মঙ্গলবার, মে ১১
শীর্ষ সংবাদ

মহামারীর দিনগুলি-৩: ক্ষুধা

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 90
    Shares

আফরোজা সোমা ::

মুখে মাস্ক পড়া এক তরুণী। দীনহীন বা দরিদ্র নন। অবস্থাপন্ন, পোশাকে-আশাকে বোঝা যায়। গলির কুকুরদের খাবার দিতে বেরিয়েছেন। আমাদের বাসার গলিতে। হয়তো আশপাশের কোনো ফ্ল্যাটেই থাকেন। সুমন বেরিয়েছিল পড়শু। তখন দেখেছে। বুভুক্ষু কুকুরগুলো! মেয়েটার দিকে ছুটে গিয়েছিল।

ক্ষুধার চেয়ে বড় সত্য নেই। ক্ষুধাই সার্বজনীন ঈশ্বর।

ওয়ার ফিল্ম আমার অন্যতম প্রিয় বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে দুনিয়ার সিনেমা খুঁজে খুঁজে দেখি। মানুষের বেদনা-যাতনা-ভোগান্তি বহু রকমের হয়। কিন্তু খাদ্যের অভাবের চেহারাটা একইরকম। জার্মানীর বনে একটা জাদুঘরে গিয়েছিলাম। মডার্ন হিস্ট্রির মিউজিয়াম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে বিস্তর জিনিষ ছিল সেখানে।

মাপা রুটির টুকরো। বাটারের মাপা টুকরো। এগুলো ছিল রেশন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। এগুলো খেয়ে মানুষের কেটেছে দিনের পর দিন।

‘হ্যানিবল রাইজিং’ সিনেমাটা সাইকো থ্রিলার। কিন্তু সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিষয়টি অদ্ভুতভাবে এসেছে। খাবারের অভাবে একদল সৈনিক একপর্যায়ে মানুষখেকো হয়ে ওঠে। হেনিবল লেক্টারের ছোট বোনকে হত্যা করে সৈনিকেরা খেয়ে ফেলে। এই দৃশ্য আট বছর বয়সী লেক্টার নিজের চোখে দেখে এক বিকারগ্রস্থ মানুষে পরিণত হয়।

বৈরি সময়ের ঘাতে কোন মানুষ কিভাবে পাল্টে যাবে তা আগে-ভাগে অনুমান করা যায় না। যুদ্ধের অনেক সিনেমাতেই খাবারের বিষয়টা আসে। আক্রমনকারী এবং আক্রান্ত উভয়েই কম বেশি ভোগে। সবচেয়ে বেশি ভোগে জনসাধারণ। খাবারের কষ্টস্মৃতি মানুষ আমৃত্যু ভুলতে পারে না।

আমার নানুর কাছে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দুর্ভিক্ষের কাহিনী শুনেছি। তাদেরও অভাবে ছুঁয়েছিল। ভাতের উপর চাপ কমানোর জন্য নানু নাকি কয়েকবার বিচী কলাও পুড়ে খেয়েছিলেন। মানুষেরা কচু-ঘেচু খেতো। বিলের মাছ, শাপলার লতা, জঙ্গলের নানান শাক-সবজি-লতা-পাতা, বুনো ফল-ফলাদি মানুষের জন্য তখন বড় সহায় ছিল। সৎজিত রায়ের ‘অশনী সংকেত’ সিনেমায় দুর্ভিক্ষের প্রভাবে মানুষের ভেতরে কী করে বদল আসে তার কিছুটা উঠে এসেছে।

আমার ছেলেবেলায় সেই আশির দশকের শেষ দিকে ও নব্বই দশকে তখনো মানুষ অনেক অভাবী ছিল। বহু মানুষের তিনবেলা খাবার জুটতো না। বিশেষত, চৈত্র মাসে খুব অভাব হতো। লোকে বলতো, আকাল। চৈত মাসের আকাল। তখন গ্রামের অপেক্ষাকৃত গরীব মানুষ বা নিম্ন আয়ের মানুষের অনেকেই একবেলা বা দুইবেলা রুটি খেতো। ভাত ছিল অবস্থাপন্নের খাবার। সকালেও গরম ভাত। মাঝে মধ্যে রুটি। এমনি দেখেছি।

শৈশবে আমার বাড়ির আশপাশেও দরিদ্র মানুষ ছিল। আম্মির কাছ থেকে ভাতের মাড় নিত নিয়মিত, এমন পরিবারও দেখেছি। লাউয়ের খোসা ছাড়ানোর পর সেই চামড়াগুলো, ফুল কপি বা বাঁধাকপি কাটলে শক্ত অংশ বা বুড়ো পাতাগুলো, যেগুলো কেটে বাতিল করে দেয়া হতো সেগুলোও চেয়ে নিয়ে রেঁধে খাবার মানুষ ছিল তখন।

শৈশব থেকে কয়েকটা কথা আব্বি এতো হাজার বার বলেছে যে কথাগুলো আমার সিস্টেমে ঢুকে গেছে। আব্বি বলতো, কাউকে যদি কোনো উপকার বা দান করতে চাও, তাইলে ক্ষুধার্তকে পেট ভরে খাওইয়াবা। আর বস্ত্রহীনরে বস্ত্র দিবা। কিন্তু দানের কথা কোনো দিন কাউরে কইবা না। নিজেও মনে রাখবা না।

আব্বি বলতো, এই যে তোমরা তিন বেলা খাইতে পাও সবাই তো তা পায় না। নিজের থাকলেই সবসময় ভোগ করতে হয় না। পৃথিবীর বহু মানুষ না খাইয়া ঘুমায়। আধপেটা খাইয়া থাকে। কোনো কোনো দিন তুমিও ইচ্ছা করে না খাইয়া থাকবা। আধপেটা খাইয়া দেখবা, দুনিয়াটা কেমন লাগে।

করোনার কারণে গৃহবন্দীত্ব চলছে। আমি নিজে ভোজনরসিক। খাওয়া উপভোগ করি। গৃহবন্দীত্বের প্রথম দিকে আমি এটা ওটা রান্না করেছি। পরিবারের সবাইকে একসাথে নিয়ে খেতে খেতে গল্প করতে ভালো লাগে। রিমুও এটা ওটা নানান কিছু বানিয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই। কিন্তু সেদিন মুরগি রান্না করতে-করতে হঠাৎ আমার আনা ফাঙ্কের ডায়রিটার কথা মনে পড়লো। যুদ্ধের সময় আলু আর বিন ছিল তাদের মুল খাবার। আর ছিল শুকনো পাউরুটির সাথে জ্যাম। সেটাও কত হিসেব করে! জানি না কেন, সেদিন খুব অপরাধ বোধ হয়েছিল। অপরাধ বোধ হবার মতন কিছুই আমি করিনি। কী জানি, হয়তো আশপাশে ভালো না থাকা মানুষের খবরগুলোই অপরাধবোধ জাগিয়ে তুলেছিল।

সেদিনই দুপুরে বেরিয়েছিলাম। বাসায় কোনো টাকা ছিল না। বিকাশের সব টাকাও শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেদিন যে ভদ্রলোকের রিকশায় করে যাওয়া-আসা করলাম তাকে নিয়েই বাসার জন্য কিছু সবজি-টবজি আর ডিম কিনলাম।

উনার সাথে লম্বা আলাপ হলো। উনি আসলে রিকশা চালক নন। দুই চারদিন ধরে তিনি রিকশা নিয়ে বের হচ্ছিলেন। উনি একটা ছোটো অফিসে অফিস সহকারীর কাজ করেন। তার তিন চারটা রিকশা আছে। কিন্তু ২৬শে মার্চের দিকে রিকশাওয়ালারা সবাই বাড়ি চলে গেলো। রিকশাগুলো থেকে দৈনিক যেই আয় হতো সেগুলো বন্ধ। কিন্তু রিকশা যেই গ্যারাজে থাকে সেটার দৈনিক ভাড়া দিতে হয়। বাসায় ছেলে-মেয়ে আছে। খাওয়া-খাদ্যের খরচ আছে। উনার অফিসও বন্ধ। তাই, সবদিক ভেবে উনি নিজেই একটা রিকশা নিয়ে নেমে পড়েছেন কয়েকদিন। একটা রুমাল দিয়ে নাকের উপর থেকে ঢেকে মাথার পেছনে গিট্টু দিয়ে তিনি রিকশা চালাচ্ছিলেন। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো মাস্কের বদলে রুমাল। উনার সাথে প্রায় ঘন্টাখানেক ছিলাম। আমি সবজি কেনার সময় একফাঁকে মুখ থেকে রুমাল খুলে উনি একটা টমেটো খাওয়ার সময় দেখলাম উনার মুখে মাস্ক আছে। মাস্কের উপরেই রুমালটা বাঁধা। কী জানি! হয়তো রুমালের আড়াল!

আমার বিলাসিতা বলতে কিছু নেই। কেনাকাটার অভ্যাস নেই। পার্লারে যাই না। তবে, খেতে ভালোবাসি। চিকনচালের ভাত। হয় বাঁশমতি নয় নাজিরশাইল।

পরিবারের মানুষদের নিয়ে, কাছের মানুষদের নিয়ে জমিয়ে আড্ডা দিতে দিতে খেতে ভালো লাগে। আব্বিও এমন ছিল। বাসায় কোনো একটা ছুতো-নাতা উপলক্ষ্য পেলেই আম্মিকে আব্বি বলতো: সোমার মা, একটু পোলাও আর গরুর মাংস রান্ধ। পরিবার বললেই আমার মাথায় আমাদের পরিবারের যে ছবিটা আগে আসে সেটি একটি খাবারের দৃশ্য।

তখনো আমরা ডাইনিং টেবিলে বসে খাইনা। মাদুর বা খেজুরপাতার পাটি পেতে বসি। পাটির উপর ভাতের থালা রাখার জন্য বিছানো হয় হাতে বানানো রঙীন দস্তরখানা। আম্মি ও দাদু বসে পিঁড়িতে। কেউ-কেউ উঁচু জলচৌকি বা পিঁড়ির উপর রাখে ভাতের থালা। গোল হয়ে সবাই বসতাম। আম্মি পাতে-পাতে খাবার বেড়ে দিত।

প্রতিদিন দুপুরের এই খাবার সময়টা ছিল একটা পারিবারিক সম্মেলন। রাতে বা সকালে এমন হতো না। রাতে আমরা আগে-ভাগে ঘুমিয়ে যেতাম। আব্বি রাত করে ফিরতো। সকালেও সবার বসা হতো না। দুপুরবেলাটায় সবাই একত্রিত হতো। খাবার শুরুর আগে একজন আরেকজনের গোসল শেষ করে আসার অপেক্ষা করতো। ক্লাশ থ্রিতে উঠার আগ পর্যন্ত এমনি ছিল আমার দুপুরগুলো। কিন্তু স্কুলে বড় ক্লাশে উঠার পর তেমন দুপুর শুক্রবার ছাড়া মিলতো না। তাই, আমার পরিবারের স্মৃতি মানে দুপুরে মাদুর বিছিয়ে সকলের একসাথে খাওয়ার সম্মেলন।

শুনতে হয়তো একটু অদ্ভুতুড়ে লাগতে পারে। এখন মাঝে মধ্যে আমি না খেয়ে থাকার চেষ্টা করি। না। ডায়েট-টায়েট কিছু নয়। এমনি। ইচ্ছে করেই না খেয়ে থাকা। এই না খেয়ে থাকাতে পৃথিবীর কোনো নিরন্নের কোনো উপকার হয় না, জানি। সামর্থ্য থাকার পরেও না খেয়ে থাকা, আর সামর্থ্য না থাকার কারণে না খেয়ে থাকা এক নয়। তবু, না খেয়ে থাকা মানুষের প্রতি এটা আমার সলিডারিটি।

আমি বিপ্লবী নই। কবি, লেখক। রাতারাতি পৃথিবী পাল্টে দেবার মতন শক্তি আমার কলমে নেই। কিন্তু নিরন্নের পক্ষে আওয়াজ জারি রাখার ইচ্ছা ও সামর্থ আছে। সেটুকুই আমি করি। লেখার মাধ্যমে আওয়াজ জারী রাখি।

গত কয়েক দিন ধরে মানুষের কষ্টের খবর আসছে। খাদ্যাভাবে আছে মানুষ। কিছু মানুষের জমানো সম্পদের পরিমান এতো যে, আগামী ৩ বছর আয়-রোজগার না হলেও তারা বসে খেতে পারবে। কিছু মানুষের সামর্থ্য এতো যে, চালের কেজি ৩শ টাকা হলেও তাদের সমস্যা হবে না। কিন্তু সংসারে এরা গুটি কয়। মেজরিটি বা সিংহভাগের দশা হচ্ছে পুলসিরাতের পুল পার হওয়ার মতন।

করোনার মহামারীর পর, অর্থনৈতিক চিত্রটা কেমন হবে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হচ্ছে। অ্যামেরিকা ট্রিলিয়ন ডলারের ফান্ড গঠণ করেছে। কিন্তু খোদ অ্যামেরিকাতেই আওয়াজ উঠেছে। ট্রিলিয়ন ডলার ফান্ডের বড় অংশটা যেনো ধনী বা কর্পোরেটদের পিছনে খরচা না হয়, সেই মর্মে বক্তব্য দিচ্ছেন অনেকে। গুটি কয় ধনীকের জন্য বেইল আউটের কথা না ভেবে সংখ্যাগুরুর কথা ভাবতে হবে। এই মহামারীর পর অর্থনীতিকে বাঁচাতে এটাই কার্যকর পন্থা, বলছেন বোদ্ধারা।

সমাজের সিংহভাগের কল্যাণে কিভাবে ফান্ডের অর্থ খরচ করা যায় সেই বিষয়ে চিন্তা করার জন্য যারা তাগিদ দিচ্ছেন তাদেরই একজন নিক হ্যানাউয়ার। তিনি নিজেই ধনী বণিক বটে। তবে ধনীক পোষা সমাজনীতি পাল্টানোর পক্ষে তিনি বহু দিন ধরেই জনমত গঠনের চেষ্টা করছেন। বড়লোকেরা তাদের ব্যাবসার লভ্যাংশ নিজেদের পকেটে ভরে। কিন্তু লোকসান হলে সেটিকে তারা সোশালাইজ করে ফেলে। জনতার ট্যাক্সের টাকায় গড়া ফান্ডের সিংহভাগ তারা পেয়ে যায়। জনতার সাথে ভাগাভাগি করে কমিয়ে নেয় নিজেদের লোকসানের পরিমান। রাষ্ট্রের নীতিও তাদের পক্ষে কাজ করে। কারণ তাদের লবি খুবই শক্তিশালী। গরীবের টাকাও নেই। লবিও নেই।

বাংলাদেশেও কয়েক হাজার কোটি টাকার ফান্ড গঠনে কার্যক্রম চলছে। এই ফান্ডের অর্থ ধনীক শ্রেনীর একাউন্টে কতটা যাবে আর সাধারণের কাছে কতটা আসবে তা নিয়ে কথা বলা দরকার।

তীব্র বৈষম্য জারী রেখে সমাজে শান্তি আনা যায় না। জিডিপির চোখ ধাঁধানো পরিমান দিয়ে ইনইকুয়ালিটি বা বৈষম্য ঢেকে রাখা যায় না। খোদ অ্যামেরিকাও তা পারেনি। সাম্প্রতিক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে, আমাদের দেশেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য প্রবলভাবে বাড়ছে।

চলমান মহামারীতে আর কিছুদিন যদি এরকম লক ডাউন বা অবরুদ্ধ দশা চলে তাহলে বিপর্যয় ঠেকানো কঠিণ হবে। কাতারে কাতার মানুষ লাইনে দাঁড়াবে সস্তার চাল ও ডালের জন্য। এখনো বিপর্যয় শুরুই হয়নি। তাই, হয়তো গলির ভেতর অভুক্ত কুকুরের দলকে খাবার দেবার জন্য রাস্তায় নেমে আসা মানুষ দেখা যায়। তাই, হয়তো নিরন্ন মানুষকে ত্রান দিতে মানুষ অনলাইনে, অফলাইনে সংঘবদ্ধ হবার ফুরসত পাচ্ছে। কিন্তু বিপর্যয় যদি ঘনীভূত হয়, অভাব যদি গণহারে মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ে তখন পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিণ হবে বৈকি! তাই, এখনি আগাম পরিকল্পনা তৈরি রাখা দরকার।

লেখক: কবি, লেখক ও সহকারী অধ্যাপক, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।
( লেখকের ফেইসবুক থেকে নেওয়া)


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 90
    Shares