শনিবার, জানুয়ারি ১৬

সোনালী করমর্দন

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 70
    Shares

রোমেল রহমান ::

জানা যাবে সরকার পাটকল গুলো বন্ধ ঘোষণা দেবার প্রক্রিয়ার চূড়ান্তে পৌঁছে গেছে এবং শীঘ্রই ২৫০০০ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন কমপক্ষে, তবে ধর্মাবতার একেবারে পাষণ্ড ভাষার প্রয়োগ করেন না, এই ব্যাপারটাকে তারা সোনালী দুঃখের মতন ‘সোনালী করমর্দন’ নাম দিয়ে শ্রমিকদের বেকার করে দেবেন! ফলে রাষ্ট্রের এই সন্তানেরা খাবার যোগাড়ের জন্য আগামী দিনে কোন রাস্তা বেছে নেবেন(কেনোনা যে পাওনা তারা
পাবেন, তা দিয়ে সাফল্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটিয়ে বাকি জীবন পার করার সফল বিগত নজির নেই)! ন্যায় শব্দটা জীবিত থাকবে কি তাদের হাতে আর? নিরুপায়ের ন্যায় কি? কানুন বা শাস্ত্র অবশ্য অটল ব্যবস্থার পক্ষে কিন্তু ক্ষুধার্তের পাকস্থলী কি সেই পথের অনুগামী হতে সমর্থ?

দ্বিতীয় পথ হিসেবে হয়তো পূর্বের ন্যায় বেছে নেয়া যাবে আত্মঘাতী হবার রাস্তা! সেই দায় আমরা রাষ্ট্রের কাঁধে দিলে রাষ্ট্রের তাতে কি এসে যায় সেই বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় দেখা গেছে চিরকাল! তোয়াক্কা না করার রাস্তায় হাঁটলে জনগণের আত্মহত্যা নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন পড়ে না! আর দ্বিতীয় পথের আরেকটা উদাহরণ আমরা আগেও দেখেছি, শ্রমিক পরিবারের নারীদের গণিকাবৃত্তিতে নাম লেখানোর সেই দিনগুলোতে! পোশাকখাত প্রণোদনা পেতে পারে তবে পাটখাত পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটির মতন শেষ বেলায় কিছু ছুঁড়ে ফেলা খুচরো খাচড়া পেলেও পেতে পারে অবস্থায় যখন যায় তখন আমরা যারা পাটকল অঞ্চলের মানুষ হয়ে রোজ বেকারির যন্ত্রণা দেখি তখন ব্যবস্থার প্রতি ঘেন্না জ্ঞাপন করে নিজেদের এগিয়ে আড়ালে রাখি বড়জোর! মানব্বন্ধন, ভুখা মিছিল, অনশনের চিরায়ত রসায়নের মধ্যে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের জয় আসে শক্তির নিরিখে! ফলে বৃদ্ধ শ্রমিকদের বেলাশেষে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যাওয়া চোখ গুলো দেখে আমাদের পিতা প্রপিতার ধ্বসে পড়ার মুখ মনে পড়ে বলেই টের পাই এরপর ‘আমি’ বা এখনই ‘আমার’ অবস্থান রাষ্ট্রের দরবারে এইটুকুই!

সুইচ ব্যাংকের পেট মোটা হলে পাচার হওয়া টাকার কীর্তন শুনতে শুনতে আমাদের টিনের চালের ফুটো দিয়ে জল নেমে এসে শূন্য থালায় টুপটাপ বা ফড়ফড় শব্দে পড়লে যেই নান্দনিক সুরের সৃষ্টি হয় তার শিল্পমান নিয়ে চমৎকার তথ্যচিত্র তুলবার পর, ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ বলে কেউ যদি মধ্যরাতে লাল করে ফেলে মিল গেটের আকাশ তবে সে চিৎকার কতদূর পৌঁছালো সেটা আমাদের জানা হয়ে গেছে বলেই, বিদেশি কোম্পানির দালালেরা শুঁকে বেড়ায় কারখানা গুলোর যায়গা জমি ইজারা নেবার বাসনায়! আর সরকারী দলের নেতারা ভাড়ুয়াবৃত্তি করে ছুঁড়ে দেওয়া ছাঁট খাবার বাসনায়!

ফলে জানা যায় উপরতলার বাসিন্দারা কাড়ি কাড়ি লেনদেনের মধ্যে দিয়ে নিজেদের ভালো থাকার বিনিময়মূল্যে এই হাভাতের দলের ভালো না থাকাকে নিশ্চিত করেছে বলেই, খোদার দরবারে গরিবের এতো মাথা ঠোকাঠুকি!

‘আধুনিকায়ন’ আর ‘উন্নয়ন’ শব্দ দুটিতে ঘেন্না ধরে গেছে এই বদ্বীপের বাসিন্দাদের! করোনা কালের চিকিৎসা ব্যবস্থায় তার নগ্নতা স্পষ্ট করে দিয়ে গেছে আরেকবার, যদিও চালকেরা লজ্জার বালাইনাশক খেয়ে ভূমিষ্ঠ হয়েছেন! তারা মানেন না, গলেন না, টলেন না কোন কিছুতেই! বরং বেশি সত্য বলে প্রতিবাদ করলে মামলা দিয়ে বা তুলে নিয়ে গিয়ে উধাও করে দেবার পদ্ধতি সহজলভ্য করেছেন! একটা ভালো দিন আসবে বা জীবন ভালোয় ভালো কেটে যাবে এই জাতীয় ভাবনার সঙ্গে চরম বিরোধ শ্রমিক জীবনের! অনিশ্চয়তার নীল ডুমো মাছি চারদিকে ভনভন করে ঘুরে ফেরে কখন কে টসে যাবে আর তার চিবুক ঘিরে উল্লাস করা যাবে সেই নেশায়! আবার, ‘নিজে মর নৈলে মারো’ তরিকায় যদি শ্রমিক রাস্তা নেয় তবে আবার খাকি পোশাকিদের কাঁদানো গ্যাস কিংবা রাবার বুলেট অথবা পালিত গুন্ডাদের চাকুর মুখোমুখি যেই শ্লোগান রঞ্জিত হবে তার বিনিময়ে হয়তো কিয়দ আশ্বাসের বৃষ্টি নেমে এলেও যথারীতি কিছুদিন পর আবার মাথা তুলে ষড়যন্ত্রের নক্সাকারেরা নিজেদের বিজয়ী করতে তৎপর হবেন, যেহেতু নাট্যটা গতানুগতিক এমন! ফলে আন্দোলন একটা নিয়মিত অভ্যাস হয়ে গেছে মালিক পক্ষের মজলিশে! আর শ্রমিকের মৃত্যু একটা বিনিময় মূল্যে বা ক্ষতিপূরণমূল্যে কিনে নেয়া প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে, রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা পাপ অনুভব হয়! কাঁদানো গ্যাসের প্রয়োজন পড়ে না শ্রমিকেরা এম্নিতেই দীর্ঘজীবন ধরে কাঁদছে! একটু রহম করবার হাত যদি ধর্মাবতার দিতেন তবে আপনারই জিকিরে থাকা এই নগণ্যের দল শান্তিতে মরতে পারতো! কিন্তু যার হারাবার কিছু নেই তার জন্য একদিকে মালিক অন্য দিকে পুলিশ আর চারদিকে ক্ষুধা সরব, ফলে তাকে হয় জান দিতে হবে নৈলে আদায় করার জন্য মরতে হবে দুটোই একই রাস্তার এদিকওদিক! মধ্যখানে মশকরা দেখতে আসে কিছু সুহৃদ যারা হাত ধুয়ে উঠে যায় হাত মেলাবার পর!

সোনালী যে বিদায় জানাতে সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, একবার কি এমত অনুভব হয় না যে, একটা ‘সোনালী জীবন’ বেঁধে দেই এই আমাদের সোনালী আঁশের শ্রমিকদের জন্য, যার ঘাড়ে চড়ে টিকে আছে আমাদের অর্থনীতির একাংশ! যখন বেসরকারি পাটকল গুলো ভালো ব্যবসা করছে আর সমগ্র দুনিয়ায় পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে তখন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা শ্রমিকদের সঙ্গে জনতার যেই আহাজারি তাকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেওয়াটা এক নির্বোধের গোঁয়ার্তুমি! নাকি শ্রমিকের মৃত্যুই অবধারিত বলেই, রাতারাতি কেটে বাদ দিয়ে দেয়ার এই ভাবনা! আমাদের কি মনে হয় কখনো এই পরিবার গুলোরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে! অর্ধেক নগদ এবং বাকিটা সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে পাওনা পরিশোধের ঘোষণা দিয়ে মিলের বাঁশির নিয়মিত আহবানকে আর্তনাদে পরিণত করার ঘোষণার মধ্যে দিয়ে পরিবার গুলোর মৃত্যু নিশ্চিতকরণ এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পূর্বে পুনরায় ভাবা অবশ্য কর্তব্য, কেনোনা এই চোখ গুলোর বেঁচে থাকার ফরিয়াদে আগুন দেবার দায় কাকে দেয়া হবে আগামী সকালে?


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 70
    Shares