বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ৩

সড়ক পরিবহণ আইন :: আতংকিত শ্রমিক, দুর্ভোগে জনগণ

এখানে শেয়ার বোতাম

রাজেকুজ্জামান রতন ::

সড়ক পরিবহণ আইন প্রয়োগ শুরু হতে না হতেই দেশের নানা স্থানে পরিবহণ শ্রমিকদের বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু হয়েছে। কোথাও কোথাও গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখার মত ঘটনাও ঘটছে। প্রথম দিনে ৮৮ টি মামলা ও কয়েক লাখ টাকা জরিমানা আদায় করার খবর এসেছে। বিআরটিএ আইনের যে ধারাগুলোতে শাস্তির বিধান আছে সেগুলোকে আলাদা করে প্রচারের উদ্যোগ নেয়াতে পরিবহণ শ্রমিকদের মধ্যে শাস্তির ভয় আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বেশ ভালভাবেই।

কোন দেশের অর্থনীতির গতি প্রবাহ, সড়কপথে নিরাপদ ভ্রমণ, পণ্য পরিবহণ ও পরিবহণ শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবন এক সুত্রে গাথা। পরিবহণ ব্যবস্থা অনেকটা শরীরের রক্ত প্রবাহের মত। রক্ত প্রবাহ বন্ধ হলে যেমন শরীরের কোন অঙ্গই সচল থাকতে পারে না তেমনি পরিবহণ ব্যবস্থা অচল হলে দেশের কৃষি শিল্প সেবা সব খাত অচল হয়ে যেতে বাধ্য। যদিও পরিবহণ খাত বলতে নৌ, রেল, সড়ক, বিমান সব খাতকেই বুঝায় কিন্তু বর্তমানে আমাদের আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়ক পরিবহণ খাত। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩ কোটি যাত্রী, খাদ্য( ধান, চাল, সব্জি, ফল, চিনি, তেল,চা, মাছ, গরু- ছাগল, মুরগি, ডিম ইত্যাদি) সহ জ্বালানী তেল, ভোজ্য তেল, রড, সিমেন্ট, বালি ইত্যাদি মিলে বার্ষিক ১০ কোটি টনের বেশি পণ্য পরিবহণ, ৩৫ লাখের বেশি যানবাহন আর ৫০ লাখের বেশি শ্রমিক নিয়ে বিশাল এই পরিবহণ জগত। হাজার হাজার কোটি টাকা যানবাহন কিনতে বিনিয়োগ, প্রতিদিন শত শত কোটি টাকা ভাড়া বাবদ আয় আর সরকারের বার্ষিক হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের খাত এই পরিবহণ সেক্টর। এর সাথে যুক্ত আছে ১০ লাখের মত মোটর মেকানিক, মোটর পার্টস ব্যবসায়ী, হোটেল রেস্টুরেন্ট সহ বহু খাতের মানুষ। নিরুপায় যাত্রী, স্বল্প শিক্ষিত শ্রমিক, শক্তিশালী মালিক এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চাঁদাবাজি নিয়ে এই খাত সবসময় আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। সড়কে দুর্ঘটনা আতংকিত করে তুলছে সবাইকেই। কিন্তু দুর্ঘটনার শাস্তি নিয়ে যতটা সরব দুর্ঘটনার কারণ দূর করার প্রচেষ্টা ততটা দৃশ্যমান হয়ে উঠে না। সবচেয়ে দুঃখজনক হল লক্ষ লক্ষ পরিবহণ শ্রমিকের অধিকার এবং সমস্যার কথা আলোচিত না হওয়া।

দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক দোষারোপের সাময়িক অবসান ঘটিয়ে ১ নভেম্বর ২০১৯ থেকে কার্যকর হতে শুরু করেছে সড়ক পরিবহণ আইন ২০১৮। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে ৪৭ নং আইন হিসেবে সংসদে সড়ক পরিবহণ আইন পাশ করার পর ৮ অক্টোবর ২০১৮ তা রাষ্ট্রপতির সম্মতিলাভ করে। সড়ক পরিবহনের সাথে যুক্ত শ্রমিক সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করে সরকার ১ নভেম্বর ২০১৯ থেকে এই আইন কার্যকর করার তারিখ নির্ধারণ করে। সড়কে শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ৫৪টি সংজ্ঞা এবং ১২৬টি ধারাকে ১৪টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করে এই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। আমরা জানি যে কোন আইনকে প্রয়োগ করতে হলে বিধিমালা প্রয়োজন হয় । কিন্তু এখনও বিধিমালা প্রবর্তন করা হয়নি ফলে আইনের প্রয়োগ কি ভাবে হবে তা স্পষ্ট না হলেও ১ নভেম্বর থেকেই আইনটি কার্যকর হবে বলে ঘোষণা দেয়ার কারনে তার কিছু প্রয়োগ শুরু হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক সড়ক পরিবহণ আইন আমরা চাই যা সড়কে শৃঙ্খলা ও যাত্রীর নিরাপত্তাই শুধু নয় শ্রমিকদেরও আইনি সুরক্ষা দেবে। যে আইনে বিআরটিএ সহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, পুলিশি হয়রানি, মালিকদের বেআইনি কার্যকলাপ ও শ্রম আইন না মানা, পথচারী ও যাত্রীদের আইন না মানা এবং শ্রমিকদের দায়িত্বপালন সব কিছুকেই বিবেচনার আওতায় আনা হবে।

সড়কে দুর্ঘটনা, প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি, সময়ের অপচয় প্রভৃতি বিষয় নিয়ে সকলেই উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকেন। দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে কমপক্ষে ৩ কোটি মানুষ প্রতিদিন যাতায়তের জন্য কোন না কোন যানবাহন ব্যবহার করেন। দেশের কৃষি, শিল্প, সেবা খাতের পণ্য, নির্মাণ সামগ্রী পরিবহণ প্রভৃতি কাজে ছোট, হালকা, মাঝারি, বড়, ভারী বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ব্যবহৃত হয় প্রতিদিন। ফলে সড়কে নিরাপত্তা সকলেরই মনোযোগ ও বিবেচনার দাবী রাখে। বিভিন্ন গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকে দেখা যায় প্রতিদিন গড়ে ২০ জন মানুষের মৃত্যু এবং ৫০ জন মানুষ আহত হয়ে থাকেন সড়ক দুর্ঘটনায়। এসব দুর্ঘটনায় বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। এসব কারনেই সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিজ্ঞানসম্মত ও গণতান্ত্রিক সড়ক পরিবহণ নীতিমালা খুবই প্রয়োজন।

দীর্ঘদিন ধরেই সড়ক মহাসড়ক ব্যবহারের নীতিমালা, বিজ্ঞানসম্মত সড়ক নির্মাণ, দুর্নীতিমুক্ত বিআরটিএ প্রতিষ্ঠা, চালকদের জন্য প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট নির্মাণ, পরিবহণ শ্রমিকদের শ্রমঘণ্টা, বিশ্রাম, নিয়োগপত্র পরিচয়পত্র, মজুরি, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ সহ বিভিন্ন বিষয়ে আন্দোলন ও নীতি নির্ধারকদের সাথে আলোচনা হয়ে আসছে। আমরা তাই আগ্রহের সঙ্গেই অপেক্ষা করছিলাম একটি গণতান্ত্রিক পরিবহণ আইন প্রণয়নের। কিন্তু যে আইনটি ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হতে শুরু করেছে তা স্বস্তির পরিবর্তে পরিবহণ শ্রমিকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে।

আমরা সবাই জানি যে কোন আইনের প্রধান লক্ষ্য থাকে সর্বাধিক মানুষের সরবচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, শাস্তির ভয় দেখিয়ে আর যাই হোক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যায় না। তাই যদি হত তাহলে এত জেলখানা, কঠিন শাস্তি ও কারাদণ্ডের বিধান থাকা সত্ত্বেও অপরাধ কমে না কেন? সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ প্রদান, অপরাধ সংশোধনের উদ্যোগ এবং শাস্তি প্রদান এই সব কিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু অন্যসব উদ্যোগ সম্পন্ন না করেই শাস্তির লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন করলে তা কখনই সড়কে শৃঙ্খলা আনবে না। তাই আইন যেন আতংকের কারন না হয় সেব্যাপারে যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। সড়ক পরিবহণ এমন একটি সমন্বিত খাত যেখানে সরকার, মালিক, শ্রমিক, যাত্রী সকলের অংশগ্রহণ ও দায়িত্ব পালন প্রয়োজন। ট্রাফিক ও বি আর টি এর দুর্নীতিগ্রস্থ কর্মকর্তা এবং মালিকদের মুনাফার লোভে চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানোর শাস্তির ব্যবস্থা না করে শ্রমিকদের জন্য জেল, জরিমানা পয়েন্ট কাটা এবং সমস্ত দায় পরিবহণ শ্রমিকদের উপর চাপানোর মানসিকতা থেকে আইন প্রণয়ন ও তাঁর প্রয়োগ করতে গেলে তা সড়কের শৃঙ্খলা কতটুকু প্রতিষ্ঠা করবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়।

সড়ক দুর্ঘটনা যখন আমরা বলি তখন একথা প্রথমেই স্বীকার করে নেয়া হয় যে এটি একটি দুর্ঘটনা। কি কি কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তা যদি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলেই দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের শাস্তি বিধান বা ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা এড়ানোর পথ বের করা সম্ভব হবে। দুর্ঘটনাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং শাস্তির লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন করা হলে তাতে সড়কে স্বস্তি বা শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে না। অপরাধীরা যে কোন অপরাধ করতে হলে পরিকল্পনা মাফিক করে কিন্তু দুর্ঘটনার কি কোন পরিকল্পনা থাকে? তাহলে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শাস্তির বিধান করতে আইন যা করা হোল তাতে দুর্ঘটনাকে আসলে অপরাধ হিসেবেই চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সে কারনেই দেখা যাচ্ছে যে, ১২৬ ধারা সম্বলিত সড়ক পরিবহণ আইনে ৫১ টি ধারা প্রবর্তন করা হয়েছে যেখানে শাস্তির বিধান আছে। একাদশ অধ্যায়ে আছে অপরাধ, বিচার ও দণ্ড। এই অধ্যায়ে ৪১ টি ধারা আছে আর ত্রয়োদশ অধ্যায়ে অপরাধ, পুলিশের ক্ষমতা এখানে ধারা আছে ১০ টি। অর্থাৎ ৫১ টি ধারা সরাসরি শাস্তি সম্পর্কিত। এর বাইরেও আরও কিছু ধারা আছে যা দিয়ে শাস্তি দেয়া যেতে পারে। একথা মনে রাখা দরকার, আইন এবং ফাইন করে যেমন শৃঙ্খলা আনা যায় না তেমনি শাস্তির ভয় দেখিয়ে স্বস্তি আনা যায় না। ৫০ লাখ পরিবহণ শ্রমিককে প্রতিপক্ষ বানিয়ে বা তাদেরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের কাছ থেকে সেবা পাওয়া কি সম্ভব? মালিকের চাপ, যাত্রীর উপেক্ষা আর পুলিশের হয়রানির ভয় নিয়ে কি সুস্থভাবে গাড়ি চালানো সম্ভব? একটি গাড়ি যখন ৬০ কিলোমিটার বেগে চলে তখন প্রতি সেকেন্ডে ৫০ ফুট দূরত্ব অতিক্রম করে। ফলে মুহূর্তের অসতর্কতা ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। গাড়ি চালনা এমন একটি বিষয় যেখানে সমস্ত ইন্দ্রিয় প্রতিমুহূর্তে সজাগ রাখতে হয়। চালকদের ক্ষেত্রে সেই সহযোগিতার মনোভাব না থাকলে নিরাপদ যাত্রা সম্ভব হবে কি?

শ্রমিকদের অবদান ও তাদের অসহায়ত্ব যেন বিবেচনায় রাখা হয়। জীবিকার দায়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় আসা শ্রমিকদের উপর এমন কোন শাস্তির বিধান যেন করা না হয় যার ভার বহন করা শ্রমিকদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কিভাবে একজন তরুণ ধীরে ধীরে পরিবহণ শ্রমিক হয়ে উঠে তা আমরা জানি। সেই পরিবহণ শ্রমিকদের বাস্তব অবস্থা যেন ভুলে না যাই। তাঁরা দিনে কত ঘণ্টা কাজ করে, তাদের কর্ম পরিবেশ কি, তাদের বিশ্রাম ও ছুটির ব্যবস্থা কি আছে, শ্রম আইনের সুরক্ষা কতটুকু তাদের জন্য প্রযোজ্য, কোন সামাজিক পরিবেশ থেকে তাঁরা উঠে এসেছে, তাদের মজুরি কেমন, তাঁরা কি খায়, কোথায় ঘুমায়, বৃদ্ধ বয়সে তাদের পরিনতি কি হয়, দুর্ঘটনায় পঙ্গু শ্রমিক তার পরিবার নিয়ে কিভাবে বেঁচে থাকে, দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটলে পরিবারের কি দুর্দশা হয় এই বিষয়গুলো যেন বিবেচনা করা হয়। আইন যেন তাদের কাছে আতংক হয়ে না দাঁড়ায়। লক্ষ লক্ষ অসহায় শ্রমিককে পুলিশি হয়রানির মধ্যে ঠেলে দিয়ে যেন সড়কের শৃঙ্খলা বিঘ্নিত না করা হয়। সড়ক পরিবহণ আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে পরিবহণ শ্রমিকদের আস্থা অর্জন করার পদক্ষেপ নেয়া উচিত। পরিবহণ শ্রমিকদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে শাস্তির বিধান শক্তিশালী করলেই সড়কে শৃঙ্খলা আসবে না। প্রতিবছরে ৫ হাজার মৃত্যু, হাজার হাজার আহত, শত শত কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয় সড়ক দুর্ঘটনায়। এর কারণ যথাযথ ভাবে উদ্ঘাটন ও দূর করার ক্ষেত্রে যেন সড়ক পরিবহণ আইন সহায়ক হয়। পেটের দায়ে কাজ করতে আসা পরিবহণ জগতের লক্ষ লক্ষ বিক্ষুদ্ধ, ক্লান্ত, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন শ্রমিক যেন আতংকিত হয়ে গাড়ি না চালায়, তাঁরা যেন জীবন ও জীবিকার নিশ্চয়তা পায় সড়ক পরিবহণ আইন যেন সে নিশ্চয়তা বিধান করে। ভাবতে হবে পরিবহণ শ্রমিক এবং যাত্রী পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। তাই শাস্তির খড়গের নিচে শ্রমিকদেরকে রেখে সড়কে শৃঙ্খলা, যাত্রীর নিরাপত্তা আর শ্রমিকের সুরক্ষা কি সম্ভব হবে?

লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাসদ ও সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট


এখানে শেয়ার বোতাম