বুধবার, জানুয়ারি ২৭

‘মুল্লুক চল’র চেয়েও বড় সংগ্রামের জন্য চা শ্রমিকদের প্রস্তুত হতে হবে : মুবিনুল হায়দার

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 279
    Shares

অধিকার ডেস্ক:: বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)-এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড মুবিনুল হায়দার চৌধুরী এক বিবৃতিতে বলেন- “ঐতিহাসিক ২০ মে এক মহান সংগ্রামের দিন। চা-শ্রমিকদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের একটি উজ্জ্বল দিন আজ। ১৮৫৪ সালে সিলেটে ব্রিটিশদের উদ্যোগে যখন চা বাগান স্থাপন করা হয় তখন আজীবন কাজ করার শর্তে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মাদ্রাজ, পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া প্রভৃতি স্থান থেকে শত শত শ্রমিককে নিয়ে আসা হয়। তাদেরকে প্রচুর টাকা পাওয়ার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল।

কিন্তু কাজ করতে এসে তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়। জঙ্গলে হিংস্র প্রাণীদের মোকাবেলা করে এই চা বাগান তাদের গড়ে তুলতে হয়েছে। অনেক শ্রমিকের প্রাণহানি হয়েছে। আবার বাঁচার মতো মজুরি, খাবার কিছুই তারা পেত না। সাহেবদের অকথ্য অত্যাচারই লেগেই থাকতো।

এই অবস্থা অনেকদিন ধরে চলতে চলতে একসময় চা শ্রমিকরা বিদ্রোহী হয়ে উঠে। তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা এই জায়গায় আর থাকবে না। তারা তাদের পূর্বের আবাসস্থলে ফিরে যাবে। স্লোগান উঠে, ‘মুল্লুক চল’।

১৯২১ সালের ২০ মে পণ্ডিত গঙ্গাদয়াল দীক্ষিত ও পণ্ডিত দেওশরণের নেতৃত্বে ৩০ হাজার শ্রমিক পায়ে হেঁটে চাঁদপুর লঞ্চঘাটে পৌঁছায়। সেখানে ব্রিটিশ সরকার ও মালিকশ্রেণির নির্দেশে গুর্খা পুলিশ বাহিনী শ্রমিকদেরকে লঞ্চে উঠতে বাঁধা দেয়। চা-শ্রমিকরা বাধা অতিক্রম করে লঞ্চে উঠতে চাইলে পুলিশ নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও গুলি চালায়। এতে শত শত শ্রমিক নিহত হয় এবং কয়েক শতাধিক আহত হয়। মৃত, অর্ধমৃত শ্রমিকদেরকে মেঘনার স্রােতে ফেলে দেওয়া হয়। লাশগুলো যাতে না ভাসে এ জন্য পেট কেটে দেওয়া হয়।

সেসময় আহতদের চিকিৎসার দাবিতে এবং হামলার প্রতিবাদে চাঁদপুরে ছুটে এসেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। চা-শ্রমিকদের বর্বর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রায় ২৫ হাজার রেলওয়ে শ্রমিকরা শুরু করেছিল আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে ধর্মঘট। জাহাজ শ্রমিক ও ছাত্ররা এ ধর্মঘটে সংহতি জানিয়ে ধর্মঘটকে আরও জোরালো করেছিল।

আন্দোলনকে চিরতরে বন্ধ করার জন্য আন্দোলনের নেতা প-িত গঙ্গা দয়াল দীক্ষিত ও প-িত দেওশরণকে পুলিশ গ্রেফতার করে নির্মম নির্যাতন চালায়। এর প্রতিবাদে অনশনরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন প-িত গঙ্গা দয়াল দীক্ষিত।

চা-শ্রমিকদের উপর ব্রিটিশদের শোষণের বিরুদ্ধে এক জ্বলন্ত সংগ্রামের রক্তাক্ত দিন এটি। এই দিনটি আমাদের সকলের স্মরণ করা উচিত। আমাদের দলের পক্ষ থেকে আমরা বহুদিন ধরেই এই দিনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে চা-শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা দাবি করে আসছি।

দেশের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতেও এই দিনটির গভীর তাৎপর্য রয়েছে। সারাদেশ যখন করোনা মহামারীতে আক্রান্ত, মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা যখন বেড়ে চলেছে, তখন চা বাগানে অনিরাপত্তার মধ্যে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকদের কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। অথচ, আগে থেকেই দাবি উঠেছিল তাদেরকে সবেতন ছুটি দেওয়া হোক।

বহু বছর ধরে চা বাগানে বাস করে আসা শ্রমিকদের এখনও ভূমি অধিকার প্রদান করা হয়নি। বাগানে পর্যাপ্ত ডাক্তার ও ওষুধের অনিশ্চয়তা, শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য স্কুল-কলেজের অনুপস্থিতি, রেশনের অনিশ্চয়তা প্রভৃতি দাবিকে সরকার একের পর এক পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। সেদিন ব্রিটিশরা যে দাবিকে অগ্রাহ্য করেছিল আজ একই কাজ স্বাধীন দেশের মালিকশ্রেণি ও তার সরকার করছে।

২০ মে’র ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই যে, চা শ্রমিকদের আজ একথা বুঝতে হবে যে- দেওশরণ, গঙ্গাদীক্ষিতের লড়াই এখনও শেষ হয়নি। আবারও আত্মত্যাগ লাগবে, আরও বড় আত্মদানের প্রয়োজন হবে, লড়াইয়ের প্রয়োজন হবে। চা শ্রমিকদের ও তাদের সন্তানদের সেভাবেই প্রস্তুত করতে হবে। আজ ব্রিটিশ বেনিয়া ও তাদের শাসকগোষ্ঠী নেই, তার পরিবর্তে আছে এদেশীয় পুঁজিপতিরা, চা শিল্পের মালিকরা। এই মজুরি দাসত্বের শৃঙ্খল না ভাঙতে পারলে সমাজের মর্যাসম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে চা শ্রমিকরা তাদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারবেনা। চা শ্রমিকরা শুধু নয়, আমাদের দলের এবং এদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সকল কর্মী এই লড়াই থেকে শিক্ষা নেবেন, শহীদদের আত্মত্যাগকে, শ্রমিকের বেদনাকে হৃদয়ে ধারণ করে শোষণমুক্তির লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করবেন। ”

কমরেড মুবিনুল হায়দার চৌধুরী বিবৃতিতে নিম্নোক্ত দাবিতে চা-শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের সংহতি জানান:

১। অবিলম্বে নতুন চুক্তি সম্পাদন কর। দৈনিক মজুরি ৪০০ টাকা ঘোষণা কর। সাপ্তাহিক রেশন ৫ কেজি মানসম্পন্ন চাল প্রদান কর।
২। ২০ মে ঐতিহাসিক ‘মুল্লুকে চল’ দিবসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘চা-শ্রমিক দিবস’ ঘোষণা কর।
৩। করোনাকালীন সময়ে চা-বাগানে শ্রমিকদের সবেতন ছুটি দাও। চা-শ্রমিকদের ঝুঁকি ভাতা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত কর।
৪। এক বছরের অধিক সময়কালব্যাপী বাগানে কর্মরত অস্থায়ী শ্রমিকদের স্থায়ী কর।
৫। চা-শ্রমিকদের ভূমির আইনগত অধিকার নিশ্চিত কর। টি-ট্যুরিজম, ইকোনোমিক জোনসহ নামে-বেনামে চা বাগানের জমি দখলের পাঁয়তারা বন্ধ কর।
৬। প্রত্যেক চা বাগানে এমবিবিএস ডাক্তার নিয়োগ কর, পর্যাপ্ত ওষুধের ব্যবস্থা কর, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত কর। করোনাকালীন সময়ে কাজ করার জন্য ঝুঁকি ভাতা দিতে হবে। করোনা আক্রান্তদের বিনামূল্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে চিকিৎসাসেবা দিতে হবে।
৭। প্রতিটি চা বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন কর। চা-শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি চালু কর। চা বাগানের কর্মক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাগানের শিক্ষিত যুবকদের নিয়োগ কর।
৮। স্থায়ী-অস্থায়ী সকল শ্রমিকের মজুরি বোর্ড নির্ধারিত মজুরি দিতে হবে। শ্রম আইন অনুযায়ী তিন কক্ষ বিশিষ্ট পাকা ঘর নির্মাণ করে শ্রমিকদের বাসযোগ্য আবাসন নিশ্চিত কর।
৯। বাগানে মদ, গাঁজা, জুয়া এবং অপসংস্কৃতি বন্ধ কর।
১০। বন্ধ কালিটি ও রেমা চা বাগান চালু কর। মালিকদের অব্যবস্থাপনায় বন্ধপ্রায় চা বাগান চালু করতে কার্যকর পদক্ষেপ নাও।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 279
    Shares