মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৩
শীর্ষ সংবাদ

মার্কস-এঙ্গেলস, শ্রেণী স্বকীয়তা ও শ্রমিকশ্রেণীর একটি ‘স্বর্গাভিযানের’ প্রসঙ্গ

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 129
    Shares

(১৮৭১ সালে দুনিয়ার শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের প্রথম রাষ্ট্র ‘প্যারি কমিউনের’ বিশ্ব ঐতিহাসিক বিপ্লবী মর্ম ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে যেয়ে ২০০২ এর মে মাসে এই নিবন্ধটি লেখেছিলেন সাইফুল হক , যা তখন সাপ্তাহিক নতুন কথাসহ আরো দুই/তিনটি ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল। লেখাটি তখন বিপ্লবী রাজনীতিমনস্ক ব্যক্তিবর্গ, অগ্রণী নেতা-কর্মী ও কিছু বিজ্ঞজনের মনযোগ আকর্ষণ করেছিল। নিবন্ধটি পরবর্তীতে সাইফুল হকের “মার্কস এঙ্গেলস ও ভাবাদর্শ” শীর্ষক গ্রন্থে সংকলিত হয়েছিল। এ বছর ‘প্যারি কমিউনের’ ১৫০তম বার্ষিকীতে অধিকারের পাঠকদের জন্য লেখাটি  প্রকাশ করা হলো।)

মার্কসবাদের সাথে শ্রেণী প্রত্যয়টি ওতপ্রতভাবে জড়িত। বস্তুতঃ মার্কসবাদী মতাদর্শের মূলে রয়েছে শ্রেণী ও শ্রেণীসংগ্রাম এবং তার অনিবার্য পরিণতি সম্পর্কিত উপলব্ধি ও সূত্রায়ণসমূহ। এসব উপলব্ধি ও সূত্রায়নসমূহ ইতিমধ্যে নানাভাবে পরীক্ষিতও হয়েছে। শ্রেণী ও শ্রেণীসংগ্রাম যে মার্কসবাদের প্রণেতা ও প্রবক্তাদের আবিস্কার নয় তা যে কোন মার্কসবাদীরই জানা কথা। বুর্জোয়া সমাজে শ্রেণী সংগ্রামের অনিবার্য পরিণতি যে সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্ব এটা সূত্রায়ন করা মার্কসবাদের প্রণেতাদের বড় কৃতিত্ব। প্রকৃতি ও সমাজ সম্পর্কে মানবজাতির যে সমগ্র জ্ঞানভান্ডার ও সেরা উপলব্ধিসমূহ তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শ্রেণীসংগ্রাম ও তার নিয়তি সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক অবস্থান। মার্কসবাদী মতাদর্শ যে নতুন সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি তথা নতুন সভ্যতা সৃষ্টিতে তৎপর সেখানে সর্বহারা শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি ও শ্রেণী অবস্থানই হচ্ছে প্রধান বিষয়। এই শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি ও শ্রেণী অবস্থানের কারণেই মার্কস-এঙ্গেলস কল্প সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের ধারণাকে বিজ্ঞানে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলেন। শ্রেণী সংগ্রামকে ইতিহাসের চালিকাশক্তি হিসাবে দেখেই তাঁরা থেমে থাকেননি। পুঁজিবাদী সমাজে পুঁজির সাথে শ্রমের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে নানা পর্যায়ের শ্রেণী সংগ্রাম যে অনিবার্যভাবে রাজনৈতিক সংগ্রামের রূপ পরিগ্রহ করে নানাভাবেই তাঁরা তা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। মার্কস-এঙ্গেলস নিজেদের জীবদ্দশায় প্রত্যক্ষভাবে শ্রেণী ও গণসংগ্রামে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এ সংক্রান্ত তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতারও সার সংকলন করেছেন।

সমস্ত ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রমহীনভাবে তাঁরা সর্বহারা শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি ও শ্রেণী স্বার্থকে তুলে ধরেছেন; আদর্শিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দিক থেকে তাকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থানকে অস্বচ্ছ ও বিভ্রান্ত করার সমস্ত প্রয়াসকে তারা নির্মমভাবে সমালোচনা করেছেন, আঘাত করেছেন, সম্ভব সমস্ত উপায়ে তাকে মোকাবেলা করেছেন। এটা করতে যেয়ে তাঁরা ‘সংকীর্ণ ও একদেশদর্শী’ হয়ে পড়েছেন- এ ধরনের নানা সমালোচনা ও বৈরী আক্রমণকেও তাঁদেরকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। এসব সমালোচনা ও আক্রমণ মোকাবেলা করতে যেয়ে তাঁদেরকে শ্রেণী সচেতনতা ও শ্রেণী রাজনীতির একেবারে খুটিনাটি বিষয়ও নাড়াচড়া, পর্যালোচনা ও বিচার বিশ্লেষণ করতে হয়েছে এবং প্রতিবারই এই উপসংহার টানতে হয়েছে যে, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণীর যে মরণপণ লড়াই সেই লড়াইয়ের কোন পর্যায়েই কোন অজুহাতে সর্বহারা শ্রেণী তার শ্রেণী বৈশিষ্ট্য, শ্রেণী স্বাতন্ত্র ও শ্রেণী স্বার্থ বিসর্জন দিতে পারে না। কোন যুক্তিতেই শ্রেণী রাজনৈতিক কর্তব্যকে ভুলে যাওয়া বা কোন কৌশলের কথা বলে শ্রেণী রাজনীতিকে খেতাববন্দি করে রাখতে পারে না। বিশেষ কোন ঘটনা বা ইস্যুতে সর্বহারা শ্রেণী যখন বুর্জোয়া শ্রেণীর কোন অংশ বা বুর্জোয়া স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী কোন বিশেষ রাজনৈতিক দলের সাথে সাময়িকভাবে এক সাথে দাঁড়ায় তখনও সর্বহারা শ্রেণী তার শ্রেণী রাজনীতি ও শ্রেণী আদর্শকে বাকসবন্দি করে রাখে না।

বিশেষ বাস্তব পরিস্থিতি, ইস্যু, শ্রেণী সমাবেশের ধরণ, নেতৃত্বদায়ী শ্রেণী হিসাবে সর্বহারা শ্রেণীর বিকাশ, সচেতনতা ও সংঘবদ্ধতার মাত্রা প্রভৃতি নানা বিষয়কে মাথায় রেখে শ্রমিকশ্রেণীকে কখনও কখনও বুর্জোয়া শ্রেণীর নানা অংশের সাথে আপোষ করতে হয়; তখনও শ্রমিকশ্রেণী তার বিশেষ শ্রেণী স্বকীয়তা ও শ্রেণী রাজনীতিকে বিসর্জন দেয় না; দেবার কোন প্রশ্নও নেই। বিশেষ পরিস্থিতিতে এই আপোষটাও শ্রমিকশ্রেণীর চুড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্যেই। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে প্রায়শই এটাকে বিকৃত করা হয় এবং তা করা হয় কৌশলের নাম করেই; যে কৌশলে সর্বহারা শ্রেণীর রণনীতিই হারিয়ে যায়, বিপর্যস্ত হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কার্যতঃ এটা বুর্জোয়া শ্রেণীর লেজুরবৃত্তিতে পর্যবশীত হয়। লেনিনের আগে মার্কস-এঙ্গেলসও এ ধরনের প্রবণতার বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণী ও তাদের সংগঠনসমূহকে সতর্ক করেছেন। কৌশলের নামে আত্মবিলোপকারী পদক্ষেপসমূহকে তীক্ষভাবে সমালোচনা করেছেন।

মার্কসবাদের প্রণেতারা জানতেন ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণীর বিজয়ের যে সংগ্রাম সেই সংগ্রামের পথ অনেক বন্ধুর, আকা-বাঁকা, মোড় পরিবর্তনে ঠাসা। কখনও কখনও এই সংগ্রামে সাময়িক ব্যর্থতা ও পরাজয় জেনেও সর্বহারা শ্রেণীক লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে হয়; কখনও বৃহত্তর লড়ায়ের প্রস্তুতির জন্যে, আবার কখনও বা নিতান্ত বাধ্য হয়েই। আবার কখনও বা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ঐতিহাসিক উদ্যোগের কারণেও সর্বহারা শ্রেণীকে আন্দোলনে সামিল হতে হয়। লেনিন লিখেছিলেন “মার্কস এ সত্যও জানতেন যে ইতিহাসে এমন মুহূর্ত আসে যখন জনগণের অধিকতর তালিম ও পরবর্তী সংগ্রামের প্রস্তুতির জন্যে, এমনকি নিষ্ফল ব্রতেও জনগণের মরীয়া সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা থাকে (ল, কুগেলমানের নিকট মার্কসের পত্রাবলীর রুশ অনুবাদের ভূমিকা-লেনিন, ১৯০৭)”। সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী লড়াইয়ে যারা কেবল নিরবিচ্ছিন্ন জয়লাভের স্বপ্ন দেখেন মার্কস-এঙ্গেলস তাদের সারিতে নন। যুদ্ধের মতই তাঁরা জানতেন দুনিয়াটা বদলাবার যে যুদ্ধ সেখানে জয়-পরাজয় দুটোই বাস্তব। খন্ড খন্ড নানা সংগ্রামে সর্বহারা শ্রেণী পরাজিত হতে পারে, বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্তও হোতে পারে। কিন্তু চুড়ান্ত সংগ্রামে সর্বহারা শ্রেণী যে জয়লাভ করবে, তাদের উপর আধিপত্য ও একনায়কত্ব কায়েম করবে সে সম্পর্কে তাঁরা ছিলেন একশতভাগ নিঃসংশয়।

জনগণের ঐতিহাসিক উদ্যোগকে মার্কস সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছেন। লেনিন লিখেছেন “১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে, কমিউনির ছয় মাস আগে মার্কস ফরাসী মজুরদের সোজাসুজি সাবধান করে দিয়েছিলেন; অভ্যুত্থান হবে নির্বুদ্ধিতা, বলেছিলেন তিনি আন্তর্জাতিকের বিখ্যাত আবেদনে (মার্কস কর্তৃক ফ্রাঙ্কো-প্রুশীয় যুদ্ধ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী জনসমিতির সাধারণ পরিষদের দ্বিতীয় আবেদন)। ১৭৯২ সালের প্রেরণায় আন্দোলন সম্ভব হবে এই জাতীয়তাবাদী মোহের স্বরূপ তিনি আগেই উন্মোচিত করেন। ঘটনার পরে নয়, অনেক মাস আগেই তিনি বলতে পেরেছিলেন; অস্ত্র ধারণ করা উচিত নয় (কুগেলমানের নিকট মার্কসের লেখা পত্রাবলীর রুশ অনুবাদের ভূমিকা-লেনিন, ১৯০৭)”।

শেষের কথাটি লেনিন উল্লেখ করেছিলেন প্লেখানভকে উদ্দেশ্য করেই, ১৯০৫ সালে রাশিয়ায় শ্রমিকশ্রেণীর প্রথম সশস্ত্র বিপ্লব প্রচেষ্টার পর ডিসেম্বরে প্লেখানভ যখন বললেন শ্রমিকদের ‘অস্ত্র ধারণ করা উচিত হয়নি।’ নিজের বক্তব্যের সমর্থনে প্লেখানভ মার্কসকেও তুলে আনলেন এবং বললেন ১৮৭০ সালে মার্কসও ফরাসি মজুরদের বিপ্লবকে থামিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা জানি ১৮৭০ সালের সেপ্টেম্বরে অভ্যুত্থানকে মার্কস ‘নির্বুদ্ধিতা’ হিসাবে আখ্যায়িত করলেও ১৮৭১ সালের মার্চে প্যারিসে ফরাসী মজুরদের অভ্যুত্থান যখন শুরু হয়ে গেল তখন প্লেখানভের ন্যায় ‘আত্মতুষ্ট কুপমন্ডুকের’ মত মজুরদের ‘অস্ত্র ধারণ করা উচিত হয়নি’ বলে মার্কস বসে থাকেন নি। ১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল প্যারিসে বিপ্লব চলাকালীন বন্ধু কুগেলমানের কাছে লেখা এক উদ্দীপক চিঠিতে মার্কস প্যারিসে মজুরদের নেতৃত্বে সংগঠিত ঘটনাবলী সম্পর্কে লিখেছিলেন “সামরিক ব্যবস্থাকে শুধু অপরের হাতে তুলে দেয়া নয়, এ হল সে ব্যবস্থাকে চূর্ণ করার প্রচেষ্টা। এবং প্রুধোপন্থী ও ব্লাঙ্কিপন্থীদের নেতৃত্বে পরিচালিত প্যারিসের ‘বীর’ শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে তিনি সত্যিকারের প্রশস্তিগীত উচ্চারণ করেন এবং বলেন ‘কি স্থিতিস্থাপকতা, ঐতিহাসিক উদ্যোগ, আত্মত্যাগের কি ক্ষমতা এই প্যারিসীয়দের- এমন বীরত্বের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে আর নেই।” “নির্বাসন কালে লন্ডনে বসেই মার্কস প্রবল আবেগ আর উদ্দীপনা নিয়ে গণসংগ্রামের এই মহাযজ্ঞে একজন শরিক হিসাবে তাতে সাড়া দিয়েছেন এবং প্যারিসীয়দেরকে “স্বর্গাভিযানে প্রস্তুত, উন্মত্ত নির্ভীক” হিসাবে আখ্যায়িত করেও তাদের “তাৎক্ষণিক পদক্ষেপসমূহের সমালোচনায় হাত দিয়েছেন।” লেনিন লিখেছিলেন “বিপ্লবী সংগ্রামের সর্বোচ্চ রূপের টেকনিক আলোচনায় যারা ভীত তেমন চুনোপুটির অতিবুদ্ধিতে মার্কস আচ্ছন্ন নন। অভ্যুত্থানের ঠিক টেকনিকাল প্রশ্নই তিনি আলোচনা করেছেন। আত্মরক্ষা না আক্রমণ? প্রশ্নটা তিনি এমনভাবে তুলেছেন যেন লড়াই চলছে লগুনের উপকন্ঠে। এবং সিদ্ধান্তে এসেছেন; দ্বিধাহীন আক্রমণ, দরকার ছিল তক্ষুনি ভার্সাই (প্যারী কমিউনের সময় প্রতিবিপ্লবী সরকারের ডেরা) অভিযান করা।”

মার্কস কমিউনার্ডদের সামরিক নেতৃত্বদানকারী কেন্দ্রীয় কমিটির তাড়াতাড়ি তাদের অধিকার ছেড়ে দেয়াটাকে দ্বিতীয় ভুল হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। লেনিন আরো লিখেছেন “অকাল অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে নেতাদের হুশিয়ার করে দেবার ক্ষমতা ছিল মার্কসের। কিন্তু স্বর্গাভিযানী প্রলেতারিয়েতের প্রতি তিনি মনভাব নেন এর কার্যকরী পরামর্শদাতার মত। গণসংগ্রামের শরিকের মত, ব্লাঙ্কি ও প্রুধোর অলীক তত্ব ও ভুলভ্রান্তি সত্বেও যে সংগ্রাম গোটা আন্দোলনটাকে তুলবে এক উচ্চতম স্তরে”। মার্কস এ সম্পর্কে লিখেছিলেন “সাবেকী সমাজের নেকড়ে, শুয়োর ও কুচুটে কুত্তাদের কাছে প্যারিস অভ্যুত্থান যদি বিধ্বস্তও হয়, তাহলেও জুন অভ্যুত্থানের পর এটা আমাদের পার্টির একটা গৌরবোজ্জল র্কীতি”। মার্কস সর্বহারা শ্রেণীর কাছে কমিউনার্ডদের একটি ভুলও চাপা না রেখে বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীদের একজনের মত প্যারী কমিউনকে স্বর্গাভিযানের র্কীতি হিসাবেই দেখেছেন। বন্ধু কুগেলমান এই র্কীতির নিস্ফলতা ও মার্কসের রোমান্টিকতার বিপরীতে বাস্তবতাবোধের পরিচয় দেবার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তখন মার্কস তাকে কঠোর সমালোচনা করে লিখেছিলেন “বিশ্ব ইতিহাস গড়া… অবশ্যই অনেক সহজ হত যদি সংগ্রাম গ্রহণ করা যেত কেবল অব্যর্থ-অনুকুল সুযোগের পরিস্থিতিতে।” কিন্তু প্রায়শই তা ঘটে না। সে কারণে ১৮৭০ এর সেপ্টেম্বরে মার্কস অভ্যুত্থানকে ‘নির্বুদ্ধিতা’ হিসাবে আখ্যা দিলেও “জনগণ যখন অভ্যুত্থান করল, মার্কস তখন তাদের সঙ্গেই যেতে আগ্রহী, এজলাসী হুকুম না দিয়ে সংগ্রামের গতিপথে তাদের সঙ্গে থেকেই শিক্ষা নিতে চান। তিনি বোঝেন যে আগে থেকেই পরিপূর্ণ যাথার্থেই সম্ভাব্যতা হিসাবে করতে যাওয়া হয় হাতুড়েপনা, নয় নিরেট বিদ্যাবাগিষী। এটাই তিনি সর্বোচ্চ তুলে ধরেন যে শ্রমিকশ্রেণী বীরের মত, আত্মত্যাগ করে, উদ্যোগ নিয়ে বিশ্ব ইতিহাস গড়েছে। এ ইতিহাসকে তিনি দেখেন তাদের চোখ দিয়ে যারা আগে থেকেই সাফল্যের অব্যর্থ হিসাব করতে না পারলেও সে ইতিহাস গড়ছে পেটিবুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, যে কেবল নীতিবাক্য ঝাড়ে; ‘সহজেই আন্দাজ করা যেত’, ‘শ্রমিকদের অস্ত্র ধারণা করা উচিত হয়নি’… (লেনিন-কুগেলমানের নিকট মার্কসের লেখা পত্রাবলীর রুশ অনুবাদের ভূমিকা)।

উপরের উদ্ধৃতির শেষ লাইনটিও ১৯০৫ সালে রাশিয়ায় সশস্ত্র অভ্যুত্থান সম্পর্কে প্লেখানভের নেতিবাচক উক্তির বিরুদ্ধে লেনিনের শ্লেষাত্মক বক্তব্য। মার্কস এর এ বিষয়ে কোন সন্দেহই ছিল না যে সমগ্র বিপ্লবী সংগ্রামে যারা প্রতি পদে পদে কেবল জয়লাভের গ্যারান্টি চায় তারা পাতি বুর্জোয়া মানসিকতায় আক্রান্ত। বাস্তব পরিস্থিতি, তার অন্ত:প্রবাহ, নানা রকম উপাদানকে বিবেচনায় রেখেই সর্বহারা শ্রেণীকে তার রাজনৈতিক কর্তব্য ও নির্দিষ্ট কৌশল গ্রহণ করতে হয়। অনেক সময় বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি পেকে উঠবার আগেই সর্বহারা শ্রেণীকে মরণপণ সংগ্রামে নেমে পড়তে বাধ্য করে। ১৮৭১ সালে ফরাসী শ্রমিকশ্রেণীর কাছে এ ধরনের পরিস্থিতিই সৃষ্টি হয়েছিল। তখন মার্কসকে লিখতে হয়েছিল “ভার্সাইয়ের বুর্জোয়া বদমাইশরা প্যারিসীয়দের কাছে এই উপায়ান্তর রাখে- হয় সংগ্রামের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ কর, নয় বিনা সংগ্রামে আত্মসমর্পণ কর। শেষের ক্ষেত্রে শ্রমিকশ্রেণীর মনবল ভেঙ্গে যাওয়াটা হত যে কোন সংখ্যক নেতার মৃত্যুর চেয়েও অনেক বড় দুর্ভাগ্য”। শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী মনবল ভেঙ্গে যাওয়ার বিপদকে পরবর্তী বিপ্লবী সংগ্রামের ক্ষেত্রে মার্কস কি বিশাল ক্ষতি হিসাবেই না দেখেছিলেন! জনগণের ‘ঐতিহাসিক উদ্যোগ’ ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মার্কসের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ লেনিনও সর্বহারা শ্রেণী তথা জনগণের উদ্যোগকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী ১৯০৫ সালের রাশিয়ায় শ্রমিকশ্রেণীর প্রথম বিপ্লবের মূল্যায়ন করেছিলেন এবং প্লেখানভের ‘অতিবুদ্ধি’ সমালোচনাকে তীক্ষ ও নির্মমভাবে খন্ডন করেছিলেন এবং কুগেলমানের নিকট মার্কসের লেখা পত্রাবলীর রুশ অনুবাদের ভূমিকার শেষে ফরাসী শ্রমিকশ্রেণী ও প্যারী কমিউনের সাথে রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণী ও ১৯০৫ সালের বিপ্লবের (যে বিপ্লবকে লেনিন পরবর্তীকালে রুশ অক্টোবর বিপ্লবের ড্রেস রিহার্সাল হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন) সাজুয্য তুলে ধরে লিখেছিলেন “রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণী ইতিমধ্যেই একবার দেখিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও একাধিকবার দেখাবে যে তারা ‘স্বর্গাভিযানের’ ক্ষমতা রাখে।” রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে অক্টোবর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে লেনিনের এই মূল্যায়ন বাস্তব ঘটনা হিসাবেই দেখা হয়।

১৮৮৩ সালে মার্কসের মৃত্যুর পর এঙ্গেলসও তাঁর জীবন সায়াহ্নে এসে পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তরে প্রবেশ ও তার নানা সংকট গভীর অভিনিবেশ সহকার লক্ষ্য করেছিলেন এবং বিশ্বযুদ্ধের নিকট সম্ভাবনার বিষয়ে উল্লেখ করেছিলেন। রাশিয়ায় এই সংকটের পরিপক্কতা যে সবচেয়ে বেশি তিনি তা চিহ্নিতও করেছিলেন এবং আসন্ন যুদ্ধ থেকে যে শ্রমিকদের বিজয় সূচীত হবে এবং এই সম্ভাবনার দিক থেকে রাশিয়া যে সবচেয়ে এগিয়ে তাও বলে গিয়েছিলেন। এঙ্গেলসের মৃত্যুর বিশ বছরের মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও তার মাত্র চার বছরের মধ্যে রাশিয়ায় লেনিন ও বলশেভিকদের নেতৃত্বে অক্টোবর বিপ্লব চমৎকারভাবেই তাঁর ভবিষ্যতবাণীকে সত্য প্রমাণ করেছে।

মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন এঁরা কেউ গণক ছিলেন না, তাঁদের ছিল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিজাত শ্রেণী ও বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের উপযুক্ত ক্ষমতা এবং সর্বোপরি সর্বহারা শ্রেণীর অযুত বিপ্লবী সম্ভাবনা ও উদ্যোগের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা ও অগাধ আস্থা। গত একশত বছরেও পৃথিবী জুড়ে কত শত সহস্র ঘটনা, আর বিপ্লবী উদ্যোগের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণী তার এই অযুত ক্ষমতা আর সম্ভাবনাকে কতভাবেই না তুলে ধরেছে!!

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওর্য়ার্কাস পার্টি।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 129
    Shares