শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:১৮ পূর্বাহ্ন


বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গতাজ মুখোমুখি নয়, পাশাপাশি

বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গতাজ মুখোমুখি নয়, পাশাপাশি

অধিকার ডেস্ক:: তাজউদ্দিন আহমদ-কে নিয়ে যদি লিখতে যাই, তবে শুরু করবো ঠিক কোন স্থান থেকে এটা ভাবতে ভাবতেই আমার বেলা গড়ায়। বঙ্গবন্ধু আর তাজউদ্দিন, দু’জনকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবার মত কষ্টের আর কিছুই হতে পারেনা। ফলে যারা এমন ইতিহাস লেখেন, কল্পনা করেন, রচনা করেন কিংবা ব্যাখ্যা করেন, আমি তাঁদের থেকে খানিকটা দূরে সরে দাঁড়াই।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় তাজউদ্দিন তাঁর নিজস্ব একটা শক্ত থিয়োরী-তে পথ চলতেন, তাঁর একটা স্পস্ট ভিশন ছিলো। পলিটিকাল পারফেকশন সম্ভব কিনা জানিনা কিন্তু তাজউদ্দিন আহমদ পারফেকশনিস্ট ছিলেন। ফলে তাঁর চিন্তা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর চিন্তার একটা চমৎকার বিতর্ক পর্যন্ত হতে পারে। ইনফ্যাক্ট, ‘বিতর্ক’ শব্দটাও মনে হয় ঠিক হোলো না। ভালো হয় যদি আমি বলি আলোচনা। তাঁদের দু’জনের কর্মপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়া? এটি আমি অন্যায় মনে করি।

‘রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে বিষ খাইয়ে বোবা বানিয়ে দিয়েছিলো’, ‘রবীন্দ্রনাথের চালাকির কারণে নজরুল নোবেল পাননি’ এইসব চটকদার আলোচনা মৌলবাদীরা করে। কেননা এখানে একটা ধর্মীয় আবহ তৈরী করা যায়। একটা বিভাজনের রেখা টেনে ধরে কূট চাল দেয়া যায়। অবশ্য দেয়া যাবার পেছনে আমাদের মজ্জাগত অভ্যাসকেই এই আলোচনাকারীরা বার বার ব্যবহার করে। আমরাও মনের গহীনে কোথাও হয়ত চাই দুইজন মানুষকে কুস্তিতে নামিয়ে একটু উপভোগ করতে।

যেমন ধরেন, মেসি আর রোনাল্ডো। দু’জন দু’জনের বাসায় যায়। গলাগলি বন্ধুত্ব। তাঁরা হাসে, তাঁরা খেলে একসাথে। কিন্তু কোনো এক কারণে আমাদের এই ভূখণ্ডে এই দু’জনকে শত্রু বানিয়ে একদল লোক কুস্তিতে নামিয়ে দেয়। যেন একটা ঝগড়া লাগলেই দেখতে বড় মজা।

যাবতীয় দ্বৈরথ কিংবা দ্বৈরথের নামাবার ইচ্ছে, তাজউদ্দিন আর মুজিবকে সামনাসামনি নামাবার সকল রাস্তা এখানে এসে চুপ করে থমকে দাঁড়ায়। এত ঝঞ্জা, এত কষ্ট, এত কাদা-পানি পার হয়ে যুদ্ধ, এত রক্ত, এত এত কাজ, এত এত পরিকল্পনা সব কিছু ছাপিয়ে তাজউদ্দিন তাঁর নেতাকেই মনে রাখলেন। যিনি এই সংগ্রামের নেতা। যিনি এই দেশের স্থপতি। যিনি এই দেশের রূপকার।

বঙ্গবন্ধু-তাজউদ্দিন জুটি’র সাথে উপরের উদাহরণ যায় কি যায়না আলাপ সেখানে না খুব সম্ভবত। আলাপ হচ্ছে এই দুই কিংবদন্তীকে একটা সুডো দ্বৈরথে নামিয়ে দিয়ে যারা আনন্দ পান তাদের যে মজ্জাগত জিনের গঠন, সেই একই গঠন উপরের উদাহরণের দর্শকদের আনন্দের ভেতরকার যাবতীয় মানসিক গঠনের সমান।

আমার মনে হোলো আমি আমার লেখাটা শুরু করি ৩ শরা নভেম্বর ১৯৭৫ সালের খুব ভোরের একটা দৃশ্য থেকে। তাজউদ্দিন আহমদ সহ বাকি তিন নেতাকে যেদিন খুন করতে এলো রিসালদার মোসলেম উদ্দিন সহ আরো চার খুনির দল। তাদের হাতে কালো অটোমেটিক মেশিনগান। সেই মুহূর্তে আমরা চলে যাবো এবং দেখবো কি ঘটছে সেখানে।

হাইকোর্টের রায় থেকে [বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী এবং বিচারপতি আতাউর রহমান খান] আমরা জানতে পারি (৫ নং প্যারাগ্রাফ) আই জি প্রিজন নুরুজ্জামান হাওলাদারের কাছে বঙ্গবভন থেকে একটি ফোন আসে। যেখানে আইজি প্রিজনকে স্পস্টত বলা হয় এই ৫ খুনীর দলকে যেন কারাগারে ঢুকতে দেয়া হয় এবং তাদের যা খুশি তারা যেন সেখানে করতে পারে।

আদালতের ভাষায়-
Mr Nuruzzaman wanted to know the purpose of such segregation of those inmates of the jail, on such query those armed personnel disclosed that they would be done to death; hearing such reply Mr. Nuruzzaman (P.W.3) then wanted to have a telephonic call to the president of the Republic then he made a telephonic call to the President; thereafter the jailor also received a telephonic call from president Mostaq who also desired to have a talk to Mr. Nuruzzaman, the IG (prison) and ultimately talk took place between the president and the IG (prison). Thereafter the DIG (prisons) wanted to know as to what sort of instructions he received from the president in reply Nuruzzaman disclosed that president ordered him to allow the 5 army personnel to do whatever they wanted

মোশতাক জেল কর্তৃপক্ষকে নিজে ফোন করে জানিয়ে দিলো এই খুনীরা যা করতে চায়, তা করতে দেয়া হোক আর তোমরা সরে দাঁড়াও। চুপচাপ থাকো।
মামলা যখন আপীলেট ডিভিশানে যায় তখন আদালত বলেন,

‘Admittedly, these four leaders were the architects of the liberation of the country and presented to the people the fruits of liberation within a shortest period of time. They organized the unarmed young and adolescent boys to become freedom fighters for liberating the country and fought against an organized Pakistani army equipped with modern sophisticated arms, collected arms for them for fighting with them and convinced the world leaders that they were fighting for political, social and economic independence from the oppressive Government’

আদালত এই জাতীয় চার নেতাকে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের আর্কিটেক্ট বলে অভিহিত করেন। পুরো মুক্তিযুদ্ধকে এই জাতীয় চার নেতা কি করে সংঘঠিত করে এগিয়ে নিয়েছেন এই ছোট্ট প্যারা থেকে আমরা তা জানতে পারি। কিন্তু কেন খুন হতে হোলো এই জাতীয় চার নেতাকে? এই প্রশ্নের শুরুতেই আপীলেট ডিভিশান আবার বলেন-

The object and purpose behind the killing of the said four leaders are discernible from the testimonies of P.Ws.10, 14 and 36. These leaders not only refused to give allegiance to Khandaker Mustaq’s usurpation of power but also refused to join his Government. Naturally, Khandaker Mustaq was not only harbouring hatred towards them, but also realised that these leaders were thorns in his way to run the Government peacefully, and if they were kept alive, they might have mobilized the workers of Awami League after coming out from the prison in future.

-মানে দাঁড়ায়, এই চার নেতা বেঁচে থাকলে সেটি হবে মোশতাকের পথের কাঁটা। মোশতাকের সাথে ষড়যন্ত্রে যোগ দিতে চান নি এই চার নেতা আর না চাওয়া-ই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো যার মূল্য চুকোতে হয়েছে নিজের প্রাণ দিয়ে।
প্রশ্ন শুধু একটাই, নিজের জীবন দিয়ে এই চার নেতা কেন মূল্য চুকোলেন? কিসের মূল্য তাঁরা দিলেন?
উত্তর খুব বেশী রকম স্পস্ট।
মুজিবের রক্তের উপর দিয়ে হাঁটবেন না তাঁরা। শুধু সেদিন যদি তাঁরা ক্ষমতায় বসে যেতেন খুনীদের সাথে গলা মিলিয়ে কিংবা মোশতাকের কথা শুনতেন, সিম্পলী বেঁচে যেতেন তাঁরা।
কিন্তু, কেবল মাত্র মুজিবের রক্তের সাথে বেঈমানী করেন নি বলেই খুন হতে হোলো তাঁদের।
আমরা যদি আপীলেট ডিভিশানের রায়ের এখানে এসে থেমে দাঁড়াই, আমরা দেখতে পাই উত্তর কত স্পস্ট। কত পরিষ্কার। জবাব একটাই। জবাব একমাত্র-ই। কি সেটি?
মুজিব। মুজিব আর মুজিব। আমরা মুজিবের সাথে বেঈমানী করব না কিন্তু প্রাণ দিতে প্রস্তুত। সব প্রোপাগান্ডা ভেসে যায় এখানেই।

মুজিব বেঁচে থাকতে নাকি দূরত্ব হয়েছিলো তাজউদ্দিন আর মুজিবের। তাঁরা নাকি দুই মেরুর হয়ে গিয়েছিলেন। রক্ত দিতে বঙ্গতাজ এতবড় প্রমাণ রেখে যাবার পরেও আজ এত দশক পর এই সুডো দ্বৈরথের কথা ওঠে। বড় কষ্ট হয়। ইতিহাসের এমন সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে যদি আমরা তাজউদ্দিনকে বঙ্গবন্ধুর সামনে শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়ে দেই, ইতিহাস আমাদের দিকে অভিসম্পাত করবে। আমাদের শেষ করে দিবে যাবতীয় ঘৃণায়। আমরা এইসব আদালত, এইসব রায়, হাইকোর্ট, আপীলেট ডিভিশান এসব থেকে বের হয়ে এসে একটু তাজউদ্দিন আহমদের নিজের লেখা ডায়রীতে চলে আসি।

প্রতিভাস প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘তাজউদ্দিন আহমদের চিঠি’ গ্রন্থের ২৪২ নম্বর পৃষ্ঠায় আমরা চলে যেতে পারি।

-৭৫১ নম্বর সাত মসজিদ রোড থেকে শুরু তাজউদ্দিন আহমদের এই দীর্ঘ ভ্রমণ। সাথী হয়েছিলেন প্রথমে ডক্টর কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম। পথিমধ্যে নেমে যান ডক্টর কামাল হোসেন আত্মীয়ের বাসায় যাবেন আর একসাথে থাকলে বিপদ হবে, এই অজুহাত দেখিয়ে। রয়ে গেলেন ব্যারিস্টার আমীরুল আর তাজউদ্দিন আহমদ। নাম পালটে ফেললেন। তাজউদ্দিন হয়ে গেলেন মোজাফফর হোসেন আর ব্যারিস্টার আমীর হয়ে গেলেন রহমত আলী। তারপর লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, রায়ের বাজার, আঁটির বাজার, জয়পাড়া তারপর সেখান থেকে পদ্মার পাড়। পদ্মা পাড়ি দিয়ে তাজউদ্দিন আর ব্যারিস্টার আমীর পৌঁছুলেন নাড়ার টেকে। সেখান থেকে ফরিদপুর শহরের উপকন্ঠে। সেখান থেকে কামারখালি। মধুমতি নদী পার হয়ে মাগুরা। রাত ১০ টা তিরিশে পৌঁছুলেন ঝিনাইদহে। ঝিনাইদহ থেকে চুয়াডাঙ্গায়। তারপর আরো পথ ঘাট মাড়িয়ে তিনি পৌঁছুলেন সীমান্তের ঐ পাড়ে। ভারত।
ভারতের হিঙ্গলগঞ্জ,টাকী, হাসনাবাদ এইসব সীমান্ত এলাকা সফর করে চলে গেলেন দিল্লী। সফদার জং রোডে ইন্দিরার সাথে আলোচনা, পরিকল্পনা।

৫-ই এপ্রিল লেখা হোলো সরকার গঠনের ঐতিহাসিক বিবৃতি ও দলিল। লেখায় সাহায্য করলেন ব্যারিস্টার আমীরুল ও রেহমান সোবহান।
৬-ই এপ্রিল বিবৃতি ও দলিলের বাংলা অনুবাদ শেষ হয়। ৮-ই এপ্রিল সরকার গঠন সম্পর্কিত সকল বিবৃতি তাজউদ্দিন আহমদের কন্ঠে রেকর্ড হয়। তারপর একটি বিশেষ বিমানে করে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় আবার আগমন। দেখা হয় বাকী সাথীদের সাথে। কামরুজ্জামান, মনসুর আলী এসে পৌঁছান সেদিন। ৯-ই এপ্রিল।
১১ এপ্রিল সৈয়দ নজরুল ইসলামের খোঁজ পাওয়া যায় ময়মনসিং এর তুরা এলাকায়। একসাথে সবাই যান আগরতলায়। প্রথমে ইচ্ছে ছিলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শপথ নেবেন চুয়াডাঙ্গায়, এটিকে রাজধানী করে। একটা নাম দেয়া দরকার। তাজউদ্দিন আহমেদ নিজেই দিলেন নাম। নাহ ‘বাংলাদেশ নগর’ নয়, ‘স্বাধীনতা নগর’ নয়, ‘মুক্তি নগর’ নয়, ‘সংগ্রাম নগর’ নয়। নাম তাজউদ্দিন-ই রাখলেন- ‘মুজিব নগর’ (তাজউদ্দিন আহমদের চিঠি, পৃষ্ঠা-২৫১)।
পরে অবশ্য শপথ নেয়া হয় মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়। নাম সেই একই থাকে। মুজিব নগর।

যাবতীয় দ্বৈরথ কিংবা দ্বৈরথের নামাবার ইচ্ছে, তাজউদ্দিন আর মুজিবকে সামনাসামনি নামাবার সকল রাস্তা এখানে এসে চুপ করে থমকে দাঁড়ায়। এত ঝঞ্জা, এত কষ্ট, এত কাদা-পানি পার হয়ে যুদ্ধ, এত রক্ত, এত এত কাজ, এত এত পরিকল্পনা সব কিছু ছাপিয়ে তাজউদ্দিন তাঁর নেতাকেই মনে রাখলেন। যিনি এই সংগ্রামের নেতা। যিনি এই দেশের স্থপতি। যিনি এই দেশের রূপকার।

আব্দুল গাফফার চৌধুরীর লেখা ‘ইতিহাসের রক্ত পলাশ’ গ্রন্থ, মহিউদ্দিন আহমেদের ‘বেলা-অবেলা বাংলাদেশ ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫’ গ্রন্থ থেকে বার বার আমরা একটা সূত্র পেতে থাকি। শেখ মনির সাথে তাজউদ্দিনের একটা দূরত্ব, শেখ মনির প্রভাব খাটাবার ইঙ্গিত ইত্যাদি, ইত্যাদি…
ওগুলোকে আমি উড়িয়ে দেই। দলের ভেতর নানা মত, নানা আলোচনা থাকে। এটিকে দলীয় কার্যক্রমের অংশের ভেতর ফেলে দিতেই আমার ভাল্লাগে। কেন আমি এই দূরত্বের গল্প এড়িয়ে যেতে চাইছি? উত্তর রয়েছে তাজউদ্দিনের ভাষণেই।

আমি সে কারণে চলে যেতে চাই ১৯৭৪ সালের ২০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলের সমাপনী অধিবেশনে দেয়া তাজউদ্দিনের ভাষণে-
‘ঘাত-সংঘাতের মধ্য দিয়েই মানুষের জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন, সমাজের ক্রম-বিকাশ হতে পারেনা, কাজেই সংঘাত থাকবেই। সেই সংঘাত যে রূপ ধারণ করুক না কেন তার মধ্য দিয়েই আমাদের যেতে হবে। আমরা ভবিষ্যতে বঙ্গবন্ধুর কাছে, জাতির পিতা হিসেবে মন্ত্রিসভার নেতা হিসেবে আবেদন করব এবং ভবিষ্যতে যে ওয়ার্কিং কমিটি হতে যাচ্ছে তাঁদের কাছেও আমার আবেদন থাকলো, যারাই সদস্য হবেন তাঁরা একটু দীর্ঘ সময় বসে মন্ত্রীদের কার্যকলাপ সম্পর্কে যেসব কথা বিভিন্ন নেতা কর্মীরা শোনেন বা তা তাঁদের নিজের মনে যে প্রশ্ন তা পরিষ্কারভাবে, বিশদভাবে বিশ্লেষণ ও আলোচনা করবেন। সেখানে মন্ত্রীদের বক্তব্য, সর্বপোরি আমাদের সর্বময় নেতা বঙ্গবন্ধুর কি বক্তব্য সেটাও শোনা প্রয়োজন হবে’

এই ভাষণেই তিনি এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেন। তিনি বলেন-
‘ওরা এক সময় বলেছিল যে বঙ্গবন্ধুকে আরো বেশী ক্ষমতা দেওয়া দরকার। এই মন্ত্রীটন্ত্রীরা খুব বেশী সুবিধের নয়। তাঁদের আসল মতলব ছিলো বঙ্গবন্ধুকে আস্তে আস্তে একা করে ফেলা-যেটা আমাদের শ্রদ্ধেয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব বললেন, একা করে একটু বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া- একা লোককে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া খুব সহজ’
এখানে এসে আমি একটা দীর্ঘঃশ্বাস ছাড়ি…কথাগুলো একটা সময় কি সত্য হয়েছিলো?

২০ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালে রাত প্রায় ৮ টার দিকে রনো সাহেব ও মেনন সাহেব বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে গেলেন তাঁর ৩২ নম্বর রোডের ৬৭৭ নম্বর বাসায়। বঙ্গবন্ধু দুই তরুণ নেতাকে দেখে যা বললেন তা হচ্ছে, তিনি এখন সিরাতুল মুসতাকীমের লাইন ধরবেন। যার মানে দাঁড়ায় সোজা রাস্তা/সরল পথ।
বঙ্গবন্ধুর ভাষায় “সিধা রাস্তা”। তো, এই সিধা রাস্তা কি? সিধা রাস্তা হচ্ছে-
“এই শোন আর দেরী নয়। আমি সমাজতন্ত্র করে ফেলব। আমি এরই মধ্যে লেট। আর দেরী নয়। আমি পাঞ্জাবী ক্যাপিটালিস্ট তাড়িয়েছি, তাই বলে মাড়োয়ারী ক্যাপিটালিস্ট এলাউ করব না। আমি ক্যাপিটালিজম হতে দেব না। আমি সোশালিজম করব। তোরা চলে আয় আমার সঙ্গে”

তাঁর এই ডেস্পারেট মুভ দেখে ভেতড়ে বুকটা কামড় দিয়ে ওঠে। প্রশ্ন এসে যায়। তিনি কি আসলেই একা হয়ে গিয়েছিলেন? তাজউদ্দিনের আহমদের বলা কথাগুলো কানে বাজে-
‘আস্তে আস্তে একা করে ফেলা’…’একা লোককে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া খুব সহজ’
যাই হোক। আমি আবারও ফিরে যাই আদালতের কাছে। ১৬-তম সংবিধান সংশোধনী বাতিল করতে গয়ে আপীলেট ডিভিশান বলেন-

‘No nation – no country is made of or by one person. If we want to truly live up to the dream of Sonar Bangla as advocated by our father of the nation, we must keep ourselves free from this suicidal ambition and addiction of ‘I’ness. That only one person or one man did all this and etc. If we look at the example from USA’s town planning; they recognised the person who worked for their town planning. For abolition of slavery, Mary Todd, wife of 16th President Abraham Lincoln, got recognition’

আদালতের ভাষ্য ছিলো, ‘আমি’ ‘আমি’ ‘আমি’ না। আমরা। একসাথে আমরা সবাই। জাতির জনক সোনার বাংলা গড়ার সে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটি ‘আমরা’ দিয়েই হয়। ‘আমি’ দিয়ে নয়।

তাজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সবচাইতে কাছের সারথী। তাঁর চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নেতা পুরো দেশকে এক করে দিয়েছিলেন, পুরো দেশকে স্বাধীনতার প্রান্তে নিয়ে এসেছিলেন আর তাঁর সারথীরা সেগুলো বাস্তবায়ন করেছিলেন। এর থেকে সহজ কথা আর কিছুই হতে পারে না।
সোহেল তাজ দু’দিন আগে তাঁর এক লাইনের এক বাক্যে বলেছিলেন, “অবিচ্ছেদ্য অংশ’। শব্দটা এটাই। অবিচ্ছেদ্য।
ফলে আমরা তাজউদ্দিন আর মুজিবকে যতবার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে মজা লুটতে চাইব, ইতিহাস আমাদের নিয়ে মজা লুটবে, লুটতেই থাকবে।

নিঝুম মজুমদার। লেখক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট।





© All rights reserved © 2018 Odhikarbd.Com
ILoveYouZannath