বুধবার, জানুয়ারি ২০

রাজা সীতারামের বসতবাটি

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 12
    Shares

অধিকার ডেস্ক:: সূর্য অনেকটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ছে। মোটরসাইকেলে চালিয়ে যাত্রা শুরু করেছি। গন্তব্য রাজা সীতারাম রায়ের বাড়ি। আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে ১৫ কিলোমিটার পথ। দুই পাশের সবুজ গাছের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা পাকা সড়ক চলে গেছে। এক পাশে নবগঙ্গা নদী বয়ে চলছে। ২০ মিনিটের পথ পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছলাম সেই রাজার বাড়ি।

পুরোনো সে বাড়ি দেখলেই বোঝা যায়, যৌবনে তার রূপ ছিল, লাবণ্য ছিল। ছিল জাঁকজমকপূর্ণ এক সোনালি অধ্যায়। এখন জৌলুশহীন সে বাড়ির সামনের বিশাল খোলা মাঠের ওপর এক পুরোনো মন্দির তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। মাঠে খেলছে শিশুরা। মাঠের আরেক পাশে রাজবাড়ির প্রধান ফটক। হাতি কিংবা সিংহ ছাড়া রাজবাড়ির প্রধান দরজার তেমন শোভা থাকে না। সীতারামের বাড়ির প্রধান ফটকের মুখেও তাই দুই হাতির শুঁড়খচিত নকশা। বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে থাকবে নকশা—এটি ছিল একসময় এই অঞ্চলের স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য। সে সূত্র মেনে, এখন রূপ-লাবণ্যহীন সীতারামের বাড়ির ভেতরের কক্ষগুলোতে বিভিন্ন ধরনের নকশা দেখা গেল।

রাজবাড়ির পেছনে এক বিশাল দিঘি, নাম দুধসাগর। দূরে আরও একটি দিঘি আছে বলে জানা গেল লোকজনের কাছ থেকে। বাড়ির সিংহদরজা বন্ধ। তাই ভেতরে ঢোকা গেল না। বাইরে থেকে ভাঙা জানালা দিয়ে উঁকি মেরে যতটুকু নজরে পড়ে, ততটুকুই দেখা গেল। ভেতরে ঢুকে দেখা না গেলেও বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে দেখা পাওয়া যাবে রাজবাড়ির বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ।

বাংলার কয়েকজন বিখ্যাত জমিদারের ইতিহাস আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম মাগুরার রাজা সীতারাম রায়। অর্থে–বিত্তে তিনি ছিলেন বেশ বড় মাপের জমিদার। সে কারণেই মানুষ তাঁকে রাজা ডাকে আর তাঁর বাড়িকে রাজবাড়ি। জানা যায়, রাজা সীতারাম ১৬৯৭-৯৮ সালের দিকে মহম্মদপুরে জমিদারির পত্তন করেন। তাঁর জমিদারি পাবনা জেলার দক্ষিণভাগ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত এবং বরিশাল জেলার মধ্যভাগ থেকে নদীয়া জেলার পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে জানা যায়।

বিস্তীর্ণ এই এলাকার জমিদার সীতারাম অল্পদিনের মধ্যে প্রবল প্রতাপশালী হয়ে ওঠেন। তিনি মহম্মদপুরে একটি দুর্গ তৈরি করেন বলেও জনশ্রুতি আছে। এ ছাড়া তিনি একাধিক প্রাসাদ, অসংখ্য মন্দির আর পানীয় জলের কষ্ট দূর করতে অনেকগুলো দিঘি খনন করেছিলেন। এ রকম একটি দিঘির নাম কৃষ্ণসাগর। এখনো এই দিঘির পানি খুবই পরিষ্কার। আর একটি দিঘির নাম রামসাগর। এর আয়তন ২০০ বিঘা।

সীতারামের খনন করা দিঘিগুলোর মধ্যে দুধসাগর অন্যতম। এ দিঘির তলদেশ পর্যন্ত পাকা বলে জনশ্রুতি আছে, এটি সীতারামের ধনাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দুর্গ এলাকায় প্রবেশের একটু আগে আরও দুটি পুকুর আছে। দুর্গের উত্তর দিকেরটি চুনাপুকুর আর দক্ষিণেরটি পদ্মপুকুর নামে পরিচিত। এই দিঘিগুলো সাধারণ মানুষের পানীয় জলের কষ্ট দূর করেছিল সে সময়। সীতারাম রায়ের বানানো ধুলজোড়া দেবালয় ১৬৮৮ সালে এবং কারুকর্যখচিত দশভুজার মন্দির নির্মিত হয় ১৬৯৯ সালে।

জনশ্রুতি আছে, রাজা সীতারামের বাবা ঘোড়ায় চড়ে যাওয়ার পথে ঘোড়ার পা লক্ষ্মীনারায়ণ শিলাখণ্ডে বেঁধে যায়। এ জন্য সীতারাম রায় ১৭০৪ সালে লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির নির্মাণ করেন। দোল মঞ্চ, রামচন্দ্র মন্দির ও দুধসাগরের পশ্চিমে যে দোতলা বাড়িটি এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেটি ছিল সীতারামের বাসভবন। দুধসাগরের পূর্বে খোলা প্রান্তরে সীতারাম রায়ের বানানো তিন স্তরবিশিষ্ট দোল মঞ্চ আছে। তার পাশে রামচন্দ্র বিগ্রহ বাটি অবস্থিত।

দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নামে। ধীরে ধীরে নিজ ঘরে ফেরার উদ্দেশে রওনা দিলাম। মোটরসাইকেলের গতি বাড়ল আর পেছনে পড়ে রইল ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মাগুরার রাজা সীতারাম রায়ের বাড়িটি।

 

মাগুরা সদর থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে মহম্মদপুর উপজেলার রাজাবাড়ি নামক স্থানে রাজা সীতারাম রায়ের বাড়ি। মহম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে আধা কিলোমিটার উত্তরে পাকা রাস্তার পাশে রাজবাড়ির অবস্থান। রিকশা, ভ্যান অথবা হেঁটে যাতায়াত করা যায় সহজে।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 12
    Shares