শনিবার, নভেম্বর ২৮

রোহিঙ্গাদের পেছনে সরকারের ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা

এখানে শেয়ার বোতাম

অধিকার ডেস্ক:: দেশে বসবাসরত ১১ লাখ রোহিঙ্গার দুই বছরের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে বাংলাদেশ সরকারসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে ব্যয়ের জোগান দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ত্রাণ বা সহায়তা বাবদ রোহিঙ্গাদের পেছনে দাতা গোষ্ঠী বা অন্য কোনও সূত্র থেকে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার বাইরেও সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে অনেক টাকাই ব্যয় হয়েছে এবং হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের পেছনে সরকারের ব্যয় প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে জানিয়েছেন রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রতিমাসে ব্যয় করছে তিনশ’ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া হিসেব অনুযায়ী গত তিন বছরে (৩৬ মাসে) রোহিঙ্গাদের পেছনে সরকারের সরাসরি ব্যয়ের পরিমাণ ৯০ হাজার কোটি টাকা।

জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের জন্য খাবারসহ ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গা নারী পুরুষ ও শিশুদের জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা বিষয়ক সহায়তা দিচ্ছে সরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ইউএনএইচসিআর, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক ও দেশীয় এনজিওর সহায়তায় রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আওতায় দুই থেকে তিন সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের জন্য প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল, নয় কেজি ডাল ও তিন লিটার ভোজ্য তেল দেওয়া হচ্ছে। চার থেকে সাত সদস্যের পরিবারের জন্য জন প্রতি মাসে ৬০ কেজি চাল, ১৮ কেজি ডাল ও ছয় লিটার ভোজ্য তেল এবং আট এর অধিক সদস্যের পরিবারের জন্য প্রতি মাসে ১২০ কেজি চাল, ২৭ কেজি ডাল এবং ১২ লিটার ভোজ্য তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি প্রতি মাসে দুই রাউন্ডে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করে।

এর বাইরেও ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য বিভিন্ন প্রকার শিশুখাদ্য সরবরাহ করা হয়। দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় ওষুধ। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন এর যাবতীয় ব্যবস্থাপনা করে।

অপরদিকে ২০১৮ সালের জুন মাসে জাতিসংঘের তৈরি করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া এই ১০ লাখ রোহিঙ্গার পেছনে সরকারের বছরে খরচ হতে পারে অন্তত ৬০ কোটি ডলার। দুই বছরের হিসেবে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১২০ কোটি ডলার। যেটি কিনা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের একটি প্রতিবন্ধকতা।

জাতিসংঘের এ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষের পেছনে সরকারের মাসিক ব্যয় মাথাপিছু ৭০০ ডলার। অথচ এ বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রার চাহিদা মেটাতে একই পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের। কিন্তু এই ব্যয়ভার বহনের জন্য কোনও আয়ের উৎস নেই। তবুও ব্যয় থেমে নেই। আর এ কারণেই টানা দুই বছর এই বিশাল ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারকেই।

এর বাইরেও ২০১৮-১৯ অর্থবছর সরকারের বাজেটে আলাদা করে রোহিঙ্গাদের জন্য ৪শ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ বছরেও রোহিঙ্গাদের পেছনে সরকারের দেওয়া বরাদ্দের পরিমাণ ৪ শ কোটি টাকার কমবেশি। তবে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের বাজেটে রোহিঙ্গা পুনর্বাসন খাতে সরকার ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল।

এদিকে জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে ৭ লাখ ৪৫ হাজার রোহিঙ্গা। একই কারণে ১৯৭৮-৭৯, ১৯৯১-৯২ ও ১৯৯৬ সালেও বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গারা। আশ্রয়ের পর তাদের জন্য তৈরি করা আশ্রয় ক্যাম্পগুলোতে নতুন করে জন্ম নিয়েছে আরও প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা শিশু। জাতিসংঘের এ হিসেব অনুযায়ী আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার পরিমাণ এখন ১১ লাখের বেশি।

বিভিন্ন সরকারি দফতর, কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ফলে এসকল হিসেব বিবেচনায় নিলে বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ লাখ ১৮ হাজারেরও বেশি।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের চিহ্নিতকরণ-সংক্রান্ত একটি কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাহাড় ও বন কেটে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থাপন করা হয়েছে প্রায় এক লাখ ৬৫ হাজার আশ্রয় ক্যাম্প। এসব ক্যাম্প তৈরি করতে উজাড় হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার একর সংরক্ষিত বনভূমি। এতে দেশের ৩৯৭ কোটি ১৮ লাখ ৩৭ হাজার ৩৯৩ টাকার সমপরিমাণ জীব-বৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়েছে বলেও মনে করে জাতিসংঘ।

এদিকে বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২-এর ৪/১৪ (ক)-অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চলের দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনও প্রকার অবকাঠামো বা স্থাপনা নির্মাণ না করার আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাংলাদেশ বন বিভাগের এই আইন উপেক্ষা করে কক্সবাজারের কুতুপালংয়ের ৪০১ দশমিক ৪০ একর, জামতলী ও বাঘঘোনার ৫১৬ একর, বালুখালীর ৮৩৯ একর, তাজনিমা খোলার ৪৫১ একর, উখিয়ার বালুখালী ঢালা ও ময়নারঘোনার ৩১০ একর, শফিউল্লাহ কাটা এলাকার ২০১ দশমিক ২০ একর, নয়াপাড়ার ২২৪ একর, টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের পুঁটিবুনিয়ার ৮৮ দশমিক ৬০ একর, কেরনতলী ও চাকমারকুল এলাকার ৭৯ দশমিক ৮০ একর এবং লেদারের ৪৫ একর সংরক্ষিত বনভূমি উজাড় করে রোহিঙ্গাদের জন্য আবাসন ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়েছে।

কক্সবাজার বনবিভাগ সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় হিসেবে এই পরিমাণ জমির দাম দাঁড়ায় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। যা সরকারের নিজস্ব সম্পত্তি। যা শিগগিরই ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

প্রথম দিকে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য খাবার সরবরাহ করতে হয়েছে বাংলাদেশ সরকারকে। পরবর্তীতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) রোহিঙ্গাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। বর্তমানে তাদের অনুদানও অনেকটাই কমেছে বলে জানা গেছে।

এই তিন বছরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে টয়লেট, গোসলখানা ও বিশুদ্ধ খাবার পানি বিতরণ করা হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে ক্যাম্পের ভেতরে রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকার প্রধান সড়কগুলোয় ১৭ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন টেনে সড়কবাতি দিয়েছে। চিকিৎসা খাতেও বাংলাদেশ সরকার প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছে। সম্প্রতি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ১ কোটি টাকা ব্যয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুটি কালভার্ট নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের নিয়ে এখন কাজ করছেন পুলিশ ও বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে ১ হাজার ৬০০ লোক। আর সামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ জন। এসব কর্মকর্তা কর্মচারী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়োজিত আছেন তাদের বেতন-ভাতাসহ যাবতীয় খরচ সরকারকেই বহন করতে হচ্ছে। যার পুরো খরচ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দিতে হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন জানিয়েছেন, যখন যা প্রয়োজন তাই করা হচ্ছে। সরকারের নিজস্ব তহবিল, দাতা গোষ্ঠীর অনুদান মিলিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের খরচ যোগান দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়াও অনেক ব্যয় আছে যা দেখা যায় না। প্রতি ঈদে কোরবানিতেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য বরাদ্দ থাকে।


এখানে শেয়ার বোতাম