মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৯

সরকারের সময়োচিত সাহসী চিন্তার ফসল বাজেট : কাদের

এখানে শেয়ার বোতাম

অধিকার ডেস্ক:: প্রস্তাবিত বাজেটকে জীবন-জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে দেশকে এগিয়ে নিতে শেখ হাসিনা সরকারের সময়োচিত সাহসী চিন্তার ফসল বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

শুক্রবার আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমন্ডি রাজনৈতিক কার্যালয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট নিয়ে আওয়ামী লীগ এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

এ সময় শারীরিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে আরও উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, আ. ফ. ম বাহাউদ্দিন নাছিম, প্রচার সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, উপ-দফতর সম্পাদক সায়েম খান।

ওবায়দুল কাদের বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে কয়েক মাস ধরে বিপর্যয়ের পরও আমাদের বাজেটের আকার কমেনি বরং বেড়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ১১ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির ধারাবাহিক অগ্রগতির সুফল এই বাজেট। করোনা মোকাবিলার পাশাপাশি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা, মানুষ যেন কষ্ট না পায় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই সব প্রতিকূলতাকে জয় করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হয়।

তিনি বলেন, এবারের বাজেট ভিন্ন বাস্তবতায়, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রণীত। এ বাজেট করোনার বিদ্যমান সংকটকে সম্ভাবনায় রূপ দেওয়ার বাস্তবসম্মত প্রত্যাশার দলিল। করোনাভাইরাসে সৃষ্ট সংকটময় পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে; সংকটকালীন ও সংকট পরবর্তী সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার গতিপথ নির্ণয়ের লক্ষ্যকে সামনে রেখেই প্রণিত হয়েছে এবারের বাজেট। যা জীবন-জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে দেশকে এগিয়ে নিতে শেখ হাসিনা সরকারের সময়োচিত সাহসী চিন্তার ফসল। গতানুগতিক ধারার সাথে ‘আউট অব বক্স’ চিন্তার সমন্বয় করে সংকট জয়ের নবউদ্যোম সৃষ্টিতে এই বাজেট পেশ করা হয়েছে।

কাদের বলেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে করোনাভাইরাসের প্রকোপে বিদ্যমান সংকটময় পরিস্থিতিতে ‘অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ পথ পরিক্রমা’ শীর্ষক যুগোপযোগী ও জনকল্যাণমুখী বাজেট প্রণয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এমপি, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল এমপিসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জ্ঞাপন করছি।প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে করোনা প্রার্দুভাবের পর ইতোমধ্যে যে অর্থনৈতিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন তাকে একটি অন্তবর্তীকালীন বাজেট বলা যেতে পারে।

তিনি বলেন, এই বাজেট প্রণয়নে দু’টি অনিশ্চয়তা ছিল, যা জয় করা ছিল দুরূহ। অনিশ্চয়তা দু’টি হচ্ছে- বাংলাদেশে করোনা মহামারি চূড়ান্ত পর্যায়ে কী হবে, সে সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো স্বচ্ছ ধারণা না থাকা এবং করোনা-উত্তর বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি কী হবে, তা সুনির্দিষ্ট করে এখনই বলতে না পারা। এই অনিশ্চয়তা জয় করে দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে দুর্যোগ মোকাবিলার একমাত্র ত্রাণকর্তা সাহসী নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত সফলভাবে বাজেট প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করেছেন।

তিনি আরও বলেন, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন- করোনা মোকাবিলার পাশাপাশি খাদ্যের অভাবে যেন মানুষকে মরতে না হয়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বলেছেন- ‘করোনা মোকাবিলা করতে গিয়ে অর্থনীতির বিষয়টি এড়িয়ে গেলে তার মাশুল গুনতে হবে, না হলে তার পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর। অর্থনীতির বিষয়টি সকলকে মাথায় রাখতে হবে। সেই কথা মাথায় রেখেই সরকার ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছে।

তিনি বলেন, গত অর্থবছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ইপ্সিত লক্ষ্যমাত্রাটি ছিল শতকরা ৮.২ ভাগ থেকে ৮.৩ ভাগ। কোভিড পরবর্তী উত্তরণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবারের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে- ৮.২ শতাংশ। অনেকে এটাকে উচ্চাভিলাষী মনে করতে পারেন। তবে, আওয়ামী লীগের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেশি। এই প্রত্যাশা পূরণে যত ঝুঁকি নিতে হয় জননেত্রী শেখ হাসিনা তা নেবেন। গত এপ্রিলে করোনা মহামারি সৃষ্টির আগের ৮ মাসের হিসাব ধরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৯.৫ শতাংশ হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল। করোনা মহামারির সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে ২০২০ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতি ৩.০ শতাংশ সংকুচিত হবে এবং বিশ্বব্যাংক দক্ষিণ এশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.৮ থেকে ২.৮ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। এমতাবস্থায়, অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে আগের উন্নয়নের ধারাবাহিকতার কাঙ্ক্ষিত ভীত রচনাই এবারের বাজেটের লক্ষ্য।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, করোনার কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাজস্ব আয় হ্রাস পেয়েছে। ফলে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে গত অর্থবছরে ধার্যকৃত লক্ষ্যমাত্রা ৩ লক্ষ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা থেকে ২৯ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা হ্রাস করে ৩ লক্ষ ৪৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়, আমাদের জাতীয় আয়-ব্যয় নির্দিষ্ট থাকবে কী না। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এটা পরিবর্তন হতে পারে। সে কারণে এটিকে একটি ফ্লেক্সিবল ডকুমেন্ট হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছর অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রথম বছর। সুতরাং এই বাজেটে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অধিকতর গুরুত্ব পাবে।এবারের বাজেটে শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে স্বাস্থ্যখাতকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে এ খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ, প্রণোদনা ও ক্ষতিপূরণ ইত্যাদির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে মোট বরাদ্দ ৪১ হাজার ২৭ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। যা জিডিপি’র ১.৩ শতাংশ এবং মোট বাজেটের ৭.২ শতাংশ। গত অর্থবছরের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের হার বৃদ্ধি পেয়েছে ২৩.০৪। পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে ১৩ হাজার ৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। করোনা মোকাবিলায় বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বপালনকারী কর্মকর্তাদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ সম্মুখযোদ্ধাদের সম্মানীবাবদ ৮৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এবারের বাজেটে কোভিড-১৯ মোকাবেলায় যে কোন জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। করোনা প্রভাব বেড়ে গেলে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতাল নির্মাণসহ আইসিইউ, ভেন্টিলেশন সাপোর্ট, কেয়ার সরঞ্জাম, করোনাভাইরাস পরীক্ষার কীটসহ নানা যন্ত্রপাতি আমদানি এবং উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূসক অব্যাহতি প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

ওবায়দুল কাদের বলেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানা ধরনের গবেষণা চলছে। ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হলে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে আনার পরিকল্পনাও বাজেট প্রস্তাবনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আমরা তৃণমূল পর্যায়ে সেবার পরিধি বৃদ্ধি করেছি। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসাপ্রাপ্তির সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা হবে। পাশাপাশি টেলিমেডিসিন সেবাকে আরও গতিশীল করা হবে।

তিনি বলেন, দীর্ঘ সাধারণ ছুটি ও লকডাউন জনিত কারণে সৃষ্ট দরিদ্র্য কর্মজীবী মানুষের কষ্ট লাঘবে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা সম্প্রসারণ করে এই খাতকে তৃতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সব দিক বিবেচনায় নিয়ে করোনার কবল থেকে ‘অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের’ এক ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট হচ্ছে এবারের বাজেট। এটি একটি জনবান্ধব ও জীবনঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। যার মাধ্যমে দেশের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উৎসাহ পাবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, এডিবি’র সাময়িকীর হিসাবে আশঙ্কা করা হয়েছে- করোনা পরিস্থিতির কারণে ১৪ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাতে পারে। ফলে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকার বাজেটে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর মাধ্যমে মোট ২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সরকার এ লক্ষ্যে ৫০০ কোটি টাকা মূলধন প্রদান করবে। আশাব্যাঞ্জক বিষয় হলো- কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতার সামঞ্জস্য রাখা এবং ভবিষ্যত অর্থনৈতিক গতিশীলতা ধরে রাখতে মেগাপ্রকল্পসমূহ চলমান রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহেও ২০.২৫ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।করোনা সংকটের মধ্যেও সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। বাজেটে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ বাস্তবায়ন এবং ‘সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা’ কাজে লাগানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মেগাপ্রকল্পসহ এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিশীলতা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে।করোনায় সৃষ্ট সংকট বিবেচনায় ব্যক্তিশ্রেণি ও কর্পোরেট লেভেলে করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে এ বাজেটে।


এখানে শেয়ার বোতাম