মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২৬

সুনামগঞ্জ শহরের ৯০ ভাগ এলাকায় বন্যার পানি

এখানে শেয়ার বোতাম

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:: অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলের পানিতে সুনামগঞ্জ শহরের ৯০ ভাগ এলাকাই পানিতে নিমজ্জিত। সদরে পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের সবকটি আবাসিক এলাকা এখনও ৫ থেকে ৭ ফুট পানির নিচে তলিয়ে আছে। সড়ক উপচে প্রবল বেগে লোকালয়ে বানের পানি ঢুকছে সুনামগঞ্জের শহরে নগরে গ্রামে। পৌর শহরের বাইরে পুরো জেলারই একই অবস্থা। তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, ছাতক, দোয়ারাবাজার, জামালগঞ্জসহ ৫টি উপজেলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। জেলায় তো বটেই শহরেও এখন চলাচলের প্রধান নৌকা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, শহরের প্রায় সব এলাকাতেই ঢুকে পড়েছে ঢলের পানি। সঙ্গে অতিবৃষ্টি সে পানি আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে খুবই ধীর গতিতে সরছে পানি। আর এতেই জেলার বন্যার্তদের সঙ্গে শহরের মানুষদেরও দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। গত চার সপ্তাহের ব্যবধানে সুনামগঞ্জবাসী এই নিয়ে তিন বার বন্যায় আক্রান্ত হলেন। সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে সৃষ্টি হয়েছে এই ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির। জেলার সদরের বাইরে বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার,ছাতক, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, দিরাই, শাল্লসহ জেলার ১১টি উপজেলার ৮৮টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভার কয়েক লাখ মানুষ এখনও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এখনও দুর্গতদের ঘরবাড়ি বানের পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, সড়ক উপচে প্রবল বেগে লোকালয়ে বানের পানি ঢুকছে সুনামগঞ্জের শহরে নগরে, গ্রামে। জেলার তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, ছাতক, দোয়ারাবাজার, জামালগঞ্জসহ ৫টি উপজেলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। বন্যা কবলিত হয়ে ও করোনা কারণে খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তাদের আয় রোজগার বন্ধ থাকায় সরকারি সহযোগিতার দিকে চেয়ে আছেন তারা।

এদিকে সুনামগঞ্জ পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডেও সবকটি আবাসিক এলাকা এখনও ৫ থেকে ৭ ফুট পানির নিচে তলিয়ে আছে। শহরের নুতনপাড়া, পশ্চিম হাজীপাড়া, ষোলঘর, উকিলপাড়া, নবীনগর, শান্তিবাগ, মরাটিলা, হাছননগর, কালীপুর, হাছনবসত, সুলতানপুর, ধোপাখালী, নবীনগর, পশ্চিমবাজার, সাববাড়িরঘাট, তেঘরিয়া, বড়পাড়া, মল্লিকপুর ওয়েজখালীসহ সব আবাসিক এলাকার বসতবাড়ি রাস্তাঘাট কোমর পানির নিচে ডুবে আছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় নৌকা দিয়ে লোকজন বাসায় যাতায়াত করছেন।

সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মো. নাদের বখত বলেন, পৌর এলাকার ৯০ ভাগ পানিতে ডুবে আছে। রাস্তাঘাট ভেঙে পড়েছে। অসংখ্য বসতবাড়ি বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে। শহরের নিচু এলাকার মানুষ চার সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। সুরমা নদীর পানি উপচে শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করছে। প্রবল স্রোতে মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন। বসতঘর ও বাড়ির আঙিনা থেকে পানি কমছে না।

জেলা প্রশাসনের কার্যালয় সূত্র জানায়, ৩৪৬টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৩ হাজার ৪১৬টি পরিবারের ১৩ হাজার ৪১৮জন নারী-পুরুষ, শিশু আশ্রয় নিয়েছে। আজ পর্যন্ত বন্যায় মারা গেছেন তিনজন। আজ পর্যন্ত ১ লাখ ২৫ হাজার ৭০৪টি পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জানানো হয়েছে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গত এলাকায় ৯১৮ টন চাল, ৫১ লাখ ৭০ হাজার টাকা, ৩ হাজার ৬০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া দুর্গত এলাকায় ৪ লাখ টাকার গোখাদ্য ও ২ লাখ টাকার শিশু খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সরবরাহ করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, আজ বেলা তিনটায় সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ১০০ মিলিমিটার ও ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। প্রতি তিন ঘণ্টায়য় ২ থেকে ৩ সেন্টিমিটার পানি কমছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, উজানে বৃষ্টিপাত না হলে পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হবে। এখন পর্যন্ত সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে বৃষ্টি হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে।

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, পরপর তিন দফায় বন্যায় আক্রান্ত হওয়ায় মানুষের এখন আর নুতন করে হারানোর কিছু নেই। দুর্গতদের জন্য মানবিক সহায়তা কার্যক্রম আরও বাড়ানো প্রয়োজন। দুর্গত এলাকায় শুকনো খাবারের প্যাকেট ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের চাহিদা রয়েছে।

ছাতক উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম কবির বলেন, ছাতকে সুরমা নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা অব্যহত রয়েছে।

সুনামগঞ্জ -৫ আসনের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক দাবি করেছেন, দুর্গত এলাকায় ত্রাণের কোনও অভাব নেই। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্যোগ মোকাবিলা করছে। কোনও মানুষকে বন্যার কারণে কষ্ট করতে হবে না।

ঘরের উঠানে পানি এসেছে, কাজ নেই। তাই জীবিকার উপায় নিয়ে চিন্তিত এক গ্রামীণ নারী।

উল্লেখ্য, গত ২৫ জুন থেকে ২৩ জুলাইয়ের মধ্যে সুনামগঞ্জবাসী তিনবার বন্যায় আক্রান্ত হয়েছেন।


এখানে শেয়ার বোতাম