মঙ্গলবার, মে ১৮
শীর্ষ সংবাদ

লকডাউন না সরকারের তামাশা?

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 47
    Shares

অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন::

৩ এপ্রিল থেকে ১১ এপ্রিল দেশে লকডাউন হলো কি হলো না, তা নিয়ে রীতিমতো একটা ধন্দ তৈরি হয়েছে। ৩ এপ্রিল সকালে সরকারি বাসভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানান, ৫ এপ্রিল থেকে সারাদেশে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন হবে। লকডাউন সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে বিস্তারিত জানানো হবে বলেও তিনি জানান। প্রজ্ঞাপন থেকে বিস্তারিত জানার জন্য মানুষ উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে। একদিন পর অর্থাৎ ৪ এপ্রিল সরকারের পক্ষ থেকে ‘করোনা ভাইরাসজনিত রোগ কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধে শর্ত সাপেক্ষে সার্বিক কার্যাবলি/চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ’ শিরোনামে ১১টি নির্দেশনা সম্বলিত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। শিল্প-কারখানা ও নির্মাণ কার্যাদি চালু থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়। লকডাউনের মধ্যে কল-কারখানা চালু রাখার কথা বলা হয়। সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত জরুরি প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে খোলা রাখা যাবে বলে উল্লেখ করা হয়। সময়সূচি পাল্টিয়ে বইমেলাও চালু রাখা হয়।

লকডাউন বা সরকারি বিধিনিষেধ যা-ই বলি না কেন, সরকারি এই নির্দেশনায় বলা হয়, অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে বের হওয়া যাবে না। কিন্তু শ্রমিকরা সব হিসাবের বাইরে! অর্থনীতি চালু রাখার সব দায় যেন শ্রমিকদের! শ্রমিকরা করোনায় আক্রান্ত হোক, মরুক; তাতে সরকারের কিছু যায় আসে না। তাঁরা কারখানায় যেতে বাধ্য! অর্থনীতি বাঁচাতে শ্রমিকের জীবন যেন কিছুই নয়! গত বছর আমরা দেখেছিলাম, করোনার ঊর্ধ্বগতির মধ্যে হঠাৎ করে গার্মেন্টস খুলে দেওয়া হয় এবং হুমকি দিয়ে শত শত কিলোমিটার পায়ে হেঁটে শ্রমিকদের কর্মস্থলে আসতে বাধ্য করা হয়। এই নির্মমতার যেন শেষ নেই।

গণপরিবহন বন্ধ রেখে অফিস চালু রাখলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে যাবেন এবং ফিরবেন কী করে, তা নিয়ে সরকারের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। গণপরিবহন না থাকায় অফিসে যেতে-ফিরতে অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে মানুষকে। দুদিন পরই ৭ এপ্রিল সকাল থেকে ঢাকাসহ সিটি করপোরেশন এলাকায় গণপরিবহন চালু করা হয়। এদিকে বইমেলাও চলতে থাকে। ৮ এপ্রিল মার্কেট, শপিংমলও খুলে দেওয়া হয়। এভাবে একে একে জনসমাগমের সব রাস্তাই খুলে দেওয়া হয়। তাহলে এ কেমন লকডাউন?

ওবায়দুল কাদেরসহ সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা লকডাউনের কথা বললেও, ৫ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ৭ দিনের সরকারি নির্দেশনা লকডাউন নয়, কঠোর নিষেধাজ্ঞা।

সব মিলিয়ে একেবারে লেজেগোবরে অবস্থা। সরকারের পরিকল্পনাহীনতা, দায়িত্বহীনতা, সমন্বয়হীনতা করোনা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। গত বছর করোনার হামলার শুরুতে এমনটাই দেখা গেছে। হঠাৎ করেই ‘সাধারণ ছুটি’ ঘোষণা করার পর, লাখ লাখ মানুষ শহর থেকে গ্রামে ছুটে গিয়েছিলেন। প্রাক প্রস্তুতি দূরে থাক, সংকট গায়ে এসে পড়লেও পরিকল্পিত উদ্যোগ দেখা যায়নি। মানুষ শুধু দেখছে সরকারের অস্থিরতা।

৯ এপ্রিল ওবায়দুল কাদের আবারও সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন, সরকার জনস্বার্থে ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য সর্বাত্মক লকডাউনের বিষয়ে সক্রিয় চিন্তাভাবনা করছে। এই সর্বাত্মক বা কঠোর লকডাউন নিয়ে মানুষ পড়েছে বিভ্রান্তিতে। আসলে কী হতে যাচ্ছে, সেটা না জানলে মানুষ প্রস্তুত হবে কী করে? এদিকে অন্তত দুই সপ্তাহ ‘পূর্ণ লকডাউন’ ছাড়া করোনাভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না বলে জানিয়েছে কোভিড-১৯ জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোয় ‘পূর্ণ লকডাউন’ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। লকডাউনের দুই সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগে সংক্রমণের হার বিবেচনা করে আবার নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

করোনার সংক্রমণ কমিয়ে আনতে লকডাউন একটি স্বীকৃত পন্থা। সংক্রমণ নিম্নমুখী হলে পরিকল্পিতভাবে ধীরে ধীরে লকডাউন শিথিল করতে হয় এবং এক পর্যায়ে তুলে নিতে হয়। দেশে দেশে লকডাউন করে করোনা নিয়ন্ত্রণে সফলতা পাওয়া গেছে। গত বছর বাংলাদেশ লকডাউন না করে ‘সাধারণ ছুটি’ করা হয়। তখন মানুষের স্বাভাবিক জীবন বিঘ্নিত হলেও, কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। সরকারের পরিকল্পনাহীনতায় সময়ের অপচয় হয়েছে, সংক্রমণ বেড়েছে আর অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে।

সামর্থ্যবান মানুষ আর ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ শ্রমজীবী মানুষের কাছে লকডাউনের মানে এক নয়। ক্ষুধার তাড়নায় মৃত্যুকে পরোয়া না করেই শ্রমজীবী মানুষকে কাজে নামতে হয়। ক্ষুধার যন্ত্রণা মৃত্যুভয়কে হঠিয়ে দেয় কখনো কখনো। ঘরে আটকে থাকার ‘বিলাসিতা’ ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ মানুষের কল্পনারও বাইরে।

লকডাউন করতে গিয়ে মানুষ না খেয়ে মরতে চাইবে কেন? করোনা নিয়ন্ত্রণে লকডাউন প্রয়োজন। আবার লকডাউন কার্যকর করতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে নিরন্ন মানুষের ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। বিভিন্ন দেশে এ ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুধু লকডাউন ঘোষণা করে দিলেই তো হলো না। নিরন্ন মানুষের খাবারের ব্যবস্থা না করে তাঁদেরকে ঘরে থাকতে বলা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু আমাদের দেশের সরকার ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ মানুষের দায়িত্ব নেয় না। লকডাউন হলে তাঁরা খাবেন কী, সে ভাবনা সরকারের নেই। গণমুখী পরিকল্পনা ছাড়া হুকুম জারি করে লকডাউন কার্যকর হবে না। গণমুখী সরকার ছাড়া এটা সম্ভব নয়।

করোনা মোকাবিলায় ‘কেরালা মডেল’ সারা বিশ্বে স্বীকৃত এবং প্রসংশিত। কেরালার বামপন্থী সরকার সাফল্যের সঙ্গে করোনা মোকাবিলা করেছে। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে নানাবিধ উদ্যোগের সঙ্গে কেরালায় লকডাউনও করা হয়। লকডাউনের মতো কঠোর কর্মসূচি কেরালায় মানবিক এবং সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়।

কেরালার বামপন্থী সরকার কোনো কিছুই আমলাতান্ত্রিকভাবে করেনি। ‘সামাজিক দূরত্বে’র কথা না বলে কেরালা স্লোগান তুলেছিল, ‘শারীরিক দূরত্ব, সামাজিক সংহতি’। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগকে কাজে লাগায় তারা। রাজ্য সরকার ৮৭ লাখ পরিবারকে (জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ) বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটা প্যাকেট পৌঁছে দেয়। এক হাজার রুপিতে তৈরি এ প্যাকেটে চিনি থেকে রান্নার তেল পর্যন্ত এ রকম ১৭ ধরনের জিনিস ছিল। এ রকম প্যাকেট দেওয়া হয় ১৪ দিনে একবার। এ ছাড়া রান্না করা খাবারও দেওয়া হয়।

শুধু কি খাবার? ঘরবন্দী মানুষের জীবনকে সহজ করতে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের বাধ্য করা হয়, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের যার যার হিসাবের বিপরীতে ৩০ ভাগ বেশি ব্যান্ডউইথ দেওয়ার জন্য। আইসোলেশনে থাকা ব্যক্তিদের সাহস দিতে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। এসব উদ্যোগের কারণে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়নি, ঘরে থেকেছে এবং না খেয়ে মারা যায়নি। ফলে লকডাউনের মতো কঠোর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে।

শুধু মাথাপিছু জিডিপি দিয়ে উন্নয়ন পরিমাপ করা যায় না। কেরালার দিকে তাকালেই এটা বোঝা যায়। উন্নয়নের ক্ষেত্রে কেরালার বামপন্থী সরকার ‘প্রবৃদ্ধি’, ‘মাথাপিছু আয়’ ইত্যাদি সূচকের দিকে ছোটেনি। মানুষকে মোহবিষ্ট না করে কেরালার সরকার জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর চেষ্টা করেছে, জোর দিয়েছে স্বাস্থ্য, শিক্ষার ওপর।

বাংলাদেশ সরকার এতদিন ‘উন্নয়ন’ ‘উন্নয়ন’ বলে গলা ফাটিয়েছে। করোনা তুলে ধরেছে ‘পুঁজিবাদী উন্নয়ন মডেলে’র অন্তঃসারশূন্যতা, বিদ্যমান উৎকট বৈষম্যকে। বামপন্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি এখন মানুষের মুখে মুখে। ব্রিজ, ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক ‘উন্নয়নে’র চেয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে অনেক বেশি জরুরি, তা এখন মানুষ উপলব্ধি করছে। অক্সিজেনের নিশ্চয়তা নেই, অথচ হাজার হাজার টাকা ঋণ করে স্যাটেলাইট প্রকল্প, যুদ্ধবিমান কেনার যৌক্তিকতা কী?

করোনা আমাদের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে তুলে ধরেছে। মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণ করে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে মূলত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংকটকালে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক মানুষের চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে পারছে না।

জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৫২টি দেশের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেওয়া হয় বাংলাদেশে। দেশের ৪৭টি জেলায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) সুবিধা নেই। দেশে পরিপূর্ণ আইসিইউ ইউনিট রয়েছে ১১২টি। আইসিইউ বেড রয়েছে ১,১৬৯টি, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম। সব আইসিইউ বেড মানসম্মত ও কার্যকর কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তো রয়েছেই। সাড়ে পাঁচশটির মতো ভেন্টিলেটর আছে। ৯৬ শতাংশ হাসপাতালে কোনো যান্ত্রিক ভেন্টিলেটর নেই। করোনার আঘাতের পর গত এক বছরে স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিশেষ কোনো উন্নতি হয়নি। কোভিড রোগীদের চিকিৎসার জন্য গত এক বছরে যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা দরকার ছিল তার কোনো কিছুই করেনি সরকার। করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল ও শয্যা সংখ্যা বাড়ানো, হাইফ্লো অক্সিজেন ক্যানুলা ও কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সাপ্লাই ব্যবস্থা চালু এবং আইসিইউ বেড স্থাপন কোনো কিছুই করেনি সরকার। বরাদ্দ যা হয়েছে, তার সিংহভাগই লুটপাট হয়েছে। এখন করোনার অতি সংক্রমণকালে আইসিইউ বেড মানে সোনার হরিণ!

লকডাউনের নামে সরকার জনগণের সঙ্গে তামাশা করছে। না কমছে সংক্রমণ, বাড়ছে কেবল ভোগান্তি। সংকট থেকে উত্তরণের জন্য গণবিরোধী সরকার ও গণবিরোধী ব্যবস্থার উচ্ছেদ করতে হবে। তা না হলে গণবিরোধী সরকারের তামাশা চলতেই থাকবে, সে লকডাউন নিয়ে হোক আর মানুষ নিয়ে হোক।

লেখক: প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 47
    Shares