শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৭
শীর্ষ সংবাদ

সাম্প্রদায়িক মন মগজ…

এখানে শেয়ার বোতাম

খান আসাদ ::

প্রায় সবাই জানেন যে কোরানের বাংলা অনুবাদ করেছেন ভাই গিরিশচন্দ্র সেন। অনেকেই মনে করেন, নামের কারণে, যে তিনি হিন্দু। আসলে তিনি ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী।

উপনিষদ প্রথমে ফার্সিতে অনুবাদ হয়। তারপর তা প্রথমে ফরাসী ও পরে ইংরেজিতে অনুদিত হয়ে ইউরোপে যায়। উপনিষদ প্রথমে অনুবাদের ব্যবস্থা কে করেন, তা সম্ভবত অনেকেই জানেন না। উপনিষদ অনুবাদ করিয়েছিলেন দারা শিকো। এই দারা শিকো সম্রাট সাজাহানের বড় ছেলে।

মগজে কি খেলা করছে আপনার? যদি ভেবে থাকেন কেন “হিন্দু” লোক কোরান অনুবাদ করে, আর “মুসলমান” লোক উপনিষদ অনুবাদ করে, তাহলে আপনি সাম্প্রদায়িক মন মগজ নিয়ে চিন্তা করছেন।

ভাই গিরিশচন্দ্র কেবল কোরান ই নয়, আরও অনেক ধর্মীয় বই যেমন তাজকেরাতুল আউলিয়া সহ চল্লিশের অধিক বই অনুবাদ করেছেন। তেমনই হিন্দু ধর্মের বেদ, উপনিষদ ও গীতা (প্রধান তিনটি ধর্ম গ্রন্থ) অনুবাদ হয়েছে নানা ভাষায় হিন্দু নয় এমন মানুষদের দ্বারা।

সমাজবিজ্ঞানের মন মগজ নিয়ে ভাবলে, আমরা বুঝতে পারি যে, জ্ঞানের উৎপাদন, বিকাশ, চর্চা ও প্রসারের একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত থাকে। সেই প্রেক্ষিত রচনা হয় প্রধানত অর্থনীতি দিয়ে। ভূমিকা থাকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির, যে প্রযুক্তি না থাকলে বই ছাপানো সম্ভব হয়না।

এই উপমহাদেশে আগে কারা ছিল, পরে কারা আসছে? এর উত্তরে সাম্প্রদায়িক মন মগজ চিন্তা করে যে, বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান – এই রকম ধর্মীয় পরিচয়ের মানুষেরা। স্কুলে কলেজের ইতিহাসে আছে “বৈদিক” যুগ, মানে হিন্দু আমল, তারপর “মুসলমানদের” আগমন। যেন বৌদ্ধ বা হিন্দু ধর্মের আগে, এই অঞ্চলে কোন মানুষ ছিলোনা, সমাজ ছিলোনা, সভ্যতা ছিলনা।

সমাজবিজ্ঞানের মন মগজ দিয়ে দেখলে, ভারতের আদি সাম্যবাদী সমাজের ইতিহাসের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। যেই সমাজ সভ্যতা আদিবাসীদের সৃষ্টি। যা সাঁওতাল, ভীম, মুন্ডা সহ অনেক অনেক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতির ইতিহাস। যেখানে শ্রেণিভেদ ছিলোনা।

ভারতীয় সমাজে কিভাবে শ্রেণিভেদ বা দাস ব্যবস্থার উদ্ভব হল? বর্ণপ্রথার আড়ালে থাকায় ও সাম্প্রদায়িক ইতিহাসের কারণে সেটা জানা কঠিন হয়ে যায়। নৃতত্ত্ব ও পুরাতত্ত্বের প্রমাণ দিয়ে বোঝার বদলে, ধর্ম দিয়ে যা বোঝানোর চেষ্টা চলছে। ভারতীয় পিতৃতন্ত্রের উদ্ভব, ধর্মের যুক্তিতে শ্রেণি শোষণের ও শাসক শ্রেণীর পক্ষে বুদ্ধিজীবী উৎপাদনের সাথে ভারতীয় দাস সমাজের অর্থনীতি ও প্রযুক্তির সম্পর্ক আছে ।

“হিন্দু” মোদী “মুসলমান” কাশ্মীরিদের টাইট দিচ্ছে, – এটি একটি সাম্প্রদায়িক বয়ান। আসল দ্বন্দ্বটি ভারতীয় রাষ্ট্রের বা আমলা কর্পোরেট পুঁজির সাথে কাশ্মীরি জনগোষ্ঠীর সম্পদের মালিকানার। মতাদর্শের দ্বন্দ্বও আছে, ফ্যাসিবাদের সাথে লিবারেল গণতন্ত্রের, অমর্ত্য সেন যার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

ইতিহাসের সত্যকে, বিজ্ঞানের আলোয় (নৃতত্ত্ব ও পুরাতত্ত্ব) বোঝার জন্য, আগে দরকার মন মগজ থেকে সাম্প্রদায়িক জঞ্জাল দুর করা। যেমন সত্যিকার মানুষ হতে হলে মন মগজ থেকে যৌনবাদী “তেঁতুল তত্ত্ব” (নারী ভোগ্য বস্তু) দুর করার দরকার হয়।

ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে ব্যক্তির বিজ্ঞান চেতনার, স্কুলে সমাজবিজ্ঞান শিক্ষা দেয়ার বা না দেয়ার সম্পর্ক আছে। মন মগজ থেকে সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার দুর করতে হলে, সমাজবিজ্ঞানের আলো দরকার।

লেখক : জার্মান প্রবাসী অনলাইন এক্টিভিস্ট


এখানে শেয়ার বোতাম