সোমবার ‚ ২২শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ ‚ ৬ই জুলাই, ২০২০ ইং ‚ দুপুর ২:১৯

Home মতামত সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা জীবন-জীবিকাকে হুমকিগ্রস্ত করেছে

সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা জীবন-জীবিকাকে হুমকিগ্রস্ত করেছে

মোহাম্মদ শাহ আলম ::

দেশে প্রথম করোনা রোগী ধরা পড়েছিলো ৮ মার্চ ২০২০। এর মধ্যে সরকার ২০২০-২১ এর বাজেটও গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে পেশ করেছে। তার গতি, প্রকৃতি, চরিত্র সম্পর্কে আমরা ও দেশের সচেতন সমাজ ওয়াকিবহাল। দেশে করোনা মহামারীর ভয়াবহ সংক্রমণ চলছে। করোনা মহামারী আমাদের সমাজ, অর্থনীতি, উৎপাদন, জীবন-জীবিকায় কি প্রভাব ফেলেছে তার দিকে দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন বলে মনে হয়। করোনা মহামারী এমন একটি সর্বগ্রাসী রোগ যা প্রতিটি ব্যক্তি-মানুষ, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, উৎপাদন কর্মকাণ্ড স্তব্ধ করে দিয়েছে। গোটা পৃথিবী এর আগে একসাথে এরকম মহাসংকটে আর কোনদিন পড়েনি। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের অবস্থা আরো নাজুক এবং শোচনীয়।

করোনা মহামারী আমাদের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ব্যবস্থা, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্র চরিত্রকে উন্মোচিত করে দিয়েছে। সরকার তিন মাসের জন্যও আমাদের জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা দিতে পারেনি, করোনা মহামারীকে প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, ফলে আমাদের দেশের জনগণের জীবন-জীবিকা দুটোই মহাসংকটে পড়েছে। কোটি কোটি লোক জীবন-জীবিকা নিয়ে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এখনো বন্ধ। যারা টিউশনি করে চলতো, তাদের টিউশনিও হাতছাড়া হয়ে গেছে। সেলুনের কর্মচারীরা বেকার, বড়বড় মার্কেট, দোকানদার, ফুল ব্যবসায়ী, দুগ্ধ খামার, পোল্ট্রি ফার্ম, হ্যাচারি, বিভিন্ন রকমের সেবাখাত যেমন: হোটেল, পর্যটন, বিভিন্ন ছোট বড় কলকারখানা, বিভিন্ন ইনফরমাল সেক্টর, স্বনিয়োজিত কর্ম এইগুলো প্রায় অচল। পরিবহন সেক্টরও সম্পূর্ণ চালু হয়নি। এর মূল ও প্রধানতম কারণ কী? নিশ্চয় করোনা মহামারী প্রতিরোধ, বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা। রোগের বিস্তারের ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনাতো দূরের কথা, আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি মানুষ, ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, ব্যাংকার, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, পরিচ্ছন্ন কর্মীসহ বহু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ও তাদের জীবন যাচ্ছে। ফলে খরচ বাড়ছে, প্রচুর অর্থের অপচয় হচ্ছে। পরীক্ষার স্বল্পতা, রোগ নির্ণয়ে অপারগতা, কিট, মাস্ক এবং স্যাম্পল নিয়ে ব্যবসা, মানুষের সাথে ব্ল্যাক মেইলিং বৃদ্ধি, ঔষধের দাম বৃদ্ধি ও মজুদ। এর জন্য দায়ী কে এবং কি? এই যে অবস্থা সরকার কি মনে করেছিল এই রোগ এমনিতে দু’একমাসের মধ্যে চলে যাবে অথবা স্তিমিত হয়ে পড়বে, কিন্তু স্তিমিত হয়নি বরং দিনদিন বাড়ছে, মানুষ মরছে। মানুষের জীবনের মূল্য কে দেবে? মানুষের জীবনের মূল্য কি নেই? উৎপাদন ও অর্থনীতির যে ক্ষতি হচ্ছে তার জবাব দেবে কে? যে কাজটি কম ক্ষতি এবং অল্প সময়ের মধ্যে সারা যেতো তা করা হলো না কেন? যেই করোনা মহামারী উৎপাদনসহ সবকিছুকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে তাকে প্রথমেই কি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত ছিলো না। জীবন ও জীবিকা স্বাভাবিক করার জন্য এটাই তো ছিলো key point। যা চীন, ভিয়েতনাম, কেরালা করেছে। এই পথ অনুসরণ করলে সর্বগ্রাসী করোনা অবরোধকে break through করা যেতো। কিন্তু Herd Immunityর পরামর্শ দিলো কে?

এটার উপর ভর করে সরকার তার পরিকল্পনায় শৈথল্যে চলে গেল কেন? কেন রোগের বিস্তার ঘটিয়ে রোগ প্রতিরোধ ও সংক্রমণকে দীর্ঘায়িত করা হলো? কেন এখন বলা হচ্ছে, আমরা মানুষকে না খেয়ে মরতে দিতে পারি না। প্রথমদিকে গুরুত্ব দিয়ে কঠোর ও নির্মোহ লকডাউন কি করা যেতো না? আমরা কি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো যতদূর আছে তাকে সমন্বয় এবং রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা, আক্রান্ত ও মৃত্যুহার কমিয়ে জীবন রক্ষা করে, মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি দূর করে, জীবন-জীবিকা ও স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে ফিরে আসতে পারতাম না? কার জন্য ভোগান্তি? কার পরামর্শ এবং নীতি কৌশলের জন্য এই ভোগান্তি বাড়লো? তা কি দেশ, জনগণ ও জাতি জানতে চাইতে পারে না? সংবাদপত্র, প্রেস, চ্যানেলগুলোকে ভয়ভীতি চাপ প্রয়োগ, ডিজিটাল আইনের ভয় দেখিয়ে আসল সত্যকে কি লুকানো যাবে?

রোগের আরো বিস্তার হলে বহির্বিশ্ব কি আমাদেরকে লকডাউন করে কি দেবে না? আমরা কি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বো না? শোনা যায়, জাপান ইতিমধ্যে আমাদেরকে লকডাউন করেছে। এরকম অসংখ্য প্রশ্ন মানুষের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

করোনা পরীক্ষার সিন্ডিকেট গড়ে উঠার সুযোগ সৃষ্টি হলো কেন? রোগ প্রতিরোধ, নির্ণয় ও চিকিৎসার বিকেন্দ্রিকিত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারলে সিন্ডিকেট ভাঙ্গা যাবে কি? জনগণের ভোগান্তি কমবে কি? এটা না করলে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যন্ত যে ব্যবসার দৌরাত্ম্য আছে তা কি বন্ধ করা যাবে?

আমরা মনে করি করোনা মহামারী প্রতিরোধ চিকিৎসায় যে বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য দায়ী সমন্বয়হীনতা, অস্বাভাবিক দুর্নীতি, করোনা মহামারীর বিপদ ও গভীরতার গুরুত্ব না বোঝা, গুরুত্ব না দেয়া, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ না শোনা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো যা ছিল তাকে ভঙ্গুর অবস্থায় রাখা, প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের মৌতাতে মেতে থাকা। এই সমস্ত কারণে মানুষের জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। চীন থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দলকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তারা বলেন, রোগের হার এবং বিস্তার ও ঊর্ধোগতি কখন হবে তা বলা কঠিন, কারণ এখানকার ব্যবস্থাপনা অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ছে, তাদের হাতে কোনো প্রকৃত তথ্য উপাত্ত নেই। এই ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জাতীয় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মহল থেকে দাবি করা হয়েছিল, কিন্তু সরকার সে আহ্বানে সাড়া দেয়নি, আমলা এবং প্রশাসন নির্ভরতায় তার কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকে। তাই আজ জনগণ বিচ্ছিন্ন এই উদ্যোগ নিয়ন্ত্রণহীন বেসামাল অবস্থায় পড়েছে।

সরকার করোনা মহামারীর চলমান সমস্যার সমাধান করে আধুনিক-সুলভ স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলার দিকে গেলো না, তার প্রতিফলন আমরা সাম্প্রতিক বাজেটেও দেখলাম। সরকার প্রবৃদ্ধির ঘেরাটোপে আটকে থাকলো, উন্নয়নের মৌতাতে মজে থাকলো। অর্থমন্ত্রী বাজেট দিয়েছেন পাঁচ লক্ষ আটষট্টি হাজার কোটি টাকার, আয় দেখিয়েছেন তিন লক্ষ আটাত্তর হাজার কোটি, ঘাটতি এক লক্ষ নব্বই হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি বাজেটের টাকা কোথা থেকে আসবে অর্থমন্ত্রীকে এই প্রশ্ন করলে মন্ত্রী বলেন, আগে খরচ করি, কোথা থেকে আসবে পরে দেখা যাবে। নিশ্চয় সরকারের পরিসেবার মূল্যবৃদ্ধি করে জনগণের পকেট থেকে এই টাকা তুলে নেবে। এমনিতে জনগণের উপর পরোক্ষ করের বোঝায়, জনগণের প্রকৃত আয় কমে গিয়েছে, প্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধি না করে ঋণখেলাপি, ব্যাংক লুটেরাদের সুবিধা বৃদ্ধি, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে বাজেটে। এর থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় সরকার কার? জনগণের না লুটেরাদের।

এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি বেসরকারি হাসপাতালগুলো চিকিৎসার নামে মানুষের পকেট থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। করোনা মহামারীর এই সময়ে স্বাস্থ্যখাতের লুটপাট ও সিন্ডিকেশনের তথ্য, উপাত্ত ও চিত্র আমরা পত্র-পত্রিকা ও চ্যানেলগুলোর নিউজে দেখছি। কোথায় নাই সিন্ডিকেট, সরকারের প্রত্যেক মন্ত্রণালয়কে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য সিন্ডিকেট। লুটেরা এবং সিন্ডিকেটরা দেশের মালিক, তারাই সরকার এবং তারাই সরকার চালায়। এই বিষয়টা হিসেবে না নিয়ে দেশের বিদ্যমান অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে হালকা ভাবনা শুধু হা-হুতাশই বাড়াবে।

যে কথা বলছিলাম, সরকার করোনার এই সুযোগে আধুনিক-সুলভ, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলার দিকে যেতে পারতো কিন্তু গেলো না। স্বাস্থ্যখাতে যতই বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা বলা হোক না কেন, মূল বরাদ্দ হলো ২৬ হাজার সাতশত ছাপান্ন কোটি টাকা। আমাদের জানা আছে, সামরিক খাতে স্বাস্থ্যবাজেট এই বাজেটের অন্তর্ভুক্ত, এখান থেকেই কর্তন করা হবে। প্রকৃত চিত্র হলো চলতি অর্থ বছর থেকে আগামী অর্থ বছরের বরাদ্দ বাড়ছে মাত্র এক হাজার বাইশ কোটি টাকা। জনগণ আশা করেছিলো এইবার স্বাস্থ্যখাতে কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তনের দিক নির্দেশনা এই বাজেটে একেবারেই নেই। এটা দিয়ে আমাদের দেশের রাজনৈতিক -অর্থনীতির চরিত্র বৈশিষ্ট্য পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রচলিত রাজনৈতিক -অর্থনীতি কোন শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করছে তাও বোঝা যায়। সরকারের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে?

তাই জনগণকে সাথে নিয়ে স্বাস্থ্য-চিকিৎসা, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি-শিল্প, কর্মসংস্থানের মৌলিক কর্মসূচি নিয়ে তৃণমূল থেকে গড়ে তুলতে হবে লড়াই, করতে হবে অবস্থা ও ব্যবস্থার বদল, গড়ে তুলতে হবে সমাজ ও রাজনীতিতে বিকল্প শক্তি সমাবেশ। আর এর জন্য চাই জান বাজী লড়াই।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ

স্কুল-কলেজে পরীক্ষা ছাড়াই পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণের ঘোষণা আসতে পারে

অধিকার ডেস্ক:: করোনায় স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় সাময়িক পরীক্ষা ছাড়াই পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু কলেজে একাদশ শ্রেণির পরীক্ষা...

রাশিয়াকে টপকে করোনা সংক্রমণে শীর্ষ তিনে ভারত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: ভারতে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন লাফিয়ে বাড়ছে। এবার আক্রান্তের দিক থেকে রাশিয়াকে পেছনে ফেলে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে ভারত।

সিলেটে করেনায় আক্রান্ত হয়ে নার্সের মৃত্যু

সিলেট প্রতিনিধি:: সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে করোনা ইউনিটে কর্মরত সিনিয়র স্টাফ নার্স নাসিমা ভারভীন করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আজ সোমবার সকাল...

চট্টগ্রামে করোনা রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়াল

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ::চট্টগ্রাম জেলায় করোনাভাইরাস শনাক্তের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ২৯২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে...
Shares