রবিবার, নভেম্বর ২৯

সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংহতি দিবস

এখানে শেয়ার বোতাম

অধিকার ডেস্ক :: ১ জানুয়ারি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংহতি দিবস। শহীদ মতিউল ইসলাম ও মির্জা কাদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের সাহসী অগ্রসৈনিক। বিশ্বব্যাপী মাকড়সার জালের মতো বিস্তৃত সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার এবং দুনিয়াজুড়ে বঞ্চিত সংগ্রামী মানুষের কাফেলায় বাঙালির রক্তের বিনিময়ে সংহতি প্রকাশের দিন ১ জানুয়ারি। ১৯৭৩ সালের এই দিনে ভিয়েতনামে মুক্তিকামী মানুষের ওপর চলমান মার্কিন বোমা হামলা এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ভিয়েতনাম সংহতি দিবসে শহীদ হন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মতিউল ইসলাম এবং মির্জা কাদেরুল ইসলাম।

ভিয়েতনামের জনগণের বীরোচিত সংগ্রামে সংহতি প্রকাশের লক্ষ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ‘ভিয়েতনাম সংহতি দিবস’ পালনের ডাক দেয়। ডাকসু’র তৎকালীন ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মাহবুব জামান প্রমুখের নেতৃত্বে সেদিন এক বিশাল মিছিল বের হয়ে মতিঝিলের ‘আদমনি কোর্ট’ ভবনে অবস্থিত দূতাবাস অভিমুখে এগিয়ে যায়। মিছিলটি ঢাকা প্রেসক্লাবের বিপরীতে তোপখানা রোডে অবস্থিত মার্কিন তথ্য কেন্দ্রের (ইউসিস) সামনে আসতেই পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার মতিউল ইসলাম ও ঢাকা কলেজের ছাত্র টাঙ্গাইলের সন্তান মির্জা কাদেরুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদের মৃত্যু বরণ করেন। মতিউলের বয়স তখন ২১ বছর, কাদেরুলের ১৭। জহুরুল হক হলের ১৪৮ নং কক্ষের আবাসিক ছাত্র মতিউল তখন ছাত্র ইউনিয়ন হল শাখার প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।

পরবর্তীতে গুলিবিদ্ধ হবার স্থানে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংহতি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয় এবং প্রতিবছর ওই দিনটি ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন শুরু হয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে নিজ দেশে যুদ্ধে পরাজিত করে স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনাম প্রতিষ্ঠিত হবার কয়েক বছর পর শহীদ মতিউল-কাদেরুলকে ভিয়েতনাম তাদের জাতীয় বীরের মর্যাদা দেয়।

৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ মতিউল এবং কাদেরের আত্মত্যাগ এখনো লড়াইয়ের প্রেরণা। আজ দেশে দেশে যুদ্ধ বাঁধিয়ে বাজার, প্রাকৃতিক সম্পদ লুটে নেয়ার নগ্ন আস্ফালনে মত্ত সাম্রাজ্যবাদীরা। মানুষ আর প্রকৃতিকে প্রতিনিয়ত করে তুলছে বিপন্ন। রক্তের হোলিখেলায়ও আপত্তিহীন সাম্রাজ্যবাদের হিংস্র থাবায় আজ ছিন্নভিন্ন বিশ্বের শতকোটি মানুষ। সম্পদলোভী শকুনের দৃষ্টি থেকে একচুলও নিরাপদ নয় বাংলাদেশ। আমাদের দেশের বন্দর, তেল, গ্যাস, কয়লা আর প্রাকৃতিক সম্পদ দখলে মরিয়া তারা। সামরিক হুমকির পাশাপাশি তাঁবেদার ক্ষমতা কাঠামো আর মুক্তবাজার অর্থনীতির মারপ্যাঁচে একটু একটু করে গিলে নিতে চাইছে আমাদের স্বদেশ। আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সার্বভৌমত্ব, মনোজগত সবই করায়ত্ব করতে চায় আজকের সাম্রাজ্যবাদ। তবে যেখানেই ধ্বংসের মচ্ছব চলুক না কেন, পরাজিত হয়ে ফিরতে হয়েছে তাকে। ভিয়েতনামের লাখো জনতাকে হত্যা করেও মানুষের শক্তির কাছে পদানত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের আধুনিক সমরাস্ত্র। আমাদের মুক্তিযুদ্ধেরও তীব্র বিরোধিতা করেছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু বাংলার মুক্তিকামী মেহনতি জনগণ তাদের রক্তচক্ষু উপড়ে ফেলে স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ঠিকই ছিনিয়ে এনেছে। পুঁজিবাদের ব্যর্থতা, অন্যায়, শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে দিকে দিকে প্রতিবাদের দামামা বাজছে। শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষের দেয়ালে ঠেকা পিঠ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। কিউবা, ভেনেজুয়েলা, ল্যাটিন আমেরিকার সংগ্রাম ছড়িয়ে পড়ছে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে সমগ্র দুনিয়ায়। ‘শ্রেণি সংগ্রামই মানবমুক্তির একমাত্র পথ’ তা আবারো দিশারী হয়ে উঠছে। মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে সমাজতন্ত্রের পতনের বুলি। ভোগবাদের ঠুলি উপড়ে দেশে দেশে তরুণ-যুবারা শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনে হচ্ছে একাত্ম। সেদিন আসলেই আর দূরে নয়, যেদিন পৃথিবীর প্রতি ইঞ্চি ভূমি থেকে উচ্ছেদ হবে সাম্রাজ্যবাদ, মানুষ মুক্তি পাবে এ ঘৃণ্য অপশক্তির হাত থেকে।

সেদিন মতিউল-কাদেরের স্লোগানে-মিছিলে চেতনায় শামিল ছিলেন তিতুমীর, সুভাষ, সূর্যসেন, প্রীতিলতা, সিধু-কানুরা। প্রতিবাদের আজকের লড়াইয়ে আমাদের চেতনায় মতিউল-কাদেররা বারবার ফিরে আসুক। দূরপ্রাচ্যের ভিয়েতনামিরা যখন নাপাম বোমায় ক্ষতবিক্ষত, হাজার মাইল দূরে থেকেও সে ক্ষতের বেদনা বুকে ধারণ করে, প্রতিবাদে শামিল হওয়ার মন্ত্র বৃথা হতে দেননি এ দুই মহানায়ক। লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, অন্যায় আর শোষণ দলে মাথা উঁচু করে মৃত্যুই যে নবজীবনের গান রচনা করে তা মতিউল-কাদেরুলরা প্রমাণ করেছিলেন। প্রতিরোধ প্রতিশোধে নিশ্চিহ্ন হোক সাম্রাজ্যবাদ।


এখানে শেয়ার বোতাম