বুধবার, ফেব্রুয়ারি ২৪
শীর্ষ সংবাদ

সাফল্যের হাসি ও ছিটকে পড়ার বেদনা

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 415
    Shares

রাজেকুজ্জামান রতন ::

পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা ৭৭০ কোটির বেশি। জাতিসংঘের সদস্য ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৩ লাখের চেয়ে কম জনসংখ্যার দেশের সংখ্যা ৪০টির বেশি। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশ এস্তোনিয়া, পূর্ব তিমুর, মরিশাস, সাইপ্রাস, জিবুতি, ফিজি ইত্যাদি। অন্যদিকে, বাংলাদেশে এবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাই ১৩ লাখের বেশি। যদিও এদের বয়সী যারা একই সঙ্গে প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি হয়েছিল তাদের সংখ্যা ছিল ২৯ লাখেরও বেশি। এই সব ঝরা পাতাদের কথা কে আর ভাবে? যে সমস্ত পাতা টিকে আছে তাদের সামনেই বা কী অপেক্ষা করছে?

সদ্যপ্রাপ্ত যৌবনের একটা শক্তি এবং সৌন্দর্য আছে। ১৮ বছর বয়সটা সেই রকম একটা সময়। চোখ ভরা স্বপ্ন আর বুক ভরা সাহসের সময় এটা। শিক্ষার্থীরা এই বয়সেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে থাকে আমাদের দেশে। প্রতি বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল ঘোষণার পর যাদের হাসি আমরা দেখি বা যাদের কান্না আমরা দেখি না তারা তো সেই বয়সেরই। কিন্তু সাফল্যের আনন্দে কতজন হাসে? যারা হাসে তারা যেন পিরামিডের চূড়ায় থাকে। পিরামিডের উঁচু চূড়া বহুদূর থেকে দেখা যায়, নিচে এবং আড়ালে থাকে তার ভিত্তি। নিচের অংশ বহন করে ওপরের সমস্ত ভার। পুঁজিবাদী সমাজটাও তেমনি পিরামিডের মতোই। নিচের বিপুল জনসংখ্যা বহন করে রাষ্ট্রের দায়, পালন করে দায়িত্ব, এরাই জোগান দেয় ট্যাক্সের টাকা, শ্রমের শক্তি, ঘোরায় উৎপাদনের চাকা কিন্তু থাকে সবার নিচে। পিরামিডের মতো এই সমাজের সুউচ্চ চূড়ায় বসে থাকা হাস্যোজ্জ্বল কৃতি মানুষদের স্বীকৃতি সবাই দিলেও যারা তাদের উচ্চে তুলেছে তারা থাকে অন্ধকারে। এরা রাষ্ট্রকে দেয় বেশি, পায় কম আর যারা দেয় কম তারা নেয় বেশি। কী আর করা যাবে, সবই অদৃষ্ট! এই সান্ত্বনা বা অসহায়ত্ব নিয়েই চলে তাদের জীবন। এই রাষ্ট্র ও সমাজে এই পিরামিড পদ্ধতি স্থায়ী করবার জন্যই অদৃষ্টের ওপর নির্ভরশীল করে রাখাটাও একটা পরিকল্পিত ব্যবস্থা।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাও যেন তেমনি এক পিরামিড। এর সর্বনিম্ন ধাপ প্রাথমিক বিদ্যালয়। জাতীয় সংসদে ২০১৯ সালের ৪ মার্চ এক প্রশ্নের জবাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী জানান, সারা দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৪৭টি। যার মধ্যে ৬৫ হাজার ৫৯৩টি সরকারি। অন্যদিকে মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা ২১ হাজারের মতো যার মধ্যে ৬৮৫টি সরকারি। মাধ্যমিক পর্যায়ে মাত্র ৬ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী সরকারি স্কুলে পড়াশুনা করে। কলেজের সংখ্যা ২ হাজার ৫০০ এর মতো, যার মধ্যে ৬০৩টি সরকারি। এসব কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ভর্তিযুদ্ধে নামবে ছাত্র-ছাত্রীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন- ইউজিসি’র দেওয়া তথ্য অনুসারে, দেশের ৩৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন আছে ৬ লাখ। ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ৩ হাজার ৬৭৫টি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮ লাখ ৭২ হাজার ৮১৫টি, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬০ হাজার, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৭ হাজার ৭৫৬টি আসন রয়েছে। দেশের দুটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন আছে ৪৪০টি। মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ১০ হাজার ৫০০টি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত সাতটি কলেজে আসন ২৩ হাজার ৩৩০টি, ৪টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ৭ হাজার ২০৬টি, টেক্সটাইল কলেজে ৭২০টি, সরকারি ও বেসরকারি নার্সিং ও মিডওয়াইফরি প্রতিষ্ঠানে আসন ৫ হাজার ৬০০টি। ১৪টি মেরিন অ্যান্ড অ্যারোনটিক্যাল কলেজে ৬৫৪টি, ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩ হাজার ৫০০টি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরও ২৯০টি আসন রয়েছে। ইউজিসির এই তথ্য থেকে এটা স্পষ্ট যে শিক্ষায় এখন প্রধান ধারা বেসরকারি অর্থাৎ টাকা ছাড়া মিলবে না শিক্ষা বা ডিগ্রি।

পিরামিডের মতো বাংলাদেশের শিক্ষা কাঠামোর উচ্চতম ধাপে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে বিবেচিত উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে সদ্য। আনন্দ-উচ্ছ্বাস এবং উৎকণ্ঠা-আতঙ্ক, আশা এবং আশঙ্কা নিয়ে ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের বাবা- মায়েরা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল পেলেন। ভালো ফল হয়েছে বলে যেমন আনন্দ-উচ্ছ্বাস তেমনি ভর্তি হবে কোথায় তা নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দুটোই আছে। তবে পাস করার আনন্দের রেশ কেটে গিয়ে আকাঙ্ক্ষা বা পছন্দের বিষয়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ না পাওয়ার আশঙ্কা ইতিমধ্যেই গ্রাস করছে তাদের।

সাধারণত প্রতি বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে প্রকাশিত হয় উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারীর কারণে গত বছরের মার্চ মাস থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ফলে ২০২০ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়াই সম্ভব হয়নি। অনেক আলোচনার পর জেএসসির ২৫ শতাংশ এবং এসএসসির ৭৫ শতাংশ গড় নম্বর বিবেচনা করে প্রায় ছয় মাস পর গত ৩০ জানুয়ারি শনিবার এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চতর শিক্ষায় সুযোগ পাওয়ার জন্য উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা এবং এতে ভালো ফল খুব গুরুত্বপূর্ণ। ‘করোনা পাস’ হিসেবে প্রচারিত এবারের পরীক্ষা ছাড়াই ২০২০ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার মূল্যায়নে ‘পাস’ ঘোষণা করা হয়েছে সবাইকে। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ৩৭৭ জন। এদের সবাই পাস করেছে, যার মধ্যে ‘জিপিএ-৫’ পেয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৮০৭ জন পরীক্ষার্থী, যা মোট পরীক্ষার্থীর ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। গতবার জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৪৭ হাজার ২৮৬ জন, যা ছিল মোট পরীক্ষার্থীর ৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা গত বছরের থেকে অনেক বেশি এবার প্রায় সাড়ে তিন গুণ।

২০২০ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় শতভাগই যে পাস করানো হবে, তা আগে থেকেই জানতেন পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। তাই ফল প্রকাশের সময় আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কতজন জিপিএ-৫ পেতে যাচ্ছে। ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেল জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট জেএসসি ও মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ না পেয়েও এইচএসসি-তে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৭ হাজার ৪৩ জন। তবে শতভাগ পাস ও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেলেও ৩৯৬ জনকে পাওয়া গেছে, যারা জেএসসি ও এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেলেও এবারের এইচএসসিতে পায়নি। এদের দুঃখের সীমা নেই। আবার অন্যদিকে জেএসসি-জেডিসি এবং এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ না পেলেও ২০১৭ সালের এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৬ হাজার ৯৭৬ জন, ২০১৮ সালে পেয়েছিল চার হাজার ১৫৭ জন এবং ২০১৯ সালে আট হাজার ৫৭০ জন। অনেক বেড়ে এবার ২০২০ সালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৪৩ জন। এ ছাড়া জেএসসি ও এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেলেও এইচএসসিতে আবার অনেকেই তেমন ভালো করতে পারে না। ফলে জিপিএ-৫ পায় না। পরিসংখ্যান বলে ২০১৭ সালের এইচএসসিতে পায়নি ১৭ হাজার ৩৭১ জন, ২০১৮ সালে পায়নি ৫২ হাজার ৬৩২ জন এবং ২০১৯ সালে ৪৫ হাজার ৮৬৫ জন। তবে এবার সেই সংখ্যা অনেক কম, মাত্র ৩৯৬ জন।

২০২০ সালের ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ৩৭৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে অনিয়মিত পরীক্ষার্থী ছিল ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫০১ জন। এর মধ্যে এক বিষয়ে অনুত্তীর্ণ ১ লাখ ৬০ হাজার ৯২৯ জন, দুই বিষয়ে অনুত্তীর্ণ ৫৪ হাজার ২২৪ জন এবং সব বিষয়ে অনুত্তীর্ণ ৫১ হাজার ৩৮৪ জন। এর বাইরে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী ছিল ৩ হাজার ৩৯০ জন। একটা বিষয় খেয়াল করার মতো। মানোন্নয়ন পরীক্ষার্থী ছিল১৬ হাজার ৭২৭ জন, যাদের সবাই এবার ভালো জিপিএ নিয়েই উত্তীর্ণ হয়েছে। উত্তীর্ণ তো হলো এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই সব ছাত্র-ছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষা পাওয়ার কতটুকু সুযোগ বা অধিকার পাবে? উচ্চ মাধ্যমিকের ফল দেখিয়ে দিল ভালো ফলাফল করাও ভর্তি ক্ষেত্রে কতটা সংকটের জন্ম দিতে পারে। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় ২৫ লাখ, জেএসসি পরীক্ষায় ২২ লাখ, এসএসসি পরীক্ষায় ১৮ লাখ আর এইচএসসি পরীক্ষায় ১৩ লাখ ছাত্র-ছাত্রী উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিটি পরীক্ষা যে ছাঁকনির মতো ছেঁকে শিক্ষাঙ্গন থেকে বের করে দিচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের তা প্রমাণিত হয়। এরপর উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে যা হয় সেটাকে শিক্ষা সংকোচনের পদ্ধতি বললে ভুল হয় না।

এই করোনাকালে শিক্ষা এবং ছাত্ররা আঘাত পেয়েছে সবচেয়ে বেশি। করোনার আঘাত লাগেনি কোথায়? ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গে এখন করোনার আঘাতের চিহ্ন। কোনো কোনো আঘাত প্রচণ্ড, কোনোটা মৃদু, কোনোটা সাময়িক আবার কোনো আঘাতের ক্ষত বয়ে বেড়াতে হবে দীর্ঘদিন। এমনকি একটা প্রজন্মকেও এই আঘাতের ফল ভোগ করতে হবে। প্রকাশ্য আঘাত দেখতে এবং বুঝতে পারছেন প্রায় সবাই। মানুষ কাজ হারিয়েছে, যারা কাজ করতেন তাদের আয় কমে গেছে, যে ছাত্ররা টিউশনি করে পড়াশুনার খরচ চালাতেন টিউশনি না থাকায় তাদের যে কী দুর্দশা তা বলে বোঝানো যাবে না। এসব কিছুর সম্মিলিত আঘাত ছাত্রদের শিক্ষাজীবনকে তছনছ করে দিয়েছে। সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থীর জীবন থেকে একটা বছর হারিয়ে গেছে, অনেকের চাকরির বয়স গেছে পেরিয়ে। অল্প কিছু ছাত্র-ছাত্রীর পরীক্ষায় সাফল্যের চূড়ায় থাকা আর বিপুল সংখ্যকের শিক্ষার আঙিনা থেকে ছিটকে পড়া দুটোই তো দেখছি। ছিটকে পড়া এই তরুণ যুবকদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত না হলে কোনো উন্নয়ন স্থায়ী হবে না। বরং স্বপ্নহীন বেপরোয়া তারুণ্য অপচয় ঘটাবে শক্তি ও সম্ভাবনার।

লেখক: সভাপতি, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট ও কলামনিস্ট

 


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 415
    Shares