মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১

‘মফিজ আলীর জীবন ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয়’

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 9
    Shares

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:: জননেতা মফিজ আলীর ১২-তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বক্তারা বলেছেন, মফিজ আলীর জীবন ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয়।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি, মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা, সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ বিরোধী নেতা, ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, প্রখ্যাত চা-শ্রমিক নেতা মফিজ আলী-এর ১২-তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পালন করা হয়।

আজ সকাল ১০ টার সময় বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট, বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি, ধ্রুবতারা সাংস্কৃতিক সংসদ, গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি, হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন, চা শ্রমিক সংঘ, রিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন ও স’মিল শ্রমিক সংঘসহ বিভিন্ন সংগঠন ও
ব্যক্তিবর্গের পক্ষ থেকে কমলগঞ্জ উপজেলার শ্রীসূর্য-ধূপাটিলাস্থ প্রয়াত নেতার সমাধিতে পুস্পস্তবক অর্পণ এবং প্রয়াত নেতার অসমাপ্ত কাজকে অগ্রসর করে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে শপথ গ্রহণ করা হয়।

পরে স্থানীয় মাঠে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির উদ্যোগে এক আলোচনা সভা অনুষ্টিত হয়। সংগঠনের জেলা সভাপতি মোঃ নুরুল মোহাইমীনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক রজত বিশ্বাসের পরিচালনায় অনুষ্টিত আলোচনা সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত
ছিলেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি কবি শহীদ সাগ্নিক, প্রয়াত নেতার অনুজ রেজাউল করিম, বিশিষ্ট বাম রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক ডা. আব্দুল হান্নান চিনু, বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি মৌলভীবাজার জেলা কমিটির আহবায়ক ডা. অবনী শর্ম্মা,
বাংলাদেশ স’মিল শ্রমিক ফেডারেশন রেজি নং বি-২২০০ এর কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন, ধ্রুবতারা সাংস্কৃতিক সংসদ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সম্পাদক অমলেশ শর্ম্মা ।

আলোচনা সভার শুরুতে প্রয়াত নেতা মফিজ আলীসহ সদ্য প্রয়াত প্রবীণ রাজনীবিদ মনোহর আলী, চা-শ্রমিকনেতা সুখরাম নায়েক ও সুভাষ কর্মকারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন কমলগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি প্রণীত রঞ্জন দেবনাথ, বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি মৌলভীবাজার জেলা কমিটির অন্যতম নেতা রমজান আলী পাখি, কৃষকনেতা এখলাছুর রহমান, হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের জেলা সম্পাদক মোঃ শাহিন মিয়া, রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সোহেল আহমেদ, চা শ্রমিক সংঘের নেতা স্যামুয়েল ব্যাগমেন, স’মিল শ্রমিক সংঘ কমলগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি মোঃ ফরিদ মিয়া প্রমূখ।

সভায় বক্তারা প্রয়াত নেতার অসমাপ্ত কাজ শোষণহীণ সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বৃহত্তর আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলার দৃপ্ত অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন মফিজ আলীর জীবন ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয়। সংগ্রামী এই জননেতা ১৯২৭ সালের ১০ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলা শ্রীসূর্য-ধূপাটিলা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। দীর্ঘ ৬০ বছরের বেশি রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছাত্র আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণ আন্দোলন, চা শ্রমিক আন্দোলন, বালিশিরা কৃষক আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদান করেন। তিনি বৃটিশ আমল, পাকিস্তান আমল ও বাংলাদেশ আমলে মোট ৭ বার কারাবরণ করেন। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আদর্শে বিশ্বাসী সাম্রাজবাদ সামন্তবাদ বিরোধীনেতা মফিজ আলী জননেতা হিসেবে শোষিত নির্যাতিত শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে যেমন নিরলস সংগ্রাম করে গেছেন তেমনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে সংশোধনবাদ, সুবিধাবাদীদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন। তিনি ইংরেজি ডন, সংবাদ, ইত্তেফাক, সাপ্তাহিক জনতা, লালবার্তা প্রভৃতি পত্রিকায় লেখালেখি করতেন। তিনি গণতন্ত্রের নির্ভীক মূখপত্র সাপ্তাহিক সেবা পত্রিকায় মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে লেখেছেন। ২০০৮ সালে ১০ অক্টোবর সংগ্রামী এই জননেতা ৮১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সভায় বক্তারা সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট, নোয়াখালী, সাভারসহ সারাদেশে ভয়াবহ লোমহর্ষক নারী ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন এসব ঘটনা প্রচলিত বৈষ্যমমূলক সমাজ ব্যবস্থার অকার্যকরতার প্রকাশ। নারীরা আজ কলেজে, মাদ্রাসায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে, কর্মক্ষেত্রে,
গণপরিবহণে, নিজ বাড়িতে ধর্ষিত হচ্ছে; এমন কি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও নারীরা নিরাপদ নয়। অথচ নারী অধিকার, নারীর ক্ষমতায়, নারী উন্নয়ন নিয়ে নানা রকম গালভরা বুলি শুনিয়ে সরকার তথাকথিত উন্নয়নের সাফাই গাইছে। নারীর সার্বিক নিরাপত্তা তথা নারী মুক্তির লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজি বিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক সরকার, রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সাথে নারী-পুরুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।

সভায় বক্তারা আরও বলেন বাংলাদেশের শিল্প সেক্টরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম মজুরি দেওয়া হয় চা-শ্রমিকদের, দৈনিক ১০২ টাকা হিসেবে মাসিক মাত্র ৩০৬০ টাকা। অথচ চা-শ্রমিকের রক্ত ঘাম করা পরিশ্রমে রেকর্ডের পর রেকর্ড চা-উৎপাদন হচ্ছে, স্বাভাবিক কারণে মালিকের মুনাফাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু মানবেতর জীবনযাপন করা শ্রমিকদের জন্য বাজারদরের সাথে সংগতি রেখে ন্যায্য মজুরির প্রদান করা হয় না। এর কারণ হচ্ছে মালিকগোষ্ঠি ও দালাল শ্রমিক নেতাদের অশুভ আতাত। চা-শ্রমিকরা আজ দালাল চা-শ্রমিক ইউনিয়নের কাছে জিম্মি, আর চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা মালিকদের কাছে দাসখত দিয়ে নিজেদের আখের গোঁছাতে ব্যস্ত। যার কারণে ইউনিয়ননের নেতাদের বাড়ি-গাড়ি, অর্থ-বিত্ত বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি বাড়ে না। এমন কি ২০১৮ সালেই দৈনিক ১০২ টাকা মজুরির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তারা মজুরি বৃদ্ধি জন্য পদক্ষেপ না নিয়ে মালিকদের কাছে অনুনয় বিনয় করতে থাকে। এই করোনা কালে যখন সারাদেশের শিল্পাঞ্চল বন্ধ ঘোষণা করা হয় তখনও চা-শ্রমিকরা জীবনের
ঝুঁকি নিয়ে উৎপাদনে সক্রিয় ছিলেন। অথচ চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি বেলা মালিকরা করোনাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে পিছ পা হচ্ছে না। দালাল নেতারা ৩০০ টাকা মজুরি করার কথাশ্রমিকদের মধ্যে প্রচার করলেও এখন মালিকদের সাথে আলোচনায় দৈনিক ১১৮ টাকা মজুরি নিয়ে
দরকষাকষি করছে। যতদুর জানা যায় মালিক পক্ষ দৈনিক ১১০ টাকা মজুরি বৃদ্ধিতে সম্মত হলেও তারা শেষপর্যন্ত ১১৫ টাকায় উঠতে পারে আর ইউনিয়নের নেতারা ১১৮ টাকা মজুরির জন্য মালিকদের দয়াদাক্ষিণ্য প্রত্যাশা করছে। অথচ দ্রব্যমূল্যের লাগামহীর ঊর্দ্ধগতির এই সময়ে শ্রমিকরা আশা করছিল দেরিতে হলেও দুর্গা পূজার আগে মজুরি বাড়বে, বোনাস এবং এরিয়ার টাকা এক সাথে পেয়ে কোন রকমে দুর্গা পূজার উৎসব করতে পারবে। কিন্তু মজুরি বাড়লেও এবার মালিকরা এরিয়ার টাকা(অক্টোবর পর্যন্ত ২২ মাস) না দেওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। আবার শ্রমআইন ও শ্রমবিধি অনুযায়ী উৎসব বোনাস পাওয়া সকল স্থায়ী শ্রমিকের আইনগত অধিকার হলেও দালাল নেতারা চুক্তিতে কর্মে উপস্থিতির উপর নির্ভর করে উৎসাহ বোনাসকে উৎসব বোনাস হিসেবে চালিয়ে শ্রমিকদের হক কেড়ে নিয়ে মালিকের স্বার্থরক্ষা করেছে। মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাজারদরের সাথে সংগতি রেখে ৬ সদস্যের একজন শ্রমিক পরিবারের নি¤œতম মূল মজুরি ২০ হাজার টাকা অপরিহার্য। এর সাথে শিক্ষা, চিকিৎসা, পোষাক, বিনোদন ইত্যাদি খরচ যুক্ত হবে। এই হিসেবে মাসিক ২০ হাজার টাকা মূল মুজরি হিসেবে দৈনিক ৬৭০ টাকা মজুরি হওয়া দরকার।

 


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 9
    Shares