শুক্রবার, ডিসেম্বর ৪

স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের তাগিদ বিশিষ্টজনদের

এখানে শেয়ার বোতাম

অধিকার ডেস্ক :: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগে আইন প্রণয়নেরও পরার্মশ দেওয়া হয়েছে। তারা বলেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতের বিষয়ে নির্বাহী বিভাগেরও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। এ জন্য বিচার বিভাগের অধীনে পৃথক সচিবালয় এবং বিচারপতি নিয়োগে আইনের প্রয়োজন। নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারকেই এ বিষয়ে উদ্যোগী হতে হবে।

শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘নির্বাহী বিভাগ হতে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের এক যুগ’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনা সভায় বিশিষ্টজনরা এসব কথা বলেন। স্বেচ্ছাসেবী মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’ এই সভার আয়োজন করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের শুরুতে একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

সংগঠনের চেয়ারম্যান আইনজীবী শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো. আবদুল মতিন, বিচার বিভাগ পৃথককীরণ সংক্রান্ত মামলার বাদী আলোচিত সাবেক জেলা জজ মাসদার হোসেন, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক এএম মাহাবুব উদ্দিন খোকন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

অনুষ্ঠানে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাংবাদিক ও সংবিধান বিশ্নেষক মিজানুর রহমান খান। তিনি বলেন, বিচারবিভাগ পৃথকীকরণে আমাদের পলায়নপরতার অবসান ঘটুক। মাসদার হোসেন মামলার অর্জনকে পাথেয় করেই আমাদের পথ চলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ১৫ শতাংশ মানুষ আদালতমুখী হন বলে মামলাজট ৩৬ লাখে এসে দাঁড়িয়েছে। যদি আরও ৮৫ শতাংশ মানুষ আদালতে যেতো তাহলে কি দাঁড়াতো? তাই এ বিষয়ে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। তিনি সভায় বিচার বিভাগ পৃথককীরণ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার রায়ে দেওয়া ১২ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নের চিত্র বিশ্নেষণ করে তুলে ধরেন।

সাবেক বিচারপতি মো. আবদুল মতিন বলেন, ন্যায়বিচার মানে মনিবের আনুগত্য নয় বরং আইনের আনুগত্য। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বার এবং বেঞ্চের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনা করা প্রয়োজন। আমাদের চরিত্রে এবং অনুভূতিতে স্বাধীনতাবোধ থাকা প্রয়োজন। তাহলেই সত্যিকারের স্বাধীনতা আসবে।

সাবেক জেলা জজ মাসদার হোসেন বলেন, নানামুখী প্রতিকূলতার মাঝে আমরা যে প্রত্যাশায় বিচার বিভাগ পৃথকীকরণে স্বাক্ষর করেছিলাম তা হয়তো অনেকটাই কার্যকর হয়েছে। কিন্ত বিচারবিভাগ আর্থিকভাবে স্বাধীন না হলে এ পৃথকীকরণ অনেকটাই মূল্যহীন।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, বিচার বিভাগের সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিদের শাসন বিভাগে সম্পৃক্ত করা উচিত না। বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির মতামত প্রাধান্য পেলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খর্ব হয়। হয়তো বিচার বিভাগ হতে আমরা যতটা চাই ততটা পাই নাই। কিন্ত স্বাধীনতার পর হতে বিচার বিভাগের অর্জন কম নয়।

বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, বিচারক নিয়োগের স্বচ্ছতায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে। বিচারের রায় পক্ষে আসলে বিচার বিভাগ স্বাধীন, আর বিপক্ষে আসলেই পরাধীন- এটা সঠিক নয়। বিচার বিভাগের সম্মান রক্ষায় সবার সচেতনতা প্রয়োজন।

ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, আমাদের বিচার বিভাগ বরাবরই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সবসময়ই সকল বিরোধী দল বিচার বিভাগ স্বাধীনতার কথা বলে। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সুফল থেকে বঞ্ছিত হওয়ার অনেক কারণই রয়েছে। এখন পর্যন্ত আমাদের বিচারক নিয়োগের কোন আইনও নেই, নীতিমালাও নেই।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করা একটা গ্লোবাল ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কোনো কর্তৃত্বপরায়ন সরকারের উদ্দেশ্য থাকে তার বিরুদ্ধে যেন কোনো রায় না আসে, যদিও বিচারের ক্ষেত্রে ইনসাফ ও সদাচার জনগণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ নির্বাহী বিভাগের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা রয়েছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার।

শীপা হাফিজা বলেন, বর্তমানে বিচার বিভাগে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা ও আদালতের অত্যন্ত জটিল ব্যবস্থাপনা বিচার বিভাগের দ্বারস্থ হওয়ার অন্তরায়। নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ একত্রিত হয়ে গেলে সুশাসনের অভাব পরিলক্ষিত হয়। তাই বিচার বিভাগের বাস্তবিক পৃথকীকরণের জন্য কার্যকর কর্মপন্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগকে স্বাধীন করে তুলতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে উদ্যোগী হওয়া দরকার।

সভাপতির বক্তৃতায় শফিকুর রহমান বলেন বলেন, উন্নয়নের শরণার্থী যেন আমরা না হয়ে যাই সেদিকে লক্ষ্য রাখা বাঞ্ছনীয়। আমরা হতাশ নই বরং আশাবাদী। আগামি দিনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সুফল যেন সমাজের সকলে সমানভাবে ভোগ করতে পারবে। আমরা সে লক্ষ্যেই আমাদের কার্যক্রম নিয়ে জেগে আছি।


এখানে শেয়ার বোতাম