রবিবার, জানুয়ারি ১৭

রাবিতে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করার নারী শিক্ষককে অপসারণ, ঘটনাটির যথাযথ তদন্ত হোক

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 17
    Shares

রাশেদ মেহেদী:: এবারের বিশ্ব নারী দিবসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গা শিউরে ওঠার মত একটি ঘটনা ঘটেছে। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করার দায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য একজন নারী শিক্ষককে প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ছেন। এর পেছনে শিক্ষক রাজনীতি’র অন্যকিছু সক্রিয় থাকার দাবি অনেকেই তুলতে পারেন। বিশেষ করে শিক্ষক রাজনীতি’র ঝানু খেলোয়াড়রা গভীর রহস্যময় হাসি দিয়ে কিংবা অতিমাত্রায় ভ্রু কুঁচকে বলতে পারেন, ‘ঘটনা এত সরল নয়’। কিন্তু আমরা আমজনতা ঘটনার পরম্পরা সরলভাবেই দেখতে চাই।

সংবাদমাধ্যমে ঘটনার বিস্তৃত বর্ণনা দিয়ে খবর ছাপা হয়েছে যেখানে ওই নারী শিক্ষকেরও বক্তব্য আছে। এ খবরের জন্য উপাচার্যের বক্তব্য চেষ্টা করেও সাংবাদিকরা নিতে পারেননি, খবর প্রকাশের খবরটা উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অস্বীকারও করেনি। অতএব সরলভাবে আমরা এটাই বুঝি যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলে একজন শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি করার প্রতিবাদের প্রতিশোধ হিসেবেই উপাচার্য বিশ্ব নারী দিবসের দিনই ওই নারী শিক্ষককে ছাত্র উপদেষ্টার প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছেন! সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে যৌন হয়রানির প্রতিবাদে একজন নারী শিক্ষকের প্রতি এত ভয়ংকর প্রশাসনিক অবিচার কিংবা অন্যায় এর আগে কখনও হয়েছে বলে আমার জানা নেই। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হচ্ছে, এ ঘটনায় আমাদের নারী সমাজ, বিশেষ করে যারা বেশ আয়োজন করে নারী দিবস উদযাপন করেন, নারীর প্রতি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অন্যায়, অত্যাচার নিয়ে গোলটেবিল আলোচনা, টক শোতে বক্তব্য দেন তাদেরও সোচ্চার হতে দেখিনি।

বিশ্ব নারী দিবসে ছাত্র উপদেষ্টার পদ থেকে নারী শিক্ষককে অপসারণ নিয়ে দু’টি সংবাদমাধ্যমে দু’ধরনের খবর ছাপা হয়েছে। দেশের বহুল প্রচারিত একটি সংবাদপত্রের খবরের শিরোনাম ছিল ‘মেয়ের শ্নীলতাহানির বিচার চাইতে গিয়ে বিপাকে রাবি শিক্ষক।’ এই খবরে মোটামুটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলে একজন ছাত্রীকে শ্নীলনতাহানির অভিযোগে ওই স্কুলেরই একজন শিক্ষককে ২০১৯ সালের ২০ অক্টোবর গ্রেফতার করা হয়। এরপর তিনি জামিনে কারাগার থেকে বের হন গত ১২ ডিসেম্বর। জামিনে বের হয়ে এই শিক্ষক নিয়মিত স্কুলে যেতে থাকেন। যে কারণে হয়রানি, নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে সংবাপদপত্রে খবর প্রকাশিত হলে একজন আইনজীবীর রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টে দ্রুত অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর গত ৫ মার্চ ওই অভিযুক্ত স্কুলশিক্ষককে বরখাস্তের কথা জানায় কর্তৃপক্ষ। এ সংবাদে অপসারিত ছাত্র উপদেষ্টার বক্তব্য নেওয়া হয়েছে এবং উপাচার্যের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার এই বর্ণনা থেকে দেখা যাচ্ছে, শ্নীলতাহানির ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত স্কুলের ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা নেয়নি, এমনকি ঘটনার তদন্ত করারও উদ্যোগ নেয়নি। বরং তারা অভিযুক্ত শিক্ষককে অবাধে স্কুলে আসতে দিয়ে প্রমাণ করেছে কর্তৃপক্ষের অবস্থান অভিযুক্তের পক্ষেই ছিল, নির্যাতিতের পক্ষে নয়। যখন হাইকোর্টের নির্দেশে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হল, তখন এ ঘটনায় যিনি শুরু থেকে প্রতিবাদী ছিলেন সেই ছাত্র উপদেষ্টার পদে থাকা নারী শিক্ষককে বিশ্ব নারী দিবসের দিনে সরিয়ে দিয়ে প্রতিশোধ নিয়েছেন! বলা যায়, হাইকোর্টের আদেশের বিপরীতে উপাচার্য তার ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন!

অপর একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘রাবির ছাত্র উপদেষ্টার অব্যাহতির নেপথ্যে’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করেছে। এ খবরে স্কুলে কী ঘটেছিল তার কোনো তথ্য না দিয়ে সরাসরি অপসারিত ছাত্র উপদেষ্টা নারী শিক্ষককে আক্রমণ করা হয়েছে। শিক্ষকের উদ্ধৃতি না দিয়ে কিংবা বিশ্বাসযোগ্য কোন সূত্র উল্লেখ না করে রিপোর্টার অনেকটা নিজ দায়িত্বেই বলে দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, কারণ ছাত্র উপদেষ্টার মেয়েকে তিনি বিয়ে করতে রাজি হননি। এখানে অপসারিত ছাত্র উপদেষ্টার বক্তব্য নিছকই দায়সারাভাবে দেওয়া হয়েছে, উপাচার্যের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে কি’না তাও বলা হয়নি। বরং এর আগে তিনি আরও একাধিক শিক্ষকের অনৈতিক কর্মকান্ডের ফোনলাপ প্রকাশের সঙ্গে জড়িত থেকে গ্রুপিং সৃস্টি করতে পারেন -এমন আশংকার কথাও নিজ দায়িত্ব নিয়ে রিপোর্টার বলে দিয়েছেন। রিপোর্টটা পড়ে উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠির মুখপাত্র কিছু দৈনিকে যেভাবে নারীদের আক্রমণ করা হয় তার চিত্রই পাওয়া গেছে। প্রথম সারির একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম হলেও এখানে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি, সেটা যেকোন সচেতন পাঠকই বুঝতে পারেন।

আমার কাছে সৎসাহসটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উপাচার্য ছাত্র উপদেষ্টাকে কেন সরিয়েছেন সৎসাহস নিয়ে তার কোনো উপযুক্ত কারণ দেখাতে পারেননি, বরং এ ব্যাপারে বক্তব্য না দিয়ে সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলে প্রমাণ করেছেন এ ব্যাপারে উপযুক্ত কারণ ব্যাখা করার সৎসাহস তার নেই। বরং অপসারিত উপদেষ্টা দৃঢ়তার সঙ্গেই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এবং নিজের অবস্থানও ব্যাখা করেছেন। এক্ষেত্রে একজন সচেতন মানুষের কাছে ছাত্র উপদেষ্টাই স্বচ্ছ অবস্থানে আছেন বলে প্রমাণিত হয়।

অনেকে বলতেই পারেন, আপনি ছাত্র উপদেষ্টার পক্ষ নিয়েছেন। কিন্তু যুক্তির বিচারে পুরো ঘটনা বিশ্নেষণ করলে উপাচার্যের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় কি? উপাচার্য যদি স্বচ্ছতার সঙ্গে নিজের অবস্থানের ব্যাখা দিতেন, তাহলে তার সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তিও সামনে আসতে পারত। কিন্তু সেটা তিনি করেননি। বরং এখানে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। মেয়ের সঙ্গে বিয়ে না হওয়ার কারণে এ ধরনের মামলা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক করতে পারেন, সেটা কি যুক্তিযুক্ত? বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এতটা অবোধ, এটা যারা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, তারা কতটা সুস্থ মানসিকতার? যে শিক্ষকরা এই বিয়ের ঘটনা নিজেদের আড়ালে রেখে সাংবাদিকদের বলছেন, তারা সামনে এসে সৎসাহস নিয়ে বলছেন না কেন? ঘটনার পর কেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করল না? তদন্তের মাধ্যমে সাক্ষ্য-প্রমাণ সহ সত্য উঠে আসলে কারও কিছু বলার থাকত না। ঘটনার শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীল আচরণ করেননি, এটা সাধারণের সামনে স্পষ্ট হয়ে গেছে।

আর হাইকোর্টের নির্দেশে যৌন হয়রানিতে অভিযুক্ত শিক্ষককে বরখাস্ত করতে বাধ্য হওয়ার পরই ওই নারী শিক্ষককে ছাত্র উপদেষ্টার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা কি প্রমাণ করে? স্পষ্ট প্রমাণ করে অভিযুক্ত শিক্ষকের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব এবং প্রতিবাদী শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ। উপাচার্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক নন। তিনি সমাজের অগ্রসর, অনুকরণীয় ব্যক্তিদের একজন। আমরা সেভাবেই উপাচার্য চরিত্রকে চিনতে চাই। কিন্তু এই জাতির দুর্ভাগ্য হচ্ছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য মহোদয়রা এমন সব বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিচ্ছেন যে ভবিষ্যতে কোন সচেতন, আত্মমর্যাদা সম্পন্ন শিক্ষক সম্ভবত, এ দায়িত্ব আর নিতে চাইবেন কি’না তা নিয়েই সন্দেহের সৃস্টি হচ্ছে।

আমাদের দেশে মেয়েদের দোষ দেওয়াটাই রীতি। একজন মেয়ের বখাটের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহত্যা করার পর সমাজের তথাকথিত মুরুব্বীরা ওই মেয়েটিকেই ‘বদ মেয়ে’ আখ্যা দিয়ে কবর পর্যন্ত দিতে বাধা দেয়, এমন ঘটনাও মাঝে মধ্যেই দেখা যায়। ভয়ংকর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বখাটেদের কখনই ‘বদ ছেলে’ বলেছে এমনটা শুনি না। বরং ছেলেদের একটু দোষ থাকতেই পারে, এমন নোংরা যুক্তি দিয়ে বখাটেপনা, যৌন হয়রানিকে উৎসাহিত করার দৃষ্টান্ত এ সমাজে এখনও স্বাভাবিক ঘটনা। এখন এ ধারায় সম্মানিত একজন উপাচার্যের যুক্ত হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নারীর নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন মানুষকে সত্যিই বড় উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দেয়।

আমার মনে হয়, সরকারের উচিত এ ঘটনায় নজর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা। যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সত্য জাতির সামনে উপস্থাপন করা। প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হলে, সচেতন মানুষ অনেকটা উদ্বেগমুক্ত হতে পারবেন।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 17
    Shares