শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন


করোনা সংক্রমণ:দেশের আসল পরিস্থিতিটা কী?

করোনা সংক্রমণ:দেশের আসল পরিস্থিতিটা কী?

ডা জয়দ্বীপ ভট্টাচার্য্য ::

চার-পাঁচদিন আগে একজন লোকের সাথে কথা হলো। তাঁর বয়স ৬০ বছরের উপরে। সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। টাকাপয়সা বিরাট না থাকলেও খুব কম নয়। সামাজিক নিরাপত্তার সূচকে তিনি উপরের দিকেই থাকবেন। আমাকে তিনি তাঁর আতঙ্কের কথা জানালেন এবং শেষে আশঙ্কা ব্যক্ত করলেন এই ভাষায় যে, “দেখুন, রোগ হবে ঠিক আছে। কঠিন রোগ, বাঁচতে নাও পারি মানলাম। কিন্তু চিকিৎসা করাতে পারব না, সেটা ভাবলে খুব ভয় লাগে। কোথায় যাব, কে আমায় রাখবে, কে সেবা করবে-বলুন তো?” এই কথার পরে এই সময়ের সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারিত প্রশ্ন, “আচ্ছা, সত্যিকার অবস্থাটা কী বলুন তো? আমাদের কি ইউরোপ-আমেরিকার মতো অবস্থা হবে?”প্রশ্নটা কঠিন। এক বাক্যে জবাব দেয়া শক্ত। অনেকগুলো তথ্য আছে আমাদের হাতে। তা বিশ্লেষণ করা যায়। এটাই বিজ্ঞাসম্মত রাস্তা। প্রচুর কথা বিভিন্নদিক থেকে হচ্ছে। আরও হতে সমস্যা কী?

আমাদের দেশের প্রেক্ষিতকে সামনে রেখে কিছু তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আমরা আমাদের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করতে পারি। আমি এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নই। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র আমি ঠিকই, তবে পেছনের বেঞ্চের। কিন্তু অবস্থা, অবস্থানকে মানছে না। প্রশ্নের উত্তর দিতেই হচ্ছে। এটাও ঠিক যে, মানুষ তো আমাদেরকেই জিজ্ঞেস করবে। আর কোথায় যাবে মানুষ? ফলে এই লেখায় আনাড়ির মতো হলেও সেটা খোঁজার চেষ্টা করি। এই লেখার মূল উৎসাহটা পেয়েছি এ বিষয়ে অন্য একটি লেখা থেকে- Tomas Pueyo এর লেখা ‘Corona virus: Why You Must Act: Politicians, Community Leaders and Business Leaders: What Should You Do and When?’ এই লেখার শেষে লেখাটির লিংক দেয়া আছে। আমাদের দেশে আক্রান্তের সঠিক সংখ্যাটা কত?প্রথমে আমরা এটা বোঝার চেষ্টা করি যে, আমাদের দেশে আক্রান্ত মানুষের সঠিক সংখ্যা কত? আইইডিসিআর এর ব্যাপারে অভিযোগ আছে তারা পরীক্ষা করছে খুবই সীমিত সংখ্যায়, বাস্তবে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তার চেয়েও বেশি। কিন্তু এই বেশিটা কত বেশি? অর্থাৎ আমাদের official case কত? true case কত? চীনের অভিজ্ঞতাটা একটু দেখা যাক।

গ্রাফটার দিকে তাকান। ওরেঞ্জ বারগুলো new diagnosed case অর্থাৎ প্রতিদিন নতুন যে কেসগুলো কনফার্ম হচ্ছে তাকে নির্দেশ করছে, এগুলো daily official new cases। গ্রে বারগুলো দেখাচ্ছে true daily cases অর্থাৎ সত্যিকারের কতগুলো নতুন কেস সেদিন ছিল। এই গ্রাফটা একটা নিছক সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা নয়। এর তথ্যগুলো Chinese Center for Disease Control and Prevention হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের medical history থেকে নিয়েছে। তারা তথ্য নিয়ে দেখেছে-ভর্তি হওয়া রোগী কখন infected হয়েছে। দেখা গেছে বিরাট একটা সংখ্যার ক্ষেত্রেই তাদের আক্রান্ত হওয়ার সময়ে অথরিটি জানতে পারেনি। জানতে পেরেছে তখনই যখন তাদের শারীরিক সমস্যা বেড়েছে, তারা ডাক্তারের কাছে গেছে এবং ডাক্তার টেস্ট করাতে পরামর্শ দিয়েছেন। সেই হিসেবে ২১ জানুয়ারিতে, যখন উহানে ১০০ নতুন রোগী করোনা আক্রান্ত হলো, স্বাস্থ্য বিভাগ নড়েচড়ে বসল, বাস্তবে সেদিন নতুন কেসের সংখ্যা ছিল ১৫০০, অফিসিয়ালি ডিটেক্টেড কেসের ১৫ গুণ বেশি। এর দুদিন পর উহান Shut down করে দেয়া হয়। সেদিন নতুন কেসের সংখ্যা সরকারি ভাষায় ৪০০, কিন্তু বাস্তবে সেদিন infected হয়েছে কমপক্ষে ২৫০০ লোক। কিন্তু সেটা অথরিটির হিসাবের বাইরে। একটা বিষয় লক্ষ করুন। এটা সেই সময়ের ডাটা, যখন করোনার স্প্রেডিং পাওয়ার সম্পর্কে আজকের মতো জ্ঞান তৈরি হয়নি। তখন চীন দিনে ৪০০ নতুন কেস ডিটেক্ট করেছে মানে তারও বেশি পরীক্ষা করিয়েছে। তখনই তার undetected true case এর সংখ্যা ২১০০।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে ভাবলে কী দাঁড়ায়? এদেশে ২১ জানুয়ারি থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ১০৭৬ টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, একদিনে সর্বোচ্চ নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১২৬ টি। ৮ মার্চ প্রথম একইসাথে তিনজন করোনা রোগী সনাক্ত করার পর আজ পর্যন্ত দিনে গড়ে নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে ৫১ টি। এই পরিসংখ্যানে official case আজ পর্যন্ত ৪৮ হলে true case কত হতে পারে? আমরা অফিসিয়াল স্ট্যাটিসটিক্সগুলোর দিকে তাকাই IEDCR এর হিসাবই ধরুন। আজ পর্যন্ত ৪৮ জন আক্রান্ত, মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের। তাহলে মৃত্যুহার ৯.৬%। বাস্তবে কোভিড ১৯ এ মৃত্যুহার ১.৫-৫%। সংখ্যাটা এমন কেন হচ্ছে? হচ্ছে এই কারণে যে official case থেকে true case অনেক বেশি। এটা বিশ্বাস করতে যদি এখনও আপনার দেরী হয়, তবে আপনার জন্য আরও কিছু তথ্য আছে। রিপ্রোডাকশন নাম্বার ও সিরিয়াল ইন্টারভ্যাল দিয়ে একটা ভাইরাসের বিস্তারের প্রাবল্য মাপা যায়। এটা সবসময় একই থাকে না। কী কী Preventive measures নেয়া হল এর উপর এটি বাড়ে কমে। যেমন উহানে Shut down এর আগে পর্যন্ত এই ভাইরাসের রিপ্রোডাকশন নাম্বার ছিল ১.১৫-৪.৭৭; মিডিয়ান হলো ২.৩৫। এই মিডিয়ান Shut down পরবর্তী এক সপ্তাহে কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১.১৫ এ।(Early dynamics of transmission and control of COVID-19: a mathematical modelling study; Open Access Published:March 11, 2020DOI:https://doi.org/10.1016/S1473-3099(20)30144-4) অর্থাৎ পারসোনাল প্রোটেকশন ও কালেকটিভ মেজার্স এর উপর এগুলো ‍নির্ভর করে। আমরা Shut down পূর্ববর্তী উহানের রিপ্রোডাকশন নাম্বারকেই ধরি। ধরি একজন গড়ে আড়াইজনকে আক্রান্ত করতে পারে। আবার এর সিরিয়াল ইন্টারভ্যাল হল ৩.৯৬ দিন [Serial Interval of COVID-19 among Publicly Reported Early Introduction of SARS-CoV-2 into EuropeIdentifying Locations with Imported SARS-CoV-2] আমরা জানি সিরিয়াল ইন্টারভাল যত কম ভাইরাসের বিস্তার তত বেশি। কারণ এক দেহ থেকে আরেক দেহে সে চারদিনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। যেখানে ইবোলার সিরিয়াল ইন্টারভাল কয়েক সপ্তাহ। ফলে একজন রোগী থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পড়ার আগেই ওই রোগীকে আইসোলেশন করা যায়। এবার এই দুই প্যারামিটারের সাথে দেশের পজিটিভ কেসগুলো মিলাই। শুধু মিরপুরের যে আক্রান্ত লোক ডেল্টা হাসপাতালের আইসিইউ এ মারা গেলেন তাকে একটা স্যাম্পল কেস হিসেবে ধরলেও ক্যালকুলেশনটা কী দাঁড়ায়? তিনি যদি মৃত্যুর ১৭ দিন আগে (এভারেজ রেটটা ধরলাম) সংক্রমিত হন, তাহলে তিনি কতজনকে সংক্রমিত করে গেছেন? আড়াই নয় দুই-ই যদি ধরি তাহলে সংখ্যাটা কী দাঁড়ায়? ওই দুজনের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আবার একই অংক চলবে।

Tomas Pueyo তার ক্যালকুলেশনে দেখিয়েছেন একটি মৃত্যু মানে ৮০০টি true case কমিউনিটিতে আছে। অন্যান্য ব্যাপারকোন একটা কেসের কয়টা traced contacts আমরা বের করতে পেরেছি? মিরপুরে ৪০ টা বাসা কোয়ারেন্টাইন করা হল। কিন্তু তাদের ব্যাপক নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা হলো না। শিবচরসহ যে জায়গাই লক ডাউন করা হয়েছে তাদের ক্ষেত্রে traced contacts ধরে ধরে নমুনা সংগ্রহ হয়নি। ফলে এই সংখ্যায় জ্যামিতিক হারে বিস্তার হয়নি বলার সুযোগ কম কারণ আমরা কোন ভাল barrier of transmission দাঁড় করাতে পারিনি। গলা বড় করে একটা কথাই আমরা বলতে পারি, সেটা হেল লক ডাউন। সেটার আলোচনায় আমি পরে আসছি। আরেকটা সংকট হচ্ছে, সরকার No test, No positive নীতিতেই শুধু চলছেন তা নয় – এই পিক আওয়ারেও এক একদিন দুইটা সেন্টার মিলে No positive আসছে। জোর করে পজিটিভ আনার ব্যাপার নেই, কিন্তু যখন দিনে হাজার হাজার টেস্ট করা দরকার তখন সামান্য সংখ্যক টেস্ট করে এবং তাতে নীল ডিক্লেয়ার করলে মানুষের কাছে মেসেজ যাচ্ছে, আমরা ব্যাপারটাকে কন্ট্রোলে নিয়ে এসেছি। ইউরোপ সময়মতো লক ডাউন করেনি, তাই তাদের এমন হচ্ছে। আমাদের দেশের লোকেদের ইমিউনিটি ভাল, ইউরোপের মতো সমস্যা আমাদের হবে না-ইত্যাদি। লক ডাউন সমাচারআমরা ‘লক ডাউন’ এ গেলাম ২৫ মার্চ। সরকারি ঘোষণার পর এক অভূতপূর্ব কান্ড ঘটলো। ওষুধই বিষ হয়ে গেলো। কারণ যে social distance এর কারণে ‘লক ডাউন’ সেটাই এক উচ্চ মাত্রার social attachment সৃষ্টি করলো। সবরকম জমায়েত নিষিদ্ধ করে আমরা একটি গণজমায়েত ঘটালাম, যেখানে বিভিন্ন জেলার অসংখ্য লোক পরস্পর ধাক্কাধাক্কি, গাদাগাদি করে বাস, স্টিমার, ট্রেন, ফেরিঘাট, লঞ্চে চড়ল। যেন এক মিলনমেলা! লক ডাউন ঘোষণার দিনের সেই সংবাদ সম্মেলনটা আমার চোখে ভাসছে। আমি যদি ভুল না করি তাহলে, আজ থেকেই লক ডাউন নয় কেন, দুদিন পরে কেন- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, দুদিনের breathing space দেয়া হয়েছে। এখন আপনি চোখ বন্ধ করে উপরের সব তথ্য ভুলে যান। আপনার ‘লক ডাউন’ একটা মিরাকল ঘটাবে সে সম্ভাবনা খুব কম। কিন্তু কিছুই করবেনা- তা বলছিনা। পরিকল্পিত ‘লক ডাউন’ হলেই আপনি কতটুকু নিশ্চিত থাকতেন? ইউরোপের দিকে তাকান। তারা প্রথমদিকটা হেলাফেলা করেছে, কিন্তু তারপর প্রপার ‘লক ডাউন’ করে, একটা ভাল হেলথ ইনফ্রাস্ট্রাকচার থাকার পরও হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে।

European Centre for Disease Prevention and Control বলছে করোনার বিস্তার এপিডেমোলজির কোন নিয়মই মানছে না। গোটা বিশ্বের চিত্রটা লক্ষ করুন- বিশ্বের কোভিড ১৯ রোগীর সংখ্যা ১ লক্ষ হতে সময় লেগেছিল ৬৭ দিন, ১ থেকে ২ লক্ষ হতে সময় লেগেছে ১১ দিন, ২ থেকে ৩ লক্ষ হতে সময় লেগেছে ৪ দিন। এখানে রিপ্রোডাকশন নাম্বার ও সিরিয়াল ইন্টারভ্যাল এর হিসাব দিয়ে অংক মেলানো যাচ্ছে না। একারণেই তাকে বলা হচ্ছে সুপার স্প্রেডার। একজন রোগী কোন এক জমায়েতে মিশে গিয়ে হাজার লোককে আক্রান্ত করতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে ‘Patient 31’ এর কথা বলা হয়। অর্থাৎ প্রথম করোনা রোগী দক্ষিণ কোরিয়ায় সনাক্ত হয় উহান থেকে আগত এক যাত্রীর মাধ্যমে। তাকে ধরে traced contacts দের কোয়ারেন্টাইন করার কাজ এগিয়ে নিচ্ছিল দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু ৩১ নম্বর অফিসিয়াল কেস গির্জার প্রার্থনা সভায় যোগ দিয়ে পুরো আউটব্রেকের চিত্রই বদলে দিল। তার মানে একটা জনাকীর্ণ জায়গায় একজন লোকও মারাত্মক একটা ব্যাপার ঘটিয়ে দিতে পারেন। তখন সকল ক্যালকুলেশনই ফেল করে যায়। আগ্রহীরা এই লিংকটাতে ঢুকে পড়ে দেখতে পারেন।https://graphics.reuters.com/CHINA-HEALTH-SOUTHKOREA-CLUSTERS/0100B5G33SB/index.htmlএতগুলো true case আমরা টের পাচ্ছিনা কেন ?

অর্থাৎ ১০ হাজার মানুষ সংক্রমিত হলে ১৩৮০ জনকে হাসপাতালে নিতে হবে। ৪৭০ জনের জন্য ইনটেনসিভ কেয়ার লাগবে। এর আগে হাসপাতালে Respiratory symptom screening করে দেখার ব্যাপার সংক্রমণটা কী মাত্রায় ছড়িয়েছে। আমাদের screening team, data analyst, Rapid Response Team কিছুই নেই বা থাকলেও আমরা জানি না। এই ধারা চলতে থাকলে একমাত্র হসপিটালে নিউমোনিয়ার রোগী over flooded না হওয়া পর্যন্ত এর মাত্রা বোঝা যাবে না। আইইডিসিআর নিউমোনিয়া নজরদারি করছেনা। করলে চিত্রটা বোঝা যেত। তারপরও একটা ছোট তথ্য চোখে পড়ল। এটা দিয়ে হিমশৈলের চূড়াটা আবছা দেখা যেতে পারে। এমনিতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে কেস রেকর্ড হয় না বললেই চলে। তারপরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও নিয়ন্ত্রণকক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে সারাদেশে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৪ হাজার ৪৬০ জন। আর এ বছর ফেব্রুয়ারিতে ভর্তি হয় ২৪ হাজার ৯৩০ জন। (প্রথম আলো, ১৭ মার্চ,২০২০)সংখ্যাটা ইঙ্গিতবহ। সঠিকভাবে তথ্য সংরক্ষণ করলে ও মার্চ মাসের ডাটা এনালাইসিস করলে একটা স্পষ্ট চিত্র আমাদের সামনে আসতো।
সহযোগিতা: https://medium.com/@tomaspueyo/coronavirus-act-today-or-people-will-die-f4d3d9cd99ca

লেখক : সহ-সভাপতি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, কেন্দ্রীয় কমিটি





© All rights reserved © 2018 Odhikarbd.Com
ILoveYouZannath