মঙ্গলবার, মার্চ ৯
শীর্ষ সংবাদ

হকার থেকে শত কোটি টাকার মালিক যুবলীগ নেতা আরমান

এখানে শেয়ার বোতাম

অধিকার ডেস্ক :: ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহসভাপতি এনামুল হক আরমান এক সময় ছিলেন গুলিস্তানের হকার। ক্যাসিনো কারবারের মাধ্যমে কামানো টাকা চলচ্চিত্রেও লগ্নি করেছেন যুবলীগ নেতারা। ক্যাসিনো কারবারের বদৌলতে তিনি বনে গেছেন চলচ্চিত্র প্রযোজক। ঢাকা মহানগর যুবলীগের প্রভাবশালী এক নেতার বন্ধু পরিচয়ে গত এক দশকে কয়েক শত কোটি টাকা কামিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক শাকিব খানকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেখে দুটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে আরমান লগ্নি করেছেন কয়েক কোটি টাকা। ক্যাসিনো কারবারের ‘নিউক্লিয়াস’ হিসেবে পরিচিত মহানগর যুবলীগের দাপুটে এ নেতা ক্যাসিনো থেকে চাঁদা আদায়ের কাজটি নিজ হাতেই করতেন।

রাজধানীর ক্লাবপাড়াসহ বিভিন্ন ক্যাসিনোতে অভিযান পরিচালনাকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, ক্লাবপাড়ার পুরনোরা আরমানকে ক্যাসিনো বাণিজ্যের গুরু বলে জানেন। মূলত তার বুদ্ধিতেই ফুটবল ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো কারবার শুরু হয়। শুধু তাই নয়, ক্যাসিনো সামগ্রী নিজের টাকায় কিনে এনে যুবলীগের শীর্ষ নেতাদের ছত্রছায়ায় যুবলীগের প্রথম ক্যাসিনো কারবার শুরু হয়।

আরমানের উত্থান অনেকটা ফিল্মি কায়দায়। ফেনীর ছাগলনাইয়া থেকে ঢাকায় এসে বায়তুল মোকাররম মার্কেটের আশপাশে লাগেজ বিক্রি করতেন তিনি। এভাবে তার সঙ্গে পরিচয় হয় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নিকটাত্মীয় ‘বাউন্ডারি ইকবাল’ হিসেবে পরিচিত ইকবাল হোসেনের সঙ্গে। ইকবালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে বিএনপি শাসনামলে ‘হাওয়া ভবনে’ যাতায়াত শুরু করেন আরমান। সেই সময় ক্ষমতায় থাকা বিএনপির ছত্রছায়ায় মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন তিনি। সেই প্রভাব খাটিয়ে বিএনপি আমলেই ফকিরাপুলের কয়েকটি ক্লাবের ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রণ নেন আরমান। এর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে যুবলীগে ভিড় জমান। যুবলীগের এক শীর্ষনেতার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা শুরু করেন। সুদর্শন ও বুদ্ধিমান আরমান খুব অল্পদিনেই ওই যুবনেতার আস্থা অর্জনে সক্ষম হন। একপর্যায়ে মহানগর যুবলীগের সবাই তাকে শীর্ষ যুবনেতার বন্ধু হিসেবে চিনতে শুরু করে। এরপর ওই যুবনেতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মতিঝিলের ক্লাবপাড়ার ক্যাসিনো বাণিজ্যের চল শুরু করেন আরমান।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কলাবাগান ক্লাব, ঢাকা গোল্ডেন ক্লাব, ওয়ান্ডার্স ক্লাব, দিলকুশা ক্লাব, মোহামেডান ক্লাব, অ্যাজাক্স ক্লাবের ক্যাসিনো থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলতেন আরমান। চাঁদা তোলার পাশাপাশি ঢাকা গোল্ডেন ক্লাবের মালিকানায় ঢুকে পড়েন তিনি। ক্যাসিনো কারবারের টাকা তুলেই গুলিস্তানের হকার থেকে কয়েক বছরের মধ্যে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান আরমান। ক্লাবপাড়ার লোকেরা জানান, নতুন মডেলের হ্যারিয়ার গাড়ি দাপিয়ে চাঁদা তুলতেন আরমান। দুটি ক্যাসিনোতে মালিকানাও রয়েছে তার। কোন ক্যাসিনোর চাঁদার পরিমাণ কত হবে, শীর্ষ যুবনেতার সঙ্গে বসে তার পরিমাণও ঠিক করে দিতেন আরমানই। সিঙ্গাপুরে অভিজাত ক্যাসিনো মেরিনা বে’তে গিয়ে যুবলীগের শীর্ষনেতাদের সঙ্গে জুয়াও খেলতেন তিনি। আরমানের দুই ভাইও ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত। র‌্যাবের প্রথম দিনের অভিযানে তার এক ভাইকে আরামবাগের একটি ক্লাব থেকে আটক করা হয়।

ক্যাসিনোতেই থেমে থাকেননি আরমান। বিভিন্ন সময় বিশেষ কোনো কাজের তদবিরে সুন্দরী নায়িকা-মডেলদের পাঠিয়ে কাউকে রাজি করানোর কাজটিও সুকৌশলে সারতেন তিনি। ঢাকা শহরের বিভিন্ন নাইট ক্লাব থেকে অনেক সময় নর্তকী বা গায়িকাকে টাকার বিনিময়ে উঠিয়ে আনতেন আরমান। রাজি না হলে জোরপূর্বক উঠিয়ে নেওয়ার একাধিক অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ঢাকা শহরের লা মেরিডিয়ান, সুইট ড্রিমসহ বিভিন্ন অভিজাত ড্যান্সবারে প্রায় প্রতি রাতেই লাখ লাখ টাকা উড়াতেও দেখা যেত তাকে।

আরও প্রাপ্তির আশায় একসময় চলচ্চিত্র তারকাদের সঙ্গে ওঠাবসা শুরু করেন আরমান। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে বেনামে সিনেমায় অর্থ লগ্নি করতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে নিজেই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান খুলে জমিয়ে বসেন। ‘দেশ বাংলা মাল্টিমিডিয়া’ নামের চলচ্চিত্র প্রোডাকশন হাউসের প্রধান কর্ণধার আরমান। গত ঈদুল আযহায় মুক্তি পাওয়া শাকিব খান ও বুবলী অভিনীত ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’ সিনেমাটির প্রযোজক আরমান। এটি আরমানের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রথম ফিল্ম। এরপর শাকিব খানের বিপরীতে নবাগতা এক নায়িকাকে নিয়ে ‘আগুন’ নামের দ্বিতীয় ফিল্মের কাজও শুরু হয় আরমানের প্রযোজনায়। আরমানের প্রথম ফিল্মের মহরত অনুষ্ঠান হয় ঢাকা ক্লাবে। দ্বিতীয় ফিল্মের মহরত হয় হোটেল সোনারগাঁওয়ে, আরও আরও জাঁকজমকপূর্ণভাবে। ওই অনুষ্ঠানে আরমান বলেন, আমরা রাজনীতির মানুষ। দায়িত্ববোধ থেকে ছবি প্রযোজনায় এসেছি। ব্যবসায়িক লাভ নয়, লগ্নি ফেরত পেলেই আমরা খুশি। ছবিটি এখন শুটিং পর্যায়ে আছে।

এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য যুবলীগ নেতা আরমানের সঙ্গে যোগাযোগে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস


এখানে শেয়ার বোতাম