সোমবার, মার্চ ৮
শীর্ষ সংবাদ

মুক্তবাজারের ঝাঁজে পকেট উজাড়, পেঁয়াজ ও দ্রব্যমূল্য কাণ্ড!!

এখানে শেয়ার বোতাম

রুহিন হোসেন প্রিন্স ::

পেঁয়াজ অবশেষে ট্রাক থেকে বিমানে চড়লো। তারপরও পুরোপুরি স্বস্তি নেই। সাধারণ মানুষকে হতবাক করে পেঁয়াজের কেজি এবছর জুন মাসে ৬৫ টাকা, জুলাইয়ে ৭০ টাকা, আগস্টে ৮০ টাকা, সেপ্টেম্বরে ১০০ টাকা, অক্টোবরে ১২০ টাকা আর নভেম্বরে দিনে দিনে বেড়ে ২৮০ টাকা পর্যন্ত দামে খুচরা বাজারে বিক্রি হতে দেখা গেল।

সাধারণভাবে দেখা গেল বাজারে পেঁয়াজের সংকট নেই। তারপরও এই অগ্নিমূল্য। কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে মোট পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ২৩ দশমিক ৩০ লাখ টন। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ সংগ্রহকালীন ও সংরক্ষণকালীন সময়ে নষ্ট হয়। তারপরও অন্ততঃ ১৬ দশমিক ৩০ লাখ টন পেঁয়াজ দেশের কৃষকরাই উৎপাদন করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ১০ দশমিক ৯১ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। এছাড়া চলতি অর্থবছরে ইতোমধ্যেই ২ দশমিক ১৩ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। তাহলে সব মিলিয়ে পেঁয়াজের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৯ দশমিক ৩৪ লাখ টন। সরকারি তথ্য বলছে, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ টন। এসব তথ্য ঠিক হলে দেশে তো চাহিদার থেকে অনেক বেশি পেঁয়াজ আছে।

তাহলে লাগামহীন দাম বৃদ্ধি কেন? এ প্রশ্ন সর্বত্র। ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে, এসব যুক্তি তাই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এমনকি এত বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রির খবর পৃথিবীর কোনো দেশে আছে বলে শোনা যায়নি। এর মধ্য দিয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার খবর বেরিয়েছে।

শুধু কি পেঁয়াজ? এই তো কয়েক ঘণ্টার গুজবে লবণ কাণ্ড ঘটে গেল। অনেকের পকেট ভারী হলো, অনেকের পকেট খালি হলো। অহেতুক চালের দাম বেড়ে গেছে। ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে। সাবান, পেস্ট, ডিটারজেন্ট পাউডারসহ অনেক নিত্যপণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। চিনি, রসুন, আদা, মসলা, ডালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্য কখন কি দামে থাকবে কেউ বলতে পারে না। ঔষধসহ জীবন রক্ষাকারী পণ্যও দাম বাড়ানো থেকে বাদ যাচ্ছে না। ভেজালরোধ করা যাচ্ছে না।

এসব মূল্য বৃদ্ধিতে কী প্রকৃত উৎপাদক উপকৃত হচ্ছে? মোটেই না। যে পেঁয়াজ নিয়ে এত কথা হচ্ছে, পেঁয়াজের ঝাঁজে সাধারণ মানুষের চোখের পানি ঝরছে। ক’দিন পর আবার দেখবো নতুন পেঁয়াজ ওঠার সময় দাম না পেয়ে কৃষকের চোখের পানি ঝরবে। ঠিক একই অবস্থা আমাদের দেখতে হবে কৃষকের ঘরে ধান ওঠানোর সময়। দেশের চিনি শিল্পও তো ধ্বংসের প্রান্তে।

একটু পেঁয়াজ ও পেয়াজ চাষীদের দিকে তাকানো যাক। তথ্য বলছে দেশের কৃষক গত বছর যে পেঁয়াজ উৎপাদন করেছে তাতে প্রতি কেজি পেঁয়াজের গড় উৎপাদন খরচ ছিল ১৭ দশমিক ৩৮ টাকা। অথচ বিক্রি করেছে গড়ে প্রতি কেজি ১০ থেকে ১৩ টাকায়। যথাযথ বিপণন ব্যবস্থা না থাকায় কৃষক উৎপাদন করে নিজের ক্ষতি করলো। লাভ(!) করলো আড়তদার, মজুদদার, সরবরাহকারীসহ মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা। এ অবস্থায় পরবর্তী বছর কৃষক উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেললে তো বলার কিছু থাকে না।

একথা মনে রাখা দরকার খাদ্য পণ্য সংকটে পড়লে হাতে টাকা থাকলেও যথাসময়ে পদক্ষেপ না নিলে করার কিছু থাকে না। এবার পেঁয়াজ সংকটে আমরা আবার এটা দেখলাম। অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় চাল সংকটের কথা নিশ্চয়ই পাঠকের মনে আছে। টাকার থলি নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও যথা সময়ে চাল কেনা যায়নি।

আর দেশের অসাধু ব্যবসায়ী, মজুদদারদের এবারও দেখা গেলে আরও উচ্চ মূল্যে পেঁয়াজ বিক্রির জন্য মজুদ রাখছে। এমনকি ঐ পেঁয়াজ পঁচে যাওয়ায় নদীতে ফেলে দিচ্ছে। কিন্তু অনৈতিকভাবে অধিক মুনাফা অর্জন বন্ধ করছে না। কোনো আবেদন নিবেদনে কাজ হয়নি।

অন্যদিকে লবণ নিয়ে গুজবের পর, এসব গুজব বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ, স্থানীয় জনমত সংগঠিত হওয়া, কোথাও কোথাও প্রতিরোধ গড়ে তোলা, বাজারে মজুদ দৃশ্যমান করা এবং ন্যায্য মূল্যে বিক্রির পর জানা গেল এখনো কোথাও কোথাও দোকানদারই আগের থেকে কম দামে লবণ বিক্রি করছেন। বাজারে বিকল্প সরবরাহ ও রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ, জনমত পুরো পরিস্থিতিকে পাল্টে দিলো।

এসব ঘটনাবলী কী কয়েকজন ব্যবসায়ীর কায়কারবার? আর সরকারের সাময়িক ব্যর্থতা? এমন সরল প্রশ্নের সহজ উত্তর খুঁজলে সমাধান পাওয়া যাবে না। সংবিধান লংঘন করে দেশ পরিচালিত হচ্ছে মুক্তবাজারের দর্শনের ধারায়। দেশে এই ধারার প্রধান প্রবণতা হলো লুটপাট। বাজার পরিচালিত হচ্ছে কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীদের হাতে। এই সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের ইচ্ছা, অনিচ্ছার উপর যেন নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারকে, জনগণকে। তেল, চিনি, পেঁয়াজসহ কতক নিত্যপণ্য মাত্র গুটিকয়েক আমদানিকারকদের উপর নির্ভর করে আছে। এদের আধিপত্যে মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরাও অসহায়। সরকারতো মাঝে মধ্যে এদের হুমকি-ধামকি দিলেও ঐ একচেটিয়া ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষা করে চলেছে। বলা হচ্ছে মুক্ত বাজারে সরকার হস্তক্ষেপ করলে ভাল হয় না।

পত্রিকার খবরে জানা গেল, ‘পেঁয়াজ কাণ্ডে’র শুরুতে বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের বৈঠকে ডাকলেন। উপস্থিত হলেন মাত্র ১ জন ব্যবসায়ী। আরেক মন্ত্রী বললেন, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে, আর তখন পেঁয়াজের দাম উঠলো প্রতি কেজি ২০০ টাকা। খাদ্যমন্ত্রী তো বললেন, তিনি পেঁয়াজ ছাড়া ২২ রকম রান্না শেখাতে পারেন।

আমদানির খরচ হিসেব করে ভ্রাম্যমাণ আদালত যখন পাইকারী বিক্রি প্রতি কেজি ৬০ টাকা বেধে দিল, তখন মন্ত্রী বললেন, ১০০ টাকার কমে পেঁয়াজের কেজি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আর পেঁয়াজ ছাড়া রান্নার উপদেশ তো আছে। এসব কথায় একদিকে মানুষের সাথে রসিকতা করা হলো, অথচ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ মন্ত্রী, সচিবদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো না। অন্যদিকে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের অবাধ লুটপাটের ধারাকে প্রশ্রয় দেওয়া হলো।

মুক্তবাজারের দর্শন নিয়ে কথা উঠলে এর সমর্থকরা বলতে চান, এখানে সাধারণ মানুষেরও স্বার্থ রক্ষিত হবে। কিন্তু আমাদের দেশে এটা বারবার প্রমাণিত হচ্ছে যে, ভোক্তা সাধারণের স্বার্থ রক্ষিত হয় না। তথাকথিত মুক্তবাজারে দেশের মানুষ এখন দুর্নীতিবাজ মুনাফাখোর ধনিকগোষ্ঠীর জালে বন্দী হয়ে পড়েছে। অতীতের মত বর্তমান সরকারও সিন্ডিকেটওয়ালাদের বিশ্বস্ত পাহারাদারের ভূমিকা পালন করে চলেছে। বাজারের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া জনস্বার্থ রক্ষার কোনো আলামত নিকট অতীতে দেখা যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সব নিত্যপণ্যে দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পিত ভূমিকা ও যেসব পণ্যে এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সম্ভব না, সেসব পণ্যের জোগান নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার। বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির পরও কেন আমাদের শুনতে হবে, উৎপাদিত পেঁয়াজের ৩০ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে? এসব রক্ষণাবেক্ষণে, গুদামজাত করায় এবং কৃষকের লাভজনক দাম নিশ্চিত করতে শুরু থেকে পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকার তথ্য প্রযুক্তির ঢাকঢোল পেটালেও দেশের পণ্য পরিস্থিতি, অন্য দেশগুলোর অবস্থা সম্পর্কে যথাসময়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার প্রকৃত তথ্য থাকবে না কেন? এসব কাজের ব্যর্থতার দায় সরকার এড়িয়ে যেতে পারে না।

সামগ্রিক ঘটনাবলীতে প্রমাণিত হচ্ছে যে, সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে অন্তত আট/নয়টি নিত্যপণ্যের রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ন্যায্যমূল্যের দোকান খুলতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী খোলা বাজারে পণ্যের বিক্রি বাড়াতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ নিশ্চিত করতে হবে। টিসিবি’র ভূমিকা জোরদার করতে হবে।

এসব কথা উঠলে, টিসিবিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা, দুর্নীতি ও অপচয় নিয়ে কথা বলা হয়। প্রশ্ন হলো- এসব প্রতিষ্ঠানকে দক্ষ, দুর্নীতিমুক্ত ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব কার? এর ব্যর্থতার দায় সরকারকেই নিতে হবে। দোষারোপকে প্রধান না করে রাষ্ট্রীয় খাত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেই এগুতে হবে। এটাইতো মুক্তিযাদ্ধের ধারার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা। যা এখনও সংবিধানে লিপিবদ্ধ আছে। সর্বত্র স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সর্বত্র জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। উৎপাদক ও ভোক্তা সমবায় গড়ে তোলা এবং কার্যকর করতে ভূমিকা নিতে হবে। উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণে কমিশন গঠনসহ নানা পথের সন্ধান করতে হবে ।

লুটপাটের ধারায় মুক্তবাজারের নামে ‘বাজার-অর্থনীতি’ জন্ম দিয়েছে ‘বাজার-রাজনীতির’। ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদ বনে গেছেন, আর নীতিহীন রাজনীতিবিদদের একাংশ রূপান্তরিত হয়েছেন ব্যবসায়ীতে। বর্তমান মন্ত্রীসভার দিকে তাকালে, ক্ষমতাসীন দল ও শুধুমাত্র ক্ষমতাশ্রয়ী মুক্তবাজারের সমর্থক দলগুলোর দিকে তাকালে এই তথ্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

‘পুঁজিবাদী মুক্তবাজার’ দর্শন মানুষকে ভয় ও লোভের চোরাগলিতে আটকে ফেলে কতক মানুষকে মুনাফার সুযোগ দেয় আর আমজনতার পকেট উজাড় করে। শেয়ার বাজার থেকে শুরু করে সর্বশেষ লবণ কাণ্ড দেখলে এ চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় না বাড়লেও মূল্যবৃদ্ধির পাগলা ঘোড়া থামছে না। তাই এই পথে সমাধান না খুঁজে মুক্তিযুদ্ধের ধারায়, সমাজতন্ত্রের পথেই সমাধান খুঁজতে হবে।

পেয়াজ, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির সাথে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ী, সিন্ডিকেট, কমিশনভোগী আর অসাধুচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে সোচ্চার হতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, সচিবদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ন্যায্যমূল্যে জনসাধারণকে সরবরাহ করতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে। উৎপাদকদের স্বার্থ রক্ষায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের দাবি এখনই জানাতে হবে। এসব দাবিতে গড়ে তোলা গণআন্দোলন হতে পারে জনগণের রক্ষা কবচ।

মনে রাখতে হবে, এদের পাহারাদারদের ক্ষমতায় রেখে বা একই ধারার শাসকদের ক্ষমতায় পুনরাবৃত্তি করে জনসাধারণের সামগ্রিক স্বার্থ সংরক্ষণ করা যাবে না। আমরা দেখেছি এক সরকার যায়, আরেক সরকার আসে। মন্ত্রী আসেন, মন্ত্রী যান। আমলা আসেন, আমলা যান। কিন্তু সিন্ডিকেট থেকে যায়। মুক্তবাজারের লুটপাটের দর্শন পাল্টে না। তাই মানুষের স্বার্থও রক্ষিত হয় না।

এজন্য মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করে একই সাথে সামগ্রিক ‘ব্যবস্থা বদল’ এর সংগ্রামও জোরদার করতে হবে।

লেখক: সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)


এখানে শেয়ার বোতাম