শনিবার, এপ্রিল ১৭
শীর্ষ সংবাদ

মৃত্যুঞ্জয়ী অহিংসার প্রতীক আবুল মকসুদ!

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 140
    Shares

 

সজীব ওয়াফি
বহুমাত্রিক জ্ঞান চর্চার একজন নিরন্তর সাধক ছিলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। মওলানা ভাসানীকে তরুণ প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়া আমাদের অগ্রজ কান্ডারি, লেখক, গবেষক, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও ন্যায়ের পক্ষে সোচ্চার এই কন্ঠ ২৩ ফেব্রুয়ারী অপরাহ্নে পরলোক গমন করছেন।

গবেষণায় তার মত হাতে গোনা খুব কমজন ব্যক্তিই আছেন। তিনি গবেষণা করেছেন নিজ উদ্যোগে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এটা খুবই বিরল। নারী শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি ও বাংলাদেশ নিয়ে তার চিন্তা-পর্যবেক্ষণ ছিল ব্যাপকভাবে বিস্তৃত।

সাধারণের ভিতরে অসাধারণ হয়ে ওঠা আবুল মকসুদ ১৯৪৬ সালের ২৬ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার এলাচিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সাংবাদিকতার মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে প্রথমে নবযুগ এবং পরবর্তীতে ন্যাপের সাপ্তাহিক ‘জনতা’য় কাজ করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে যোগ দিয়ে ছিলেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায়। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদকও ছিলেন তিনি। প্রাবন্ধিক হিসেবে তার ছিল সিদ্ধহস্ত। প্রাণ প্রকৃতি, প্রতিবেশ সহ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামে তাকে আমরা প্রথম কাতারেই পেয়েছি। তরুণদের নিয়ে তিনি বেশি স্বাপ্নিক ছিলেন। আবুল মকসুদ আশাবাদী ছিলেন পঁচে যাওয়া এই বাংলাদেশটা তরুণেরাই বাঁচিয়ে তুলবে। এ কারণেই তরুণদের সময় দিতে তিনি কুণ্ঠাবোধ বা বিরক্ত হননি কখনোই।

আজীবনের জন্য আদর্শ করে নিয়েছিলেন মানবতাকে। ইরাকে মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের ভিতরে তিনি ছিলেন প্রথমে। অহিংস আন্দোলন জোরদার করতে তিনি পরলেন সেলাইবিহীন দু’টুকরো সাদা কাপর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেলাইবিহীন দু’টুকরো সাদা কাপড়েই নানান জায়গাতে চলাফেরা করেছেন। তরুণদের স্পষ্টভাষী ভাষায় শুনিয়েছেন অহিংসার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, সচেতনতা তৈরি করেছেন বিভিন্ন পত্রিকায় লেখনীর মাধ্যমে। এরফলে অনেকের কাছে বিরাগভাজনও হয়েছেন, তবে ভালবাসাটাই পেয়েছেন বেশি। মিশে যেতে পেরেছেন এদেশের কোটি কোটি খেটে খাওয়া মানুষের সাথে।

একবার মওলানা ভাসানী’র সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। কিন্তু ব্যস্ত ভাসানী সময় দিতে পারছেন না। পাশ থেকে হেটে যাওয়ার সময়ে দেখলেন আবুল মকসুদ তার সাক্ষাৎকার নিতে বসে আছেন। ভাসানী তখন তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘হবে, তোমাকে দিয়েই হবে’। হয়েছেও তাই। সৈয়দ আবুল মকসুদ পেরেছেন।

চলনে-বলনে সাদাসিধা এই মানুষটি সাঙ্গ করেছিলেন মওলানা ভাসানীকে। ভাসানীকে নিয়ে যে গবেষণা রেখে গেছেন, এই একটি মাত্র কারণেই তিনি মরেও গিয়েও বেঁচে থাকবেন। তিনি লিখেছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ কে নিয়ে। ‘সহজিয়া কড়চা’ এবং ‘বাঘা তেঁতুল’ শিরোনামে কলাম লিখে তিনি খ্যাতির দুয়ারে পৌঁছেছিলেন।

১৯৮১ সালে তার কবিতার বই ‘বিকেলবেলা’ প্রকাশিত হয়। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর জীবন, কর্মকাণ্ড, রাজনীতি ও দর্শন (১৯৮৬) ও ভাসানী কাহিনী (২০১৩)। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘দারা শিকোহ ও অন্যান্য কবিতা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে নিয়েও তিনি গবেষণা চালিয়েছেন। লিখেছেন গল্প, ভ্রমণ কাহিনী। তার লেখা বইয়ের সংখ্যা চল্লিশেরও বেশি। সাহিত্য ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ঋষিজ পুরস্কার।

মানবাধিকার, পরিবেশ, সমাজ ও প্রেম নিয়ে তিনি যেমনি লিখেছেন, তেমনি ন্যায়ের পক্ষে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইও করেছেন সমানতালে। সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলন চলাকালীন একবার ক্ষোভ নিয়ে উচ্চারণ করলেন, ‘সরকার সব সময় বলে আসছে আমরা আবেগে কথা বলি, যুক্তি ও বিজ্ঞান নেই।

অথচ ১০ মাস আগে সরকারের অতি উচ্চপর্যায়ের আমলা আবুল কালাম আজাদের কাছে ১৩টি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র দিয়েছি, সেখানে বৈজ্ঞানিকভাবে দেখানো হয়েছে রামপাল হলে সুন্দরবনের কী ক্ষতি হবে। এরপর এ বিষয়ে সরকার একটি কথাও বলেনি। ১৯৭১ সালে যদি ইয়াহিয়া বলত তোমরা বিজ্ঞান দিয়ে বোঝাও, তাহলে দেশ স্বাধীন হতো না। দেশের প্রতি মমতা-আবেগ থাকার কারনেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে।’

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনসহ ন্যায্য দাবির পক্ষে জীবনের শেষ মুহূর্ত অনড় থেকেছেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদ।

গতকাল ২৪ ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে শেষ বিকেলের শেষ যাত্রা করেছেন আমাদের এই অগ্রজ কান্ডারি। ভাসানীর হাত যে ধরে সে খালি হাতে ফেরার নয়। আবুল মকসুদও খালি হাতে ফিরেন নাই। অসংখ্য মানুষের চোখের জলে বিদায় নিয়েছেন। তাঁর ফাঁকা জায়গা পূরণ হবে না কোনদিনই। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর আদর্শ অনুসরণ হয়ে থাকবে। ভাল থাকবেন আবুল মকসুদ!


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 140
    Shares