ মাস ধরে অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে, তার অভিঘাতকে লঘু করতে প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে দেখানোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত। ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ সাড়ে তিন মাস যেভাবে অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছিল, সেখানে কি ম্যাজিকে আগের সাড়ে আট মাসের প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে এই অচিন্তনীয় নেতিবাচক প্রবণতাগুলোকে উল্টে দিয়ে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলো, সেটা বিশেষজ্ঞদের কাছে এক বিস্ময়!

করোনা মহাবির্পয়কালে মানুষের জীবন ও জীবিকা যখন সংকটাপন্ন তখন অতি ধনীদের সম্পদ কিন্তু বেড়ে চলেছে। অতিমারির কারণে ২০২০ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ভারত নামক রাষ্ট্রটির যেখানে মোট দেশজ উৎপাদন সংকুচিত হয়েছে ২৩.৯ শতাংশ। ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বেকারত্বে ভুগছে দেশটি। কোটি কোটি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে দিনের পর দিন পায়ে হেঁটে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন। ঠিক একই সময়ে সে দেশের রিলায়েন্স শিল্পগোষ্ঠীর সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৫ শতাংশ। তাদের কর্নধার মোদী ঘনিষ্ঠ মুকেশ আম্বানী পৃথিবীর ধনীদের তালিকায় দশম থেকে পঞ্চমে উঠে এসেছে।

আমাদের দেশে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। আবার যা পাওয়া যায় তার গুনগতমান নিয়ে প্রশ্ন করার অবকাশ থাকে। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ তথ্য প্রকাশ করলে দেখা যাবে এই করোনাকালেও বাংলাদেশে অতি ধনীর সংখ্যা বেড়েছে। অতি ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে। সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে। নইলে এই দুর্যোগ, দুর্বিপাকের সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যখন চরম আর্থিক সংকট ও দৈন্যতার মধ্যে দিনাতিপাত করছে তখন মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির বিষয়টা আমাদের সামনে এক বিশাল প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দেয়।

লেখক: প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)





© All rights reserved © 2018 Odhikarbd.Com
ILoveYouZannath