মঙ্গলবার, মে ১১
শীর্ষ সংবাদ

স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসঃ ছাত্রলীগের একাল-সেকাল

এখানে শেয়ার বোতাম

আল কাদেরি জয় ::

সময়টা ছিলো ১৯৬৮ সাল।
“বঙ্গবন্ধু যখন ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’য় অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে তখন আওয়ামী লীগ অফিসে বাতি জ্বলতো না।বিল দিতে না পারার কারণে বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া হয়েছিলো। আমেনা বেগম তখন আওয়ামী লীগের কার্যকরী সম্পাদক। আমি ও দাদা (সিরাজুল আলম খান) পলাশি মোড় থেকে বাসে পুরোনো পল্টন যেতাম। ভাড়া ছিলো ১৫ পয়সা। আমার ও দাদার পকেটে কোনো পয়সা নেই। ইকবাল হলের ক্যান্টিনে এর-ওর কাছ থেকে চেয়ে চার আনা পয়সা জোগাড় করতে পারলেই তা নিয়ে পুরনো পল্টন আওয়ামী লীগ অফিসে যেতাম।বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হবার পর এমনই আর্থিক অনটনে পড়ি যে, সাতদিন বলতে গেলে প্রায় উপবাসের মতোই কাটে।এসময় অনেকটা পানি খেয়েই দিন কাটিয়েছি।”

  • কথাগুলো একসময়ের ডাকসু ভিপি, ছাত্রলীগ নেতা জেএসডি প্রধান আ.স.ম আবদুর রবের।সিরাজুল আলম খানের জীবনালেখ্য ‘ আমি সিরাজুল আলম খান ‘ বইয়ে তাঁর এই অভিজ্ঞতার কথা পাওয়া যায়।এ কেবল তাদের ব্যক্তিগত নয়,পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সেদিনের লড়াইয়ে রাজনৈতিক কর্মীদের বিশেষত ব্যক্তিজীবন ও কষ্টসহিষ্ণু জীবনের ছবি ফুটে উঠে।

একই বইয়ে প্রধান চরিত্র সিরাজুল আলম খান (দাদা) তাঁর বর্ণনায়ও পাওয়া যাবে তৎকালীন ছাত্রলীগ কর্মীদের চরিত্র ও কর্মকান্ডের চেহারাঃ
” ঢাকাভিত্তিক ‘বিএলএফ’ সংগঠকদের প্রতিদিন যাতায়াত ও খাওয়াদাওয়ার বাবদ যে অর্থের প্রয়োজন, তার ব্যবস্থা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না।সারাদিনে এক বেলা খেয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাটাতে হতো। পায়ে হেঁটে ঢাকা শহরের এ মাথা থেকে ও মাথায় যেতে আসতে হতো।এরজন্য কাউকে বাস ভাড়া দেওয়া সম্ভব হতো না। এমনও দিন গেছে দুই আনা,চার আনা করে মোট দেড় টাকা সংগ্রহ করতে পেরেছি। পায়ে হেঁটে মিরপুর, সেখান থেকে দশ-বারো আনা দিয়ে বিরাট একটা কাঁঠাল কিনে মাথায় করে নিয়ে এসে তারপর আট আনার মুড়ি কিনে তা দিয়েই দশ-বারো জনের রাতের খাবারের প্রয়োজন মেটাতে হতো।”

কি রুপকথা কিংবা গালগল্প বলে মনে হচ্ছে? অথচ এই-ই ছিলো একদিন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের জীবনযাপন। সেদিন স্বাধীনতার সংগ্রামে নিয়োজিত এই কর্মীরা সেদিন ভাবে নি নিজেদের ক্যারিয়ার কিংবা ভোগবিলাস।

আজ যখন ছাত্রলীগের নেতাদের দেখা যায় কোটি টাকার চাঁদাবাজিতে লিপ্ত, লাখ টাকার বিনিময়ে দলীয় পদ পাইয়ে দেবার মতন অর্থলিপ্সা,কোটি টাকার গাড়িতে চড়ে কর্মসূচীতে হাজির হওয়া, প্রশ্নফাঁস, মাদক প্রভৃতির সাথে যুক্ত- তখন কি চিন্তা করা যায় একদিন এই ছাত্রলীগ নামেই ছাত্ররা উপোষ থাকতো,পায়ে হেঁটে হেঁটেই স্বার্থহীনভাবেই, বিনিময় ছাড়াই দলের কাজ করতো?

সেদিন এই নেতাকর্মীদের গাড়িবাড়ী ছিলো না; টেন্ডার,পেশিশক্তির লড়াই কিংবা বড়াই কোনোটাই হয়তো ছিলো না তবে চরিত্রের ঘাটতি হয় নি। আর আজকে তাদের এগুলো সব আছে ঠিকই, তবে ক্ষমতা প্রদশর্নের হুড়োহুড়ি,তোলাবাজ, লাঠিয়াল বাহিনী হয়ে তারা চরিত্রটাই খুইয়েছে।
এর কারণ কি? কারণ একটাই -সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই চরিত্র গড়ে উঠে।এটা জন্মের মাধ্যমে নয়,কর্মের মাধ্যমেই তা অর্জন করতে হয়।আর এই লড়াই কেবল তখনই সম্ভব হয় যখন ক্ষমতার মমতার বদলে জনতার অধিকার ও স্বার্থের পক্ষে জীবন পরিচালিত হয়।

আমাদের স্বাধীনতার লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলো আওয়ামী লীগ।অনেক দূর্বলতা থাকা সত্ত্বেও আঃলীগ-ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে দেশের জন্য ছিলো ভালোবাসা,সমাজের মানুষের প্রতি ছিলো দায়িত্ববোধ। যদিও এই আঃলীগেই তাজউদ্দীনের মতন নেতা যেমন ছিলো আবার খন্দকার মোশতাকের মতন নেতারও অভাব হয় নি।স্বাধীনতার প্রশ্নে, ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নে সেদিন তারা ন্যায়ের পক্ষে ছিলো।পাকিস্তানি অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে তাদের প্রাণ গিয়েছে ঠিকই কিন্তু এই লড়াইয়ে তাদের নেতাকর্মীদের চরিত্র সংযম গড়ে উঠেছিলো।

আর স্বাধীনতার পরে শাসকের ভুমিকায় অবর্তীণ হয়ে এই নেতাকর্মীরা হারিয়েছে অতীতের সকল অর্জন ও গৌরব।

স্বাধীনতার পূর্বেই সার্বভৌমত্ব,পূর্ণ স্বাধীনতা,গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা,সমাজতন্ত্র প্রভৃতি প্রশ্নে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে ছিলো ছিলো দুটো ধারার দ্বন্দ্ব – প্রগতিশীল( র‍্যাডিক্যালিস্ট) ধারা ও জাতীয়তাবাদী ধারা।আভ্যন্তরীণ বিরোধ থাকলেও পাকিস্তানি উপনিবেশিকবিরোধী লড়াইয়ে তাদের উভয়ের একটা ঐক্যের জায়গা থাকে।তবে তৎকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানান ঘটনায় এই প্রগতিশীল ধারাটাই ছিলো ছাত্রলীগের সবচেয়ে ডেডিকেটেড,লড়াকু ও বলিষ্ঠ অংশ।

১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনের পটভূমিতে মুক্ত স্বদেশ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গড়ে উঠা ” স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস” দ্বারা পরিচালিত ছাত্রলীগের এই অংশটি তাত্ত্বিক ও রাজনেতিকভাবে মূলধারা হয়ে উঠে মূলত ১৯৭০ সালে ১২ আগস্ট ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় বর্ধিত সভায় ‘সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ এর পক্ষে ভোটাভুটিতে।ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক স্বপন চৌধুরীর উত্থাপিত এই প্রস্তাবটি ৫৫-৭ ভোটে গৃহীত হয়।অর্থাৎ বাংলাদেশ স্বাধীন হলে রাষ্ট্রের রুপ হবে সমাজতান্ত্রিক; পুঁজিতান্ত্রিক নয়।

এটাই ছিলো সেদিন ছাত্রলীগের মূল স্পিরিট। অথচ এই সমাজতন্ত্রের কথা এতোটা স্পষ্টভাবে কোনো কমিউনিস্ট পার্টিই (মস্কো কিংবা পিকিংপন্থী) বলতে পারে নি।

স্বাধীনতার পর ঐতিহাসিকভাবেই এই প্রশ্নটা সম্মুখে চলে আসে।কোন পথে এগুবে বাংলাদেশ? তখন এই প্রগতিশীল অংশ শ্লোগান তুললো-আমরা লড়ছি শ্রেণি সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য!” আর অপর অংশটি বললো-“বিশ্বে এলো নতুন মতবাদ- মুজিববাদ!”

মুজিববাদী ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী-এই দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়লো ছাত্রলীগ।মুজিববাদী ছাত্রলীগের ধারাটাই আজ আমরা দেখতে পাই আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র লীগ হিসেবে। অন্যদিকে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারী, ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান,জাতীয় পতাকার নির্মাতা এবং সর্বোপরি স্বাধীনতার ইতিহাস সৃষ্টিকারী ছাত্র লীগের মূল অংশ হয়ে পড়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ।

এই ইতিহাস অনেকেরই জানা। অথবা ইতিহাসের বিভিন্ন বই ঘাঁটলে তা পাওয়াও যাবে।কিন্তু ছাত্রলীগের চেহারা বুঝতে হলে এই সময়টাকে বোঝা দরকার ব্যাপকভাবে।কারণ রাজনৈতিক চরিত্র নির্মাণ কিংবা ধ্বংসের কিছু ঐতিহাসিক, দার্শনিক কার্যকারণ রয়েছে। এমনিতেই তা হয় না। জন্ম থেকেই কেউ ভালো বা খারাপ হয়ে জন্মায় না। ছাত্র লীগের ছেলেগুলোও কেউ খারাপ হয়ে জন্মায় নি।কিন্তু রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক যে প্রক্রিয়ায় বর্তমান শাসকদল ক্ষমতার মসনদটি দখলে রাখতে পেরেছে সেই প্রক্রিয়ায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বর্তমান চেহারা এমনই হওয়াটা স্বাভাবিক।

আজকে গোপালগঞ্জের বশেমুরবিপ্রবিতে, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দলটিকে নিপীড়ক কিংবা ছাত্র স্বার্থবিরোধী কর্মকান্ডে লিপ্ত হতে দেখা যায়। পাকিস্তান আমলে এনএসএফকেই এই লাঠিয়াল ভুমিকায় দেখা যেতো। কারণ তারা ছিল শাসক পাকিস্তানীদের স্বার্থ রক্ষাকারী সংগঠন। আর বর্তমান শাসকদলের মাস্তান বাহিনীতে পরিণত হওয়ায় এদের নেতাকর্মীদের চরিত্র ও কর্মকান্ড নিচে নামতে বাধ্য। যতই নেতা পরিবর্তন করা হোক না কেন নীতির পরিবর্তন না ঘটিয়ে কর্মীদেরকে মাস্তান-সন্ত্রাসী বানিয়ে আদর্শের চেহারায় ফিরিয়ে আনা শেখ হাসিনা তো বটেই,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষেও সম্ভব নয় বা হতো না।

তাই ছাত্রলীগের এই চেহারার পিছনে শ্রেণির প্রশ্নটাই প্রধান হওয়া উচিত। কারণ শাসকগোষ্ঠীর নীতিহীন রাজনীতির লেজুড় হয়ে এই ছাত্ররা কখনোই মুড়ি খেয়ে বা পায়ে হেঁটে রাজনীতি করতে শিখবে না। দলের নেতা,এমপি,মন্ত্রীদের কোটি কোটি টাকার ব্যবসা থাকবে, অবৈধ বাণিজ্য-ক্যাসিনো গড়ে উঠবে, বিদেশে টাকা পাচারসহ লুটপাটের কর্মকান্ড দেখে কর্মীরা আর যাই হোক- ত্যাগী, নিঃস্বার্থ হয়ে উঠবে এমন আশা করাটা সোনার পাথরবাটি ছাড়া আর কিছুই নয়। এমপিরা সংসদ দখল করে আর কর্মীরা হল দখল করবে না? নেতারা চাল,চামড়া,সারের সিন্ডিকেট গড়ে তুলবে আর কর্মীরা হলে সিট বাণিজ্য করবে না?

বিরোধী মতকে দমন,একদলীয় শাসনের গড়িমা এবং স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় দেশ চালাতে গিয়ে এভাবে তারা নিজেরাই হয়ে উঠেছে নিজেদের হন্তারক।

ইতিহাসের নির্মমতা এখানেই যে ছাত্রলীগের যে অংশটি প্রধান ধারা হতে পারতো সেই জাসদ অংশটি ভুল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় পর্যবসিত হয়। হঠকারী ও সুবিধাবাদী দুটো পথেই নিঃশেষিত হয় তাদের সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্নটি। অনেক ত্যাগ, বীরত্ব ও লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই ছাত্রলীগের এই অংশটিরও অপমৃত্যু হয়।তবে সেখানে ছিলো না ব্যক্তিগত স্বার্থ-চাহিদা কিংবা লোভ-লালসার চাহিদা। কিন্তু এটাও যেহেতু সঠিক ধারায় না গিয়ে ভুল পথেই এগুতে থাকে তাই এই অংশেরও পরিণতি ঘটে বাকশাল থেকে জিয়ার নিষ্ঠুরতায় আত্মদান, হতাশা, নিষ্ক্রিয়তা ও সাংগঠনিক অবলুপ্তিতে।

তবে ইতিহাস এখানেই থেমে থাকে নি। কালের পরিক্রমায় এই র‍্যাডিকাল অংশেরই যে স্বপ্ন, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আকাঙ্খা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আকুতি গড়ে উঠে এই ব্যর্থতার শিক্ষা নিয়ে। পেটিবুর্জোয়া ভাবধারার এই অংশটির সাথে ছেদ ঘটিয়ে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের বিজ্ঞানসম্মত উপলব্ধির ভিত্তিতে ১৯৮৪ সালে গড়ে উঠে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট।

সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন ও প্রেরণা নিয়ে গড়ে উঠা এই শক্তি সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াই জারি রাখুক।অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের এই সংগ্রামের ভেতরে আবারও তৈরি হোক যৌবনের সত্যিকারের বলিষ্টতা,চরিত্রের আদর্শ।

এভাবে আগামীর লড়াইয়ের মধ্যেই বেঁচে থাকবে শোষণমুক্তির নিউক্লিয়াস!

লেখক: আল কাদেরি জয়, সহ-সভাপতি , সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, কেন্দ্রীয় কমিটি
( লেখকের ফেইসবুক থেকে নেওয়া)


এখানে শেয়ার বোতাম