শুক্রবার, জানুয়ারি ২২

শিল্পের বেসরকারিকরণ ই কি সমাধান?

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 403
    Shares

রাশিব রহমান ::

২৫টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাটকল বন্ধ হয়ে গেল। অনির্দিষ্টকাল পর যখন খুলবে (যদি খোলে) তখন এটি আর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন থাকবেনা। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে চলবে। অর্থাৎ এতদিনের জনগণের মালিকানাধীন কারখানাতে জনগণের অংশীদারিত্ব কমবে। ধারাক্রম বজায় রাখতে পারলে একদিন জনগণের অংশীদারিত্ব শূণ্যে পৌঁছে দেয়া যাবে। মালিকানা জনগণের হলেও মালিকানা ভোগ করার ‘সাংবিধানিক অধিকার’ সরকারের। সরকার কেন এ পবিত্র অধিকার সত্ব ত্যাগ করতে উদ্যত? কর্তারা বলছেন এটা লোকসানি খাত। বেসরকারি কারখানাগুলো লাভ করছে কিন্তু রাষ্ট্রীয় মালিকানারগুলো লোকসান করছে। তাই কারখানা বেসরকারি খাতে দিলে তা আবার জাদুকাঠির ছোঁয়ায় লাভ প্রসব করবে। কথা সত্য। এবং এ সত্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অপরাপর শিল্পের ক্ষেত্রেও কম-বেশি প্রযোজ্য। শুধু শিল্প কেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের মত বনেদি সেবাখাতেরও একই পরিণতি হতে যাচ্ছে শোনা যায়। সমাধানের উপায় হিসেবে বেসরকারিকরণের সমর্থক নিতান্ত কম নয়। বিভিন্ন সময়ের সরকারি প্রেসনোট, আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়া পুঁজিপতি, নয়া উদারনীতিবাদের ফেরিওয়ালা বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ, কমিশনখোর বুদ্ধিজীবি, ‘স্বাধীন’
গণমাধ্যম রাতদিন আমাদের যা বোঝাচ্ছেন, তা না বুঝে আমাদের আর উপায় কী?

এবার একটু কাণ্ডজ্ঞান কাজে লাগানো যাক। ধরুন আপনার ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসায় কয়েক মরসুম লোকসান গুনছেন। সমস্যাটি সমাধানে আপনি কোন পথ অবলম্বন করবেন? লোকসানের কারণ অনুসন্ধান করে তা দূর করায় ভূমিকা রাখবেন নাকি কোন মাসতুতো ভাইকে ডেকে ব্যবসায়ের মালিকানা বুঝিয়ে দিবেন? স্বাভাবিক মস্তিষ্কসম্পন্ন যেকোন মানুষ নিশ্চয় প্রথম অপশনটিই বেছে নিবেন।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিক জনগণের সামনে লোকসানের প্রকৃত কারণ সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ না করে এবং সে কারণ দূরীকরণে গৃহীত উদ্যোগ ও তার ফলাফল সবিস্তারে উপস্থাপনকে পাশ কাটিয়ে নেয়া যেকোন সিদ্ধান্ত নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারেনা। বিভিন্ন সময়েপ্রচারিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কারখানাগুলোর লোকসানের কারণগুলোকে যুক্তির নিরিখে যাচাই করার চেষ্টা করা যাক।

প্রথমে আসা যাক ‘সানসেট ইন্ডাস্ট্রি’ তত্ত্ব। আদমজীর মত বিশাল পাটকল বন্ধ করার সময় যুক্তি করা হল পাটশিল্পের সূর‌্য নাকি অস্তগামী। তৎকালের বিশেষজ্ঞমত বা পরবর্তীকলের অভিজ্ঞতা কোনটিই এমতকে সমর্থন করেনা। শিল্প যদি অস্তগামীই হবে তবে দ্রুততম সময়ে প্রায় পৌনে তিনশ’ সবেসরকারি পাটকল গড়ে উঠতে পারত না। প্রতিবেশিদেশ ভারতেও পাটকল বাড়ছে। পরিবেশবান্ধব মোড়ক, পোশাক, আসবাবপত্র এবং সৌখিন বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে দুনিয়াজুড়ে পাটের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

রাষ্ট্রীয় কারখানায় শ্রমিকের মজুরি বেশি (বেসরকারি’র তুলনায়), তাই এটি অলাভজনক – এমন দাবিও করা হয়। অথচ স্কপনেতা, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন জানাচ্ছেন, “৪০/৫০ বছরের পুরোনো যন্ত্রপাতির বদলে আধুনিক মেশিন স্থাপন করলে খরচ হত ১২০০কোটি টাকা। উৎপাদন বৃদ্ধি পেত তিনগুণ, শ্রমিক ছাঁটাই তো করতে হতই না বরং ২৫হাজার টাকা মজুরি দিয়েও কারখানা লাভজনক করা যেত। সেই টাকা বরাদ্দ হলনা কিন্তু ৫হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলো কারখানা বন্ধ করার জন্য।” [দৈনিক দেশ রূপান্তর, ১জুলাই, ২০২০]

দোষ চাপানোর মত আরেকটি চওড়া কাঁধ ট্রেড ইউনিয়নের। প্রায়ই শোনা যায় ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের দৌরাত্মে কারখানা টেকানো দায়। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই ইউনিয়ন নেতারা ভারি দূরাচারী, তবু কারখানা বন্ধ বা ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার খর্ব করা যৌক্তিক হতে পারেনা। উপরন্তু দেখা যায় প্রায় সব রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সিবিএ নিয়ন্ত্রিত হয় শাসকদলের অনুগত শ্রমিকনেতৃত্বে। তাঁদের যাকিছু বাড়বাড়ন্ত তাতো ঐ রাষ্ট্রক্ষমতার খুঁটি ধরে। এদায় তো জনগণের ঘাড়ে চাপানো ঠিক হয়না।

এসব ধোপে টিকতে না পারা যুক্তির বিপরীতে লোকসানের প্রকৃত কারণ অত্যন্ত সরলভাবে উঠে এসেছে ইমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী’র কলমে, “সরকারী পাটকল যে লোকসান গুণছে তার প্রধান কারণ ব্যবস্থাপকদের দুর্নীতি। বাজারে এরা পাট কিনতে আসে দেরীতে, ততক্ষণে ভালো পাট বিক্রি হয়ে গেছে। তারা নিম্নমানের পাট সস্তায় কেনে কিন্তু কাগজে কলমে দাম দেখায় উঁচুমাত্রার। পাট কেনে পাটকলের আশেপাশের এলাকা থেকেই, খাতায় লেখে কিনেছে দূরদূরান্ত থেকে, যাতে যাতায়াত ও যানবাহন খরচ পড়েছে ভালো রকমের। উদ্বৃত্ত টাকা তাদের পকেটে চলে যায়। লোকসান হয়ে পড়ে অনিবারর‌্য। ফলে শ্রমিক-কর্মীদের বেতন বকেয়া পড়ে; নিরুপায় শ্রমিক- কর্মচারীরা ধর্মঘট করে, উৎপাদন বন্ধ থাকে, লোকসান বাড়ে এবং ক্ষেত্র তৈরী হয় মিলে তালা ঝুলাবার, নয়তো প্রাইভেটের কাছে পানির দরে বিক্রি করে দেবার।” [ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত, জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সংখ্যার সম্পাদকীয়]

এছাড়া আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকট পূর্বে উল্লেখিত শ্রমিকনেতার বক্তব্যে ধরা পড়েছে। আরেকটি সংকট থাকে বাজার সংক্রান্ত। যেহেতু রাষ্ট্রীয় কারখানা নিম্নমানের পাট সংগ্রহ করে, সেহেতু তার উৎপাদিত পণ্যও হয় নিম্নমানের। তাই বিশ্ববাজারে পাটজাত পণ্যের ক্রমসম্প্রসারণশীল বাজারেও আমাদের রাষ্ট্রীয় কারখানা আশানুরূপ জায়গা নিতে ব্যর্থ।

এসব কারণ দূরীকরণের উদ্যোগ না নিয়ে বা লুটপাটের ব্যবস্থা বহাল রেখে স্বেচ্ছাকৃত লোকসানের দায়ভার জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়ে জনগণের হাজার হাজার একর জমি ও কোটি কোটি টাকার নসম্পদ, সুলভ কাঁচামাল ও সস্তা শ্রমে কতিপয় পুঁজিপতিকে মুনাফা লোটার সুযোগ করে দিয়ে রাষ্ট্র তার শ্রেণি চরিত্রের নগ্ন প্রকাশ ঘটালো, যা সে প্রায়ই আড়াল রাখার প্রয়াস পায়। অনতিবিলম্বে আমরা চিনিসহ অপরাপর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পক্ষেত্রেও অনুরূপ দুঃখজনক অভিজ্ঞতার শিকার হতে চলেছি।

লেখক: প্রাবন্ধিক।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 403
    Shares