সোমবার, মে ১০
শীর্ষ সংবাদ

সর্বত্র কর্তৃত্ববাদী শাসন জন্ম দিয়েছে বেপরোয়া লুটপাট, নৈরাজ্য ও অরাজকতার : হায়দার আকবর খান রনো

এখানে শেয়ার বোতাম

অসুস্থ অবস্থায় কমরেড “হায়দার আকবর খান রনো” সাক্ষাৎকার ::

টানা দুই টার্ম পুরো ক্ষমতায় থাকা কৃতিত্বও তো বটেই। সেই বড়াই সরকারি দল আওয়ামী করছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির যে নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছিল, সেটি ছিল ভোটারবিহীন নির্বাচন। অর্ধেকের বেশি আসনে নির্বাচনই হয়নি। বাদবাকি আসনে নামকাওয়াস্তে যে নির্বাচন হয়েছে, সেখানেও ভোটারের উপস্থিতি ছিল নিতান্তই কম এবং সত্যিকারের কোনো বিরোধী দল না থাকায় সরকারদলীয় প্রার্থীরা খুব সহজে নির্বাচিত বলে বিবেচিত হয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে সরকারি জোটের বাইরে কেউই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। আওয়ামী লীগের মূল প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপির মতো চরম দক্ষিণপন্থি দলও যেমন করেনি তেমনি ছোট ছোট মধ্যপন্থি বুর্জোয়া দলগুলোও করেনি, তেমনি করেনি সিপিবিসহ বামপন্থি দলগুলো।

এরপর গত চার বছরে উপজেলা নির্বাচন, ঢাকা-চট্টগ্রামের কর্পোরেশন নির্বাচন, পৌরসভা নির্বাচন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন যে কয়টি নির্বাচন হয়েছে, তার কোনোটিকেই নির্বাচন বলা চলে না। ভোটকেন্দ্র দখল, পুলিশ ও প্রিজাডিং অফিসারকে দিয়ে সিল মারা, আগের রাত্রে সিল মারা, ভোট গণনার সময় রেজাল্ট শিট পালটে দেয়া–এই সবই ছল সাধারণ চিত্র। এই ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন। বিএনপি আমলে মাগুরার উপনির্বাচনে কারচুপি হয়েছিল এই অভিযোগে সেদিন আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি উত্থাপন করেছিল। পরবর্তীতে টাঙ্গাইল জেলার কাদের সিদ্দিকির আসনেও তৎকালীন শাসকদল আওয়ামী লীগ বেপরোয়া কারচুপি করেছিল। কিন্তু অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে জনাব রকিবউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। বস্তুতঃ নিরপেক্ষ সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন আর হয়নি ১৪ দলীয় সরকারের আমলে।

অসুস্থ অবস্থায় কমরেড “হায়দার আকবর খান রনো” সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন একতা টিভি’কে

৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ বলেছে, গণতন্ত্রের বিজয় দিবস। এটা কি ঠাট্টা মসকরা না অন্য কিছু তা ভাবনার বিষয়। বলা উচিত ছিল ‘গণতন্ত্রের বিদায় দিবস’। বিএনপিও তেমন একটা কিছু বলেছিল। প্রতিবাদ জানানোর জন্য তারা এই বৎসরও সভা করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। কারণ পুলিশ প্রশাসন অনুমতি দেয় নি। বিএনপি এখন খুব কোণঠাসা অবস্থায় আছে। তার জন্য দলটি নিজেও কম দায়ী নয়। ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে ঠেকানোর জন্য তারা জামায়াতে ইসলামীর সহায়তার সহিংসতার পথ নিয়েছিল। তাতে লাভ হয়নি।

পরের বৎসর একই দিবসকে কেন্দ্র করে একদিকে বিএনপি যেমন বোমাবাজী করে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল, অপরদিকে খালেদা জিয়াকে ঘরের মধ্যে আটকে রেখে, গেটের সামনে বালুর ট্রাক রেখে (জনেক মন্ত্রীর কথানুযায়ী ট্রাক নাকি অফিস বিল্ডিং মেরামতের জন্য আনা হয়েছিল, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে, বাইরে থেকে খাবার আনতে বাধা দিয়ে সরকার এমন নজির সৃষ্টি করেছিল, যাকে আর যাই হোক গণতান্ত্রিক আচরণ বলা চলে না।


এদিকে জামায়াতের নেতাদের যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছিল। বিচারের সুষ্ঠুতা নিয়ে বিএনপি ইনিয়ে বিনিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। জামায়াত ও সহিংস পথে বিচার বন্ধের অপচেষ্টা চালিয়েছিল। জামায়াতের সাথে জোট বাধা অবস্থায় থাকার কারণে এবং বোমাবাজীর পথে যাওয়ার কারণে বিএনপিও সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পায়নি। এই অবস্থায় ক্ষমতাসীনরা আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছিল।

কর্তৃত্ববাদী শাসন ও গণতন্ত্রহীনতা জন্ম দিয়েছে বেপরোয়া লুটপাট, নৈরাজ্য ও অরাজকতার। এর সাম্প্রতিকতম দৃষ্টান্ত হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনরত সাধারণ ছাত্র ও ছাত্র ইউনিয়নসহ কয়েকটি বাম ছাত্র সংগঠনের নেতাদের উপর ছাত্রলীগের বর্বর হামলা। শোনা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নাকি সাহায্যের জন্য ছাত্রলীগকে ডেকেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি তেমন কোনো ঘটনা ঘটেই থাকে, তার জন্য পুলিশী ব্যবস্থা নিতে পারতেন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যখন পুলিশ ডাকার বদলে ছাত্রলীগকে দিয়ে পুলিশী কাজ করতে চায়, তখন বোঝা যায়, দেশের সাধারণ চিত্রটি কেমন। কোনো নিয়মনীতির বালাই নেই। অরাজকতা একেই বলে।

শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য এই আমলে ধারাবাহিকভাবে চলেই আসছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস একটা নিয়মিত ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ও কলেজ হোস্টেলে সিট প্রাপ্তি নির্ভর করে ছাত্রলীগের দয়ার উপর, অবশ্য শর্ত থাকে, ছাত্রলীগের মিছিলে যেতে হবে। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্রী আফসানা আহমেদ ছাত্রলীগের মিছিলে যোগ দিতে অস্বীকার করলে ছাত্রলীগ তাকে হল থেকে বের করে দেয় এবং তিনি সারা রাত শীতের মধ্যে ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রক্টর ও হলের প্রাধ্যাক্ষকে জানানো হলেও তারা কিছুই করেননি। হয় তারা ছাত্রলীগের দাপটের সামনে অসহায় ছিলেন অথবা নিজেরাই সরকার দলীয় রাজনীতির সঙ্গে থেকে রাজনৈতিক আচরণ করছেন।

নৈরাজ্য এখন সর্বক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। ছাত্রলীগ, যুবলীগের অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণেও খুন খারাবির খবর আসছে প্রায়শ। ছাত্রলীগের কারণে মায়ের পেটেই শিশুও গুলিবিদ্ধ হয়েছে এই আমলে।
গত ২৬ জানুয়ারি প্রথম আলোর লিড সংবাদের শিরোনাম ছিল এইরূপ “আবু বকরকে কেউ খুন করেনি।” ২০১০ সালে পহেলা ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর স্যার এফ রহমান হলের সিট দখল নিয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় আহত হয়ে পরদিন মারা যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু বকর সিদ্দিক। এই মামলায় ছাত্রলীগের যে ১০ জনকে আসামী করা হয়েছিল নিম্ন আদালতের রায়ে সকলেই

বেকসুর খালাস পান। মামলা পরিচালনা করছিলেন সরকার পক্ষের কৌশলি। আট মাস আগে রায় প্রকাশ হলেও তা আবু বকরের বাবা-মা এবং বাদীপক্ষকে জানানো হয়নি এবং ইতোমধ্যে উচ্চ আদালতে আপিল করার সময় পার হয়ে গেছে। সরকারি কৌশলী সম্ভবত ছাত্রলীগের নেতাদের রক্ষা করার জন্য সেই উদ্যোগ নেননি এবং নিহতের আত্মীয়দেরও অন্ধকারে রেখেছেন। কর্তৃত্ববাদী শাসনকালে বিচার পাওয়ার সুযোগও কম। কত হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের বিচার হয়নি, তার তালিকা বেশ বড়।

শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা, পুলিশী ব্যবস্থা, প্রশাসন সর্বত্রই চলছে কর্তৃত্ববাদী শাসনের থাবা এবং নৈরাজ্য। আইনের শাসন না থাকলে নৈরাজ্য তো দেখা দেবেই। এই নৈরাজ্য ব্যাংকিং খাতেও প্রসারিত। সিপিডির পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ‘গেল বছরটি ছিল ব্যাংক কেলেঙ্কারীর’। এই সত্য ভাষণে অবশ্য সরকারের কর্মকর্তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সেটি অস্বাভাবিকও নয়। কারণ দুই হাজার কোটি টাকা সোনালি ব্যাংক থেকে লুটপাট হয়ে গেলে অর্থমন্ত্রী ওটাকে সামান্য টাকা বলে মন্তব্য করেছিলেন। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নৈরাজ্য, লুটপাট ও পরিবারতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা গোটা অর্থব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য।

এই শাসনামলে আমরা দেখেছি, চালসহ সকল খাদ্যদ্রব্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য দ্রব্যের দাম ক্রমাগতই বৃদ্ধি পাচ্ছে। চালের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে গরিব মানুষ তো বটেই, এমনকি মধ্যবিত্তও দারুণ সংকটের মধ্যে পড়েছে। অথচ গত কয়েক বছরের খবর হল খোদ কৃষক ধানের দাম পায়নি। লাভ করেছে মধ্যস্বত্বভোগীর দল, কৃষকও নয়, ক্রেতা সাধারণও নয়। সরকারি কাজকর্মে টেন্ডারবাজদের দাপট ও ব্যবসায়ের প্রতিটা ক্ষেত্রে সরকারি দলের ছোট বড় নেতাদের জন্য দেয় মাশুল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও যে নৈরাজ্যের পরিস্থিতি তৈরি করবে, তা সহজেই বোঝা যায়।

অথচ শোনা যাচ্ছে বিরাট উন্নয়ন হচ্ছে। আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হতে চলেছি। কথাটা আংশিক সত্য। আমাদের জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে তিনটি জায়গা থেকে– বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিটেন্স, গার্মেন্টসের শ্রমিকদের দেয়া শ্রম এবং কৃষকের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও শ্রম। কিন্তু যারা দেশের জিডিপিতে অবদান রাখছেন, তারা থাকছেন বঞ্চিত। গণতন্ত্রহীনতা, নৈরাজ্য ও স্বল্পসংখ্যক সুবিধাভোগীর অনাচার ও লুটপাটের কারণে উন্নয়নের সুফল চুইয়ে চুইয়েও নিচে পড়ছে না। সিপিডির প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে, তা খোলা চোখেই দেখা যাচ্ছে– “ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, দরিদ্ররা আরও দরিদ্র।”


এখানে শেয়ার বোতাম