বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:২৩ অপরাহ্ন


করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে জার্মানিতে মৃত্যুহার কেন কম?

করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে জার্মানিতে মৃত্যুহার কেন কম?

মানিক চন্দ্র দাস:: গোটা রিপোর্টে কিছু ব্যাপার পরিস্কার। জার্মানি শুরু থেকেই সচেতন ছিলো এবং সবচাইতে ইন্টারেষ্টিং হচ্ছে তাদের একজন সংসদ সদস্য এপিডেমিওলজিষ্ট। আমাদের দেশের কথা নাই বা বললাম। বাংলাদেশ এমন একটা দেশ, এখানে চিকিৎসকদের পিপিই থাকে অন্যদের কাছে।

দিনের পর দিন, ভাইরোলজিষ্টদের মাথায় একটা প্রশ্নই ঘুরছেঃ অন্যান্য দেশের তুলনায় জার্মানিতে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত রোগীর মৃত্যুহার কম কেন? জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, ইতালিতে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীর মাঝে মৃত্যুহার ৯.৫%, ফ্রান্সে ৪.৩% কিন্তু জার্মানিতে মাত্র ০.৪%!

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রোগের একদম শুরুর দিকে জার্মান রোগীদের ট্র্যাক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর সংক্রমিত মানুষদের দলকে যে আলাদা করে ফেলেছিলো, সেটাই আসলে এই বিরাট পার্থক্যের জন্যে দায়ী। এর সহজ অর্থ হচ্ছে শুধু নিশ্চিত উপসর্গ সহ আসা রোগী, খুবই অসুস্থ্য বা সর্বোচ্চ-ঝুঁকির রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি রোগটি ছড়িয়ে পরার সত্যিকারের একটি ছবি তাদের হাতে ছিলো।

বার্লিন ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজির ডিপার্টমেন্ট অফ হেলথকেয়ার ম্যানেজমেন্ট এর হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট, রেইনহার্ড বিউসে বলেন, “শুরুতে আমাদের যখন কেইসের সংখ্যা কম ছিলো, সংক্রমিতদের খুঁজে বের করে আলাদা করে ফেলাটা খুব সহজ ছিলো। জার্মানীর সাফল্যের মূল কারন এই”।

মৃত্যুহার কমের পেছনে অন্যান্য কিছু ব্যাপার ও আছে, যেমন সংক্রমিতদের বয়স, যে সময়টায় রোগের বিস্তার ঘটলো সেই সময়টাও। বড় স্কেইলে পরীক্ষাটাও একটা বিষয়। গত মঙ্গলবার (২৪/৩/২০২০) দুপুর পর্যন্ত জার্মানিতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিলো ৩১,১৫০ জন। ফ্রান্সে তখন আক্রান্তের সংখ্যা ২০,১৪৯ জন। কিন্তু ফ্রান্সে মৃত্যুহার বেশি, এর অর্থ হচ্ছে ওখানে সংক্রামিত কিন্তু রোগ নির্ণয় হয়নি এমন কেইস অনেক আছে এবং ফ্রান্সে আউটব্রেক টা সম্ভবত জার্মানির চাইতে বেশি।

শুরুর দিকে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ ‘ইনফেকশন ক্লাস্টার’ একেবারে নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করেছিলো। যখনই কোন ব্যক্তির পরীক্ষার ফলাফল ‘পজিটিভ’ এসেছে, তারা কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং এর মাধ্যমে সংক্রমিত ব্যক্তি কাদের সংস্পর্শে এসেছিলো তা বের করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে কোয়ারেন্টাইন করে ফেলেছিলো, ইনফেকশন চেইন বা সংক্রমনের চক্রটা ওখানেই ভেঙ্গে গেছে।

বার্লিনের চ্যারিটি হাসপাতালের ভাইরোলজিষ্ট ক্রিশ্চিয়ান ড্রোস্টেন এর বক্তব্য হচ্ছে,জার্মানির খুবই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘ডায়াগনোষ্টিক ক্যাপাসিটি’ টাই মহামারী সনাক্তকরণের কাজটা করেছে সবার আগে”। এতে করে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোন সুযোগ নেই বলে তিনি সাবধান করে দিয়েছেন, বলেছেন, “সামান্য একটু ভুলেও আমাদেরকে একই পরিনতি বরন করতে হতে পারে”।

জার্মানিতে করোনা আউটব্রেকের দুটি আলাদা বিশেষ ধাপের দিকে খেয়াল করাটা খুব জরুরী বলে জানিয়েছেন এপিডেমিওলজিষ্টরা। যখনই কম্যুনিটি স্প্রেড শুরু হলো, ইনফেকশন চেইন খুঁজে বের করাটা হয়ে গেলো প্রায় অসম্ভব। কয়েকজন চিকিৎসক জানিয়েছেন এ সময়টায় করোনাভাইরাস হটলাইনে ফোন করে পরীক্ষা করাতে চেয়েছে এমন লোকজনকেও বাড়ীতে পাঠিয়ে দিতে তারা বাধ্য হয়েছিলেন, কারন নিরাপদে তাদেরকে পরিষেবা দেয়ার মতো যথেষ্ট প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট তাদের হাতে ছিলো না।

কেইসের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে , দেশের স্বাস্থ্যবিভাগ সোশ্যাল ডিসট্যান্স বা সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি সকল প্রকার জনসমাগম বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করে দিলেন। ফেডারেল স্টেইটস বাড়ির বাইরে দুইজনের বেশি মানুষকে একসাথে থাকার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে দিলেন।

মহামারিকালীন পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্যে দক্ষিন কোরিয়ার প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ, তাদের দেশে মৃত্যুহার ছিলো মাত্র ১.২ %। আর জার্মানীকে বিউসে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন সিদ্ধান্ত গ্রহনে টাইমিং এর জন্যে, যাতে করে মৃত্যুহার কমেছে।

বিউসে বলছেন,“দক্ষিন কোরিয়াতে সংক্রমনের সময়সীমা ছিলো বেশ লম্বা,তাই জার্মানির সাথে আসলে তুলনায় যাওয়া যাচ্ছেনা। আমাদের এখানে নতুন নতুন কেইস প্রচুর আসছে, এদের মৃত্যুর সময় হয়নি এখনো। জার্মানীর অবস্থা দক্ষিন কোরিয়ার চাইতে নরওয়ের সাথে মিল বেশী। জার্মানী এবং নরওয়ে এই দুটি দেশে একই সময়ে রোগটি এসেছে, কাজও করেছে একই ভাবে এবং মৃত্যুহারও একই,০.৪%”।

ফেডারেল এজেন্সির ডিজিজ কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট প্রেসিডেন্ট, লোথার ওয়েলার বলছেন, “সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখাটা আসলেই মৃত্যুহার কমাচ্ছে কিনা, তা এখনো পরিস্কার না। আজ সোমবার (২২/০৩/২০২০), এখনো হয়তো সংখ্যাটা খুব দ্রুত বাড়ছেনা, কিন্তু সবকিছু এখনই ঠিকঠাক বলা যাচ্ছেনা, কারন ডেটা বেশ ওঠানামা করছে। বুধবার (২৪/০৩/২০২০) নাগাদ হয়তো কিছুটা বোঝা যেতে পারে। শুরুতে জার্মানীর টেস্টিং ক্রাইটেরিয়া ছিলো ইটালীর মতো। যাদের শুধু উপসর্গ দেখা দিচ্ছিলো এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আছেন বা যদি তারা ইতিমধ্যে সংক্রমিত বলে ঘোষনা দেয়া মানুষের সংস্পর্শে এসে থাকেন-শুধু তাদেরই শুধু পরীক্ষা করা হচ্ছিলো। কিন্তু পরে অনেক কেইস পাওয়া গেলো যারা অন্যান্য দেশ থেকে মাত্রই বেড়িয়ে এসেছে।

এরপর থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার গাইডলাইনের পরিধি বেশ বাড়ানো হয়েছে। জার্মান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন এর মতে, মার্চের প্রথম সপ্তাহে ৩৫০০০ টেষ্টের বিপরীতে দ্বিতীয় সপ্তাহে টেষ্ট করা হয়েছে ১০০০০০। এর মাঝে হাসপাতালের ভেতরে যে পরীক্ষা করা হয়েছে তা অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি”।

জার্মান সংসদ সদস্য, এপিডেমিওলজিষ্ট কার্ল লোটারবাখ এর মতে, “জার্মানীতে রোগটি ছড়িয়েছে মূলত তরুনদের মাধ্যমে। এরা সবাই ছুটিতে দেশের বাইরে বেড়াতে গিয়েছিলো। বয়স্কদের তুলনায় তরুন সম্প্রদায় করোনা ভাইরাসের প্রকোপ ভালোভাবে সামলে উঠছে। ইতালিতে রোগটি ছড়িয়ে প্রথমেই আঘাত করেছে বয়স্ক লোকেদের। লোটারবাখের মতে,জার্মান সমাজেও যখন বয়স্কদের এই ভাইরাসটি আক্রমন করবে, তখন মৃত্যুহার বাড়তে পারে”।

সবার পরীক্ষা করা হচ্ছেনা, তাই অনেক করোন আক্রান্ত মানুষের রোগ সনাক্তই হবেনা তাই সত্যি সত্যি মৃত্যুহার জানা অসম্ভব। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, স্পেন, ইতালির মতো দেশ, যেখানে ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্যপরিষেবা ব্যবস্থা ভেঙে পরেছে, সেখানে মৃত্যুহার বেশি হবে, স্বাভাবিক। লোটারবাখের মতে, ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি ইন্টেনসিভ কেয়ার বেড, ভেন্টিলেটর থাকা এবং ভাইরাস বিস্তারের একদম শুরু থেকেই বিভিন্ন সুরক্ষা কার্যক্রম হাতে নেয়া জার্মানীর অবস্থা কখনোই ইতালি বা স্পেনের মতো হবেনা”। এরপরেও লোটারবাখ সামাজিক বিধিনিষেধের উপর গুরুত্ব আরোপ করছেন, বলছেন, “সবকিছুর বিচারে মহামারীর বিপক্ষে লম্বা সময়ের এই যুদ্ধের প্রথম রাউন্ডে জার্মানী যথেষ্ট ভালো করেছে, বাকীটা দেখা যাক”।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর করোনাই হচ্ছে জার্মানির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, বলেছেন এঞ্জেলা মার্কেল
গোটা রিপোর্টে কিছু ব্যাপার পরিস্কার। জার্মানি শুরু থেকেই সচেতন ছিলো এবং সবচাইতে ইন্টারেষ্টিং হচ্ছে এদের একজন সংসদ সদস্য এপিডেমিওলজিষ্ট। আমাদের দেশের কথা নাই বা বললাম। বাংলাদেশ এমন একটা দেশ, এখানে চিকিৎসকদের পিপিই থাকে অন্যদের কাছে। শুধু হাসপাতালে চাকরি করেন বলে চিকিৎসক কে বাসা ছাড়ার নোটিশ দেয়া হয়। করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ভেবে নিজেই কোয়ারেন্টিনে যাওয়া চিকিৎসক কে সরকারী ডাকবাংলো থেকে বের করে দেয়ার দুঃসাহস দেখায় একদল পাতি কেরানি।

জনগন জম্বির মতো ট্রেনে, ফেরিতে মুড়িঠাসার মতো হয়ে গ্রামের বাড়ীতে ফেরে। বাজার বন্ধ ঘোষনার পরেও বাজার বসে। সেটা ঠেকাতে গেলে পুলিশের উপর লোকজন লাঠি নিয়ে চড়াও হয়। বিদেশ ফেরত হয়েও ডাক্তারের কাছে সেটি গোপন করে যায়। করোনায় মৃত ব্যক্তির লাশ দাফনে কবরস্থানে নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। মহামারির সময়টায় সবার কাঁধে কাঁধ রেখে লড়াই করার সময়। এ সময় বিভেদের নয়। মহামারীর বিরুদ্ধের এই যুদ্ধে মানুষকে জিততেই হবে।

United (by maintaining social distance) we rise, divide we fall.

সূত্রঃ ওয়াশিংটন পোষ্ট
লিখেছেনঃ ওয়াশিংটন থেকে ক্রিস মুনি এবং বার্লিন থেকে ল্যুইসা বেক।
অনুবাদঃ মানিক চন্দ্র দাস।





© All rights reserved © 2018 Odhikarbd.Com
ILoveYouZannath