রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন


বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড: সংবিধান ও আইন দ্বারা স্বীকৃত!!

বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড: সংবিধান ও আইন দ্বারা স্বীকৃত!!

আবু নাসের অনীক::

স্বাধীনতার পর ’৭৩ সাল থেকে রক্ষীবাহিনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের সূচনা হয়। সেই সময় এই বাহিনীর হাতে হাজার হাজার বামপন্থী বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন।

’৭৫ পরবর্তীতে জিয়া সরকারের আমলে সরাসরি এ ধরনের হত্যাকান্ডের পরিবর্তন এনে সামরিক বিচারের নামে হাজার হাজার সামরিক বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করা হয়। এমনকি সেই সময়ে হত্যার শিকার অনেকের মৃতদেহের হদিস তাদের পরিবার পায়নি।

২০০২ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারী পর্যন্ত সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে অপরাপর বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর মাধ্যমে সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়।

‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামে যৌথ অভিযানে ৫৭ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজার হাজার পরিবার। এই সকল হত্যাকান্ড সম্পর্কে গল্প প্রচার করা হতো, ‘জিজ্ঞাসাবাদের সময় বা অস্ত্র উদ্ধারের সময় বা ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় ‘হার্ট অ্যাটাক’ এ মৃত্যু হয়েছে’। পরবর্তীতে ২০০৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন-২০০৩’ আইনটি পাশ করে জোট সরকার সেই সময়ে ঘটা সকল হত্যাকান্ড ও নির্যাতনের দায় থেকে যৌথবাহিনীকে মুক্তি দেয়। এই অভিযানের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিলো সরকার দলীয় বেশকিছু সন্ত্রাসী তাদের প্রচারিত তথাকথিত ‘হার্ট অ্যাটাক’ এ মৃত্যুবরণ করে। এই বিষয়টিকে অনেকেই অভিযানের ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন! কিন্তু এটা ঘটার কি কারণ ছিলো সেটি আমি লেখার পরের অংশে আলোচনা করবো।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেন,‘জনগণের স্বার্থে সংবিধান অনুযায়ি প্রচলিত আইনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অপারেশন ক্লিনহার্ট পরিচালিত হচ্ছে। অস্ত্র উদ্ধারকালে বাধা দিলে কঠোর হস্তে দমন করা হবে’(২৬ অক্টোবর ২০০২- প্রথমআলো)। খালেদা জিয়া হয়তো এখন বিস্মৃত হয়েছেন তিনি এ ধরনের বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে সেই সময়ে বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ডের জাষ্টিফিকেসন দিয়েছিলেন।

‘হার্ট অ্যাটাক’ এ মৃত্যু হয়েছে গল্পটা খুব বেশি দিন চালানো সম্ভব না হওয়ার কারণে পরবর্তীতে ২৬ মার্চ ২০০৪ সালে র‌্যাবের জন্ম দেয় বিএনপি-জামাত জোট সরকার। গঠনের পর ২৪ জুন র‌্যাবের হাতে ক্রসফায়ারে প্রথম মৃত্যু সংগঠিত হয়। ১৮ অক্টোবর থেকে র‌্যাব দেশব্যাপী অপারেশন শুরু করে এবং ক্রসফায়ারের একের পর এক ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে আর সাথে চিরাচরিত সেই একই গল্প ‘ আসামীকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে বের হলে আগে থেকে ওত পেতে থাকা তার সহযোগীরা তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশে র‌্যাবের উপর আক্রমন চালায়, র‌্যাব প্রতিরক্ষার জন্য পাল্টা গুলি ছুড়ে, উভয় পক্ষের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে আসামী নিহত হয়, র‌্যাবের তিন জন সদস্য আহত হন, ঘটনাস্থল থেকে একটি কাটা রাইফেল, বিদেশী পিস্তল উদ্ধার করা হয়…’। যা এখনও চলমান। র‌্যাবের সাথে সাথে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুক যুদ্ধেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড সংঘটিত হতে থাকে, যা বর্তমানেও চলমান।

বছরের পর বছর ক্লান্তিহীনভাবে তারা একই গল্প প্রডিউস করে যাচ্ছে। পাঠক আসুন আমাদের নেতা-নেত্রীদের বয়ান আপনাদের একটু মনে করিয়ে দিই-

তৎকালীন সময়ের আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমেদ র‌্যাবের ক্রসফায়ার সম্পর্কে বলেন,‘ আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। সন্ত্রাসীদের সাথে এটি র‌্যাবের যুদ্ধ। ফলে ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার ঘটনা কোনভাবেই মানবাধিকারের সাথে সম্পর্কিত নয়’(৭ জানুয়ারী ২০০৫- দৈনিক আমার দেশ)।

তৎকালীন সময়ের বিরোধী দলীয় নেতা আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ প্রধানমন্ত্রী র‌্যাবকে মানুষ খুনের লাইসেন্স দিয়েছেন’ (২৩ জুলাই ২০০৪- দৈনিক সংবাদ)।

সেই সময়ের আইনমন্ত্রী মওদুদ সাহেব ২০১৬ সালের ২৬ জুনে এসে বলছেন, ‘ আজকে একদিকে গুম-হত্যা, বিচার বহির্ভূত হত্যা ক্রসফায়ার এনকাউন্টার চলছে; ক্ষমতায় গেলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ করা হবে। সরকার কাউকে গুম করবেনা এবং বিনা বিচারে কাউকে আটকও রাখা হবে না’।

বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার তাদের নির্বাচনি ইস্তেহারেও স্পষ্টভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি ব্যাক্ত করেন। কিন্ত বাস্তবে সেটা শুধু প্রতিশ্রুতির মধ্যেই থেকে গেছে। কারণ এ ধরণের গণবিরোধী সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড ব্যাতীত টিকে থাকতে পারে না। একপক্ষ ‘সন্ত্রাস দমন’ অন্যপক্ষ ‘মাদক নির্মূল’ এর নামে বাংলাদেশ জন্মকালীন সময় থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন,‘বিচার বহির্ভূত হত্যা তো আমরা করিনা। আমাদের উপর এটাক হলে কাউন্টার এটাক করি’(৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৯-দৈনিক প্রথমআলো)। যেমন কাউন্টার এটাক করে হত্যা করেছে মেজর (অব:) রাসেদ কে! শাষক গোষ্ঠীর এই রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের প্রত্যেকের বক্তব্য এক ও অভিন্ন। ক্ষমতায় থাকলে একরকম আর বাইরে থাকলে আর একরকম পার্থক্য শুধু এটুকু। এছাড়া বোঝার উপায় থাকেনা কে বিএনপির আর কে আওয়ামী লীগের হয়ে বলছে! এবার দেখার চেষ্টা করবো কেন এমন হয়!!

স্বাধীনতার পরপরই দেশের অভ্যন্তরে প্রবলভাবে ভিন্নমতের উত্থান ঘটে। সেই মতকে দমন করার জন্য তৎকালীন সরকারের বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেই সময় থেকে লুটপাটের একটি প্রক্রিয়াও যুগপৎভাবে শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে লুটপাট করার জন্য বিভিন্ন চক্র গড়ে তোলে শাষকগোষ্ঠী (আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জামাত, জাতীয় পার্টি)। কিন্তু দেখা যায় শাষকগোষ্ঠীর লুটপাট বাস্তবায়নকারী ও পাহারাদার গোষ্ঠীর মধ্যে (বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনী) কিছু কিছু অংশ তারা আর কারিগর এবং পাহারাদার হিসাবে ভূমিকা পালন না করে নিজেরাই গড ফাদার হয়ে উঠতে চাইছে, তারা প্রভুদের শিকল ছিন্ন করে নিজেরাই রাজত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তা করছে, তখনই শাষকগোষ্ঠীদের সেইসব অংশকে দমন করার প্রয়োজনীয়তা পড়ে। সেই প্রয়োজনীয়তা মেটায় ক্রসফায়ার-এনকাউন্টার-ফায়ার লাইন যে নামে ডাকি! একটি উদাহরণ দিলে আরো পরিষ্কার হবে। পিচ্চি হান্নান ক্রসফায়ারে মারা যাবার পর তার মেয়ে বলেন,‘এমপির নির্দেশে বাবাকে মারা হয়েছে, কিন্তু নির্বাচনে আমার বাবা এমপির পক্ষে অনেক কাজ করেছে’(৮ আগষ্ট ২০০৪-প্রথমআলো)।

এর পাশাপাশি বিরুদ্ধ রাজনৈতিক দলকে দমনের জন্যেও ব্যবহার করা হয় এই সমস্ত বাহিনীগুলোকে। সরকারের পক্ষ থেকে অনৈতিকভাবে যখন র‌্যাব-পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করে ক্ষমতা পোক্ত করা হয়, বিভিন্ন স্বার্থ হাসিল করা হয় তখন একটা পর্যায়ে যেয়ে ঐ সমস্ত বাহিনীর সদস্যরাও নিজেরা তৎপর হয়ে ওঠে তাদের সম্পদ বৃদ্ধির কর্মকান্ডে। তারা নিজেরাও বিভিন্ন ঘটনা ঘটায়। সরকার যেহেতু অনৈতিকভাবে তাদের ব্যবহার করে সেকারণে বাহিনীর নিজস্ব ‘ক্রসফায়ার’ জাতীয় কর্মকান্ডকে সরকারকে হজম করতে হয়। অর্থাৎ উভয় উভয়ের সহযোগিতায় তাদের কর্মকান্ড পরিচালনা করে।

সরকার ও বাহিনীর উভয়ের এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের আইনগত বৈধতা দেয় আমাদের সংবিধান, ঔপনেবেশিক আমলের পেনাল কোড ও দন্ডবিধি। দেখুন, সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অংশে বলা হচ্ছে,‘আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।’ অর্থাৎ আইনানুসারে জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে। প্রশ্ন হচ্ছে কোনটি আইনানুসারে এবং কোনটি নয় সেটি কী দ্বারা নির্ধারিত হবে! এটি প্রচলিতভাবে নির্ধারণ করে থাকে সরকারের বাহিনীসমূহ। একইসাথে সংবিধানের ধারাসমূহেও সেটি নির্দেশ করে।

সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদের দায়মুক্তি বিধানের ক্ষমতা অংশে বলা হচ্ছে,‘এই ভাগের পূর্ববর্ণিত বিধানবলীতে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্বেও প্রজান্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোন ব্যক্তি বা অন্য কোন ব্যক্তি জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের প্রয়োজনে কিংবা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমার মধ্যে যে কোন অঞ্চলে শৃঙ্খলা রক্ষা বা পূর্ণবহালের প্রয়োজনে কোন কার্য করিয়া থাকিলে সংসদ আইনের দ্বারা সেই ব্যক্তিকে দায়মুক্ত করিতে পারিবেন কিংবা ঐ অঞ্চলে প্রদত্ত কোন দন্ডাদেশ , দন্ড বা বাজেয়াপ্তির আদেশকে কিংবা অন্য কোন কার্যকে বৈধ করিয়া লইতে পারিবেন’। এই ধারাতেও সরকার বা তার বাহিনী নির্ধারণ করে শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এবং সেই অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। যার দরুন এ পর্যন্ত দেশে একটি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিচার হয়নি।

THE CODE OF CRIMINAL PROCEDURE, 1898- PART III CHAPTER V (OF ARREST, ESCAPE AND RETAKING) এর Resisting endeavor to arrest- 46(3),`Nothing in this section gives a right to cause the death of a person who is not accused of an offence punishable with death or with transportation for life’. অর্থাৎ মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হতে পারে এমন মামলার আসামী ধরার জন্য প্রয়োজনে তাকে মেরে ফেলার বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয়তাটা নির্ধারণ করে বাহিনীর সদস্যরা।

পেনাল কোডের ১০০ ধারায় দেহের ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার অধিকারঃ ‘পেনাল কোড আইনের ৯৯ ধারার শর্ত সাপেক্ষে ১০০ ধারা মোতাবেক নিজের দেহ এবং অপরের দেহ আক্রমণকারীর আক্রমনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য নিম্নবর্ণিত ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার প্রয়োগ করা যায়। ১। এমন আঘাত মৃত্যুই যার পরিনতি ২। এমন আঘাত গুরতর জখমই যার পরিনতি।’ এখন আঘাতটি কেমন ছিলো বা আদৌও আঘাতের মত পরিস্থিতি ছিলো কিনা এটাও কিন্তু নির্ধারণ করে ঐ বাহিনীর সদস্যরাই।

৭৬ ধারায় বলা হচ্ছে,‘সরকারী কর্মচারী নিজেকে আইনবলে বাধ্য মনে করে বা ভুল ধারনা বশতঃ কোন কাজ করতে গিয়ে অপরাধ হয়ে গেলেও তাহা অপরাধ হিসাবে গণ্য হবেনা’। সুতরাং এই ধারাবলে বাহিনীর সদস্যকে জনগণের সাথে যা ইচ্ছা তাই করার সুযোগ প্রদান করা হয়েছে। কারণ সে যেকোন একটি অপরাধ (হত্যাকান্ডও হতে পারে) করে বলতেই পারে তার ভুল হয়ে গেছে। তখন এই ধারা তার রক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করবে।

এটা অত্যন্ত পরিষ্কার শুধুমাত্র বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিচার দাবী করলে তা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের’ ব্যবস্থাপনাকে টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করবে। একইসাথে এই ব্যবস্থা পরিবর্তনের আওয়াজ তুলতে হবে। নাহলে একটি দুটি ঘটনার বিচার হলেও বিনা বিচারে হত্যাকান্ড চলতেই থাকবে!

সেনা বাহিনীর সাবেক মেজর রাশেদের হত্যাকান্ডটি পুলিশ সামলে উঠতে পারেনি। কারণ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ও বাইরে তার সাবেক সহকর্মীরা বিক্ষুব্ধ হয়েছেন। সাবেক সেনা কর্মকর্তারা প্রথমবারের মত সংবাদ সম্মেলন করেছেন এধরনের কোন হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে। রাওয়া ক্লাবের চেয়ারম্যান মেজর (অব:) খন্দকার নুরুল আবসার বলেন,’দীর্ঘদিন ধরে বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারে মৃত্যু বা হারিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তিকে গায়েব করে সমাজের বিভিন্ন অপরাধ দমন করার প্রবণতার নেতিবাচক দিক প্রকাশ পাচ্ছে। অবৈধভাবে আশকারা পেয়ে গড়ে ওঠা সুবিধাবাদী গোষ্ঠী এই ক্রসফায়ার বা হারিয়ে যাওয়ার হুমকি ব্যবহার করে অবৈধ অর্থ উপার্জন ও এলাকায় অজাচিত নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করছে। আইনের শাষনের দূর্বলতার কারণে হয়রানি এড়াতে অধিকাংশ জনগোষ্ঠী এসব আইনবহির্ভূত কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসেনা’।

পুলিশ এই ঘটনা সম্পর্কে বলছে এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এর দায় বাহিনী নিবেনা। এই ঘটনার আলোচিত ব্যক্তি ওসি প্রদীপ সাহা দেশের সর্বোচ্চ পদক প্রাপ্ত অফিসার। পদক প্রাপ্তির জন্য সে ছয়টি অভিযানের উল্লেখ করে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠায়। সে ছয়টি ঘটনার প্রত্যেকটি ঘটনাই ছিলো ক্রসফায়ারের। সুতরাং এটা ধরে নিলে ভুল হবেনা যে তাকে পদক প্রদান করা হয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডে বিশেষ পারদর্শিতা অজর্নের জন্য। তার নেতৃত্বে গত এক বছরে টেকনাফ থানায় ক্রসফায়ারে হত্যাকান্ড ঘটেছে ২৪০ টি, এর মধ্যে শুধু মেরিনড্রাইভ ঐ রাস্তায় ১৬১ টি ঘটনা ঘটলেও একটি ঘটনা নিয়েও কোন উচ্চবাচ্চ হয়নি। প্রতিটা ঘটনাই হজম করে ফেলা হয়েছে। শেষের ঘটনাটি রং চয়েসের কারণে বদ হজম হয়ে গেছে।

এই হত্যাকান্ডের পর কক্সবাজারের এসপি ঘটনার সাফাই গেয়ে ষ্ট্যাটমেন্ট দিয়েছেন। পুলিশ বাদী হয়ে নিহত মেজর সহ তার টিমের অন্য দুইজনের নামে মামলা করে দুই জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তার হেফাজত থেকে ইয়াবা, মদ উদ্ধার দেখিয়েছে। এই ঘটনার সাথে যারা যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে আদালতে। মামলার বাদী হত্যাকান্ডের শিকার মেজরের বোন। তারপরেও পুলিশের পক্ষ থেকে এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে বলা হচ্ছে!! আজকে শুধুমাত্র মেজর (অব:) রাশেদ হত্যার বিচার নয় সাথে সাথে ওসি প্রদীপের নেতৃত্বে ঘটা প্রত্যেকটি ক্রসফায়ারের বিচারের দাবির আওয়াজ তুলতে হবে।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা লে: কর্ণেল মাহমুদুর রহমান চৌধুরী বলেন,‘বাংলাদেশের বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বেড়েই চলেছে। কে বাঁচবে, কে মারা যাবে, তা একজন পুলিশ পরিদর্শক কিভাবে সিদ্ধান্ত নেন! তাহলে আইন কোথায়, আদালত কোথায়!’ ঠিক তাই ! বর্তমানের এই ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন ছাড়া দেশে আপামর জনগণের বাঁচার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কারণ বর্তমান সংবিধান, ফৌজদারি কার্যবিধি আর দন্ডবিধি বছরের পর বছর টিকিয়ে রাখবে বিচারবহির্ভূত হত্যকান্ডকে।

লেখক: সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।





© All rights reserved © 2018 Odhikarbd.Com
ILoveYouZannath