শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২৬
শীর্ষ সংবাদ

রোহিঙ্গা গণহত্যার চিত্র হেগের আদালতে তুলে ধরলেন আইনজীবী

এখানে শেয়ার বোতাম

অধিকার ডেস্ক :: রাখাইনে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর চালানো বর্বরতার তথ্য-উপাত্ত ও দেশটির স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির ভূমিকা আদালতে তুলে ধরেন যুক্তরাষ্ট্রের আইনজীবী তাফাদজ পাসিপান্দো। তিনি জানান, রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণের কথা অস্বীকার করতে সুচি বলেছিলেন, ‘সেনাবাহিনী এবং বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর কেউ নোংরা বাঙালি মেয়েকে ছোঁবে না। ওরা আকর্ষণীয় নয়। ফেসবুকে ‘ফেক রেপ’ নামে যে পেজ খোলা হয়েছে সেটির নিয়ন্ত্রণও হচ্ছে স্টেট কাউন্সিলরের দপ্তর থেকে।’

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের বিচারিক আদালতে (আইসিজে) করা মামলার বিচার শুরু হয়েছে মঙ্গলবার। দেশের হয়ে আইনি লড়াই চালাতে আদালতে উপস্থিত আছেন মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো নেত্রী অং সান সু চি। মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বিকাল তিনটায় নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়ার তথ্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে তিনদিনের শুনানি শুরু হয়েছে।

মার্কিন আইনজীবী তাফাদজ পাসিপান্দো আদালতের কাছে আরাকানে এখনো যে ৬ লাখ রোহিঙ্গা আছেন, তাঁদের দুর্ভোগ ও ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের কাঁটাতারের বেষ্টনীর মধ্যে শিবিরে আটক রাখা, চলাচলের স্বাধীনতা খর্ব করা ও অন্যান্য বিধি-নিষেধের কথা যা জাতিসংঘ তদন্তে উঠে এসেছে সেগুলোর বিবরণ দেন তিনি।

তাফাদজ পাসিপান্দো বলেন, রোহিঙ্গাদের চাষাবাদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে, খাদ্য সরবরাহ কমানো হয়েছে, তাদের পালিত পশু কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে জাতিসংঘ তদন্তে যে তথ্য উঠে এসেছে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদের অভুক্ত রাখা। এগুলো গণহত্যার উদ্দেশ্য হিসাবে সনদের লঙ্ঘন। আরও গণহত্যার অপরাধ যাতে না ঘটে, সে জন্য ব্যবস্থা নিতে পারে এই আদালত। বিভিন্ন প্রমাণ তুলে ধরে তিনি বলেন, এগুলোতে গণহত্যার উদ্দেশ্যের প্রতিফলন ঘটেছে। এরপর তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।

শুনানিতে মিয়ানমারে গণহত্যা বন্ধের নির্দেশ দিতে আইসিজের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে গাম্বিয়া। দেশটির আইন ও বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু এই আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আধুনিক যুগে এই গণহত্যা কোনোভাবেই গ্রহণ করা যায় না। রোহিঙ্গারাও মানুষ। খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানসহ বাঁচার অধিকার তাদের রয়েছে। রোহিঙ্গা শিশুদের অধিকার রয়েছে শিক্ষা লাভ করে ডাক্তার হওয়ার। তিনি বলেন, আমি ২০১৮ সালে কক্সবাজারে ওআইসির পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করি। সেখানে গিয়ে রোহিঙ্গাদের চোখে ভয়, কষ্ট ও মানবিকতার চরম অবমাননা দেখতে পেয়েছি। সেখানে গিয়েই জানতে পেরেছি রাখাইনে গণহত্যা চালানো হয়েছে। গণহত্যা না হলে এত মানুষ পালিয়ে আসত না।

দ্য হেগের স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রোহিঙ্গা এবং মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে শুনানি শুরু হয়। মঙ্গলবার আদালতে গাম্বিয়ার বক্তব্য উপস্থাপনের পর বুধবার মিয়ানমার তাদের অবস্থান তুলে ধরবে। এরপর বৃহস্পতিবার সকালে গাম্বিয়া এবং বিকেলে মিয়ানমার প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন ও চূড়ান্ত বক্তব্য পেশের সুযোগ পাবে। গাম্বিয়ার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সে দেশের আইন ও বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু।

মিয়ানমারের নেতৃত্বে থাকছেন দেশটির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। শুনানির শুরুতে আইসিজের প্রেসিডেন্ট আবদুলকোয়াই আহমেদ ইউসুফ শুনানির প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিচারকক্ষে উপস্থিত সুধীজনদের অবহিত করেন।

বাংলাদেশ এই মামলার সরাসরি অংশগ্রহণকারী পক্ষ না হলেও পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকের নেতৃত্বে কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞদের একটি প্রতিনিধি দল ওই শুনানিতে উপস্থিত রয়েছেন। মামলার শুনানি উপলক্ষে হেগ শহরে গাম্বিয়া ও মিয়ানমার ছাড়াও অন্য কয়েকটি দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা হাজির হয়েছেন। মামলায় গাম্বিয়াকে সমর্থন দিতে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) কূটনীতিকেরাও উপস্থিত হয়েছেন। এছাড়াও বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী এবং মিয়ানমার সরকারের সমর্থকেরাও উপস্থিত রয়েছেন।

আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতের বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন সোমালিয়ার বিচারপতি আবদুলকোয়াই আহমেদ ইউসুফ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট চীনের বিচারপতি ঝু হানকিন। বিচারকদের নির্বাচন করেন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদ।

অন্য সদস্যরা হলেন—স্লোভাকিয়ার বিচারপতি পিটার টমকা, ফ্রান্সের বিচারপতি রনি আব্রাহাম, মরক্কোর মোহাম্মদ বেনুনা, ব্রাজিলের আন্তোনিও আগুস্তো কানকাদো ত্রিনাদে, যুক্তরাষ্ট্রের জোয়ান ই ডনোহু, ইতালির গর্জিও গাজা, উগান্ডার জুলিয়া সেবুটিন্দে, ভারতের দলভির ভান্ডারি, জ্যামাইকার প্যাট্রিক লিপটন রবিনসন, অস্ট্রেলিয়ার রিচার্ড ক্রর্ফোড, রাশিয়ার কিরিল গিভরগিয়ান, লেবাননের নওয়াফ সালাম এবং জাপানের ইউজি ইওয়াসাওয়া।


এখানে শেয়ার বোতাম