শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩:৪২ পূর্বাহ্ন


করোনা: শত্রুর সাথে বসবাসের ছয় মাস

করোনা: শত্রুর সাথে বসবাসের ছয় মাস

  • 43
    Shares

আবু নাসের অনীক::

কোভিড-১৯ এর সাথে বসবাসের ছয় মাস পেরিয়ে জনগণের মধ্যে প্রথম ১/২ মাস যে ভীতি ছিলো তা এখন নেই বল্লেই চলে। আর এই ভীতি কমার জায়গা থেকে চুড়ান্তভাবে উদাসীনতা দেখা দিয়েছে। যেকোন যুদ্ধে শত্রু সম্পর্কে অহেতুক ভীতি দুর করা যেমন জরুরী একই সাথে শত্রুর সামর্থ্যকে ছোট করে দেখা মানেই নিশ্চিত বিপর্যয়। এই ‘বায়োলজিক্যাল ওয়ার’ এ আমাদের অবস্থা ঠিক তাই হয়েছে। প্রধানত সরকারের প্রচার কৌশলের ভুলের কারণেই এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। একইসাথে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর সক্রিয় কোন পদক্ষেপ না থাকাও একটি অন্যতম কারণ।

বিএসএমইউ এর সাবেক উপাচার্য জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা: নজরুল ইসলাম বলেন,‘সরকারের করোনা বিষয়ক পুরো কার্যক্রমেই একটা গাছাড়া, ঢিলেঢালাভাব দেখা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত সময় পাওয়ার পরও জেলা পর্যায়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করেনি, পরামর্শক কমিটি পরীক্ষা বাড়ানোর সুপারিশ করলেও পরীক্ষার সংখ্যা কমানো হয়েছে। পরীক্ষা কম হওয়ায় সন্দেহভাজন অনেক রোগী শনাক্ত করা যাচ্ছেনা’ পরীক্ষা বাড়ালে নিশ্চিতভাবেই সংক্রমণের সংখ্যা বর্তমান সংখ্যার চেয়ে কয়েকগুন বেশি হবে। যা ইতিমধ্যে আইইডিসিআর এর গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। ফলে বেশি সংখ্যক রোগী প্রকাশ হলে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ‘ফলস সাকসেস’ প্রকাশিত হয়ে পড়বে। মন্ত্রীরা গালভরা বুলি আওড়াতে পারবেনা। অথচ অল্প টেস্ট করার জন্য দেশে সংক্রমণ একটা দীর্ঘস্থায়ী রুপ নিয়েছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সংক্রমণের হার কিছুটা কমে এসেছে। কিন্তু এই হার কমে আসার একটি অন্যতম কারণ হতে পারে টেস্ট কমিয়ে আনা। গত ১-৮ সেপ্টেম্বর গড় টেস্ট করা হয়েছে ১৩ হাজার ৬৮৬, গড় শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৩১, শনাক্তের হার ১৫ শতাংশ। প্রকৃত অর্থে শনাক্তের হারসহ অন্যান্য অবস্থা বোঝার জন্য বর্তমানে টেস্ট ২০-২৫ হাজার প্রয়োজন প্রতিদিন। সেখানে টেস্ট হচ্ছে গড়ে সাড়ে ১৩ হাজার যা খুবই অপ্রতুল। এমন বাস্তবতায় সরকার প্রতিনিয়তো প্রচারণা করছে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় দেশের করোনা পরিস্থিতি ভালো।

বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতির প্রথম দিকের নাজুক দেশগুলোর তথ্য বিশ্লেষন করলে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রের এ পর্যন্ত টেস্ট হয়েছে ৮ কোটি ৯২ লক্ষ ৮৯ হাজার ৩৪, ভারত ৫ কোটি ২৯ লক্ষ ৩৪ হাজার ৪৩৩, রাশিয়া ৩ কোটি ৯৫ লক্ষ, কলম্বিয়া ৩০ লক্ষ ২৮ হাজার ৭৫৪, পাকিস্তান ২৮ লক্ষ ৫০ হাজার ১২১, ইটালী ৯৫ লক্ষ ৫৪ হাজার ৩৮৯, চিলি ২৭ লক্ষ ১৯ হাজার ৬৮৭, স্পেন ৯৯ লক্ষ ৮৭ হাজার ৩২৬। আর বাংলাদেশে পরীক্ষা হয়েছে ১৬ লক্ষ ৯০ হাজার ১১ (ওয়ার্ল্ডোমিটার-১০.০৯.২০)।

যে সমস্ত দেশের টেস্টের সংখ্যা উল্লেখ করেছি উক্ত দেশগুলোর শনাক্তের হার যুক্তরাষ্ট্রের ৭.৩৩%, ভারত ৮.৪৯%, রাশিয়া ২.৬৪%, কলম্বিয়া ২২.৬৭%, পাকিস্তান ১০.৫২%, ইটালী ২.৯৬%, চিলি ১৫.৭৬%, স্পেন ৫.৪৪%, বাংলাদেশ ১৯.৭০%। এই দুটি তথ্য থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, আমাদের এখানে যদি উল্লেখিত অন্যান্য দেশের ধারে কাছে পরীক্ষা হতো তাহলে বৈশ্বিকভাবে বাংলাদেশ সংক্রমণের সংখ্যায় প্রথম পাঁচটি দেশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতো (ওয়ার্ল্ডোমিটার-১০.০৯.২০২০)।

University of Oxford টেস্ট প্রসঙ্গে বলছে,‘ Testing is our window onto the pandemic and how it is spreading. Without testing we have no way of understanding the pandemic. It is one of our important tools in the fight to slow and reduce the spread and impact of the virus.’ অথচ প্রথম থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত সরকার টেস্টের বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্বহীনভাবে দেখেছে। এমনকি এমন মেকানিজম করেছে যাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টেস্টের সংখ্যা কমে আসে। টেস্টের সংখ্যা না বাড়িয়ে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। এমন অবস্থা চলতে থাকলে সারাবিশ্ব থেকে করোনা চলে গেলেও এই দেশ থেকে করোনা সংক্রমণ বন্ধ হবে না।
দেশে প্রতিদিনই সুস্থতার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনার প্রতিটা ক্ষেত্রে যেমন উদ্দেশ্যমূলকভাবে সকল তথ্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে এ বিষয়ে তার ব্যত্যয় ঘটছে না। দ্বিতীয় টেস্ট না করেই হাসপাতাল থেকে ১৪ দিন পর রিলিজ করে দেওয়া হচ্ছে। সরকারি হিসাবে ঐ সুস্থ হওয়া ব্যক্তি হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে পুনরায় অসুস্থবোধ করছেন এবং দ্বিতীয়বার টেস্ট করে আবারো করোনা পজিটিভ হচ্ছেন। হাটহাজারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম রাসেদুল আহাম হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে বাসায় চলে যাবার পর অসুস্থবোধ করায় পুনরায় টেস্ট করলে তার করোনা পজিটিভ আসে (দৈ:যুগান্তর ৩ সেপ্টেম্বর অন:)। উপজেলা চেয়ারম্যান বলে খবর হচ্ছেন, কিন্তু যারা সাধারণ নাগরিক তাদের পরিসংখ্যান আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রতিদিন প্রেসরিলিজে তরতর করে সুস্থতার হার বেড়ে যাচ্ছে। যে রোগীকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করা হচ্ছে তার কোন ফলোআপ করা হচ্ছেনা। ফলোআপ করা হলে এ ধরনের রোগীর তথ্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পাওয়া সম্ভব হতো। এবং সেক্ষেত্রে সুস্থতার হারের নির্ভুল তথ্য পাওয়া যেত।

গত ০৬ সেপ্টেম্বর বিসিএসআইআর কোভিড-১৯ এর জিনোম সিকোয়েন্সিং গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করে বলে, সংগৃহীত নমুনায় শতভাগ ক্ষেত্রে আধিপত্যকারী ভ্যারিয়েন্ট ‘জি৬১৪’ এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশ্বব্যাপী বর্তমানে এই ভ্যারিয়েন্ট অধিকমাত্রায় ক্রিয়াশীল রয়েছে। এটি মূলত ‘ডি৬১৪জি’ ভ্যারিয়েন্ট এর পরিবর্তিতরুপ। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া, উপসর্গ দৃশ্যমান হয় কম, যারা পূর্ব থেকে অন্য রোগে আক্রান্ত তাদের জন্য এটা মৃত্যু ঝুঁকি বেশি তৈরি করে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ২৪ শতাংশের কমরবিডিটি আছে। সেই জায়গা থেকে এটা অনেক বেশি ঝুঁকি বহন করছে ক্ষয়ক্ষতির। আনবিক জীববিজ্ঞানী Bette Korber ‘জি৬১৪’ ভ্যারিয়েন্ট সম্পর্কে বলেন,‘ These findings suggest that the newer form of the virus may be even more readily transmitted then the orginal form-whether or not that conclusion is ultimately confirmed, it highlights the value of what were already good ideas:to weare masks and to maintain social distancing.’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভাষ্যমতে দেশের কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের শয্যা অধিকাংশই খালি। কিন্তু বিএসএমইউ, স্কয়ার, ইউনাইটেড, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য বলছে তাদের এখানে কোভিডের জন্য প্রায় সব শয্যাই পূর্ণ। এবং এই হাসপাতালগুলোর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকগণ জানিয়েছেন ঈদের দেড় সপ্তাহ পর থেকে নতুন রোগী আসার সংখ্যা বরং বেড়ে গেছে। বোঝা যাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো তথ্যের সাথে বাস্তবিক তথ্যের ভিন্নতা রয়েছে।

সরকার সংক্রমণের শুরু থেকেই অবাধ তথ্য প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। প্রথমে প্রেস ব্রিফিং-এ সংবাদ কর্মীদের প্রশ্ন করা বন্ধ করেছে, তারপর প্রেস ব্রিফিং বন্ধ করেছে, সরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রেসের সাথে কথা বলা নিষিদ্ধ করেছে। তথ্যকে যতোভাবে নিয়ন্ত্রিত ও আড়াঁল করা যায় তার সকল কৌশল অবলম্বন করেছে। কিন্তু অবাধ তথ্য প্রবাহ ছাড়া মহামারি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। University of Oxford বলছে,‘ Without data on COVID-19 we cannot possibly understand how the pandemic is progressing. Without data we cannot respond appropriately to the threat; neither as individuals nor as a society. Nor can we learn where countermeasures against the pandemic are working.’

ছয় মাস পার করে এসে এখন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। মুগদা হাসপাতালে মারা যাওয়া রোগীদের উপর এক গবেষণায় দেখা গেছে ৪২ শতাংশ মৃত্যু হচ্ছে হাসপাতালে ভর্তির ৪৮ ঘন্টার মধ্যে। ৬০ শতাংশের বেশি রোগী হাসপাতালে আসছেন রক্তে অক্সিজেন ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে চলে যাওয়ার পর। এই অবজারভেশন এটাই নির্দেশ করে যে, মৃত্যু কমিয়ে আনার জন্য করোনা সংক্রমিত রোগী বিশেষ করে যাদের কমরবিডিটি আছে তাদের কে প্রথম থেকেই হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য মোটিভেট করতে হবে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার উপর রোগীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। কোভিড হাসপাতাল বন্ধ করার পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হবে। নইলে এটা আমাদের জন্য অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

সরকার যদি তার নিয়োজিত করোনা প্রতিরোধে গঠনকৃত কমিটিগুলোর সুপারিশ অনুসারে পদক্ষেপ গ্রহণ করতো তবে ছয় মাসে সংক্রমণের চেহারা আজকের মতো এমন নাজুক অবস্থায় থাকতো না। প্রশ্ন হচ্ছে সরকার কেন এমন করছে! এর উত্তর পাওয়া যেতে পারে সুইজারল্যান্ডের সেন্টার ফর সিকিউরিটি ষ্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক বেনো জগ এর বক্তব্যে। ‘পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা দেখাতে চান, তারা গণতান্ত্রিক দেশের চেয়ে ভালোভাবে সংকট মোকাবিলা করতে পারেন। তা ছাড়া কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা সমাজ ও তথ্য নিয়ন্ত্রণ করেন। এতে আসল চিত্র বাইরে আসেনা’। এটাই আমাদের বাস্তবতা!

‘দৃঢ় সত্যের দিতে হবে খাঁটি দাম, হে স্বদেশ, ফের সেই কথা জানালাম। জানে না তো কেউ পৃথিবী উঠছে কেঁপে ধরেছে মিথ্যা সত্যের টুঁটি চেপে, কখনো কেউ কী ভূমিকম্পের আগে হাতে শাঁখ নেয়, হঠাৎ সবাই জাগে? যারা আজ এত মিথ্যার দায়ভাগী, আজকে তাদের ঘৃণার কামান দাগি।’

লেখক: সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।

 

 





© All rights reserved © 2018 Odhikarbd.Com
ILoveYouZannath