বুধবার, জানুয়ারি ২০

ভ‍্যাকসিন জাতীয়বাদ ও আমরা!

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 36
    Shares

ডা: দিবালোক সিংহ ::

১.কিছু তাগিদ
কিছূদিন ধরে অনুভব করছি করোনা ভ‍্যাকসিন বিষয়ে কিছু লিখে রাখার। এর ভেতর মাঝে মাঝে অনলাইন টিভি এসব বিষয়ে আলোচনায় অংশগ্রহন করার আমন্ত্রন জানায়। অনেক সময় অংশ নেই। বিষয়টির কারিগরি দিক আমার গভীরে জানা নেই। তারপরও এর রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক, কুটনৈতিক, সামাজিক দিকটি আমাকে ভাবায়।

প্রথমত এটা বলা দরকার আমাদের দেশে করোনা সংক্রমন শুরু হয়েছে গত মার্চের শুরুতে। এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার লক্ষ আক্রান্ত হয়েছে। মৃত‍্যু হয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার (27 নভেম্বর )। আমাদের দেশের জন বসতির ঘনত্ব বিবেচনায় সংখ‍্যা খুব মারাত্মক নয়। তবে শীতের মৌসুমে প্রকোপ বাড়বে এ আশংকা আছে। আবহাওয়ার সাথে করোনার সম্পৃক্ততা স্বীকৃত নয়। যদিও WHO যে পরিসংখ্যান দেখাচেছ তাতে দেখা যায় জুলাই মাসে সর্বোচ্চ পিক, তারপর অগাস্টে কিছু নেমে যায়,তারপর আবার উর্ধগতি সেপ্টেম্বরে কিছু কমে গিয়ে,অক্টোবর- নভেম্বরে আবার বাড়ছে। কিন্তু কখনো এটা বিশ শতাংশের নিচে যায় নি। আসে পাশেই থাকছে। অন‍্যদিকে শহরে রোগের প্রকোপ অপেক্ষা কৃত তীব্র। গ্রামাঞ্চলে সে ধরনের তীব্রতা পরিলক্ষিত হয়নি। অর্থনৈতিক ভাবে শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠী বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের ঢাকা ছাড়তে হয়েছে, চাকুরি চলে গেছে, ছোট ব‍্যবসা বানিজ‍্য বন্ধ হয়েছে, ভাড়াটিয়া বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। শিক্ষকরা মাসের পর মাস বেতন পাচছেন না। অনেকে বকেয়া গ্রস্ত হয়েছেন। প্রয়োজনীয় খরচ চালাতে তারা হিমশিম খাচছেন। পল্লী অঞ্চলে এ সমস‍্যা কম। কৃষি বা এর সাথে জড়িত খাতগুলো সেরকম ধাক্বা খায় নি। কৃষি উৎপাদন ভাল হয়েছে। ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে। অন‍্যদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন আশীভাগ গার্মেন্টস কারখানা চালু আছে। তার মানে মোটা দাগে পঞ্চাশ লাখ শ্রমিকের বিশভাগ অর্থাৎ প্রায় দশ লাখ এখনো ঘুরে দাড়াতে পারে নি। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী প্রায় ছয় লক্ষ প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন।

সরকার প্রথমে দুর্যোগ মোকাবেলায় চরম ব‍্যর্থ হয়েছে। লিখিত করোনা মোকাবিলা কৌশল থাকলেও বড় শহর বিশেষত: ঢাকার সমস‍্যা তথা বড় হাসপাতালগুলো নিয়ে স্বাস্থ‍্য অধিদপ্তর ব‍্যস্ত থাকছে। অন‍্যদিকে করোনার অব‍্যবস্থাপনা ও দূর্নীতি সরকারের অযোগ্যতাকে দৃশ‍্যমান করে তুলেছে। সরকারের বহুল প্রশংসিত কমিউনিটি ক্লিনিক এ অতিমারিতে কোন দৃশ‍্যমান উদ‍্যোগ নিতে ব‍্যর্থ হয়েছে। করোনা মোকাবেলায় নজরদারী (surveillance) ব‍্যবস্থা গ্রহন, সুষ্ঠ যোগাযোগ কৌশল তৈরী ও জন অংশগ্রহণ অনুপস্থিত। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ‍্য সেবা শক্তিশালী করার পদক্ষপ দৃশ‍্যমান হয় নি।

২.কোভিড ভ‍্যাকসিন বা টিকা

বর্তমানে (নভেম্বর ২০২০)প‍্রায় ৫৫টি টিকা মানব দেহে প্রয়োগের(clinical stage) বিভিন্ন ধাপে রয়েছে। এছাড়া আরো ৮৭ টি টিকা প্রস্তুতকারক প্রাণীদের ওপর পরীক্ষার (pre clinical stage) বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছেন। ১৩ টি ভ‍্যাকসিন পরীক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

যে কোন ভ‍্যাকসিন তৈরী প্রক্রিয়ায় বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। মানুষের শরীরে এই টিকা পরীক্ষার আগে কোষে ও প্রাণীদের শরীরে এ পরীক্ষা চালান হয়। এতে সফলতা পেলে তখন মানব দেহে পরীক্ষা শুরু হয়।প্রাণী বলতে সাধারণত ইদুর বা বানরের উপর এ ধরনের পরীক্ষা চালান হয়। এ ধরনের পরীক্ষায় দেখার বিষয় হল ঐ টিকা প্রাণীদের শরীরে প্রতিরোধমৃলক প্রতিক্রিয়া সৃস্টিতে সক্ষম হচছে কি’না। যদি এ ধাপ সফল হয় তাহলে মানব দেহে প্রয়োগ বা clinical পরীক্ষার ধাপ শুরু হয়। মানব দেহে প্রয়োগের চারটি ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপে ২০-৮০ জন স্বেচছাসেবক মনোনীত করা হয়। এ ধাপের লক্ষ হল এই টিকার নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় মাত্রা বা ডোজ ঠিক করা। তাছাড়া মানুষের শরীরে এই টিকা প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা প্রতিক্রিয়া (immune systems response ) সৃস্টি করছে কি’না? দ্বিতীয় সম্প্রসারিত ধাপে কয়েকশ স্বেচছাসেবী নির্বাচন করা হয়। এর ভেতরে শিশু ও বয়স্ক এরকম দল থাকে। এ ধাপ সফল হলে কার্যকারিতা ধাপের পর্যবেক্ষন শুরু হয়। এ ধাপে কয়েক হাজার স্বেচছাসেবীকে যুক্ত করা হয় (এক থেকে পঞ্চাশ হাজার পর্যন্ত হতে পারে) । যাদের শরীরে টিকা দেয়া হয় নি ( placebo) তাদের বিপরীতে যাদের টিকা দেয়া হয়েছে তাদের শারীরিক প্রতিক্রিয়া কি!?এই ধাপে দেখা হয় কতজন সংক্রমিত হয়েছেন। শারীরিক প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া (immune response ) প্রয়োজনীয় মাত্রায় সঞ্চারিত হচছে কি’না। এ ক্ষেত্রে নুন‍্যতম পঞ্চাশ ভাগ স্বেচছাসেবীর শরীরে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া সঞ্চারিত হলে এই টিকা অনুমোদন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের জন‍্য বিবেচিত হয়। টিকা অনুমোদন সাধারণ ভাবে প্রত‍্যেকটি দেশের নিজস্ব অনুমোদন ব‍্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। চতুর্থ ধাপ, টিকা অনুমোদন পরবর্তী পরিবীক্ষন । এ ধাপে টিকা ব‍্যবহারের প্রবণতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, দীর্ঘ মেয়াদী ইমিউনিটি সৃস্টি সংক্রান্ত বিষয় সমুহ বিবেচনায় নেয়া হয়।

৩.টিকা তৈরির কিছু কারিগরি দিক:-

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Moderna একটি ব‍্যাক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। তারা জিন প্রযুক্তি ভিত্তিক (mRNA) ভ‍্যাকসিন বা টিকা প্রস্তুত করছে। ঐ জিন mRNA মানুষের শরীরে স্পাইক বা পেরেকের মত দেখতে ‍প্রটিন বা আমিষ কনা তৈরী করে। ঐ পেরেক সদৃশ‍্য আমিষ কনা শরীরে প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া সৃস্টি করে। মডার্না তিরিশ হাজার স্বেচছাসেবকের উপর এই পরীক্ষা চালাচ্ছে। কানাডা, জাপান, ও কাতারের স্বেচছাসেবীরা এতে অংশ নিচছেন। মডার্না তাদের টিকা ৯৪ ভাগ সফল বলে দাবী করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার দশ কোটি ডোজ টিকা সরবরাহের জন্য তাদের সাথে২৫০ কোটি মার্কিন ডলারের চুক্তি করেছে।

অন‍্যদিকে ফাইজার ও বাইওএনটেক ( Pfizer -BioNtech) তারাও তাদের সম্প্রসারিত তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় ৪৩০০০ স্বেচ্ছাসেবক সম্পৃক্ত করেছেন। তারা প্রথম ১৬৪ জন স্বেচছাসেবীর উপর চালানো পরীক্ষার ভিত্তিতে বলছে তাদের টিকার কার্যকারিতা ৯৫ শতাংশ।বয়স্কদের ক্ষেত্রে কার্যকারিতা ৯৪℅। তারা ইতিমধ্যে দশ কোটি টিকা সরবরাহের লক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ১১৯ কোটি ডলারের চুক্তি করেছে। তাছাড়া জাপান বারো কোটি ডোজ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশ কোটি ডোজ টিকা সরবরাহের অগ্রীম চুক্তি করেছে।

এসট্টাজেনিকা (AstraZenca) ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় শিম্পানজির শরীরের আডোনো ভাইরাস জীবাণুর জিনের উপর ভিত্তি করে টিকা উদ্ভবনের কাজ করছে। তারা দাবি করছে তাদের টিকা ৯০ ℅ সফল। এই টিকা সাধারণ ফ্রিজে রাখা যাবে। যদিও তাদের তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে কিছু সংশয় দেখা দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তিরিশ কোটি ডোজ কেনার জন‍্য ১০২ কোটি ডলারের চুক্তি করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ইতিমধ্যে চল্লিশ কোটি ডোজ নেয়ার জন‍্য অগ্রীম চুক্তি সই করেছে। এদের কোম্পানি CureVac আরো ষাট কোটি ডোজ ২০২২ সালে সরবরাহের ঘোষনা দিয়েছে ।

লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ rna জিন প্রযুক্তির ভিত্তিতে টিকা উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচছে।

DNA জিন প্রযুক্তির ভিত্তিতে জাপানের প্রতিষ্ঠান ANGES কাজ করছে। আগামী ২০২১ সালে তারা তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা শুরু করবে।
ভাইরাস ভেক্টর ভিত্তিক টিকা:- এই টিকা Adonovrus (Ad5) জিবানুর জীনের উপর ভিত্তি করে তৈরী করা হচছে।CONSINO-Biologics নামে একটি চীনা প্রতিষ্ঠান এই প্রযুক্তিতে কাজ করছে। এই প্রতিষ্ঠান তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা শুরু করেছে। এই পরীক্ষা দক্ষিণ আফ্রিকা , পাকিস্তান ও রাশিয়ার স্বেচছাসেবীদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচছে।

একই কারিগরি প্রক্রিয়ায় রাশিয়ার গামালা ইনস্টিটিউট স্পুটনিক -৫ নামে একটি টিকা উদ্ভাবনের ঘোষনা দিয়েছে। এই টিকা বর্তমানে প্রায় ৪০০০০ স্বেচছাসেবীর উপর প্রয়োগ করা হচছে। এই স্বেচ্ছাসেবকরা সংযুক্ত আরব আমিরাত, বেলারুশিয়া, ভেনেজুয়েলা, এবং ভারতের। রাশিয়া দাবী করছে তাদের টিকার উপযোগিতা ৯২ শতাংশ। যদিও রাশিয়া এখনো এ সংক্রান্ত কোন তথ‍্য আন্তর্জাতিক ভাবে প্রকাশ করে নি (not peer reviewed )। তারপরও ভারত, মেক্সিকো, ভেনেজুয়েলা ও ব্রাজিল সফল হলে কেনার জন‍্য অগ্রীম চুক্তি করেছে।

[ ] আমিষ (protein) ভিত্তিক টিকা :- নভোভক্স একটি বৃটিশ কোম্পানি। তারা পরীক্ষার তৃতীয় ধাপে রয়েছে। তারা বৃটেনের ১৫০০০ স্বেচছাসেবীর উপর এই পরীক্ষা চালাচ্ছে।ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট (SII) এর সাথে তারা চুক্তি করেছে। সফল হলে তারা বছরে দুইশ কোটি ডোজ উৎপাদন করবে। ২০২১ সালে চূড়ান্ত ফলাফল আশা করা হচছে।

নির্জিব বা অর্ধ মৃত করোনা (inactivated or attenuated )ভাইরাস ভিত্তিক টিকা:- এই প্রযুক্তি অবলম্বনে কাজ করছে চীনা প্রতিষ্ঠান SINOPHARM। তারা চীন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত,মরক্বো ও পেরুতে পরীক্ষা চালাচ্ছে। প্রায় দশ লক্ষ স্বেচছাসেবী তাদের সহযোগিতা করছে।

৪.ভ‍্যাকসিন বা টিকা প্রাপ্তি প্রসঙ্গ

বিশ্ব স্বাস্থ‍্য সংস্থার উদ‍্যেগে একটি টিকা বিতরন প্রক্রিয়ার কাজ শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার নাম কোভাক্স (C 19 Vaccines Global Access Facilities )। এই প্রক্রিয়া গাভি ( GAVI),CEPI (coalition for epidemic preparedness innovations ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত। এ কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধনকৃত দেশগুলো তার জনসংখ্যার বিশভাগ পর্যন্ত টিকা কিনতে পারবে। এ প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক ঔষধ সরবরাহকারীদের সাথে চুক্তি করবে, যখনই বাজারে টিকা আসবে তখনই সরবরাহের ব‍্যবস্থা করবে, অতিমারি দমনে কাজ করবে এবং অর্থনৈতিক ব‍্যবস্থা পুনর্গঠনে সহযোগিতা করবে। প্রায় ১৯০টি দেশ এ প্রক্রিয়ায় যোগ দিয়েছে। কোভাক্স প্রক্রিয়ায় টিকা পেতে হলে দুটো পদ্ধতি আছে। প্রথম পদ্ধতি প্রতি টিকার জন‍্য তার দামের এক তৃতীয়াংশ বা ১•৬ ডলার বা ১৩৬ টাকা অগ্রীম পরিশোধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোভাক্স প্রস্তুতকারির সাথে যোগাযোগ করে টিকা সরবরাহের ব‍্যবস্থা করবে। অন‍্য পদ্ধতি অনুযায়ী প্রতিটি টিকার জন্য ৩•১৬ ডলার বা ২৬২ টাকা অগ্রীম পরিশোধ করতে হবে। সেক্ষেত্রে তারা তাদের পছন্দের ঔষধ কোম্পানি থেকে টিকা সংগ্রহ করতে পারবেন। এ প্রক্রিয়ায় মোট তহবিলের প্রয়োজন দুশ কোটি ডলার। এ পর্যন্ত সংগৃহীত হয়েছে১৪০ কোটি ডলার বা (১৬৯০০ কোটি টাকা )। আরো একশ কোটি ডলার সংগ্রহের প্রচেষ্টা চলছে।

৫.ভ‍্যাকসিন জাতীয়তাবাদ

তবে আমেরিকা ও চীন এ কোভাক্স প্রক্রিয়ায় যোগদানে বিরত আছে।এরকম একটি পরিস্থিতিতে ধনী ও পরাক্রমশালী দেশগুলো নিজের দেশের জন‍্য অগ্রীম টিকা কিনে রাখছে। এ প্রবণতা দৃশ‍্যমান। তা ছাড়া টিকা প্রস্তুতকারক বেশীরভাগ কোম্পানি পশ্চিমা দেশের হওয়াতে তারা যে কোন সময় নিজেদের স্বার্থ বিবেচনায় টিকা বা এ প্রযুক্তি রপ্তানি নিষিদ্ধ করতে পারে। ২০০৯ সালে এরকম একটি পরিস্থিতির সৃস্টি হয়েছিল H1N1 ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর সময়। ঐ সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দুশ কোটি ডোজ টিকার চাহিদা দিয়েছিল। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাই ষাট লক্ষ ডোজ কিনে নিয়ে অগ্রীম মজুত তৈরী করেছিল। একই সময়ে বৃটেন, কানাডা, সুইভেন, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া টিকা কেনার অগ্রীম চুক্তি সম্পন্ন করেছিল। পরবর্তীতে যখন মহামারীর প্রকোপ কমে আসে এবং বাজারে টিকার চাহিদা কমে যায় তখন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে টিকা সরবরাহ আলোচনায় তারা ফিরে এসেছিল।

এরকমের অতি জাতীয়তাবাদী পদক্ষেপ এখনকার পৃথিবীতে আরো উৎসাহ ও পরাক্রমের সাথে গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেভাবে লোকরঞ্জনবাদ, মৌলবাদ ও উগ্রজাতীয়তাবাদ বিকশিত হয়েছে তাতে করোনা টিকা আবিষ্কৃত হলেও তৃতীয় বিশ্বের গরীব মানুষের জন‍্য তা অধরাই থেকে যেতে পারে।

৬.টিকা উদ্ভাবিত হলে উৎপাদন, কেনাকাটা ও ন‍্যায‍্য বিতরন

টিকা উদ্ভাবিত হলে এই টিকার বিশাল সংখ্যক উৎপাদন, কেনাকাটা ও ন‍্যায‍্য বিতরন ব‍্যবস্থা অন‍্যতম চ‍্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হবে। যেমন মভার্না বা ফাইজারের টিকা যথাক্রমে মাইনাস আশী ডিগ্রী বা বিশ ডিগ্রীর নিচে রেখে সংরক্ষণ করতে হবে। UPS বা FedEx ইতিমধ্যে বিশেষ ভাবে ঠাণ্ডা গুদামঘর(ware house) নির্মাণ শুরু করেছে। এর জন‍্য প্রয়োজন শুকনো বরফ (dry ice)। তাছাড়া টিকা ইনজেকশনের জন‍্য প্রয়োজন উচ্চ ঠাণ্ডা সহ‍্য শক্তি সম্পন্ন কাচের সিরিঞ্জ। এ সব কিছুই এ ধরনের টিকা সরবরাহ ও বন্টনে বিশাল বানিজ‍্য সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচছে। একই সাথে এর ফলে শুধু ধনী ও পরাক্রমশালী দেশ গুলো লাভবান হবে আর বেশীর ভাগ দেশ এ প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যাবার ঝুঁকি দৃশ‍্যমান হয়ে উঠছে।

৭.বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

আমাদের এখানে টিকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সীমিত। তাই আমাদের নির্ভর করতে হবে বিদেশী সরবরাহ বা অনুদানের ওপর। দেশে এখন তেতৃিশ ভাগ লোক দরিদ্র সীমার নিচে বাস করছে। একটি টিকার আনুমানিক দাম অনুমান করা হচছে ৩২-৪০ ডলার। একজনকে তিন সপ্তাহের ব‍্যবধানে দুটো টিকা নিতে হবে। এই হিসেবে শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিনা মৃল‍্যে টিকা সরবরাহ করলে খরচ হবে ৫০০ মিলিয়ন ডলার (৫০০×1000000= ৫০ কোটি ডলার বা ৪২২৫ কোটি টাকা )। এ অর্থ বছরে আমাদের কোভিড এর জন‍্য থোক বরাদ্দ আছে দশ হাজার কোটি টাকা। ঐ বাজেট ব‍্যবহার করা যেতে পারে। যদিও বাজেটে ঘাটতি দু লক্ষ কোটি টাকা!। বিশ্ব ব‍্যাঙ্ক ১২০০ কোটি ডলার কোভিড তহবিল ছাড়ের ঘোষনা দিয়েছে। তাছাড়া চীন ও রাশিয়ার নিজস্ব কোভিড টিকা বাজারে আসছে এরকম খবর বেরিয়েছে। চীনা রাষ্ট্রপতি আগে বলেছিলেন তাদের আবিষ্কৃত টিকা বিতরনে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো অগ্রাধিকার পাবে। বাংলাদেশ কূটনৈতিক ভাবে এসব বিষ য়ে কতটুকু এগিয়ে আছে তা গণমাধ্যমে পরিষ্কার নয়।

প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা কি হতে পারে
এ ক্ষেত্রে আমরা নিম্নলিখিত ভাবে ভেবে দেখতে পারি :-
১. টিকা বিতরনের একটি জাতীয় পরিকল্পনা।
২. পুরো টিকা বন্টনের জন‍্য একটি কৌশলগত পরিকল্পনা।
৩. কার্যকরি পরিকল্পনা যাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে বিনামুল্যে টিকার আওতায় রাখা যায়।
৪. একটি কার্যকর সমতা ভিত্তিক বন্টন ব‍্যবস্থা।
৫. টিকা দেয়ার একটি জাতীয় তথ‍্য ভান্ডার ব‍্যবস্থা।

লেখক : সদস্য, সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটি।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 36
    Shares