সোমবার, নভেম্বর ২৩

রেড স্যালুট কমরেড শ্রীকান্ত দাশ

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 238
    Shares

মোহাম্মদ মনির উদ্দিন অ্যাডভোকেট::

সাম্যবাদী আন্দোলনের মাঠ পর্যায়ের আলোকবর্তিকা ছিলেন প্রয়াত কমরেড শ্রীকান্ত দাশ। জীবনভর লাল নিশান অসীম সাহসে বুক চিতিয়ে উড়িয়েছেন। ছিলেন দুঃসাহসী, দুরন্ত ও দুর্বিনীত গণসংগ্রামী অনন্য এক মানুষ। মানবমুক্তির মহান সংগ্রামে রত ছিলেন আজীবন। শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সমবেত থেকেছিলেন আমৃত্যু। আদর্শিক লক্ষ্যে ছিলেন একেবারেই অবিচল। বাবার কাছে তিনি সমাজতন্ত্রের দীক্ষাসহ নিয়েছিলেন মানুষ, জীবন, সমাজ, পৃথিবীকে ভালোবাসার পাঠ। পার্থিব বিষয় সম্পদে ছিলেন উদাসীন। তবে মানুষের কষ্ট লাগবে ছিলেন একনিষ্ঠ, দৃঢ় ও উদার। তাঁর প্রয়াণে স্বজন হারানোর গভীর বেদনায় কষ্টনীল হয়েছে অজস্র রাজনৈতিক সহচর ও পরিবারের। ভাটি অঞ্চলের হাওর জনপদের বিপ্লবী কমরেড শ্রীকান্ত দাশ ১৯নভেম্বর, বৃহস্পতিবার, ২০০৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। জীবিতকালের আইনগত হলফপূর্বক প্রতিশ্রুতি থাকায় দেহদান করা হয় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

মরণোত্তর শরীরদান! চিকিৎসাবিদ্যায় ব্যবহারের জন্যে মহৎ একটি কাজ।গুটিকয়েক মানুষ দেহদান করেন। সেই দানের শুরু বেশিদিনের নয়।বাংলাদেশে ২০০৩ সালে চালু হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় একটি মরদেহ প্রথম দান হিসেবে গ্রহণ করে। এই মেডিকেলে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মাত্র ১২ জন দেহদান করেছেন। বিভিন্ন মেডিকেলে মরদেহ দান করেছেন গুটিকয়েক মানবিক মানুষ। এবং দানের জন্যে অছিয়ত বা অঙ্গীকারও রয়েছে কিছু মহৎ মানুষের। যে বা যারা করেছেন, মানব সেবা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির মনোবৃত্তি নিয়েই করেছেন। মানব ইতিহাসে তাঁরা অমর ও অক্ষেয়।যাঁরা করেছেন, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য-আরজ আলী মাতুব্বর, ড.আহমদ শরীফ, ভাষাসংগ্রামী আব্দুল মতিন, ড. নরেন বিশ্বাস, ওয়াহিদুল হক, গায়ক সঞ্জীব চৌধুরী, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা পঙ্কজ ব্যানার্জি, কমরেড শ্রীকান্ত দাশ, ভাষাসংগ্রামী বেলাল মোহাম্মদ, সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ, অধ্যাপক অজয় রায় ও তাঁর স্ত্রী শেফালী রায় এবং ছেলে বিজ্ঞানী ব্লগার অভিজিৎ রায়, মো. পারভেজ মাসুদ, সীমা রায়, মৈত্রীয় চট্রোপ্যাধায়, ঝর্ণাধারা চৌধুরী, শিখা ব্যানার্জি, সুপ্রিয় চক্রবর্তী রঞ্জু। আরো অনেকে এযাবৎ দেহদান করেছেন,বা অঙ্গীকারাবদ্ধ রয়েছেন। মহৎ কাজ হলেও নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ফলে ক’জনেই বা পারেন। যাঁরা পেরেছেন, তাঁদের তরে কুর্নিশসহ অভিবাদন জানাই।

বাংলাদেশে মরণোত্তর দেহদানের সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই।তবে মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯ নামে একটি আইন আছে;যা ২০১৮ সালে কিছুটা সংশোধন করা হয়েছে।মরণোত্তর দেহদানের ক্ষেত্রে জীবিত থাকা সময়ের একটি ঘোষণা থাকলেই হবে।চিকিৎসাবিদ্যার বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন একজনের মরদেহ ০৭ জনকে বাঁচানোর কাজে লাগতে পারে।অর্থাৎ একজন মানুষের প্রায় ৫০টি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাজে লাগানো যায়।এছাড়া শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে তো লাগেই।বিশ্বে যুক্তরাজ্যের মানুষ সবচেয়ে বেশি মরদেহ দান করে।পরিসংখ্যানে দেখা যায় যুক্তরাজ্যে ২০১৭-২০১৮ সালে ১,৫৭৫ জন মানুষ মরণোত্তর দেহদান করেছেন।সারাবিশ্বে গড়ে প্রতিবছর ০১লক্ষ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়।বাংলাদেশে প্রতিবছর ৪০ হাজার মানুষের কিডনি বিকল হয়;কিন্তু মাত্র ১৫০ এর মতো প্রতিস্থাপন হয়।এই বিবরণ ও তথ্য-উপাত্ত থেকে সহজেই অনুমেয় যে,মরণোত্তর দেহদান অতি গুরুত্বপূর্ণ।এই বিষয়টি কমরেড শ্রীকান্ত দাশ অনুধাবন করেছিলেন।জেনেশোনে বোঝেই তিনি মহৎ কাজটি করেছিলেন।অজপাড়া গাঁওয়ে এমন বিরল মানবতাবাদী মানুষ সচরাচর খুব একটা খোঁজে পাওয়া যায় না।

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কমরেড শ্রীকান্ত দাশ প্রথম মরণোত্তর দেহদান করেন।এরপূর্বে কেউই সিলেট অঞ্চলের কোনো মেডিকেলে দেহদান করেন নি।পরেও জানামতে সিলেটে কেউই করেন নি।ফলে কমরেড শ্রীকান্ত দাশ ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন।ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে তাঁর নাম।ইহা একটি অনন্য ও বিরল দৃষ্টান্ত।জীবিতকালে তিনি অছিয়ত বা অঙ্গীকার করেন।অঙ্গীকার করেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যুর পর মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠজন এবং পরিবারের লোকজন এই বিষয়ে জানতেন।ফলে মারা যাওয়ার পর রাজনৈতিক ঘনিষ্টজন পরিবারের সহাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে মেডিকেলে দেহ হস্তান্তর করেন।পরিবার অঙ্গীকারের কোনো ব্যত্যয় করেনি।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হয়েছিলাম ১৯৯৩ সালে।আমার এলাকার মেধাবী ছাত্র জ্যোতির্ময় রায় সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে পড়তেন।তিনি তাঁর ভাই জগদীশ চন্দ্র রায় ও আমি এবং ১৯৯৩ সালে আমবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয় হতে যাঁরা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন তাঁদেরকে ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই পরামর্শে ছাত্র ইউনিয়নে আমার যুক্ত হওয়া। পরে সিলেটে ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক ধারাবাহিক কাজের সাথে আমি সম্পৃক্ত হই ১৯৯৬ সালে। দশবারো বছর ছাত্রআন্দোলনে শরিক থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে বিদায় নেই।আমার সময়ে কমরেড শ্রীকান্ত দাশ’র ছেলে সুশান্ত দাস প্রশান্ত ছাত্র ইউনিয়ন সিলেটে যুক্ত হয়। সে ২০০১ সালে সদস্যপদ গ্রহণ করে। এম.সি. কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে পড়ে। খুবই বিনয়ী ও বুঝ-ভাবনায় অগ্রসর। এবং পারিবারিকভাবেই সাম্যবাদী ধারায় রাজনীতি সচেতন। ছাত্র ইউনিয়নের একটি ছাত্র মেস ছিলো উপশহরে ‘এ’ ব্লকে। নয়জনের বসবাস। সেই ছাত্র মেসে প্রশান্ত প্রায়ই আসতো। ছাত্রআন্দোলনের সুবাদে পরিচয় ও জানাশোনা। জানলাম কমরেড শ্রীকান্ত দাশ হলেন প্রশান্তর বাবা। বিপ্লবী ধারার অনন্যসাধারণ এক মানবিক মানুষ। প্রশান্তের কাছ থেকেই তাঁর বাবা সম্পর্কে প্রথম জানা। এবং পরবর্তীতে এই প্রকৃত বিপ্লবী গুণীমানুষ সম্পর্কে অনেককিছুই জানতে থাকি। এখনও জানার অবশিষ্ট রয়েছে, অজানা রয়েছে অনেককিছুই। তাঁর সমগ্রজীবন গবেষণার বিষয়।

কমরেড শ্রীকান্ত দাশ’র জীবন সংগ্রামমোখর। প্রতিবাদী ও আজীবন বিপ্লবী মানুষ। মুক্তিযুদ্ধে যেমন তাঁর অনন্য ভূমিকা তেমনি অন্যতম সংগঠক ও মনেপ্রাণে খাঁটি একজন দেশপ্রেমিক। সাধারণের মধ্যে তিনি ছিলেন অসাধারণ আদর্শবান ব্যক্তি।তিনি নীরব-নিভৃতে অসীম সাহসী কর্মবীরের মতো সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যে আমৃত্যু প্রকৃত কর্মসৃজন করেছিলেন। প্রদর্শণ বাতিকতা বা প্রবনতা অনুপস্থিত ছিলো তাঁর কাজের মধ্যে।নিজেকে প্রচার ও প্রকাশের ধারধারি ছিলেন না কখনও।ছিলেন একেবারেই প্রচারবিমুখ নিভৃতচারী। এই অকৃত্রিম প্রগতিশীল লোকটি মহান মুক্তিযুদ্ধের নিষ্ঠাবান সংগঠক। ছিলেন খেটে খাওয়া মানুষের পরম নির্ভরতার আশ্রয়স্থল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী,বন্ধুবৎসল ও সৎসাহসের মূর্ত প্রতিক।

কমরেড শ্রীকান্ত দাশ ১৯২৪ সালের ০৫,জুলাই শনিবার সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার আঙ্গারুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর পিতা যোগেন্দ্র কুমার দাশ ও মাতা জ্ঞানদায়িনী দাশ।জন্মের আটদিনের মধ্যে তিনি মাতৃহারা হন।দাদা তাকে লালনপালন করেন।পাঠশালা শেষে নবীগঞ্জ হাই স্কুলে ভর্তি হন।রাজনৈতিক কারণে তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়।পরে লউলারচর মধ্যবঙ্গ স্কুলে অধ্যয়ন করেন।নানা প্রতিকুলতায় ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা-শিক্ষাগ্রহণ সম্ভব হয় নি।তবে প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাগ্রহণের ধারাবাহিকতায় ঠিকে না থাকলেও;প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ ও বিদ্যমান সমাজবাস্তবতা থেকে পাঠগ্রহণ থেমে থাকেনি।জীবনব্যাপী নিরবধি স্বসাধানায় নিজেকে প্রগতিশীল-সাম্যবাদী জ্ঞান-গরিমায় সমাসীন করেছিলেন।এতে কোনো কার্পণ্য ও অলসতা ছিলো না কিংবা বাস্তবজীবনে ঝিমিয়ে পড়েন নি।তাঁর বিদ্যা-জ্ঞান ও প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার দ্যূতি ছড়িয়ে ছিলেন অন্যদের মধ্যে।বিপ্লবী ধারার সাংস্কৃতিক ও আদর্শবাদী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আবির্ভূত হয়েছিলেন ভিন্নমাত্রায়।এবং অনবদ্য অনন্য উচ্চতায়।গণসংস্কৃতি,গণসঙ্গীত ও সমাজতন্ত্রের মহান আদর্শে নিমগ্ন হয়ে ঝুকে পড়েন।গভীর মনোনিবেশ করেন।তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন,এইসব বিষয়ে অবদান না রাখতে পারলে,প্রগতিশীল সমাজতান্ত্রিক-সাম্যবাদী সমাজ কোনোভাবেই বিনির্মাণ করা সম্ভব নয়।তাঁর মধ্যে দুরদর্শীতা ও বিচক্ষণতা ছিলো বলেই তিনি বোঝতে পেরেছিলেন।প্রকৃত অর্থে এমনই অগ্রসর চিন্তার মানুষ ছিলেন প্রয়াত কমরেড শ্রীকান্ত দাশ।

দেশের স্বাধীনতা!মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিলো।এদেশের গণমানুষ পাকিস্তানি হায়েনা-শোষকদের বিরুদ্ধে ক্রমশই মাথা উঁচু করে সরব ও সোচ্চার হতে থাকে।মানুষের সামগ্রিক অধিকার আদায়ের নিমিত্ত সুপ্তাবস্থা থেকে জাগিয়ে উজ্জিবিত করতেন স্ব-স্ব এলাকার অগ্রসর মানুষজন।প্রতিটি অঞ্চলে স্বল্প সংখ্যক নেপথ্যের কারিগর ছিলেন।যাঁরা নীরবে-নিভৃতে সংগঠক হিসেবে কাজ করতেন।কমরেড শ্রীকান্ত দাশ ছিলেন সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলে আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম কারিগর।ভাষা আন্দোলনসহ মহান মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালে শুরু হওয়ার আগেপরে তিনি মুখ্য সংগঠকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের আবর্তে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশমাতৃকার জন্যে নিজেকে মনেপ্রাণে সমর্পিত-নিবেদিত করেছিলেন।

কমরেড শ্রীকান্ত দাশ একজন দেশপ্রেমিক খাঁটি মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন। মা-মাটি ও গণমানুষকে ভালোবাসতেন।এ কারণেই পাকবাহিনী,দেশীয় লুটেরা-দালাল,আল-বদর,আল-শামস ও রাজাকার-কুলাঙ্গারদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত এবং স্বাধীন করার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে দেশমাতৃকার প্রবল টানে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে গণমানুষকে মুক্তিসংগ্রামে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেন এবং সময়ের প্রয়োজনে নিজেই সম্মুখসারির মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে একনিষ্ট হয়ে সম্মুখসমরে অংশ নিয়েছেন।এতৎবিষয়ে সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী তাঁর ‘ভাটি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ ও আমার অহংকার’ বইতে ‘হাতে নিলাম রাইফেল..’ ৭১-৭২ পৃষ্ঠায় নির্মোহভাবে লিখেছেন ‘ওর দায়িত্ববোধ দেখে মাথা নত হয়ে এলো’।বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রীকান্ত দাশ’র যুদ্ধদিনের এমন তথ্য-উপাত্ত দেখতে পাওয়া যায় বিভিন্ন লেখকের বইয়ের মাধ্যমে।’মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জ’ সংকলনে- মো.আলী ইউনুছ ‘সশস্ত্রযুদ্ধে উত্তোরণ: অপারেশন ঘুঙ্গিয়ারগাওঁ ও দিরাই’ পৃষ্ঠা-১১-এ।’দাস পার্টির খোঁজে’ লেখক- হাসান মোরশেদ পৃষ্ঠা-২১-২২-এ।’সুনামগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধ’লেখক- রনেন্দ্র তালুকদার পিংকু পৃষ্ঠা ৫৫-৫৬-এ।এছাড়াও ব্যক্তি বিশেষের বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও স্মৃতিচারণমূলক লেখা এবং মৌখিক বর্ণনায় কমরেড শ্রীকান্ত দাশ’র মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অনবদ্য অবদানের স্মৃতি ও কর্মের সাক্ষর পাওয়া যায়।দেশ স্বাধীনের পর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি বা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিসনদ গ্রহণ না করলেও পরবর্তীতে ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন এর গ্যারিলা বাহিনীর তালিকায় তাঁর নাম তালিকাবদ্ধ হয়।এবং তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসবে গ্যাজেটভুক্ত হন।কমরেড শ্রীকান্ত দাশ মৃত্যুবরণ করার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে শাল্লায় তাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করার হয়।প্রকৃত অর্থে জনযোদ্ধাদের ত্যাগ-তিতিক্ষার ফলেই আজকের এই বাংলাদেশ।দেশ স্বাধীনের পর সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বহমান ধারার সংগঠন সমুহের সাথে, বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ের কাজে আজীবন ব্যপৃত ছিলেন।আমৃত্যু লাল নিশানের ঝাণ্ডা উড়িয়েছেন বাংলার শহরে-গ্রামে,পথে-প্রান্তরে।

কমরেড শ্রীকান্ত দাশ ১৯৪২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হয়ে কাজ শুরু করেন।রাজনৈতিক তালিম নেন কমরেড বরুন রায়ের বাবা করুনা সিন্দুর রায়ের কাছ থেকে।ধারাবাহিকভাবে সাম্যবাদী আদর্শের সাথে যুক্ত থেকে কাজ করেছেন।তাঁর দাদা,বাবাও কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি অনুগত ছিলেন।গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলন ১৯৬৮ সালে শাল্লার আঙ্গারুয়া গ্রামে কমরেড শ্রীকান্ত দাশ’র বাড়িতে হওয়ার কথা।কমরেড শ্রীকান্ত দাশ’র ঘরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় প্রতিবেশি জগৎচন্দ্র দাশ’র লাকাড়ী অর্থাৎ বাড়ির বাইরের ঘরে অনুষ্ঠিত হয়।কমরেড অনিল মুখার্জি,আব্দুস সালাম(বারীণ দত্ত) এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।কমরেড বরুণ রায় ঐ সম্মেলনের মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টি সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক হন।

কমরেড শ্রীকান্ত দাশ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন ১৯৭২ সালে। মুলত গণসাংস্কৃতিক কর্মের প্রতি তাঁর প্রবল ঝোঁক ছিলো। তিনি নিজে গান রচনা ও সুরারোপ করে গাইতেন। নাটকে অভিনয় করতেন, নাটকও লিখতেন। অর্ধশতাধিক গান লিখেছেন, সুর দিয়ে গেয়েছেন। গণসঙ্গীতের মোহে আবিষ্ট ছিলেন। ছিলেন গণসঙ্গীত প্রেমিক ও দারুণ সমজদার। গণসঙ্গীতকে শোষণ ও মানুষের মুক্তির শক্তিশালী হাতিয়ার মনে করতেন। ছিলেন গণসঙ্গীতের আপাদমস্তক শিল্পী। তাঁর স্বরচিত সাড়াজাগানো সঙ্গীতের মধ্যে-

এক.
কাউয়ায় ধান খাইল রে; খেদানোর মানুষ নাই
কামের বেলা আছে মানুষ খাইবার বেলা নাই ।
রাউয়ালপিন্ডি ঢাকার শহরে(বাংলাদেশের রাজধানীতে)কাউয়ায় করছে বাসা
সেইখান থেকে শোষন করে দেশের গরীব চাষা ।।
কাউয়ার বাড়িত দালান কোটা আরো টিনের ছানি
খরের ছানি ঘর আমার খাই শীলার পানি ।।
চাল নাই,ডাল নাই ঘটিত নাইরে তেল
সারাদিনের কামাই আমার কাউয়ায় লইয়াগেল ।।
ধূর্ত কাউয়া চিন্যা লও ভাই বাঁচতে যদি চাও
নইলে খাটবায় জীবন ভরা পাইবায় না আর ভাও ।।

দুই.
আউল্লা জাউল্লা বর্শিবাউরা উইচ্ বাউরা আর কুইচ্ বাউরা ;
দিনে আইন্যা দিনে খাউরা,আয়রে সবে আয়রে ছুটে ভাইরে,
এলড়াই বাঁচার লড়াই, দেরীর সময় নাইরে।
মহালদারদের সাথে মোদের বাইধাছে লড়াই রে ;
জিতলেই বাঁচব বাঁচার মতো,নইলে উপায় নাই রে ।।
যখন কাম থাকেনা বাইষ্যামাসে,হাওরে মাছধরে কোনমতে;কাটাই জীবন,না-খাইয়া আর আধ-খাইয়া-
তাও তাদের সয়নারে ভাই,বাইধাছে তাই ন্যায়ের লড়াই।
না খাইয়া প্রায় মইরাই আছি,মরনের ভয় নাইরে।।
যারা হাওরের মাছ লুঠ কইরা,মোদের মুখের খাওয়ন কাইড়া,
টাকার বেটা বইন্যা মালদার,পায়না গায়ে তালরে-
আমরা সবাই মিল্লা গ্রামে, গ্রামে কমিউনিস্টপার্টী বানাইয়া
খোদার বিল খোদার আদেশকে দিব আজ বুঝাইয়া-
আইন সভায় বিল তুলিব কোন আপোষ নাইরে- ।।

তিন.
আমার অধিকার দিতে হবে আজ, পেয়েছি এবার আমার পরিচয়, আমার পরিচয় ।।
আমি আদম সন্তান,আদম সন্তান, আদম সন্তান
সাম্যের তরে পেয়েছি আমার বাঁচার অধিকার,
দাসখত দিয়ে বাঁচিতে আমি দেইযে ধ্বিকার। দেইযে ধ্বিকার ।।
আমি মজুদুর কিষাণ, মজুদুর কিষান, মজুদুর কিষাণ
দিন রাত খেটে ভাত নাই পেটে, করি হাহাকার ,
জুর জুলুমের কুড়ব কবর, গড়ব গণরাজ, গড়ব গণরাজ ।।
আমি মৃত্যুঞ্জয়, মৃত্যুঞ্জয়, মৃত্যুঞ্জয়
জন্মের সাথে পেয়েছি মৃত্যু, মৃত্যুরে নাই ডর, সাম্যবাদ গড়ব এবার, বদ্ধ পরিকর। বদ্ধ পরিকর ।।…

এমন অনেক জনপ্রিয় সঙ্গীত তাঁর রয়েছে। মানুষের অধিকার আদায়ে ‘মুই ভূখানাঙ্গা’ নাটকে অভিনয় করে তৎসময়ে সরকারের রোষানলে পড়ে জেল খেটেছেন। বৃটিশ-বেনিয়া বিরোধী আন্দোলন, ভাষার জন্যে লড়াই এবং মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বিশেষ করে খেটে-খাওয়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে গান গাইতেন। ‘গণনাট্য সংঘ’ ‘কলকাতা ইয়ুথ কয়্যার’ এর গান ভালোবাসতেন এবং গাইতেন।নিজের বাড়িতে প্রায়ই গানের আসর বসাতেন। সুরমা উপত্যকায় ১৯৪২ সালে অষ্টম কৃষক সম্মেলনে গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন। নেত্রকোনায় অল ইণ্ডিয়া কৃষক সম্মেলনে ১৯৪৫ সনে যোগদেন। তিনি ১৯৭০ সালের দুর্ভিক্ষের সময় গণসঙ্গীত গেয়ে-গেয়ে দুর্গতের জন্যে গণসাহায্য সংগ্রহ করেছেন।তাঁর গাওয়া গণসঙ্গীতের প্রশংসা করছেন কমরেড মনি সিংহ, সত্যেন সেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশে ও ভারতে উভয় যায়গায় তাঁর গোপন বিচরণ ছিলো।যুদ্ধে যাওয়ার জন্যে যুবকদের উদ্ধুদ্ধ করেছিলেন।মূলত প্রকৃত সংগঠকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।অবশেষে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ১৯৭১ সালের ০৫ জুলাই শাল্লা অপারেশনে সম্পৃক্ত হয়ে যুদ্ধ করেন।অনেকের মতো যুদ্ধের সময় ভারতে অবস্থান করে ‘তাস’ খেলে ও ‘মদপান’ করে বিকৃত আনন্দে সময় কাটান নি। কমরেড শ্রীকান্ত দাশ’র মতো দেশপ্রেম বুকে ধারণ করে শপথ নিয়ে যাঁরা যুদ্ধে গিয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন তাঁরাই প্রকৃত ও খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা।শাল্লায় গ্রামের পর গ্রামগুলো রাজাকারদের তাণ্ডবে পুরে ছাড়খার হয়;তখন গ্রামের সাধারণ মানুষদের নিয়ে ভারতের ‘বালাট’ শরণার্থী ক্যাম্পে উঠেও তাঁর কন্ঠ থেমে থাকেনি। সুর তুলেছেন গণজাগরণের। মুক্তির চেতনায় উদ্দীপ্ত করেছেন মানুষকে।তিনি গান করেন-‘ভুট্টো দেখরে চাহিয়া,নিক্সন দেখরে চাহিয়া; বাংলার মানুষ ঘুমে নাইরে উঠছে জাগিয়া। ২৫শে মার্চ রাত্রিকালে ছিল বাঙ্গালীরা ঘুমের ঘোরে,এমন সময় মিলিটারি দিলায় তোমরা লেলাইয়া’ এমন তথ্য উঠে এসেছে অ্যাডভোকেট বজলুল মজিদ খসরু কর্তৃক ‘রক্তাক্ত-৭১’ বইয়ের ১৫৩ পৃষ্ঠায়।যুদ্ধ চলাকালে বাবু মহেন্দ্র মাস্টারের ধানের বাড়াল থেকে গোলাভর্তি ধান খেটে-খাওয়া, ভূখানাঙ্গা মানুষকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।স্বাধীনের পর কমরেড শ্রীকান্ত দাশ এবং কমরেড প্রভাংশু চৌধুরীকে আসামি করে ১৯৭২ সালে লুটপাটের মামলা দেওয়া হয়েছিলো।আইনগতভাবে মোকাবেলা করে মুক্ত হয়েছিলেন মামলা থেকে।

ব্র্যাক একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ।তিনি অতিক্ষুদ্র পরিসরে ১৯৭২ সালে সুনামগঞ্জের শাল্লার আনন্দপুর(ঘুঙ্গিয়ারগাঁও)ব্র্যাকর প্রথম প্রকল্প শুরু করেন।থাকতেন শাল্লা ডাকবাংলোতে।’গণ কেন্দ্র’ নামে ব্রাকের একটি অনিয়মিত প্রকাশনা বের হতো।শুরুর সময়ে তিনি ভাটি অঞ্চলের প্রবাদপ্রতিম গণমানুষের নেতা কমরেড বরুণ রায়,কমরেড শ্রীকান্ত দাশ,কৃষক সমিতির রমানন্দ,ক্ষেতমজুর সমিতির অমর চাঁন দাস,পল্লীচিকিৎসক মনোরঞ্জন দাশ,উমেশ চক্রবর্তীর সাথে যোগাযোগ করেন।পরামর্শ,মতামত ও সহযোগিতা চাইলে তাঁরা স্যার ফজলে হাসান আবেদকে ব্র্যাকের শুরুর সময় সার্বিক সহযোগিতা করেছিলেন।আজ এই ব্রাক একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান।কমরেড শ্রীকান্ত দাশ ব্র্যাকের প্রথম প্রকল্পের কাজে সরাসরি জড়িত থেকে অবদান রেখেছিলেন।এছাড়াও তিনি সমাজসেবার মনোভাবে অন্যান্য সামাজিক সংগঠনকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছিলেন,জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও।

কমিউনিস্ট পার্টির গণসংগঠন উদীচী। শাল্লা উদীচীর প্রতিষ্ঠা থেকে কেন্দ্রীয় উদীচী’র সাথে যুক্ত থেকে কাজ করেছেন।কেন্দ্রীয় উদীচী’র উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।পদ-পদবী পাওয়ার কোনো আকাঙ্খা তাঁর মধ্যে লক্ষণীয় ছিলোনা।তবে যেসময় যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন,তা সুচারূপে পালন করেছেন।বিপ্লবী শৃঙ্খলা মেনে চলতেন এবং অন্যদেরকেও মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করতেন।অর্থাৎ আদর্শ ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে ছিলেন একেবারেই অন্তপ্রাণ।সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন সোপান।এই সোপান ২০০২ সালের ১৪ এপ্রিল কমরেড শ্রীকান্ত দাশকে ‘ভাষাসৈনিক’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক’ হিসেবে সম্মাননা ও অনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।

কমরেড শ্রীকান্ত দাশ মরণোত্তর দেহদান করার সিদ্ধান্ত নিয়ে হলফনামা সম্পাদন করেন ০৬,অক্টোবর ২০০৪ সালে।এই হলফনামার লিখিত বিবরণ ও হলফকারীকে সনাক্ত করেন অ্যাডভোকেট এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম।এবং হলফনামাখানা নোটারি করেন অ্যাডভোকেট মো. রাজ উদ্দিন।আইনগতভাবে মরণোত্তর দেহদানের প্রতিশ্রুতির ০৫ বছর পর ১৯নভেম্বর,২০০৯ সালে বৃহস্পতিবার কমরেড শ্রীকান্ত দাশ মৃত্যুবরণ করেন।তাঁর ছোটো ছেলে প্রশান্ত তখন উচ্চশিক্ষার জন্যে যুক্তরাজ্যে।আমি ছাত্রআন্দোলন থেকে তখন সদ্য যুবআন্দোলনে জড়িত হয়েছি।সবাইকে মৃত্যুবার্তা জানানো হয়।কমরেড শ্রীকান্ত দাশ মরণোত্তর দেহদান করেছেন।মরদেহ সিলেট এমএজি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হস্তান্তর করতে হবে।ঐসময়ে সিপিবি সিলেটের সভাপতি ছিলেন কমরেড বেদানন্দ ভট্টাচার্য ,সাধারণ সম্পাদক কমরেড আনোয়ার হোসেন সুমন এবং সহকারী সম্পাদক কমরেড ইফতেখারুল হক পপলু।যুব ইউনিয়ন সিলেটের সভাপতি অ্যাডভোকেট রমেন্দ্র কুমার চন্দ,সাধারণ সম্পাদক বিএইচ আবির এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ মনির উদ্দিন ছিলেন।ছাত্র ইউনিয়ন সিলেট জেলা সংসদের সভাপতি রাজীব চক্রবর্তী ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন দীপন চন্দ্র সরকার।ছাত্র ও যুব ইউনিয়ন মরদেহ হস্তান্তর কাজে সার্বিকভাবে সহায়তা করে।

সিলেটের সিপিবি মরদেহ হস্তান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করে।ঐদিন ছিলো রবিবার,২২নভেম্বর,২০০৯ খ্রিস্টাব্দ।সকালেই যাঁর যাঁর মতো করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান গেইট সম্মুখে সিলেটের সিপিবি,ছাত্র ইউনিয়ন,যুব ইউনিয়ন,উদীচী,খেলাঘরের নেতাকর্মী এবং অন্যান্য প্রগতিশীল সংগঠনের লোকজন জড়ো হন।তখন সময় সকাল দশটা হবে।প্রয়াত কমরেড শ্রীকান্ত দাশ’র পরিবারের লোকজন মরদেহ নিয়ে উপস্থিত।মরদেহ হস্তান্তর করার জন্যে সিপিবি একটি কালো কাপড়ের ব্যানার নিয়ে আসে।ব্যানারসহযোগে শোকর্যালির মাধ্যমে আমরা হাসপাতালে প্রবেশ করি।ঐসময় ছিলেন ব্যারিস্টার মো. আরশ আলী,বেদানন্দ ভট্রাচার্য,পুরঞ্জয় চক্রবর্ত্তী বাবলা,ডা. সুকান্ত মজুমদার,মইনুদ্দিন আহমদ জালাল,সমর বিজয় সী শেখর,গিয়াস উদ্দিন,প্রণতি চক্রবর্ত্তী,আনোয়ার হোসেন সুমন,রমেন্দ্র কুমার চন্দ,ইফতেখারুল হক পপলু,বিএইচ আবির,মোহাম্মদ মনির উদ্দিন, নিরঞ্জন দাস খোকন,রাজীব চক্রবর্তী,দীপন চন্দ্র সরকার।মরদেহ হস্তান্তরের সময় পরিবারের পক্ষে কমরেড শ্রীকান্ত দাশ’র বড়ো ছেলে দুরন্ত দাশ,জামাতা মানিক লাল তালুকদার,মানিক লাল দাশ,সেবক রঞ্জন দাস,মৌসুমী তালুকদার তন্বী,মানসী তালুকদার অ্যানী,মিথুন তালুকদার,মনি তালুকদার,রিন্টু দাশ এবং অপরাপর উপস্থিত ছিলেন।লাশ হস্তান্তর পক্রিয়ার সময় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তৎকালীন অধ্যক্ষ (অধ্যাপক) ডা. এমএ আহবাব,তাঁর সহকর্মীসহ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের একটি দল নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মরদেহ গ্রহণ করেন।মরণোত্তর দেহদানের আনুষ্ঠানিকতা সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্যে এই দিনটি একটি ঐতিহাসিক দিন।কারণ এটিই প্রথম এই হাসপাতালের মরণোত্তর মরদেহ গ্রহণেরএকটি দিন।ইতোপুর্বে কেউই এই হাসপাতালে মরদেহ দান করে নি।

কমরেড শ্রীকান্ত দাশ’র প্রয়াণে কমিউনিস্ট পার্টি সিলেটের উদ্যোগে ২২ জানুয়ারি ২০১০ সাল শুক্রবার একটি শোকসভা সিলেট সিটি কর্পোরেশনের হলকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন সিপিবি সিলেটের সভাপতি কমরেড বেদানন্দ ভট্রাচার্য,শোকসভা পরিচালনা করেন কমরেড আনোয়ার হোসেন সুমন।এই সভায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি পক্ষে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জননেতা কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমদ এবং হায়দার আকবর খান রনো।সিপিবি সুনামগঞ্জ কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড রহমান মিজান,প্রভাংশু চৌধুরী,ব্যরিস্টার মো. আরশ আলী,ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ,পুরঞ্জয় চক্রবর্তী বাবলা,এনায়েত হাসান মানিক, প্রফেসর প্রাণকান্ত দাস এবং ছাত্র ইউনিয়ন, যুবইউনিয়ন, খেলাঘর, উদীচী, সিপিবি লোকজন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও শোকসভায় কমরেড শ্রীকান্ত দাশ’র স্ত্রী ছায়া রানী দাশ, বড়ো ছেলে দুরন্ত দাশ, বড়ো মেয়ে আল্পনা তালুকদার, মানিক লাল তালুকদার, দ্বীপা দাশসহ অপরাপর স্বজন শাল্লা থেকে এসে উপস্থিত হন। প্রয়াত কমরেড শ্রীকান্ত দাশ’র বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের উপর ‘দ্রোহী সংসপ্তক’ নামে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়।

কমরেড শ্রীকান্ত দাশ শারীরিকভাবে হয়তো আজ নেই।তবে সুমহান কর্ম,স্মৃতি,অবিনাশী প্রেরণা ও সাম্যবাদী মহান আদর্শ বিদ্যমান আছে।এবং থাকবে।তাঁর চেতনার আদর্শ সমাজতান্ত্রিক ধারা বহমান রয়েছে।তিনি ছিলেন সত্য-সাহস,মনন-মগজে মাথা উঁচিয়ে ঋজু হয়ে পথ চলার এক অনন্য আলোকবর্তিকা।তাঁর বিশ্বাসের আদর্শিক প্রাণস্পর্শ অনন্য বাতিঘর হয়ে আলো দেখাবে নববিপ্লবীদের।ন্যায়-নীতি,সৎ ও সততার বিপ্লবী হয়ে রইবেন যুগ-যুগান্তর।আজীবন বিপ্লবীধারার কাজে নিজেকে সমর্পিত করেছিলেন।অনন্যসাধারণ সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব হিসেবে অনন্যমাত্রায় অধিষ্টিত করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন।রেড স্যালুট প্রিয় কমরেড শ্রীকান্ত দাশ!

লেখক :: মোহাম্মদ মনির উদ্দিন অ্যাডভোকেট, প্রাক্তন সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সিলেট জেলা কমিটি


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 238
    Shares