শনিবার, নভেম্বর ২৮

রক্তে লেখা ‘ফুলবাড়ী দিবস’ আজ, দেশব্যাপী জাতীয় কমিটির কর্মসূচি

এখানে শেয়ার বোতাম

নিজস্ব প্রতিবেদক:: আজ ২৬ আগস্ট রক্তে লেখা ‘ফুলবাড়ী দিবস’। ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির ১৪তম বার্ষিকী। ২০০৬ সালের এই দিনে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি প্রকল্প বাতিল, জাতীয় সম্পদ রক্ষা এবং বিদেশি কোম্পানি এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়ী থেকে প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ফুলবাড়ীর মানুষ।ফুলবাড়ী আন্দোলন এই দাবিতেই গণঅভ্যুত্থান তৈরি করেছিলো, আর বুকের রক্তে, সংগ্রামে ১৪ বছর ধরে প্রতিরোধ জাগ্রত রেখেছে।

বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর সেদিন পুলিশ ও বিডিআর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করলে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় তিন জন, আহত হয় দুই শতাধিক। ঘটনার ১৪ বছর পার হয়ে গেলেও অসম্পূর্ণ ফুলবাড়ীবাসীর সেই ৬ দফা চুক্তি।

সেদিন সকাল থেকেই ফুলবাড়ীর ঢাকা মোড়ে ফুলবাড়ী, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ ও পার্বতীপুর উপজেলার হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে থাকে। দুপুর ২টার দিকে তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ও ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটির নেতৃত্বে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল নিমতলা মোড়ের দিকে এগুতে থাকলে প্রথমে পুলিশ বাধা প্রদান করে। পুলিশের বাধা পেয়ে বিশাল মিছিলটি জঙ্গি রূপ নেয়। পুলিশ-বিডিআর-এর ব্যারিকেড ভেঙে মিছিলটি এগুতে থাকলে আন্দোলনকারীদের ওপর টিয়ার সেল, রাবার বুলেট ও নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করা হয়।

বিডিআরের গুলিতে এ সময় নিহত হন আল আমিন, সালেকীন ও তরিকুল। আহত হন দুই শতাধিক আন্দোলনকারী। আহতদের অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। এরপর ফুলবাড়ীবাসী ধর্মঘটের মাধ্যমে এলাকায় অচলাবস্থা সৃষ্টি করে।

বাধ্য হয়ে তৎকালীন সরকার এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার, দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা যাবে না, গুলি বর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার’সহ ৬ দফা চুক্তি করলে এলাকাবাসী ধর্মঘট প্রত্যাহার করে। এই চুক্তির এখনও পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি, বরং এখনও ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনির পায়তারা চলছে বলে অভিযোগ এলাকার মানুষের।

জাতীয় সম্পদ কয়লা খনিতে চুরির ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবি করেছেন জাতীয় কমিটির নেতারা। এখনও এশিয়া এনার্জি চক্রান্ত ও মিথ্যা মামলা দিচ্ছে বলে অভিযোগ আন্দোলনকারী নেতাদের। চুক্তি বাস্তবায়ন ও লক্ষ্য পুরণ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই ও সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা তাদের।

আন্দোলনে পুলিশ ও বিডিআরের বাধা তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে যে চুরি হয়েছে এখনও তার বিচার হয়নি। সেই বিচারের আশায় আছি। তাছাড়া এখনও ৬ দফা চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। সরকার সে ব্যাপারে নির্বিকার। চুক্তি বাস্তবায়ন ও নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করার দাবি আমাদের এখনও রয়েছে। দাবি বাস্তবায়নে আবারও আন্দোলনে নামা হবে বলে হুশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, বহুজাতিক বিদেশি কোম্পানিকে এ দেশ থেকে বিতাড়িত করতে হবে।

বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু বলেন, সেই সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৬ দফা চুক্তি ও ফুলবাড়ীবাসীর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ঘটনার ১৪ বছর যার মধ্যে ১২ বছরই শেখ হাসিনা ক্ষমতায়। কিন্তু এখনও ৬ দফা দাবির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। এখনও এশিয়া এনার্জি অপতৎপরতা চালাচ্ছে। নেতাদের নামে মামলা দিচ্ছে। যত দিন

পর্যন্ত ৬ দফা চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হবে, দেশে কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি হবে না এই নিশ্চয়তা না পাবো এবং এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে না তত দিন পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

আন্দোলনের অন্যতম নেতা ফুলবাড়ী পৌরসভার মেয়র মুরতুজা সরকার মানিক বলেন, ফুলবাড়ীকে রক্ষা করতে আন্দোলনে মানুষ বুকের তাজা রক্ত দিয়েছিল। কিন্তু এখনও এশিয়া এনার্জি চক্রান্ত করছে, মামলা দিচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে আবারও এলাকার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে নামবে।

প্রতি বছর তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি আজকের দিনটিকে ‘জাতীয় সম্পদ রক্ষা দিবস’ ও ফুলবাড়ীবাসী ‘ফুলবাড়ী শোক দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। যেখান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। তবে করোনার কারণে এবারের কর্মসচি স্বল্প পরিসরে করা হয়েছে।

দেশব্যাপী জাতীয় কমিটির কর্মসূচি:
তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ২৬ আগস্ট ,বুধবার দেশব্যাপী ফুলবাড়ী দিবস পালন করবার আহবান জানিয়ে এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেছেন: “উন্নয়নের নামে প্রাণ-প্রকৃতি-সম্পদ, জনস্বাস্থ্য-জনজীবন ও জীবিকার বিপরীতে মুনাফা-অন্ধ তৎপরতায় বিশ্বের বাস্তুসংস্থান, নদী-সমুদ্র-জলবায়ু আক্রান্ত। তথাকথিত উন্নয়নের এই প্রাণবিনাশী মুনাফালোভী চরিত্রের কারণে বিশ্ব আজ কোভিড ১৯ অতিমারিসহ নানা বিপর্যয়ের শিকার। বাংলাদেশেও করোনা বিপর্যয়ে কয়েক কোটি মানুষ কাজ-খাদ্য-শিক্ষা-চিকিৎসা সংকটে আক্রান্ত। এই ধারায় বিশ্ব চলতে থাকলে সামনে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় আসবে, বাংলাদেশের জন্য বিপদ হবে আরও বেশি।

তাই যেসব প্রকল্প প্রাণ প্রকৃতি, জনস্বাস্থ্য, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জননিরাপত্তা বিপন্ন করে সেগুলো প্রত্যাখ্যান করে মুনাফার বদলে মানুষকে গুরুত্ব দেবার দাবি উঠেছে বিশ্বজুড়ে। ফুলবাড়ী আন্দোলন এই দাবিতেই গণঅভ্যুত্থান তৈরি করেছিলো, আর বুকের রক্তে, সংগ্রামে ১৪ বছর ধরে প্রতিরোধ জাগ্রত রেখেছে।

এই ঐতিহাসিক দিবসের প্রাক্কালে আমরা সালাম জানাই শহীদ তরিকুল, সালেকিন, আল আমিন; বীর যোদ্ধা বাবলু রায়, প্রদীপ, শ্রীমন বাস্কেসহ অগণিত সংগ্রামী মানুষকে। মানুষের ঐক্য ও অবিরাম প্রতিরোধ উত্তরবঙ্গসহ সারা দেশকে রক্ষা করেছে, নদী-কৃষিজমি-ভূগর্ভস্থ পানির আধারকে এক অকল্পনীয় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে। কিন্তু চক্রান্ত এখনও চলছে, মিথ্যা মামলা দিয়ে আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে হয়রানি করা হচ্ছে, ভুইফোড় কোম্পানি বেআইনীভাবে বাংলাদেশের সম্পদ দেখিয়ে লন্ডনে শেয়ার বাজারে ব্যবসা করছে, চীনা কোম্পানির সাথে চুক্তি করেছে । এসব চক্রান্ত মোকাবিলায় তাই প্রতিরোধও জোরদার করতে হবে। ফুলবাড়ীর প্রতিরোধ চেতনা দিয়ে বাংলাদেশকে নতুন দিশা দিতে হবে।

এই দিনে কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে থাকবে সারাদেশের শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন, র‌্যালী, প্রতিবাদ সমাবেশ। সকাল ১০টায় ফুলবাড়ীতে র‌্যালী ও শ্রদ্ধা নিবেদন, ফুলবাড়ী শহীদ স্মৃতিস্থম্ভ; এরপর প্রতিবাদ সমাবেশ- নিমতলা মোড়। ঢাকায় কর্মসূচি হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, সকাল ১১টায়। লন্ডনে প্রতিবাদ সমাবেশ হবে (লন্ডন সময়) বেলা ১২টায়। এছাড়া দেশে বিদেশে অনলাইনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। কেন্দ্রীয় অনলাইন আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে রাত ৮টায়। এতে ফুলবাড়ী, লন্ডন ও ঢাকা থেকে নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখবেন।

এশিয়া এনার্জি (জিসিএম)কে দেশ থেকে বহিষ্কারসহ ‘ফুলবাড়ী চুক্তি’র পূর্ণ বাস্তবায়ন, ফুলবাড়ী নেতৃবৃন্দের নামে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, রামপাল-রূপপুরসহ প্রাণবিনাশী স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প বাতিল করে করোনা মোকাবিলাসহ সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবাখাত প্রতিষ্ঠা, উত্তরবঙ্গসহ সারাদেশে সুলভে সার্বক্ষণিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে জাতীয় কমিটি প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে ফুলবাড়ী দিবস পালনের জন্য আমরা সবার প্রতি আহবান জানাচ্ছি।”


এখানে শেয়ার বোতাম