শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২৬
শীর্ষ সংবাদ

স্বাধীনতার পর ২ লাখ ৮০ হাজার একর বনভূমি বেদখল

এখানে শেয়ার বোতাম

অধিকার ডেস্ক :: দুই বছর চার মাসে দেশের প্রায় ১১ হাজার একর বনভূমি বেদখল হয়ে গেছে। আর স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত দেশে বেদখল হওয়া মোট বনভূমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮০ হাজার একর, যা পুরো মাগুরা জেলার আয়তনের সমান। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এসব বনভূমি অবৈধভাবে দখল করেছে। দখলকারীরা বেশির ভাগই প্রভাবশালী। তারা বনভূমি ধ্বংস করে বসতি ও শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছে। বন বিভাগের প্রতিবেদনেই এ তথ্য উঠে এসেছে। গত সোমবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে বন বিভাগ এই প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে বেসরকারি হিসাবে দখল হওয়া বনের পরিমাণ আরও বেশি বলে মনে করছেন পরিবেশ ও বনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। গত ২৬ জুলাই পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ থেকে প্রকাশিত বিশ্বের বনভূমি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ৩ লাখ ৭৮ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়েছে, যা দেশের মোট বনভূমির প্রায় ৮ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু ২০১৭ সালেই দেশে সর্বোচ্চ, প্রায় ৭০ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়েছে। আর গত পাঁচ বছরে উজাড় হয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৩ একর বনভূমি।

বন বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া মোট বনভূমির পরিমাণ ১ লাখ ৬০ হাজার। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৯৩ একর বনভূমি একসময় সংরক্ষিত বন ছিল। বরাদ্দ দেওয়ার সময় এসব বনভূমির সংরক্ষিত বনের সুরক্ষা বাতিল করা হয়।

বর্গকিলোমিটারে হিসাব করলে স্বাধীনতার পর বেদখল হওয়া মোট বনভূমির পরিমাণ ১ হাজার ১২৯ বর্গকিলোমিটার, যা পুরো মাগুরা জেলার (১ হাজার ৪৯ বর্গকিলোমিটার) চেয়েও বড়। আর বরাদ্দ ও বেদখল মিলিয়ে মোট বনভূমি ১ হাজার ৭৮০ বর্গকিলোমিটার, যা দেশের অন্যতম বড় জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের (১ হাজার ৭০২ বর্গকিলোমিটার) চেয়ে বড়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিবেশসচিব আবদুল্লাহ আল মহসীন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা বেদখল হওয়া জমির একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছি। এখন আরও বিস্তারিত তথ্য জোগাড়ের কাজ চলছে। এরপর আমরা এসব বনভূমি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেব।’

কোথায় বেড়েছে, কোথায় কমেছে

সরকারি হিসাবে (২০১৬ সালের ডিসেম্বর) দেশের মোট বনভূমির পরিমাণ ৬৩ লাখ ৬৮ হাজার ৮৫৯ দশমিক ১৭ একর। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেদখলে থাকা বনভূমির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬৮ হাজার ২৬৫ একর। আর বিভিন্ন সংস্থাকে দেওয়া ভূমির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩১ দশমিক ৬১ একর।

গত দুই বছরে সবচেয়ে বেশি বনভূমি বেদখল হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলে। এই সময়ে অঞ্চলটিতে ২৪ হাজার ৩৩২ একর বনভূমি দখল হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ হাজার ৪১২ একর বনভূমি দখল হয়েছে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায়। এ ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে ২ হাজার ৮৩৪ একর, বগুড়া অঞ্চলে ৪ হাজার ৯৯২ একর এবং বন্য প্রাণী অঞ্চলে ৫১২ একর বনভূমি দখল হয়েছে।

অন্যদিকে কিছু এলাকায় গত দুই বছরে বনভূমি দখলমুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় অঞ্চলে (ঢাকা) দুই বছরে ২১ হাজার ৯৭৭ একর ভূমি দখলমুক্ত হয়েছে। ২০১৬ সালে কেন্দ্রীয় অঞ্চলের ১ লাখ ৬৩ হাজার ১৪২ একর বনভূমি বেদখলে ছিল। বন বিভাগের নানা উদ্যোগে এসব বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে। তারপরও বর্তমানে এই অঞ্চলের বেদখলে থাকা বনভূমির পরিমাণ ১ লাখ ৪১ হাজার ১৬৫ একর।

গত ২ বছরে সবচেয়ে বেশি বনভূমি বেদখল চট্টগ্রাম অঞ্চলে
প্রভাবশালী ব্যক্তি–প্রতিষ্ঠান বনভূমি অবৈধভাবে দখল করেছে
প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থার (আইইউসিএন) হিসাবে পৃথিবীতে যে পরিমাণে কার্বন নিঃসরিত হয়, তার অর্ধেকের বেশি গাছ শুষে নেয়। বিশ্বের বৃষ্টি ও নদী দিয়ে আসা মিঠাপানির ৭০ শতাংশই গাছ ধরে রাখে। পৃথিবীর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ এখনো বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশেও এর কাছাকাছি চিত্র দেখা যায়। একটি দেশের সামগ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে হলে মোট ভূখণ্ডের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকতে হয়। সেখানে সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে আছে ১২ শতাংশ বনভূমি।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, সামগ্রিকভাবে দেশের পরিবেশের ভারসাম্য ধরে রাখতে বনভূমি আরও বাড়াতে হবে। কিন্তু বন বিভাগের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, সরকারিভাবে ঘোষিত বনভূমিগুলোই বেদখল হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার নামে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, আবার যাদের যতটুকু বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তারা তার চেয়ে বেশি জমি দখল করেছে। দখলদারেরা অনেক ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী।

সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা বন বিভাগকে বলেছি, তারা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া কোনো বনভূমি যাতে ইজারা না দেয়। আর বিপুল পরিমাণে বনভূমি দখলমুক্ত করতে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ করেছি।’

কোন এলাকায় কোন সংস্থার কাছে কত বনভূমি

বন বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় অঞ্চলের ১ লাখ ৪১ হাজার ১৬৫ দশমিক ৫৬ একর, চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৮৭ হাজার ২৪৩ দশমিক ৩৭ একর, উপকূলীয় এলাকায় ১৭ হাজার ৬৫২ দশমিক ৩৬ একর, রাঙামাটি অঞ্চলে ১৪ হাজার ৭৯৭ দশমিক ৮৫ একর, বগুড়া অঞ্চলে ১৪ হাজার ৬৯৩ দশমিক ৬২ একর, ঢাকা সামাজিক বন অঞ্চলের ৩১৮ দশমিক ৫১ একর এবং বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের ৩ হাজার ২২৫ দশমিক ৩১ একর বনভূমি বেদখলে আছে। এর বাইরে খুলনা অঞ্চলের কত পরিমাণ বনভূমি বেদখলে আছে, তার হিসাব দেওয়া হয়নি।

সরকারিভাবে বনভূমি বরাদ্দ পাওয়া সংস্থাগুলোর মধ্যে সেনাবাহিনী ৯২ হাজার ৫১৯ একর, বিমানবাহিনী ১ হাজার ১৪৯ একর, নৌবাহিনী ১৬৭ একর, র‍্যাব ৪০ একর, বিজিবি ৪৭ একর। এসব বাহিনীকে দেওয়া হয়েছে মোট ৯৩ হাজার ৯২৩ একর। বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনকে দেওয়া হয়েছে ৪৩ হাজার ৯৫ একর। অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কাছে ২৩ হাজার ১৩ একর।

মহেশখালীর সংরক্ষিত বনে অপরিশোধিত তেলের ডিপো (ট্যাংক ফার্ম) ও পাইপলাইন স্থাপন করছে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি। সোনাদিয়া দ্বীপে বরাদ্দ পেয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), যার বেশির ভাগ জুড়ে আছে শ্বাসমূলীয় বন। বিভিন্ন বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো নির্মাণে বরাদ্দ দেওয়া বনভূমি ব্যবহৃত হচ্ছে।

দেশের প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বনভূমি বেদখল হওয়া এবং বনের বাইরে গাছ কাটা সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বনভূমি মানে শুধু কিছু গাছপালা নয়। বনভূমি মানে বন্য প্রাণী ও বিচিত্র বৃক্ষরাজির জীববৈচিত্র্য। দেশের জিনগত সম্পদের সবচেয়ে বড় আধারও এসব বনভূমি। এসব বন এক দিনে তৈরি হয়নি। কিন্তু বেদখল ও বরাদ্দ পাওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যে এসব বন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বরাদ্দ বা বেদখল হওয়ার আগে আমরা জানতেও পারি না এসব বনে কী সম্পদ ছিল। আর আমরা কী হারালাম।’

প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জোট আইইউসিএন বাংলাদেশের সাবেক এই কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেন, সরকারের উচিত হবে সামগ্রিকভাবে দেশের বনভূমির একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন ছাড়া কোনো বনভূমি ইজারা না দেওয়া। আর বেদখল হওয়া বনভূমি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিয়ে উদ্ধার করা।


এখানে শেয়ার বোতাম