মঙ্গলবার, মে ১৮
শীর্ষ সংবাদ

“২০২০ রুদ্ধশ্বাস ৪ মাস” : ১ম পর্ব ও ২য় পর্ব

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 33
    Shares

ছায়েরা খুকু ::

সময়তো সময়ের আবর্তে পরিবর্তিত হয়। একেক সময় নিয়ে আসে নতুন নতুন বৈচিত্রতা। এই বৈচিত্রতা হয় অনেক সময় সুখের আবার অনেক সময় বিস্বাদের। সন ২০১৯, শহরের দুই মেরুর দুই বাসিন্দা আবরার আহমেদ ও আছিম উদ্দীন। আবরার আহমেদ শহরের এক ধণাঢ্য ব্যবসায়ী এবং তিন সন্তানের বাবা। তার দুই মেয়ে এবং এক ছেলে। কন্যাদের নাম সাবাহ আহমেদ ও সুরাইয়া আহমেদ, ছেলে আহনাফ আর স্ত্রী এনা। ঐদিকে আছিম উদ্দীন চালান রিক্সা, তিন সন্তানের বাবা। দুই পুত্র সন্তান সাবিব, তামিম, কন্যা সাবিহা এবং স্ত্রী আইনুন নাহার। চলছে তাদের কোনো রকম জীবন। এই দুই পরিবারের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে আজ আমার এই কাহিনী লেখা।

আবরার সাহেবের অঢেল টাকা পয়সা সম্পত্তি। সকাল থেকে শুরু টাকা নামক অর্থ অনর্থের পিছনে ছুটোছুটি। অবিরাম গতিতে চলে ব্যস্ততা।এমন ব্যস্ততায় তাঁর স্ত্রী সন্তানদের সময় দেয়া হয়ে উঠেনা।তাদের সারাটা দিন কেমন করে যায় আবরার সাহেবের তা জানার দরকার নেই। জবাবদিহিতার কোনো প্রয়োজন বোধ করেন না তিনি। তাঁর কথা হলো তিনি দিচ্ছেন তো টাকা, আছেতো তাদের সব, তাঁকে আর কি দরকার। কিন্তু স্ত্রী এনা ঠিক বুঝে টাকা ছাড়াও চলতে গেলে অবশ্যই সন্তানদের বাবা এবং একজন স্ত্রীর স্বামীর দরকার।কিন্তু কে শোনে কার কথা আবরার সাহেবের তো তা শোনার সময় নেই। তাকে তো ছুটতে হবে অবিরাম মেশিনের মত। তাঁর বাড়াতে হবে সমাজে সম্মান, যশ, প্রতিপত্তি। আর এটার জন্য লাগবে টাকা। সারাদিন ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে গভীর রাতে এসে বিছানায় যখন গা এলিয়ে দেয় রাজ্যের ঘুম যেন তখন চোখে এসে ভর করে। অজানা থেকে যায় সন্তানের চাহিদা কি?স্ত্রীর চাহিদা কি? স্ত্রীর তখন মনে এসে ভীড় করে এক রাশ অভিমান। স্ত্রী এনা তখন ভাবে কি হবে এত টাকা পয়সা দিয়ে? কি হবে এত বিত্ত বৈভব দিয়ে? যদি প্রিয় মানুষটাকে কাছে না পায়, যদি না পারি প্রিয় মানুষটার সাথে মন ভরে কথা বলতে। যদি না পায় সন্তানরা বাবার স্নেহ। পিতার কাছে যদি না পারে সন্তানরা আবদার করতে।

অন্যদিকে আছিম উদ্দীন দিনে আনে দিনে খান। সারাদিন রাস্তায় রিক্সা চালিয়ে কতই বা পান। কোনোদিন ৭শ – ৮শ টাকা আবার কোনোদিন ৫শ – ৬শ টাকা। আবার তা থেকে মহাজনকে দিতে হয় দৈনিক ৪শ টাকা। দিন শেষে যা থাকে তা দিয়ে চলে তাঁর দিন। তবুও যেন তাঁর সংসারে ভালোবাসার অভাব নেই। সন্তানদের পিতৃস্নেহ দিতে নেই কোনো কার্পণ্য। দিনের অবসানে বাসায় ফিরার তাগিদ যেন তার কর্তব্য ও ভালোবাসা। এক কক্ষের একটা ঘরে ছেলেমেয়েদের অগোচরে বিছানায় আইনুন কে কাছে পাওয়া যেন অনেক বড় পাওনা। কিন্তু স্বামীর এমন আহ্লাদী চাওয়া পাওয়া আইনুনের বিরক্ত লাগে। কথায় আছেনা, “অভাব যখন দরজায় টোকা দেয়, ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালাই। ” আইনুনের ভাবনা সর্বক্ষণ সন্তানদের মুখে ভালো মন্দ একটু তুলে দিতে পারেনা, পরিধাণের জন্য ভালো জামাকাপড় দিতে পারেনা, নিজেরও একটা ভালো শাড়ী নেই। অভাব অনটনের সংসার। তার স্বামী কেমন করে বায়না ধরে সে যেন দিনের শেষে আইনুনের হাসি খুশি চেহারা দেখে।

২০১৯ এর শেষের দিকে একদিন আছিম উদ্দীন দুপুরে দোকানে বসে খাচ্ছিলেন। তখন টিভির সংবাদে শুনতে পেলেন চীনে নাকি এক নতুন রোগ দেখা দিয়েছে। এই রোগে নাকি ছোঁয়াছুঁয়ি যাবেনা।

 

দ্বিতীয় পর্ব:

২০১৯ এর শেষের দিকে একদিন আছিম উদ্দীন দুপুরে দোকানে বসে চা পান করছে । তখন টিভির সংবাদে শুনতে পেল চীনে নাকি এক নতুন রোগ দেখা দিয়েছে । এই রোগে নাকি ছোয়াছুয়ি যাবেনা। সন্ধ্যায় যখন বাসায় ফিরলো স্ত্রীকে হাসি ঠাট্টা করে বলতে শুরু করলো আছিম উদ্দীন, “ আইনুন শুনছোস, একটা নাকি নতুন রোগ আইছে , তাতে নাকি মেলা লোক আক্রান্ত অইতেছে , কারো কাছে কেউ যায়তে পারতেছেনা । তাইলে কি অইবো আইনুন ? আমগো দেশোত আইলে আমিতো তোরে ছুইতে পারুম না ,তোর কাছে আইতে পারুম না।“ আইনুন তেঁড়িয়ে উঠে বলে, “ যান তো , আফনের সবকিছুতে আদিক্ষেতা । চাল নেই , চুলো নেই , তার আবার ভালোবাসা । আহ্লাদে আর বাচি না , সরেন আমি ভাত বসাইতে যাই। আছিম হাসে আর মনে মনে বলে, “ আইনুন, তুই আর মানুষ হইলিনা, আমার মর্ম বুঝলিনারে। যখন আমি থাকবোনা তখন তুই বুঝবি আমার অতিরিক্ত আহ্লাদ তোর জন্য কি ছিলো ।“

ওইদিকে আবরার সাহেবের কানেও কোনোরকমে পৌঁছল চীনের নতুন রোগের কথা। নাম নাকি করোনা। মনে মনে ভাবে আমাদের দেশে তো আসবেই যেহেতু আমদানি রপ্তানির সম্পর্ক আছে। এভাবে দুই মেরুর দুই বাসিন্দার ভাবনার মধ্য দিয়ে পার হলো দুই মাস।

সন ২০২০। আসলো বাংলাদেশে নতুন ঝড় করোনা ঝড়। যা বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের উপর প্রভাব ফেলে বিরুপ প্রতিক্রিয়ায়। হঠাৎ ঘোষণা পরলো লকডাউনের। ঘরে না থাকলে সংক্রমণ বাড়বে। যা প্রতিহত করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হবেনা। সময় থাকতে সদ্ব্যবহার করতে হবে। দেশে চলছে লকডাউন । অফিস আদালত ব্যবসা পাতি সব বন্ধ। তাই আবরার সাহেব এবার এনার খাচায় বন্দী। দিনগুলো শুরু হচ্ছে স্ত্রী সন্তানদের মুখ দেখে । ঘুম আসছেও তাদের মুখ দেখে। অনেকদিন পর স্ত্রী সন্তানদের কাছে পেয়ে আবরার সাহেবের খারাপ লাগছেনা। স্ত্রী এনা পেলো যেন সুখের স্বর্গ । কতবছর পর প্রিয় মানুষটার একটু কাছে আসা, দুইজন মিলে বসে একটু আড্ডা, মানুষকে নিয়ে একটু ভাবনা , মন্দতো নয়। এনার অনেক ভালো লাগছে এই দিনগুলোতে কেননা তার স্বামী বিকেলবেলা হলে ইউটিউব চ্যানেল দেখে স্ত্রী সন্তানদের জন্য বিভিন্ন নাস্তা তৈরি করেন আর তাদেরকে সাথে বসিয়ে তাঁর তৈরি করা নাস্তা পরিবেশন করে খাওয়ানো এই যেনো অন্যরকম পাওয়া , চেপে যাওয়া ভালোবাসা যেন মাটি ফুঁড়ে বের হচ্ছে পাতালপুর থেকে। করোনার কারণে বাসার কাজের মেয়েরও ছুটি। আবরার সাহেব ভাবেন এনা কে তো এইসব কাজে আমি একটু সাহায্য করতে পারি । তাই তিনি সন্তানদের সাথে নিয়ে এনাকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতে লাগলেন।

এনা ভাবে ,” বছরের সবদিনগুলো যদি এভাবেই চলতো।“ রাত্রে বিছানায় গেলে বিরামহীনভাবে দুইজনের গল্প করে রাত কাঁটানো, একটু ছুঁয়ে দেখা , খুনসুটি করা কতই না আনন্দের ! লকডাউনের দিনগুলো এভাবে চলতে লাগলো এনার। কিন্তু কথায় বলেনা সুখ চিরস্থায়ী নয় , সুখ যেন ওঁত পেতে থাকে দুঃখের খবর আনার জন্য। আবরার সাহেবের পরিবারে বেজে উঠলো অশনি সংকেত । কি থেকে কি হয়ে গেলো। এক বিকেলে আবরার সাহেবের এক আত্মীয় আসলেন তার বাড়ীতে শ্বাসকষ্ট নিয়ে। আবরার সাহেব দয়ালু মানুষ। তিনি উনাকে নিয়ে ভর্তি করালেন হাসপাতালে। করোনা ভাইরাস বলে কথা ,ছোঁয়াছুঁয়ি যাবেনা তাই এনার কথা আবরার সাহেবকে পরীক্ষা করাতে হবে । উনিও তাতে মত দিলেন। তিনি ও পরিবারের সবাই পরীক্ষা করালেন । কোনো লক্ষণবিহীন সবাই করোনা পজিটিভ শুধু এনা ও তার সন্তানরা ছাড়া। কিন্তু সন্তানদের না হলে কি হবে এনার সবচেয়ে বড় আপনজন ,তার প্রাণের চেয়েও প্রিয় স্বামীর তো পজিটিভ। এবার আলাদা থাকার পালা । আলাদা থাকতে হবে সবাইকে , কাছে থেকেও সবাই দূরে , অনেক দূরে। এটা এনার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। সে আস্তে আস্তে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়তে লাগলো। তাকে সান্তনা দেওয়ার ভাষাও যেন তার পরিবার হারিয়ে ফেলেছে। সবাইকে ভিডিও কলে বলা তার আকুতি গুলি ছিলো,” আমার স্বামীর কিছু হবে না তো? তার কিছু হলে আমি কোথায় যাবো, আমার সন্তানদের কি হবে?” উনাদেরও যেন চোখের পানি শুকিয়ে গেছে , তাকে কিছু বলার ভাষা যেন হারিয়ে ফেলেছে। যারা করোনা পজিটিভ তারা কিন্তু এনার মত ভেঙ্গে পড়েনি। তারা পজিটিভ হলেও অসুস্থ না। এনাতো তার প্রিয়জনের চিন্তায় ব্যাকুল । সে ভেবে ভেবে অস্থির যে মানুষটার দিন যেত শুধু বাইরে বাইরে সেই মানুষ কেমন করে পারবেন নিজেকে একটা রুমে বন্দী রাখতে। তাই এনার কথা আবরার সাহেবের দরজা বন্ধ রাখা চলবেনা ,ফোন বন্ধ রাখা চলবেনা। যদি একটু সাড়া সব্দ না পায় আরো অস্থির হয়ে যায় সে, আরো অস্থিরতা বেড়ে যায় যখন তার রুমের বেল্কনিতে যায়। গিয়ে যখন দেখে শহরের অতি ব্যস্ততম রাস্তাটা যেন জনমানবশুণ্য এক মরুপ্রান্তর। কোনো মানুষের অস্তিত্ব যেন শহরে নেই শুধু দেখে কাকফাঁটা রোদ্দুর। এই রোদ্দুর যেন জানান দিচ্ছে আসছে সম্মুখে নতুন কোনো বিপদ। পরম কাছের মানুষ নিজ সন্তানরাও আজ কাছে নেই। তাদেরকেও দিয়ে রেখেছে তার বোনের কাছে। ভয়ে তাদের সাথেও কথা বলেনা পাছে ছেলেমেয়েরা যদি এসে যেতে চায় কান্না করে। তাদের জন্য সে চিন্তা করেনা তেমন । তারা আছে তার প্রিয় নির্ভরযোগ্য স্থানে যেখানে তাদের কোন বিপদ হবেনা। আস্তে আস্তে ভাইরাস পজিটিভদেরও চৌদ্দদিন পালন হলো অসুস্থতাহীন। এবার আবার পরীক্ষার পালা। এনার নতুন ভাবনা নেগেটিভ আসবেতো? অবশেষে জল্পনাকল্পনার শেষ । সবাই নেগেটিভ, এনা এবার স্বামী সন্তানদের কাছে পেলো। এনা একটূ শঙ্কামুক্ত । দোয়া করে দুই হাত তুলে,” আল্লাহ, সবাইকে শান্তি দাও, স্বস্তি ফিরিয়ে দাও।“

অপরদিকে , আছিমউদ্দীন লকডাউন কি জিনিস বুঝেনা , তার পেটেতো ক্ষিধা। তার স্ত্রী সন্তানদের মুখে খাবার দিতে হবে। তাই সে রিক্সা নিয়ে পথে বের হলো। কিন্তু রাস্তায় এসে দেখে কোনোখানে মানুষ নেই, আছে শুধু আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কিছু স্বেচ্ছাসেবক। আছিম উদ্দীন ভাবনায় পরে গেলেন কি করবেন আর রাস্তার এই হাল কেন? মানুষজন কই? কেউ রিক্সার সওয়ারী না হলে তো ভাত জুটবেনা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও যেন বেপরোয়া হয়ে উঠলো দেশের স্বার্থে কারণ তারা রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের জনগণের সেবায় নিয়োজিত। তাদের জীবন দিয়ে হলেও মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে হবে। আছিম উদ্দীন যখন সামনে এগোতে থাকে তখন একজন পুলিশ সদস্য এসে বললেন যে রিক্সা চলবেনা কারণ লকডাউন চলছে। সেতো হতবাক আর ভাবে লকডাউন এটা আবার কি?

গল্পটি চলবে…….

 


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 33
    Shares