মঙ্গলবার, মে ১৮
শীর্ষ সংবাদ

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম-এর জীবন ও সংগ্রাম

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 209
    Shares

অধিকার ডেস্ক:: ‘রুমির সাথে ক’দিন ধরে খুব তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে। ও যদি ওর জানা অন্য ছেলেদের মত বিছানায় পাশ-বালিশ শুইয়ে বাবা-মাকে লুকিয়ে পালিয়ে যুদ্ধে চলে যেত, তাহলে এক দিক দিয়ে বেঁচে যেতাম। কিন্তু ঐ যে ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছি লুকিয়ে বা পালিয়ে কিছু করবে না। নিজের ফাঁদে নিজেই ধরা পড়েছি। রুমী আমাকে বুঝিয়েই ছাড়বে, সে আমার কাছ থেকে মত আদায় করেই ছাড়বে।

কিন্তু আমি কি করে মত দেই? রুমীর কি এখন যুদ্ধ করার বয়স? এখন তো তার লেখাপড়া করার সময়। কেবল আই.এস.সি পাস করা এক ছাত্র, এখানে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছে। আবার আমেরিকার ইলিনয় ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতেও ওর অ্যাডমিশন হয়ে গেছে। …’
‘আই.আই.টিতে তোর ক্লাস শুরু হবে সেপ্টেম্বরে, তোকে না হয় কয়েক মাস আগেই আমেরিকা পাঠিয়ে দেব।’

‘আম্মা, দেশের এই রকম অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়ত যাব শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তাহলে আমার বিবেক চিরকালের মত অপরাধী করে রাখবে আমাকে। আমেরিকা থেকে হয়ত বড় ডিগ্রি নিয়ে এসে বড় ইঞ্জিনিয়ার হবো; কিন্তু বিবেকের ভ্রুকুটির সামনে কোনদিনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো না। তুমি কি তাই চাও আম্মা?

‘আমি জোরে দুই চোখ বন্ধ করলাম। বললাম, ‘না তা চাই নে। ঠিক আছে, তোর কথাই মেনে নিলাম। দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে। যা তুই যুদ্ধেই যা।’

ঘটনার বর্ণনাটি এক জননীর ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের শৈল্পিক সৃষ্টি, ‘একাত্তরের দিনগুলি’ ডায়েরি থেকে নেয়া। একজন শহীদ রুমীর মা কিভাবে লক্ষ-কোটি মানুষের জননীতে পরিণত হতে পারেন তার বিরল সংগ্রামের দৃষ্টান্ত জাহানারা ইমাম।

জাহানারা ইমামের জন্ম ১৯২৯ সালের ৩ মে। মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে। বাবা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ আব্দুল আলী এবং মা সৈয়দা হামিদা বেগম এবং বাবার পুরনো বন্ধু মটকা চাচার অনুপ্রেরণাতে জুড়ু ওরফে জাহানারা ইমাম লেখাপড়া শেখার বিষয়ে উৎসাহী হন। ক্লাস সেভেনে পড়াকালীন সময়ই জুড়ু – এক সাহিত্য পাগল মাস্টার মশাইয়ের অনুপ্রেরণায় টলস্টয়, দস্তয়ভস্কি, ভিক্টর হুগো, লেগার লফ, শেক্সপিয়র, বানার্ড শ, ন্যুট হামসুন– অনেকের বইয়ের বাংলা অনুবাদ পড়েছিলেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় জুড়ু শান্তি নিকেতনে পড়ার স্বপ্ন দেখেছিল। ১৯৪১ সালের ৯ আগস্ট বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর সাথে সাথে জাহানারা ইমামের শান্তি নিকেতনে যাবার স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে। ১৯৪২ সালে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৪৪ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে আই এ পাশ করে ১৯৪৫ সালে লেডি-ব্রেবোর্ন কলেজ (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে তিনি বিএ পাস করেন।

পরিবারের অনুপ্রেরণায় শিক্ষা-শিল্প সাহিত্যের জগতে শহীদ জননীর প্রবেশ ঘটলেও পারিবারিক বাধার কারণে তিনি প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হতে পারেননি। বাম ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত বন্ধু অঞ্জলির ব্যক্তিত্ব, মর্যাদাবোধ, প্রজ্ঞা জুড়ুকে আকৃষ্ট করেছিল। কেবলমাত্র নিজের বা পরিবারের জন্য নয়, সমাজের মানুষের জন্যও যে দায়বোধ-ভালোবাসা এবং কর্তব্য আছে এটা তিনি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি আর যুক্তি দিয়ে বুঝেছিলেন। তাই জীবনের শেষদিনগুলিতে ক্যান্সারকে সাথী করে বাংলাদেশের লক্ষ-কোটি মানুষকে নেতৃত্ব দিতে তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। ছাত্র অবস্থাতেই আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছিল জুড়ুর। আজ থেকে একশত বছর আগে নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া মেয়েদের অলঙ্কারকে দাসত্বের নির্দশন হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। একইভাবে শহীদ জননীও জীবনে বাহুল্যতাকে কখনোই প্রশ্রয় দেননি-পরিবারের প্রতি, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধই ছিল তার জীবনের-চরিত্রের অলঙ্কার। ১৯৪৮ সালের ৯ আগষ্ট সিভিল ইঞ্জিনিয়ার শরীফ ইমাম এর সাথে তার বিয়ে হয়। স্বর্ণালঙ্কারের পরিবর্তে ফুলের মালা পরে তিনি বিয়ে করেছিলেন। মুক্ত ও পরিশীলিত মনের মানুষ শরীফ ইমামের সহযোগিতায় তিনি স্কুলে শিক্ষকতা করেন, ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকায় পড়তে যান। ১৯৬৪ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাশ করেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ এই দুই বছর অধ্যাপনা করেন ঢাকা টির্চাস ট্রেনিং কলেজে। দীর্ঘ ১৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনে শহীদ জননী ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী গার্লস স্কুল, ঢাকা সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলসহ তিনটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন।
১৯৭১ সালে স্নেহশীল-মমতাময়ী এই শিক্ষক মায়ের পুরো পরিবারই হয়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। শরীফ ইমাম বাংলাদেশের সমস্ত ব্রিজ-কালভার্টের ডিজাইন দেখে মুক্তিযোদ্ধাদের সেগুলো ভাঙার এমন নকশা তৈরি করে দিয়েছিলেন যেন যুেদ্ধর পরে স্বল্প সময়ে স্বল্প ব্যয়ে তা সংস্কার করা যায়। রুমীর উপর পাকিস্তানীদের বর্বর অত্যাচার এবং তার শহীদী মৃত্যুর শোকে কাতর হয়ে শরীফ ইমাম বিজয়ের মাত্র তিনদিন আগে মারা যান। স্বামী পুত্রের শোকে কাতর মা আমাদের শহীদ জননী যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অভূতপূর্ব দীপ্তি এবং শৌর্য নিয়ে দেশবাসীর সামনে উপস্থিত হন। লাখো সন্তান হত্যা, অসংখ্য নারী নির্যাতন, ধর্ষণের সহযোগী রাজাকার-আলবদরের বিচারের দাবিতে গড়ে তোলেন গণআদালত।

১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর একাত্তরের চিহ্নিত নরঘাতক গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমীর ঘোষণা করলে সচেতন দেশবাসী বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। যুদ্ধাপরাধী বলে যার নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছিল সেই নাগরিকত্বহীন গোলাম আযমকে প্রকাশ্যে দলের আমীর ঘোষণা করা-একটি স্বাধীন দেশের জনসাধারণের বিশ্বাস-অস্তিত্ব এবং আবেগের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শণের শামিল। এই ধৃষ্টতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। তিনি হন এর আহবায়ক। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে এর আহবায়ক নির্বাচিত হন জাহানার ইমাম। দেশের লাখ লাখ মানুষ শামিল হয় নতুন এই প্লাটফর্মে।

এই কমিটি ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ‘গণআদালত’-এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আজমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালতে গোলাম আজমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আজমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন। সমবেত লক্ষ লক্ষ মানুষের পক্ষ থেকে জাহানারা ইমাম গণআদালতের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।

গণআদালত প্রতিষ্ঠিত হবার পর সরকার ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অজামিনযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের করে। এরপর শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপী গণস্বাক্ষর, গণসমাবেশ, মানববন্ধন, সংসদযাত্রা, অবস্থান ধর্মঘট, মহাসমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে ৩০ জুন ১৯৯২ নির্মূল কমিটির সমাবেশে হামলা চালায় তৎকালীন বিএনপি সরকারের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী। পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জে আহত হন জাহানারা ইমাম।

এই আন্দোলনে নিজের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে জাহানারা ইমাম বলেন, ‘মানুষ কি চায়, কোন পথে চায়, তা প্রতিফলিত হয় সংগঠিত হওয়ার মধ্যে-আন্দোলনের মাধ্যমে। কয়েকজনের ভাবনা অনেককে যুক্ত করতে পারে। অনেকের ঐক্যমত সংগঠনের জন্ম দেয়। সংগঠন আন্দোলন গড়ে তোলে। বিরানব্বইর জানুয়ারি থেকে তিলে তিলে গড়ে উঠেছে একটি আন্দোলন-বিবৃতি, অজস্র বৈঠক, সংগঠন, বহু মিছিল, অনেক সভা, গণআদালত, ছোটখাটো সংঘর্ষ ও হরতালের মধ্য দিয়ে। আর এ আন্দোলনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক সংযুক্তিও খুবই ঘটনাবহুল।

একাত্তরের ঘাতক গোলাম আযমকে জামাতে ইসলামী যখন দলের আমীর ঘোষণা করলো তখন আমি দেশে ছিলাম না। আমি বিদেশে ছিলাম ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য। ৬ জানুয়ারি দেশে ফিরি। আমার অনুপস্থিতিতে আমার জন্য বাসায় কোন না কোন একটি পত্রিকা রাখা হয়। অনেক দিনের জমে থাকা পত্রিকা পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা খবর দেখে চমকে উঠি। কি অদ্ভূত সব ঘটনা। জামাতে ইসলামী ঘাতক গোলাম আযমকে দলের আমীর ঘোষণা করে বসেছে। ২৯ ডিসেম্বর এই ঘাতককে আমীর ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রতিবাদে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সভা, সমাবেশ, মিছিল হয়েছে এ খবরও পড়লাম। বিভিন্ন শ্রেণী পেশার সংগঠন ও অনেক রাজনৈতিক দলের প্রতিবাদ বিবৃতিও দেখলাম এই ঘটনার নিন্দায়। সব কিছু দেখে খুব কষ্ট হচ্ছিল। বিচলিত বোধ করলাম। ক্ষুব্ধ হলাম।”

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধকালে গোলাম আযম-জামায়াতে ইসলামীর পাকিস্তানীদের সমর্থন, গণহত্যায় সহযোগিতা, লুটতরাজ, ধ্বংসযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন-ধর্ষণের কথা কখনো ভুলতে পারিনি। সব সময় চেয়েছি এসব যুদ্ধাপরাধীর বিচার হোক। অতীতে অনেকের সঙ্গে এই প্রসঙ্গে কথা বলেছি, কাজ করার চেষ্টা করেছি, আন্দোলন করতে চেয়েছি। ঘাতক, দালাল, রাজাকার, আলবদর, আলশামস, গোলাম আযম, জামায়াত শিবিরসহ এই সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে আমরা অনেকেই সোচ্চার ছিলাম। আমার মধ্যে এই ঘৃণিত শক্রদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল, ব্যথা ছিল, যন্ত্রণা ছিল। এখনো আছে। অনেকে বহুবার নানা ধরনের সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন সকলকে নিয়ে। সেসব সফল হয়নি; বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে। দেশে সামরিক দুঃশাসন ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলো বহুবিধ প্রশ্নে বিতর্কে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একতা ছিল অলীক স্বপ্ন। জেনারেল এরশাদের দুঃশাসন এবং তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অনেক জট খুলেছিল, এক ধরনের ঐক্য গড়ে উঠেছিল। আবার অনেক আশা-ভরসার পেছনে একপা-দু’পা করে সামনে আসছিল জামায়াত-শিবির ঘাতক চক্র- অনেকের অগোচরে, অনেকের প্রশ্রয়ে। স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর টেলিভিশনের পর্দায় আরেক স্বৈরাচারকে দেখলাম। ধর্মীয় স্বৈরাচারী জামাতের নেতা ঘাতক আব্বাস আলী খানের চেহারাও ভেসে উঠলো খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা, রাশেদ খান মেননের পাশাপাশি। বিচিত্র সব ঘটনা। সংসদ নির্বাচনে তারা আঠারো আসনে নির্বাচিত হলো। দেশের সাধারণ মানুষের সামনে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে কোন বক্তব্য ছিলনা। আমরা নতুন প্রজন্মের মানুষকে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে সচেতন করে তুলতে পারিনি। এই অপরাধের দায় থেকে আমরা কেউ ক্ষমা পাবো না।”
১৯৯৪ সালে শহীদ জননীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এ বছর ২ এপ্রিল চিকিৎসার জন্য তিনি মিশিগানের ডেট্রয়েট হাসপাতালে ভর্তি হন। ২২ এপ্রিল ওখানকার ডাক্তাররা জানান তিনি চিকিৎসার আওতার বাইরে চলে গিয়েছেন। মৃত্যুর জন্য শুধু অপেক্ষা… এর মধ্যেও আমাদের শহীদ জননী সন্তানদের প্রতি তাঁর দায়িত্ব পালন করতে ভুল করেননি।

দেশে রেখে আসা কোটি সন্তানের উদ্দেশ্যে তিনি চিঠি লিখেন–
“সহযোদ্ধা দেশবাসীগণ, আপানারা গত তিন বছর ধরে একাত্তরের ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমসহ স্বাধীনতাবিরোধী সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছেন। এই লড়াইয়ে আপনারা দেশবাসী অভূতপূর্ব ঐক্যবদ্ধতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। আন্দোলনের শুরুতে আমি আপনাদের সঙ্গে ছিলাম। আমাদের অঙ্গীকার ছিল লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ রাজপথ ছেড়ে যাব না। মরণব্যাধি ক্যান্সার আমাকে শেষ মরণ কামড় দিয়েছে। আমি আমার অঙ্গীকার রেখেছি। রাজপথ ছেড়ে যাইনি। মৃত্যুর পথে বাধা দেবার ক্ষমতা কারো নেই। তাই আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি এবং অঙ্গীকার পালনের কথা আরেকবার আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই। আপনারা আপনাদের অঙ্গীকার ও ওয়াদা পূরণ করবেন। আন্দোলনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে থাকবেন। আমি না থাকলেও আপনারা আমার সন্তান-সন্ততিরা–আপনাদের উত্তরসূরিরা সোনার বাংলায় থাকবেন ।

এই আন্দোলনকে এখনো অনেক দুস্তর পথ পাড়ি দিতে হবে। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র ও যুবশক্তি, নারী সমাজসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ এই লড়াইয়ে আছে। তবু আমি জানি জনগণের মতো বিশ্বস্ত আর কেউ নয়। জনগণই সকল শক্তির উৎস। তাই একাত্তরের ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধী বিরোধী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল সমন্বয় আন্দোলনের দায়িত্বভার আমি আপনাদের বাংলাদেশের জনগণের হাতে অর্পণ করলাম। জয় আমাদের হবেই।”

২২ জুনের পর থেকে শহীদ জননীর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে। সব ধরনের খাবার গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকরা ওষুধ প্রয়োগ বন্ধ করে দেন। এসময় হাইকোর্টের রায়ে কুখ্যাত রাজাকার গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব প্রদান করে। জাতির জন্য লজ্জাকর এই সিদ্ধান্ত সেদিন শহীদ জননী জানতে পারেননি। ততোদিনে তাঁর অপূরিত কাজের সমস্ত দায়িত্ব দেশবাসীর কাঁধে অর্পণ করে, দেশের মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহী অপবাদ মাথায় নিয়ে ২৬ জুন আমাদের মা ৬৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধে একজন মানুষ কেমন করে তার সমস্তকিছু উজাড় করে দিতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ হলো জাহানারা ইমাম। কিন্তু শাসকদের কাছে মানুষের এই চাওয়ার কোন মূল্যই রইল না। তারা মানুষের চাওয়ার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, বড় করে দেখলো তাদের ক্ষমতাকেন্দ্রীক লুটপাটের রাজনীতিকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে শুরু থেকে পরিস্কার অবস্থান নিতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। তারা রাজাকার, আলবদরদের সমাজে প্রতিষ্ঠা করা, আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়া এবং এই শক্তিকে নিজেদের ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করলো। ফলে যুদ্ধাপরারীদের বিচারের দাবির তীব্র আকাক্সক্ষা থেকেই গড়ে উঠে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’-আর এর নেতৃত্ব দেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও বিচারের কাজটা একভাবে শুরু হলেও শেষ করা যায়নি। এর মধ্যদিয়ে শাসকদের মনোভাব ফুটে উঠে। তার ধারাবাহিকতায় গণজাগরণ মঞ্চ, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম আন্দোলনের গতি ধারা। জাহানারা ইমামের সংগ্রামী চেতনা আমাদের নব প্রজন্মের জন্য এখনও অনেক বেশি প্রেরণাদায়ী। সেই শিক্ষা নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

( সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের মুখপত্র নারীমুক্তি পত্রিকার আগস্ট-অক্টোবর ২০১৫ সংখ্যায় লেখা টি প্রকাশিত হয়েছিল)


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 209
    Shares