বুধবার, ডিসেম্বর ২

সর্বাঙ্গের ব্যথা সারবে কোন ওষুধে

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 89
    Shares

রাজেকুজ্জামান রতন ::

ছয় বছরে নয় জন, এটা কোনো নয়-ছয় নয়। ভয়াবহ সত্য। গত ৬ বছরে ৯ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আক্রান্ত হয়েছেন। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর আক্রমণের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া ঘটেছে প্রশাসনসহ সমস্ত ক্ষেত্রে। কিন্তু এটাই তো প্রথম নয় আর এ কথা অনুমান করা অসংগত হবে না যে এটাই শেষ ঘটনাও নয়। ঘটনার কারণ বহাল থাকায় ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটবে। ঘটনাগুলো একইরকম শুধু নয় বরং একটার চাইতে আরেকটা খারাপ! প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললে এই অনুভূতি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। উপজেলা পর্যায়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হলে খবর হয়, মানসিক চাপে থাকলে, নীতিবহির্ভূত কাজ করতে বাধ্য হলে সে খবর প্রকাশিত হয় না কোথাও। আক্রমণ করেন বা চাপ দেন যারা তারা ক্ষমতাবান মানুষ অথবা ক্ষমতার প্রভাব বলয়ের মানুষ। মাঝে মাঝে দুয়েকটা ঘটনা সহ্যসীমার বাইরে চলে গেলে তাতে সবাই নড়েচড়ে উঠে বলতে শুরু করেন, আর সহ্য করা হবে না। আক্রান্ত হওয়ার কারণগুলোও একেবারে সাধারণ ও সবার জানা এবং সেই তালিকা খুব বড় নয়। এর বেশিরভাগই হলো বালুমহাল, জলমহাল, খাসজমি, নদী-খাল-বিল-হাওর, ঘাট, হাট-বাজার ইজারা, অবৈধ পাথর কয়ারি, ইটভাটা চালানো আর পিয়ন দারোয়ানসহ ছোট পদে নিয়োগ কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানপদ অলংকৃত করা নিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তির বিরোধের বহিঃপ্রকাশ। ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালীরা ক্ষেপে গেলে তার প্রতিক্রিয়া শারীরিক আক্রমণের পর্যায় পর্যন্ত চলে যায়। এই উদাহরণ তো কম নয়।

এত ঘটনার খবর ছাপা হচ্ছে যে মাঝে মাঝে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়তে হয়, কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখব। যাদের বয়স ৬০ অতিক্রম করেছে তাদের অনেকেরই ছোটবেলার বায়োস্কোপ দেখার অভিজ্ঞতা আছে। একদিকে আকর্ষণীয় কণ্ঠে ঘটনার বর্ণনা, অন্যদিকে একের পর এক দৃশ্যের পরিবর্তন শিশুকিশোর বয়সীদের শুধু মুগ্ধ করে রাখত তাই নয়, একেবারে আটকে রাখত আঠার মতো। বায়োস্কোপ দেখানো ব্যক্তির কুশলী হাতের ছোঁয়ায় দৃশ্যপটের পরিবর্তনে বিস্ময় যেন শেষ হতো না। সে বিস্ময়ে ছিল কৌতূহল মেশানো আনন্দ আর মানুষটিকে মনে হতো অসীম ক্ষমতাধর এক অতিমানুষ। তার চলে যাওয়া পথে তাকিয়ে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আক্ষেপ হতো, হায়! আর যদি কিছু পয়সা বেশি থাকত তাহলে আরও কিছুক্ষণ এবং আরও অনেক কিছু দেখার আনন্দ পাওয়া যেত। অসংখ্য কিশোরকে অতৃপ্ত রেখে চলে যাওয়া বায়োস্কোপের জাদুকরের জন্য প্রতীক্ষায় থাকার সেই উত্তেজনাময় অপেক্ষার কথা মনে হলে সেদিনের কিশোর যারা আজ সিনিয়র সিটিজেন তারা ভাবেন, আহা! কী সব দিন ছিল সেই সময়ে। আসবে না আর ফিরে সেই সব দিন!

কালের পরিক্রমায় সেদিনের সেই কিশোর আর কিশোর নয়, প্রৌঢ়ত্ব অথবা বার্ধক্যে উপনীত হয়েছে এবং বায়োস্কোপের সে দিনও আর নেই। তবে দৃশ্যপটের ঘন ঘন পরিবর্তনের ব্যাপারটা আছে। বায়োস্কোপে নয়, এখন তা ঘটছে বাস্তবে। কৌতূহলের পরিবর্তে এসেছে আঁতকে ওঠার অনুভূতি এবং আনন্দ রূপ নিয়েছে আতঙ্কে। প্রতিদিন পত্রিকায় যা প্রকাশিত হয় তা পড়লে বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটতে চায় না। সন্দেহ হয় এক অন্যরকম বায়োস্কোপ ফিরে আসছে না তো আবার?

দেশে একদল মানুষের হাতে এত টাকা, এত টাকা যে অবিশ্বাস্য মনে হয়। অনেকেই বলেন, দুই চার কোটি টাকা তো কিছুই নয়। নিয়োগ, মনোনয়ন, বদলি, পদোন্নতি সব কিছুর সঙ্গে এখন বাণিজ্য কথাটা যুক্ত হয়ে গেছে। সেখানে নাকি কোটি টাকা কোনো ব্যাপারই না। টাকার কি ওজন নেই? বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আর্থিক নোট হলো এক হাজার টাকার নোট। এর একশোটির ওজন ১১৫ গ্রাম। তাহলে এক কোটি টাকার ওজন দাঁড়ায় সাড়ে এগারো কেজি। তাহলে যারা কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান অদৃশ্য ক্ষমতা বা জাদুবলে, এই টাকা যদি তাদের বহন করতে হতো কতই না কষ্ট হতো তাদের! অনেকে বলবেন, এখন তো নগদ টাকা নিয়ে ঘুরতে হয় না, চেক এবং অনলাইনে টাকা লেনদেনের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু যারা ঘুষের লেনদেন করেন তারা তো চেকে বা অনলাইনে করেন না। বরং তারা নিজেরা লুটপাট সমিতি করে ব্যাংকগুলোকে খালি করে দিচ্ছেন। আর জনগণ ছিদ্রওয়ালা চৌবাচ্চা ভর্তি করতে অবিরাম ট্যাক্সের টাকা জুগিয়ে যাচ্ছে। শুনছে প্রতি বছর মাথাপিছু আয় বাড়ছে। এমনকি করোনাও থামাতে পারেনি মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি। দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৬৪ ডলার, টাকায় পরিবর্তন করলে যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৭৩ হাজার টাকার বেশি। যে শিশু গতকাল জন্ম নিয়েছে আর আজ যে বৃদ্ধ বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করলেন তারও এই পরিমাণ আয়! গত বছর মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৯০৯ ডলার। মেলে না কিছুই, হিসাব মেলে না। এক গবেষণায় ব্র্যাক দেখিয়েছে, করোনার প্রভাবে সারা দেশে ৯৫ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। এই আয় কমার পরিমাণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ আগে মাসে ১০০ টাকা আয় করলে এখন করছেন ২৪ টাকা। গ্রামের তুলনায় শহরে মানুষের আয় কমেছে বেশি। কিন্তু মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সরকারি হিসাব তো মিথ্যে হতে পারে না। তাহলে বাকি ৫ শতাংশের আয় এত বেড়েছে যে তা সবার ঘাটতি পুষিয়ে তা দেশের আয় বাড়িয়ে দিয়েছে। মাথাপিছু আয় তাই কারও পকেটে আর বেশিরভাগ মানুষের মাথায়।

বাড়ি-গাড়ি-ব্যাংক ব্যালেন্স কথাটা শুনলে এখন যে প্রশ্ন মাথায় আসে, তা হলো এসব কোথায়? দেশে না দেশের বাইরে? সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে টাকা রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ধনীরা এশিয়ার মধ্যে প্রতিযোগিতা করছে প্রথম হওয়ার জন্য। এখনো তৃতীয় অবস্থান তাদের জন্য লজ্জাজনক বৈকি! সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৯’ নামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সেখানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের নামে রয়েছে ৬১ কোটি ৩০ লাখ সুইস ফ্রাঁ। প্রতি ফ্রাঁ সমান ৯০ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৫ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। ভারতের আছে ৮৯ কোটি ফ্রাঁ আর পাকিস্তানের ৩৬ কোটি ফ্রাঁ। কানাডায় বাড়ি তো এখন স্ট্যাটাস সিম্বল। ১ কোটি ৩০ লাখ বাংলাদেশি পৃথিবীর ১৬৭ দেশে পরিশ্রম করে দেশে টাকা পাঠান আর দেশ থেকে একদল মানুষ বিদেশে বাড়ি ও ব্যাংকে বিনিয়োগ করেন। অর্থনীতির নিয়ম না বুঝলে একে সহজেই কপাল বলে মেনে নেওয়া যায়। গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) এর রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬৫১ কোটি ডলারের সমপরিমাণ প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। পদ্মা সেতুর খরচ ৩০ হাজার কোটি টাকা আর মেট্রো রেলের জন্য লাগবে নাকি ২২ হাজার কোটি টাকা। এক বছরে বিদেশে পাচারকৃত টাকা এই দুই প্রকল্পের মোট টাকার সমান! দ্রুত ধনী হওয়ার দিক থেকেও বাংলাদেশ এখন পৃথিবীতে প্রথম। অন্যদিকে শ্রমিকদের মজুরির বিবেচনায় এখনো বাংলাদেশ পৃথিবীতে সর্বনিম্ন কাতারেই আছে।

দুর্নীতি সহ্য করা হবে না, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না এ ধরনের হুঙ্কার শুনে ক্লান্ত মানুষ যদি প্রশ্ন করে আর কতদিন? বাজার অর্থনীতি, মুনাফার সংস্কৃতি আর লাভের মানসিকতা যে সমাজের চালিকাশক্তি সেখানে দুর্নীতি থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রত্যাশা যে বারবার মার খাবে অভিজ্ঞতা সেটাই বলে। সর্বাঙ্গে ব্যথা হলে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে মলম লাগিয়ে যে লাভ হয় না সে কথা কি আবার প্রমাণ করতে হবে?

লেখক : সভাপতি, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট, কেন্দ্রীয় কমিটি ও কলামনিস্ট

[email protected]


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 89
    Shares