বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৫
শীর্ষ সংবাদ

সাম্প্রতিক বিষয়ে কিছু অগোছালো নোটস

এখানে শেয়ার বোতাম

অভিনু কিবরিয়া ইসলাম ::


১.
যারা দুই নম্বরি করে অবৈধভাবে অঢেল অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন, যারা দুর্নীতি করেছেন, তাদের দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এমনিতেই গ্রেফতার করার কথা। ‘উপরের নির্দেশে’ ঢাক ঢোল পিটিয়ে বিশেষ অভিযান করার অর্থই হলো ‘উপরের নির্দেশ’ ছাড়া অপরাধীদের গ্রেফতার করা সম্ভব নয়। এই যে ‘উপরের নির্দেশ’ ছাড়া গ্রেফতার না করা, সেটাও তো দুর্নীতি। এই দুর্নীতির বিচার কে করবে?

২.
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনিই দুর্নীতির বিচার করবেন। ওয়ান ইলেভেনের প্রয়োজন নাই। এই কথার দুটি অর্থ দাঁড়ানো সম্ভব। এক. ওয়ান ইলেভেন হয়েছিল লুটেরা রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে, এবং দুই. আরেকটি ওয়ান ইলেভেন ঠেকাতেই ঢাক ঢোল পিটিয়ে এই অভিযান। অভিযানের শুরুতেই সেনাপ্রধানের এই অভিযানকে আগ বাড়িয়ে সমর্থন দেয়া নিয়েও অনেক বিশ্লেষণ দাঁড় করানো যেতে পারে। ক্ষমতার ভরকেন্দ্র কোথায় এই প্রশ্নটিও সামনে আসছে।

৩.
বিগত দুটি নির্বাচনের ধরনে প্রমাণিত হয়েছে, রাষ্ট্রের স্টেক হোল্ডার হিসেবে জনগণের ভূমিকা একেবারেই গৌণ, যেখানে সংবিধান মোতাবেক জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। সর্বশেষ নির্বাচনে লুটেরা দুর্বৃত্ত রাজনৈতিক নেতাদের চাইতেও অনেকাংশে আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনের ভূমিকা বেশি ছিল বলে মানুষ মনে করে। রাষ্ট্রের বল প্রয়োগের সংস্থা, সিভিল প্রশাসন, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো নিরংকুশভাবে ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন করেছে ও নির্বাচনে তাদের জেতাতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে বলেই মানুষ দেখেছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে ক্ষমতাসীন দলের ভূমিকা ও গুরুত্বও অনেকাংশে খর্ব হয়েছে।

৪.
রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও তার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় শাসকশ্রেণির মধ্যেও অভ্যন্তরীণ কনট্রাডিকশন রয়েছে। সিভিল-মিলিটারি প্রশাসন, বিদেশী পুঁজির উপর নির্ভরশীল কর্পোরেটস এবং লুটেরা দুর্বৃত্ত গডফাদার রাজনীতিবিদদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে দ্বন্দ্ব আছে। এই অবৈরী দ্বন্দ্ব কখনো কখনো বৈরী দ্বন্দ্বে রূপ নেয়।

৫.
একটা রাষ্ট্রের অর্থনীতি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট এর সুফলে মূলত উৎপাদনশীল শ্রমশক্তির অবদানে এই দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশীল শিল্পের বিকাশ এখানে সেভাবে ঘটেনি। এদেশের ধনিকশ্রেণি মোটাদাগে বিদেশী লগ্নি পুঁজির অধীন। এই দেশের শাসকশ্রেণির একটা বড় অংশ লুটপাট ও অর্থ পাচারে ব্যস্ত, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে তারা আগ্রহী নয়। অপরদিকে এই বিশাল শ্রমশক্তিকে কাজে লাগাতে বিদেশী লগ্নি পুঁজি তৎপর। বিদেশী লগ্নি পুঁজি ও তার এদেশীয় অধীনস্ত ধনিকশ্রেণির মুনাফার স্বার্থে দুর্নীতিবাজ লুটেরা রাজনীতিবিদদের লাগামছাড়া লুটপাটের লাগাম টানা কখনো দরকারি হয়ে পড়ে। এই নিয়েই শাসকশ্রেণির অভ্যন্তরে একটা দোটানা বা দ্বন্দ্ব কাজ করে। রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক পরিস্থিতিতে নিজ দলের লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে কিছু সীমিত অভিযান মূলর বিদেশী লগ্নি পুঁজি ও এদেশীয় কর্পোরেটদের কিছুটা আশ্বস্ত করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বিক্ষুব্ধ জনগণকে একটু সামলে রাখার হাতিয়ার বলেই মনে হয়।

৬.
দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে সাময়িক কিছু অস্থিরতা বা টেনশন দেখা দিতে পারে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলে এই অবস্থা বেশিদিন টিকবে না৷ ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিবিদরাও হয়তো জানেন, ক্ষমতায় টিকে থাকতে তাদের ভূমিকা দিন দিন গৌণ হয়ে পড়েছে, ক্ষমতায় টিকে থাকতে সিভিল-মিলিটারি প্রশাসন ও কর্পোরেটসদের সমর্থনই এখন বেশি জরুরি৷ তাই চুপচাপ এই সময়টাকে পার করে দেয়ার তালে আছে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকা গডফাদারেরা।

৭.
শুধু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই নয়, বৈশ্বিক রাজনীতি ও প্রতিবেশি দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র নাজুক অবস্থায় রয়েছে৷ চীন ঘেরাও কর্মসূচিতে ট্রাম্প এবং মোদি একাট্টা। অন্যদিকে এতদিন চীন-রাশিয়াকেও বিভিন্ন কিছু দিয়ে থুয়ে সন্তুষ্ট করা গেছে। কিন্তু রোহিংগা সংকটের সমাধানে কেউই পাশে এসে দাঁড়ায়নি, বাংলাদেশও পারেনি রোহিংগাদের ফিরিয়ে দিতে। একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকার, কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতায় জনগণের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে পারা সরকার যেভাবে বৈশ্বিক এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের সুবিধাকে কাজে লাগাতে পারে, যেনতেনভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকলে তা পারা যায় না।

৮.
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে যে চুক্তিগুলো হয়েছে, সাধারণ মানুষের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হয়নি, বরং মানুষ মনে করছে ক্ষমতায় টিকে থাকতে প্রতিবেশী দেশের সমর্থন আদায়ের জন্যই চুক্তিগুলোর অধিকাংশ সম্পাদিত হয়েছে। প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা, সকলের সাথে বন্ধুত্ব রাখা আমাদের ফরেন পলিসির পার্ট। অবশ্যই আমরা আমাদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে অন্যদেশের স্বার্থকেও বিবেচনায় নেব, সহযোগিতা করব৷ কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বমূলক সম্পর্কের কথা ঘটা করে প্রচার করা হলেও সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট মূল ইস্যুগুলোর সমাধান না করেই একতরফাভাবে আমরা আমাদের বার্গেনিং এডভান্টেজগুলো হারাচ্ছি। তিস্তার পানিবন্টন, সীমান্ত হত্যা, এনআরসিসহ বিষয়গুলোতে অগ্রগতি হয়নি, উলটো ভারতকে দেয়া হলো ফেনী নদীর পানি, ত্রিপুরায় গ্যাস রপ্তানি, ট্রানজিট, রাডার বসানো সবকিছু যে ভারতের আগ্রহে ও স্বার্থেই হচ্ছে তা সামান্য বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই বোঝে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ডামাডোলে এই সত্যকে অস্বীকার করা যাবে না।

৯.
প্রকৃত দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সরকার ও প্রশাসনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। জনগণের প্রতিরোধ, পালটা আঘাত ছাড়া দুর্নীতি নির্মূল সম্ভব নয়। রাষ্ট্রক্ষমতায় জনগণের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা অর্থে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া এবং সেই সাথে লুটেরা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমূলে উৎপাটন ছাড়া দুর্নীতির সম্পূর্ণ উচ্ছেদ সম্ভব নয়। বর্তমান ব্যবস্থায় এক শাসকশ্রেণির এক অংশের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা আরেক অংশকে রাজত্ব করার সুযোগ তৈরি করে দেবে, যারা দুর্নীতি, শোষণ ও লুটপাটকে আরেকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা দেবে। তাই দুর্নীতিবিরোধী লড়াই সর্বজনের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং লুটেরা ধনবাদী ব্যবস্থা পরিবর্তনের সংগ্রামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

১০.
গত বছরের ২৯শে ডিসেম্বর রাতে গোটা দেশব্যাপী রাষ্ট্রের পরিচালনায় এক সুদক্ষ দুর্নীতি পরিচালিত হয়েছিল। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কে?

লেখক : শিক্ষক, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)


এখানে শেয়ার বোতাম