বুধবার ‚ ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ ‚ ২৭শে মে, ২০২০ ইং ‚ রাত ৩:২৬

Home মতামত হার্ড ইম্যুউনিটি ও করোনা-মহামারী

হার্ড ইম্যুউনিটি ও করোনা-মহামারী

অনুপম সৈকত শান্ত::

হার্ড ইম্যুউনিটি (Herd Immunity) কি?

যখন কোন দেশের বা কোন কমিউনিটির একটা বড় সংখ্যক মানুষের মাঝে কোন ভাইরাসের বিপরীতে ইম্যুউনিটি থাকে, তখন সেটি নতুন একজনকে (যে ইম্যুউনড না) ঐ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। এই ব্যাপারটাকেই বলে হার্ড ইম্যুউনিটি বা কমিউনিটি ইম্যুউনিটি।

হার্ড ইম্যুনিটি কিভাবে কাজ করে?

যখন একেবারে নতুন কোন ভাইরাস কোন অঞ্চলে চলে আসে, তখন সেই ভাইরাসের বিপরীতে কেউই ইম্যুউনড থাকে না। ফলে ভাইরাসটি যে কাউকেই আক্রান্ত করতে পারে এবং সেই ব্যক্তি থেকে অপরের মাঝে ছড়াতে থাকে, ও ধারাবাহিকভাবে একজন থেকে আরেকজন, এভাবে একটা চেইনের মত অনেকের মাঝে ছড়াতে পারে (চিত্র ১ এর বামের ছবি)। কিন্তু একজন ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার পরে সুস্থ হয়ে উঠলে বা ভ্যাক্সিনেশনের মাধ্যমে তার মধ্যে ইম্যুউনিটি গ্রো হলে, সেই ব্যক্তিটি দেয়াল বা শিল্ডের মত কাজ করে, মানে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে ভাইরাসটি নিয়ে নিজে আক্রান্ত হওয়া ও অন্যদের আক্রান্ত করার কাজটি তার কাছে এসে আটকে যাচ্ছে (চিত্র ১ এর ডানের ছবি)। অর্থাৎ এই ইম্যুউনড মানুষটি অনেক নন-ইম্যুউনড মানুষকে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে একরকম পরোক্ষ সুরক্ষা দিচ্ছে। যখন বিপুল সংখ্যক মানুষ এরকম ইম্যুউনড হয়ে যাবে, তখন বস্তুত সেই ভাইরাস আর সেভাবে আক্রান্ত করার মানুষ খুঁজে পাবে না, ফলে বংশ বৃদ্ধি করতে না পেরে একসময় ভাইরাসটি নির্মূল হয়ে যাবে। এটিকেই হার্ড ইম্যুউনিটি বলে।

চিত্র ১: একজন ইম্যুউনড ব্যক্তি অপর নন-ইম্যুনড ব্যক্তিকে পরোক্ষা সুরক্ষা দিতে পারে

হার্ড ইম্যুউনিটির জন্যে কতভাগ মানুষকে ইম্যুউনড হতে হবে?

এর জন্যে জানতে হবে ঐ ভাইরাসের সংক্রমণের হার কত! তার জন্যে বিজ্ঞানীরা Ro (আর-নট) বলে একটা নাম্বারের কথা বলেন, এটি হচ্ছে ভাইরাসের বেসিক রিপ্রোডাকশান নাম্বার বা বাংলায় ভাইরাসের প্রজনন হার, যার মানে হচ্ছে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে গড়ে কতজন ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে, সেই সংখ্যা বা হার। কোন ভাইরাসের Ro যদি হয় ২, তাহলে প্রথম ধাপে যদি ১ জন আক্রান্ত থাকে, দ্বিতীয় ধাপে আক্রান্ত হবে আরো ২ জন, তৃতীয় ধাপে হবে আরো ৪ জন, চতুর্থ ধাপে ৮ জন, তারপরের ধাপে ১৬ জন, এরপরে ৩২ জন, তারপরে ৬৪ জন। এভাবে গুণোত্তর বা এক্সপোনেনশিয়াল হারে বাড়তে বাড়তে ১০ম ধাপে আক্রান্তের সংখ্যা ১০০০ পার হবে, ১৭ তম ধাপে ১ লাখ পার হবে আর ২৪ তম ধাপে গিয়ে ১ কোটি পার হবে। অবশ্য এরকম পুরোপুরি গুণোত্তর হারে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়া একইরকম থাকে না, কেননা কিছুদিন পর থেকেই একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে যে দুজন ব্যক্তির আক্রান্ত হওয়ার কথা, অনেক সময়ে দেখা যাবে সেই দুজনের একজন বা দুজনই এরই মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে। ফলে সেক্ষেত্রে তার একটি বা দুটো চেইনই থেমে যাচ্ছে (যথাক্রমে)।

চিত্র ২: হার্ড ইম্যুউনিটি কিভাবে কাজ করে

যদি অর্ধেক জনগোষ্ঠী ইম্যুউনড হয়, তাহলে ভাইরাসটির প্রজনন হার ২ হওয়ার পরেও আক্রান্তের সংখ্যা সেভাবে বাড়তে পারবে না। কেননা, এক্ষেত্রে একজন আক্রান্ত ব্যক্তির তার পাশের যে দুজনের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়ানোর কথা ছিল, দেখা যাবে গড়ে মাত্র একজনের মাঝেই ছড়াতে পারবে, যেহেতু সেই দুই জনের মাঝে একজন এরই মধ্যে ইম্যুউনড। কিছু ক্ষেত্রে দুইজনই নন-ইম্যুনড যেমন থাকবে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে দুইজনই ইম্যুউনডও পাওয়া যাবে। অর্থাৎ কোন কোন ক্ষেত্রে দুটি চেইন শুরু হলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেখান থেকে ডালপালা ছড়াবে না, এবং একটা সময় যখন একজনও নন-ইম্যুউনড পাবে না, সেখানে চেইনটি এসে থেমে যাবে। এভাবেই ভাইরাসের আসল Ro এর মান ২ হলেও অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ইম্যুউনড করার মাধ্যমে ভাইরাসের কার্যকর Ro এর মান হয়ে যাচ্ছে ১ বা ১ এর কম।

অর্থাৎ যে ভাইরাসের Ro এর মান ২, তার বিপরীতে হার্ড ইম্যুনিটি অর্জনের জন্যে ৫০% লোককে ইম্যুউনড হতে হবে। এক্ষেত্রে, খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, Ro এর মান। মূল ব্যাপার হচ্ছে যতক্ষণ এর মান ১ এর উপরে থাকে, ততক্ষণ আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। যখনই এর মান ১ বা তার নীচে নামবে আক্রান্তের সংখ্যা আর বাড়বে না, বরং কমতে কমতে এক সময় ভাইরাসটি নাই হয়ে যাবে। ফলে, হার্ড ইম্যুউনিটির ক্ষেত্রে জনগোষ্ঠীকে ইম্যুউনড করার মাধ্যমে এই Ro এর মান ১ বা এর নীচে নেয়া হয়। ফলে, সূত্রটা দাঁড়াচ্ছে এরকম, যদি ভাইরাসের আসল প্রজনন হার Ro, তাহলে (Ro – ১)/ Ro অনুপাতে জনগোষ্ঠীকে ইম্যুউনড করলেই হার্ড ইম্যুউনিটি অর্জন করা সম্ভব। যদি Ro এর মান হয় ৩, তাহলে প্রতি ৩ জনে ২জনকে, মানে ৬৭% জনগোষ্ঠীকে ইম্যুউনড করলেই একজন আক্রান্ত ৩ জনের মধ্যে ২ জনকেই ইম্যুউনড পাবে বিধায় কেবল ১ জনকেই আক্রান্ত করতে সমর্থ্য হবে। এভাবে, Ro যদি হয় ৪, তাহলে ৭৫% জনগোষ্ঠীকে ইম্যুউনড হতে হবে। আমরা জানি, হাম খুবই সংক্রামক একটি রোগ, এর Ro এর মান ১২-১৮, ফলে হাম থেকে রক্ষার জন্যে ৯০%-৯৫% মানুষের ইম্যুউনিটি দরকার, সে কারণেই হামের ভ্যাক্সিনেশন প্রোগ্রামে সামান্য দুর্বলতার উপায় নেই।

R0ভাগ কে ম্যুউনড হতে হবে?
০%
৫০%
৬৭%
৭৫%
১২-১৮ (হাম)৯২-৯৫%
২.৪ – ৩.৩ (কোভিড-১৯)৬০-৭০%
টেবিল ১: কতভাগ জনগণকে ইম্যুউনড হতে হবে?

কোভিড-১৯ এর বিপরীতে হার্ড ইম্যুউনিটির জন্যে কত মানুষকে ইম্যুউনড হতে হবে?

এ সম্পর্কে জানার জন্যে আগে জানতে হবে, সার্স-কোভ-২ এর Ro কত! এটা নিশ্চিতভাবে বলা মুশকিল! কেননা দুনিয়াজুড়ে এই ভাইরাসের নানারকম ডাটা আছে, কিছু ক্ষেত্রে ডাটার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে, কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাসেরও এলাকাভেদে ভিন্ন আচরণ দেখা গিয়েছে। তারপরেও, বিভিন্ন স্টাডিতে দেখা যাচ্ছে সার্স-কোভ-২ এর Ro এর মান ২.৪ থেকে ৩.৩। সে হিসেবে এর বিপরীতে হার্ড ইম্যুউনিটি অর্জনের জন্যে শতকরা ৬০-৭০ ভাগ মানুষকে ইম্যুউনড হতে হবে। এই যে Ro এর মান ২.৪ থেকে ৩.৩ বলা হচ্ছে, সেটিও দুনিয়াজুড়ে নানারকম পদক্ষেপ, লকডাউন তথা একদেশের সাথে আরেক দেশের এক শহরের সাথে আরেক শহরের স্বাভাবিক যোগাযোগ বন্ধ, মানুষের সচেতনতা যেমন ঘনঘন হাত ধোয়া, সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা- এসব ধরেই। সেগুলো বাদ দিয়ে সাধারণ অবস্থায় Ro এর মান আরো বেশি হতে পারে। তারপরেও Ro এর মান পূর্ণসংখ্যায় যদি ধরি ৩, তাহলেও ৬৭% জনগোষ্ঠীর ইম্যুউনড হওয়ার আগ পর্যন্ত কারোর নিশ্চিন্ত থাকার উপায় নাই। অর্থাৎ গোটা দুনিয়ার পৌনে ৮ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে প্রায় ৫ বিলিয়ন মানুষ যতদিন না ইম্যুউনড হচ্ছে, ততদিন এই করোনাভাইরাসের হাত থেকে মুক্তি নেই।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হার্ড ইম্যুউনিটি কিভাবে অর্জন সম্ভব?

বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। হার্ড ইম্যুউনিটির জন্যে যদি ৩ জনের ২ জনকে ইম্যুউনড হতে হয়, তাহলে প্রায় ১২ কোটি মানুষকে ইম্যুউনড হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, কোন উপায়ে বাংলাদেশের এই ১২ কোটি মানুষ বা দুনিয়ার প্রায় ৫ বিলিয়ন মানুষকে ইম্যুউনড বানিয়ে হার্ড ইম্যুউনিটির পথে যেতে হবে? কৃত্রিম উপায়ে ভ্যাক্সিনেশনের মাধ্যমে, নাকি প্রাকৃতিক উপায়ে? এই করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক বা ভাক্সিন এখনো ট্রায়াল ফেজ উত্তীর্ণ হয়নি, সেই পর্যায় পার হয়, ব্যাপক হারে উৎপাদন, ব্যাপকহারে মানুষকে ভ্যাক্সিন দেয়া, এতে কম করে হলেও দেড়-দুই বছর লাগবেই। ফলে, ভ্যাক্সিন আসার আগ পর্যন্ত হার্ড ইম্যুউনিটির আলোচনার অর্থই হচ্ছে, প্রাকৃতিক উপায়ে জীবিত, শক্তিশালী, ভীষণ সংক্রামক ভাইরাস দিয়ে ইম্যুউনিটি অর্জন। এক্ষেত্রে, সবার আগেই মাথায় আনা দরকার এই ভাইরাসের মৃত্যু ঘটানোর সামর্থ্যের কথা। কোভিড-১৯ এর মৃত্যুহার যদি ধরি ১%, তাহলে বাংলাদেশে মারা যাবে ১২ লাখ মানুষ। যদি কম করে ধরি ০.১% বা প্রতি হাজারে ১ জন (ফ্লু ভাইরাসের চাইতেও কম), তারপরেও ১২ কোটি মানুষকে প্রাকৃতিক উপায়ে ইম্যুউনড করতে চাইলে মারা যাবে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ। প্রকৃতপক্ষে, একই সময়ে যদি বিপুল সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হতে শুরু করে, তাহলে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার পক্ষে অধিকাংশ মানুষকে সামান্যতম চিকিৎসা সেবা সম্ভব হবে না, বিধায় মৃত্যুহার অনেক বাড়বে। সুতরাং, ভ্যাক্সিন আসার আগে এরকম হার্ড ইম্যুউনিটির নামে মানুষের মাঝে অবাধে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা (সমস্ত রকম লক ডাউন তুলে দিয়ে স্বাভাবিক মেলামেশি শুরু করার মাধ্যমে) করার অর্থ হচ্ছে হাজারে হাজারে, লাখে লাখে মানুষের মৃত্যুর ব্যবস্থা করা, যা বস্তুত গণহত্যারই সমতুল্য। অর্থাৎ, যেসব সরকার ভ্যাক্সিন ছাড়াই হার্ড ইম্যুউনিটির কর্মসূচি নিচ্ছে, তারা আসলে গণহত্যার কর্মসূচিই নিচ্ছে।

হার্ড ইম্যুউনিটির ব্যাপারে সরকারগুলোকে কোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে?

যতদিন ভ্যাক্সিন আমাদের হাতে না আসছে, ততদিন এই হার্ড ইম্যুউনিটিকে ঠেকাতে হবে, ধীর করতে হবে, হার্ড ইম্যুউনিটির পথে যত দেরিতে যাওয়া সম্ভব সেই চেস্টা চালাতে হবে। আর, যেই মুহুর্তে আমাদের হাতে ভ্যাক্সিন চলে আসবে, তখন থেকে যত দ্রুত সম্ভব আমাদের হার্ড ইম্যুউনিটি অর্জনের জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

কিছু সাধারণ প্রশ্ন/ যুক্তি এবং তার উত্তরঃ

১। হার্ড ইম্যুউনিটি কর্মসূচির পক্ষে বিপক্ষে বিতর্ক হচ্ছে। একটা বড় যুক্তি বা প্রশ্ন অনেকেই করছেনঃ অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্যে হার্ড ইম্যুউনিটির পথে কি যাওয়া উচিৎ?

আগেই বলেছি, ভ্যাক্সিন আসার আগ পর্যন্ত হার্ড ইম্যুউনিটির পথে এগুনোর কোন কর্মসূচির কথা কল্পনাও করা যাবে না, সমস্ত কর্মসূচির কেন্দ্রে থাকতে হবে- এই হার্ড ইম্যুউনিটির পথে কত ধীরে ও কত দেরিতে যাওয়া যায় সেই উদ্দেশ্য। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই, অন্য বিষয়গুলোর সাথে একরকম সমন্বয়ের মাধ্যমে চলতে হবে। এটা ঠিক যে, একটা দেশের বা পরিবারের শতভাগ মানুষকে অনির্দিষ্টকাল ধরে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মত ঘনবসতিপূর্ণ দেশে ঘরে, পাড়ায়, মহল্লায় ঘরের ভিতরেও পরিবারের সদস্য সংখ্যা, তাদের পারস্পরিক দূরত্ব ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানোর জন্যে অনুকূল নয়। আর, অর্থনীতির চাকা সচল রাখার তাগিদ শুধু ধনিক শ্রেণীর নয়, সাধারণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষদেরও। যে কারণে দেখা যায়, আমাদের দেশে সেই নিম্নবিত্ত মানুষেরাই লকডাউন ভেঙ্গে ত্রাণের জন্যে গাদাগাদি করে লাইনে দাঁড়াচ্ছে, ত্রাণের দাবিতে রাস্তা অবরোধ করছে- বিক্ষোভ করছে। কারখানা খুলে দিলে শ্রমিকরা পড়িমরি করে ছুটে আসছে, এই মহামারীর মাঝেই বেতন-ভাতার দাবিতে বিক্ষোভ করছে। করোনায় না ক্ষুধায় মরবো- এরকম নির্মম এক সমীকরণের মাঝে তারা। ফলে, অর্থনীতির বিবেচনাটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের খাবারের চাহিদা মেটানোর জন্যে কৃষি উৎপাদন বন্ধ করার উপায় নেই, সেই খাদ্যপণ্য পরিবহনের জন্যে পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ করার উপায় নেই, চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত মানুষদের ঘরে থাকা তো দূরের কথা, আরো অনেক বেশি সংখ্যায় ও সময় ধরে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। পুলিশ সদস্যদের, ত্রাণ দেয়ার দায়িত্বে থাকা মানুষদের, এরকম বিভিন্ন মানুষের ঘরে বসে থাকার উপায় নেই। আর্থিক লেনদেনের জন্যে অনেক ব্যাংক সীমিত পরিসরে খোলা রাখতে হচ্ছে। এমনকি পরিবারের ক্ষেত্রেও কাউকে না কাউকে খাদ্য কেনার জন্যে হলেও বাজারে যেতে হচ্ছে। ফলে, সীমিত আকারে হলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হচ্ছে বৈকি, সেগুলোকে চাইলেও বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এসবকে হার্ড ইম্যুউনিটির নামে চালানোর উপায় নেই। ভ্যাক্সিন আসার আগ পর্যন্ত হার্ড ইম্যুউনিটিকে ধীর করার উদ্দেশ্য মাথায় রেখেই অপরিহার্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু রাখার উদ্দেশ্য মোটেও হার্ড ইম্যুউনিটির পথে যাওয়া না, বরং হার্ড ইম্যুউনিটিকে আটকে রাখা বা ধীর করার কর্মসূচিতে বাধ্য হয়েই কিছুটা ছাড় দিতে হচ্ছে, যেটুকু না পারলেই নয় কেবল সে জায়গায় ছাড় দিয়ে অন্যক্ষেত্রে হার্ড ইম্যুউনিটিকে আটকে দেয়ার কাজ অব্যাহত রাখা হচ্ছে, ব্যাপারটাকে এভাবে দেখা দরকার। এভাবে দেখলেই, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা নেয়া সম্ভব। জনগণের যে অংশের মাঝে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি, তাদেরকে ঘরে রেখে কম ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী যেমন যুবক- তরুণ- সুস্থ- সবল মানুষের অধিক দায়িত্ব নেয়া, শ্রম ঘন কর্মকাণ্ড বন্ধ করে বা বিভিন্ন শিফট চালু করে ও শ্রমঘন্টা কমিয়ে শ্রম ঘনত্ব কমানো, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার সময় বাড়িয়ে (যেমনঃ ব্যাংক খোলা রাখার সময় এখন কমানো হয়েছে, এতে ভিড় বেড়েছে; অথচ দরকার ছিল ১২-১৫ ঘন্টা খোলা রেখে একসাথে খুব অল্প সংখ্যক গ্রাহককে সেবা দেয়া) ও নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট গ্রাহককে সেবা প্রদানের সিরিয়াল দেয়ার ব্যবস্থা চালু করে গ্রাহক ভিড় কমানো, ইনডোরের কর্মকাণ্ডের জায়গায় আউটডোরে সূর্যের রোদের মাঝে কর্মকাণ্ড চালানো (যেমনঃ এসি রুমে আবদ্ধ সুপারশপের বদলে খোলা বাজারকে উৎসাহিত করা, বড় খোলা মাঠে বাজারকে স্থানান্তরিত করা)- এরকম উদ্যোগ নেয়া সম্ভব ছিল।

২। আরেকটি যুক্তির কথা শুনা যাচ্ছে, সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট! মানে, প্রাকৃতিক নিয়মে কিছু আন-ফিট (অযোগ্য)মানুষ মারা যাবে, এটা মেনে নিয়েই হার্ড ইম্যুউনিটির পথে কি এগুনো উচিৎ নয়?

সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট কথাটার ভুল প্রয়োগ অনেকের মাঝেই দেখা যায়, এই যুক্তিও সেরকমই এক ভুল প্রয়োগ। এটা ঠিক যে প্রকৃতিতে প্রতিনিয়ত প্রজাতিতে প্রজাতিতে যে সংগ্রাম চলছে, সেখানে যোগ্যতমরাই জয়ী হচ্ছে ও টিকে থাকছে। কিন্তু, যোগ্যতার বিচার বা মাপকাঠি কি? কেবল শারীরিক গঠন, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবের মিউটেশন, জীবের সেই রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, শারীরিক শক্তি সামর্থ্য- শুধুমাত্র এগুলোই? অন্তত, মানুষের সমাজে এসে কিন্তু যোগ্যতার মাপকাঠি কেবল এতটুকু নয়, বরং মানুষের সমাজের যুথবদ্ধ বেঁচে থাকা আর মানুষের বুদ্ধিমত্তা, তার আবিস্কার- এরকম অনেক কিছুর কথাই সামনে আসবে। আজকে একজন বয়স্ক বা অসুস্থ ব্যক্তিকে করোনা ভাইরাসের মুখে ঠেলে দিয়ে যদি বলি সে আনফিট বলেই বাঁচতে পারলো না, একইভাবে কিন্তু একজন সুস্থ, সবল, তরুণ, পেটা শরীরের ব্যক্তিকে ভয়ংকর ক্ষুধার্ত বাঘ বা বিষধর সাপের সামনে একা ছেড়ে দিয়েও বলা যেতে পারে, সেই বাঘ বা সাপের তুলনায় মানুষটি ফিট না বলেই সে মারা গেল। শারীরিকভাবে অনেক দুর্বল হওয়ার পরেও যে আজ মানুষ দুনিয়াজুড়ে এরকম রাজত্ব তৈরি করতে পারছে, মস্ত বড় হাতি বা প্রকাণ্ড শক্তিশালী গণ্ডারকেও বশে এনেছে, তার পেছনে আছে যুথবদ্ধ সমাজ ব্যবস্থা এবং মানুষের বুদ্ধিমত্তা। ফলে, সেই কথা ভুলে ভাইরাসের আক্রমণের সামনে সবচাইতে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে ঠেলে দিয়ে সার্ভাইভাল অব ফিটেস্টের কথা বলা খুব ভুল একটা কথা। বস্তুত, বুঝতে হবে যে, এসব ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে মানুষ আজ যতখানি জয়লাভ করতে পেরেছে, তা কেবল তার শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে নয়, বরং তার বুদ্ধিমত্তা, বিজ্ঞান, আবিস্কার, চিকিৎসাবিজ্ঞান- সেই ওষুধপাতি, ভ্যাক্সিনেশন, এন্টিবায়োটিক- এসবের মাধ্যমেই। এই জ্ঞান-বিজ্ঞানটুকু, এই আবিস্কারগুলোকে বাদ দিয়ে যদি সমস্ত মানুষকে প্রকৃতির সামনে ঠেলে দেয়া হতো, তাহলে আজকে দুনিয়ার মানুষের সংখ্যা ৭০০-৮০০ কোটি হতো না, মানুষের গড় আয়ু বেড়ে ৭০ বছরের উপরে যেত না, যেটি ১৯৫০ সালেও ছিল মাত্র ৪৭ বছর। খৃষ্টপূর্ব ১০০০ সাল থেকে যদি খৃস্টাব্দ ১০০০ সাল পর্যন্ত দেখা যায়, দুনিয়ার জনসংখ্যা কখনোই ২০-২৫ কোটির বেশি ছিল না, খৃস্টাব্দ ১০০০ থেকে ১৭০০ – ১৮০০ নাগাদ সেটা হয়েছে ১০০ কোটি। তারপর থেকে এই জনসংখ্যা বেড়েছে পাগলাঘোড়ার মত। ১৯৫০ নাগাদ সেটা হয়েছে ২৫০ কোটি, ১৯৭০ সাল নাগাদ ৩৭০ কোটি। আর ১৯৭০ থেকে শেষ ৫০ বছরে এটা হয়েছে দ্বিগুনেরও বেশি! ৭০০ কোটি ছাড়িয়েছে ২০১১-১২ সালে, এখন ৭৮০ কোটি, যদিও জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিগুলো আবিস্কার আর মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে গত ৫০ বছরে মানুষের জন্মহার অনেকগুন কমেছে! জন্মহার যত কমেছে, তারও অনেক বেশি কমেছে শিশু মৃত্যুহার, সাধারণভাবে মৃত্যুহার কমেছে, বেড়েছে মানুষের গড় আয়ু। অর্থাৎ, জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই হারের মূল কারণই হচ্ছে, এই সময়কালে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে মৃত্যুহার ব্যাপকহারে কমে যাওয়া। ১৯ শতকেও দুনিয়াজুড়ে গুটি বসন্তে কোটি কোটি মানুষ মরেছে, ৭০ এর দশকে এসে সেই গুটি বসন্ত দুনিয়া থেকে নির্মূল হয়ে গিয়েছে। দুনিয়া থেকে সমস্ত ভ্যাক্সিনেশন আর এন্টিবায়োটিক যদি তুলে দিয়ে বলা হয়, যাও প্রকৃতির মুখোমুখি হও, যোগ্যতমরাই কেবল বাঁচার সুযোগ পাবে, দুনিয়ার আজকের জনসংখ্যা প্রায় ৮০০ কোটি থেকে ৫০-২৫ কোটিতে নেমে আসতে খুব বেশি সময় লাগবে না। ফলে, আমরা কি আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্টের কথা কল্পনাও করতে পারবো?

আর, মানুষের এই সমাজে কোন ব্যক্তিকেই কি বিচ্ছিন্ন করে আন-ফিট বলার উপায় আছে? দুনিয়াতে হাতেগোনা কয়েকজনই ওষুধপাতি, ভ্যাক্সিন আবিস্কার করছে, হাতেগোনা কয়েকজন এগুলো উৎপাদন করছে, দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষ সেগুলো ব্যবহার করছে, যারা জানেও না এসব ওষুধপাতি কিভাবে তৈরি হয়, কিভাবে কাজ করে। যারা এই ওষুধপাতি, ভ্যাক্সিন তৈরি করছে, আবিস্কার করছে- তারা কি বলতে পারবে যে, এটা কাউকেই দিবো না- যেহেতু আমরা আবিস্কার করেছি আমরাই একমাত্র ফিট বা যোগ্য? না, এমনটা তারা বলতে পারবে না, কারণ খাওয়া, পরা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনে অসংখ্য কিছু তারা ব্যবহার করে, যা তারা নিজেরা উৎপাদন করেনি বা আবিস্কার করেনি। এমনটা তারা বলতে পারবে না, কারণ তারা যে ভ্যাক্সিন বা ওষুধটি আবিস্কার করছে, তার পেছনেও যুগ-যুগান্তরের আরো অসংখ্য জীবিত, মৃত মানুষের জ্ঞানের ধারাবাহিকতা রয়েছে, তা বাদ দিয়ে একা বিচ্ছিন্নভাবে কিছুই আবিস্কার করতে পারতো না। ফলে, মানুষের যোগ্যতম হয়ে গড়ে ওঠার পেছনে যে জ্ঞান, বিজ্ঞানের বড় ভূমিকা, তা আসলে যুথবদ্ধ জ্ঞান, বিজ্ঞান, বিচ্ছিন্ন কোন ব্যক্তি বিশেষের আবিস্কার নয়। মানুষ যোগ্য হিসেবে আজ টিকে আছেই এই যুথবদ্ধতার মাধ্যমে এবং তার যুথবদ্ধ বুদ্ধিমত্তার কারণে। অতএব, আজকেও করোনার ভ্যাক্সিন আসার আগে যারা মারা যাচ্ছে, তাদেরকে যুথবদ্ধ সমাজ থেকে ও যুথবদ্ধ বিজ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন করে অযোগ্য বা আন-ফিট বলার কোন উপায় নেই।

৩। বাংলাদেশ কি হার্ড ইম্যুউনিটির পথে চলছে?

বস্তুত, কোভিড-১৯ এর বিপরীতে যদি দুই তৃতীয়াংশ মানুষ ইম্যুউনড হলেই হার্ড ইম্যুউনিটি অর্জন করা যায়, তাহলে একজন মানুষও যদি আক্রান্ত হওয়ার পরে সুস্থ হয়ে ফিরে আসে, বলতে হবে যে- হার্ড ইম্যুউনিটির পথে আমরা এগুলাম। সে হিসেবে গোটা দুনিয়াই হার্ড ইম্যুউনিটির পথে চলছে। যেসব দেশ আক্রান্তের সংখ্যা একেবারে শুন্যে নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছে, তারা বাদে সবদেশই হার্ড ইম্যুউনিটির পথে চলছে। এখানে আসল প্রশ্নটি হচ্ছে, কে কত দ্রুত হার্ড ইম্যুউনিটির পথে চলছে, আর কে হার্ড ইম্যুউনিটির পথে কত ধীরে চলছে বা হার্ড ইম্যুউনিটিকে আটকে দিতে সফল হয়েছে। এর জবাবে বলতে হবে, বাংলাদেশ এই মুহুর্তে দুনিয়ার মধ্যে সবচাইতে দ্রুত গতিতে হার্ড ইম্যুউনিটির পথে ছোটা দেশ। বাংলাদেশে অপ্রতুল টেস্টের পরেও এখন পর্যন্ত প্রায় ২৪ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আইইডিসিআর এর একজন উপদেষ্টার মতে ৪০ গুণ, সেই হিসেবে হয় প্রায় ৯৬ লাখ। সরকারিভাবে ঘোষিত এই আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুন হয়েছে মাত্র ১২ দিনে। ২০ হাজারের উপরে আক্রান্ত আছে এরকম দেশগুলোর মধ্যে এক ব্রাজিল বাদে আর কোন দেশ নেই যাদের আক্রান্তের সংখ্যা ১২ দিনে বা তার কম সময়ে দ্বিগুন হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার মুখে হার্ড ইম্যুউনিটির কথা না বললেও, বস্তুত হার্ড ইম্যুনিটিকে আটকে দেয়ার বা একে ধীর করার কোনরকম কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনি। সাধারণ ছুটি বা কিছু কিছু হটস্পট উপজেলা, জেলা আর আক্রান্তের ও মৃতের বাড়ি, পরিবার, পাড়া মহল্লা লকডাউনের নামে যেসব কর্মসূচি নিলেও, পরিপূরক অত্যাবশ্যক পদক্ষেপ না নেয়ায় এ পর্যন্ত নেয়া সমস্ত কর্মসূচিই অপর্যাপ্ত ও অকার্যকর হিসেবে প্রমানিত হয়েছে। মানুষের কাজ বন্ধ করেছে, কিন্তু খাবারের দায়িত্ব নেয়নি, সাধারণ ছুটি দিয়ে একসাথে বিপুল সংখ্যক মানুষকে বাসে- ট্রেনে- লঞ্চে গাদাগাদি করে শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে যেতে দিয়েছে, আবার হুট করে সবচাইতে শ্রমঘন শিল্প, সেই গার্মেন্টসগুলো খুলে দিয়ে ঢাকায় ফেরা মানুষের ঢল তৈরি করেছে! মোটের উপরে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানোর ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এবং এখনো দিয়ে চলেছে। তার ফল স্বরূপ, বাংলাদেশ অতি দ্রুত গতিতে হার্ড ইম্যুউনিটির দিকে ছুটে চলেছে।

৪। যেহেতু বাংলাদেশে কখনোই সেভাবে লকডাউন প্রয়োগ করা যায়নি, কমিউনিটি স্তরে ব্যাপকভাবে ভাইরাসের সংক্রমন ঘটেই গিয়েছে, তাহলে এই মুহুর্তে আর লকডাউন করে লাভ কি? তার চাইতে যত দ্রুত সম্ভব হার্ড ইম্যুউনিটি অর্জন করতে পারলেই কি বেশি ভালো নয়?

বস্তুত, এরকম যুক্তির মানে হচ্ছে, এক ভুলকে অযুহাত হিসেবে দেখিয়ে একই ভুলকে অব্যাহত রাখা, কিংবা তার চাইতেও আরো অনেক বড় ভুলের দিকে এগিয়ে যাওয়া। অথচ, বাংলাদেশ যে কখনো কার্যকর লকডাউন প্রয়োগ করতে পারেনি, এই ভুলের বিপদ উপলব্ধি করে কিভাবে এই ভুল থেকে সরে এসে সঠিক পন্থা অবলম্বন করা যায়, সেদিকেই আমাদের দৃষ্টি দেয়া উচিৎ ছিল। ভ্যাক্সিন আসার আগে হার্ড ইম্যুউনিটি দ্রুত অর্জনের পথে যাওয়া মানে অসংখ্য মানুষ যে মারা যাবে, কেবল এই বিষয়টি মাথায় রাখলেই তো ভ্যাক্সিনের আগে হার্ড ইম্যুউনিটির চিন্তাও আমাদের মাথায় আসার কথা নয়। এরই মধ্যে ভাইরাসের কমিউনিটি স্তরে ব্যাপক বিস্তার হয়ে গিয়েছে মানে এই না যে, শতভাগ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। সেই ইতালি, স্পেনের মত ভয়ানক আক্রান্ত দেশে চালানো এন্টিবডি সার্ভে থেকে করা রিসার্চ মডেলে দেখা গিয়েছে মাত্র ৫-৬% অংশ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। ৬০-৭০% মানুষকে আক্রান্ত করতে আরো কত মানুষকে আক্রান্ত হতে হবে, কত মানুষকে মারা যেতে হবে? বাংলাদেশে কমিউনিটি বিস্তারে যদি ধরেও নেই, ১-২ কোটি মানুষ এর মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে, তার মানে হচ্ছে এখনো প্রায় ১৬-১৭ কোটি মানুষ আছে, যারা এখনো আক্রান্ত নয়! তাহলে, তাদের মাঝে ভাইরাসের অবাধ বিস্তার ঠেকানোর লক্ষে আরো কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া কি উচিৎ না?

৫। কোভিড-১৯ থেকে সুস্থ হওয়ার পরে রি-ইনফেকশন বা পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার খবরও এসেছে, এরকম ক্ষেত্রেও তো হার্ড ইম্যুউনিটি কাজ করবে না! সেক্ষেত্রে করণীয় কি?

রি-ইনেফকশন বা পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার আশংকাটা পুরামাত্রায় আছে। এই করোনাভাইরাসের ইম্যুউনোলজিক্যাল মেমোরি যদি ফ্লু ভাইরাসের মত স্বল্প হয়ে থাকে, তাহলে মানবজাতির সামনে এর চাইতে দুঃখের বিষয় আর কিছুই হবে না। এর মানে দাঁড়াবে, কেবল প্রাকৃতিক উপায়ে না, ভ্যাক্সিনেশনের মাধ্যমেও ইম্যুউনিটিটা বেশিদিন স্থায়ী হবে না। ফলে ফ্লু ভাইরাসের মত বছর বছর ভ্যাক্সিনেশন চালিয়েই যেতে হবে এবং আমরা কোনদিনই হয়তো এই করোনাভাইরাসের হাত থেকে মুক্তি পাবো না। আসলে অনেক কিছুই হতে পারে, এই ভাইরাস ফ্লু ভাইরাসের মত হতে পারে, আবার অন্য অনেক ভাইরাসের মত দুর্বল হয়ে একসময়ে নির্মূলও হয়ে যেতে পারে। যত সময় যাবে আমরা আরো বেশি জানতে পারবো। কেবল এই করোনাভাইরাসই নয়, ভবিষ্যতে আরো নানারকম রোগ-জীবাণুর আক্রমণের আশংকাও রয়েছে, এমন কোন ভাইরাস যদি আসে যার সংক্রমণ হার এই ভাইরাসের মত বা বেশি, কিন্তু একই সাথে মৃত্যুহারও ভীষণ বেশি- সেই ইবোলা বা গুটি বসন্তের মত; তাহলে কি ভয়ানক দুর্যোগই নেমে আসবে দুনিয়ার বুকে! ফলে, একটা ব্যাপার নিশ্চিত যে, দুনিয়াজুড়েই বর্তমানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আর গবেষণা দিয়ে চলবে না। এই করোনা মহামারী আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেল, আমরা এখনো কত অসহায়, আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা কত অপ্রতুল, আমাদের গবেষণা এখনো একটা ক্ষুদ্র ভাইরাসের মোকাবেলায় দ্রুত কোন ওষুধ বা ভ্যাক্সিন হাজির করতে সক্ষম নয়! ফলে, স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা ও চিকিৎসা-গবেষণা – দুটোকেই আমূল পাল্টাতে হবে। মুনাফাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার বদলে মানুষকে বাঁচাতে সকলের জন্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষেই এই স্বাস্থ্য-ব্যবস্থাকে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের দেশেও স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে, একদম ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র বানিয়ে সরকারি চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থকর্মীদের নিয়োগ দিতে হবে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে শয্যার সংখ্যা বাড়াতে হবে, চিকিৎসা সুবিধা বাড়াতে হবে, মেডিকেল কলেজ বাড়াতে হবে, নার্সদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রতিষ্ঠান বাড়াতে হবে, প্রচুর চিকিৎসক- নার্স- স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিতে হবে। একইভাবে স্বাস্থ্য গবেষণায় বিশাল বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণামুখী করে গড়ে তুলতে হবে। চিকিৎসা খাত নিয়ে প্রাইভেট ব্যবসার লাগাম টেনে ধরতে হবে। এসব বাদে ভবিষ্যতের সমস্ত আশংকা মোকাবেলার আর কোন পথ মানবজাতির সামনে খোলা নেই।


শুধু চিকিৎসা ও গবেষণায় গুরুত্ব দিলেও আসলে চলবে না। এই প্রকৃতিকে গুরুত্ব দিতে হবে, প্রকৃতিকে রেহাই দিতে হবে, প্রাণ – প্রকৃতি – পরিবেশ – প্রতিবেশকে বাঁচানোর দায়িত্ব নিতে হবে। কোন মানুষ একা একা টিকে থাকতে পারে না, সমস্ত মানুষকে নিয়েই যুথবদ্ধতার মাধ্যমেই যোগ্যতম হয়ে উঠতে হয়। অল্প কিছু মানুষের মুনাফার স্বার্থে চলা এই দুনিয়া বেশিরভাগ মানুষের সুস্থ-স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের যেমন নিশ্চয়তা দিতে পারছে না, মানুষের আজকের এই দুনিয়া ক্রমাগত প্রাণ প্রকৃতিকেও ধ্বংস করে চলেছে। ফলে, প্রকৃতিও সেই টিকে থাকার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হচ্ছে, মনুষ্য প্রজাতি প্রকৃতির সামনে যতই হুমকি হয়ে দাঁড়াবে, টিকে থাকার স্বার্থেই প্রকৃতি মানুষের বিরুদ্ধে মরণ কামড় দিতে থাকবে। এরই ফলে এরকম ভয়ংকর ভাইরাসরা আসছে, ব্যাকটেরিয়াগুলো টিকে থাকার সংগ্রামে এন্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির উপরে লাগামহীন অত্যাচারের ফলেই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে, ঝড় সুনামি জলোচ্ছাস বাড়ছে, শতাব্দীতে এই প্রথম এমন অসময়ে আম্পানের মত ঘুর্ণিঝড়ের মুখোমুখি আমরা হচ্ছি। মেরু অঞ্চলের বরফ গলার ফলে বরফের নীচে চাপা থাকা রোগ-জীবাণু যেমন ফিরে আসছে, বন-জঙ্গল উজাড় করার ফলে অসংখ্য জীবজন্তু, পাখির আবাসস্থল নষ্ট করে দিয়ে তাদেরকে মানুষের কাছাকাছি আনছি, ফলে বন্য জীবজন্তুর মধ্যকার রোগ-জীবাণুগুলোকে মানুষের মাঝে ছড়াতে ভূমিকা রাখছি। এভাবেই, আসলে আমরা আমাদের নিজেদের কবর খুড়ছি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মারাত্মক অনিশ্চিত এক জীবনের মুখে ঠেলে দিচ্ছি! তাই, আজ দরকার এই প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশকেও বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব নেয়া। মানুষের সেই যুথবদ্ধতার যে বলয়, সেখানে কেবল নিজেকে বা নিজ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে নয়, কেবল গোটা দুনিয়ার মানব সমাজকেই নয়, সেখানে আসলে সমগ্র প্রকৃতি জগতকে, এর সমস্ত জীব বৈচিত্র, সমস্ত প্রাণীকূল ও উদ্ভিদ, সমস্ত নদী – নালা – খাল বিল, বাতাস ও মাটি, সমুদ্র, পাহাড় – পর্বতকে সবাইকে যুক্ত করে, সকলকে টিকিয়ে রেখেই, কেবল মানুষ যোগ্যতম জীব হিসেবে টিকে থাকতে পারবে।

লেখকঃ প্রকৌশলী ও গবেষক, যোগাযোগঃ [email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ

যুক্তরাষ্ট্রে মৃতের সংখ্যা লাখ ছাড়ালো, বিশ্বে ৩ লাখ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: মহামারি করোনায় যুক্তরাষ্ট্রের মৃতের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। শুধুমাত্র নিউইয়র্কেই মারা গেছে ২৯ হাজারের বেশি মানুষ। নিউইয়র্কে আক্রান্তের সংখ্যা তিন...

রংপুরে মদপানে ঈদ উদযাপন, ৬ জনের মৃত্যু

অধিকার ডেস্ক:: রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় বিষাক্ত মদপানে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে মদপানে অসুস্থ হয়ে হাসপাতাল ও বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন অন্তত সাতজন।

যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ হার বেশি

অধিকার ডেস্ক:: এপ্রিলের শুরুতে করোনার সংক্রমণ হার ৫ শতাংশের নিচে থাকলেও চলতি সপ্তাহে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ শতাংশে। দেশে নমুনা পরীক্ষায় আগের...

যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: করোনা পরিস্থিতির মধ্যে যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম...