শনিবার, ডিসেম্বর ৫

ভেজা চুলে যৌনতা !

এখানে শেয়ার বোতাম

সাবিনা শারমিন ::

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর
হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা–

কবি জীবনানন্দ দাস বনলতা সেন এর কেশরাশির বর্ণনা দিয়েছিলেন কবিতায়। আর এতোবছর পর নারীর কেশকে দায়ী করা হলো ধর্ষকের যৌন কামনার সংকেত হিসেবে।আগে বনলতা সেন এর কেশ পুরুষকে কাব্যময় করে তুলতো,আর এখন নারীর কেশ পুরুষকে পরিণত করে তোলে ধর্ষক এ। কুড়িগ্রামে নারী সাংবাদিকদের যৌন সুরক্ষার জন্য নারীর ভেজা চুলকে দায়ী করলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক,জনাব ড.নজরুল ইসলাম। তাহ’লে ডিগ্রী কান্ধে নিয়ে আমরা কি এগোচ্ছি না পেছনের দিকে যাচ্ছি?

নজরুল মনে করেন নারীর ভেজা চুল যৌনতা প্রদর্শন করে।তার দেয়া তথ্যানুযায়ী এই ফাইন্ডিংস এর রেফারেন্স হচ্ছে ”কোনো কোনো সংস্কৃতিতে ভেজা চুল যৌন সংকেত বহন করে।” এতোটুকুই তার যুক্তি ও তথ্য। আর সে কারণে তিনি নিজেও নারীর ভেজা চুলকে কাম উত্তেজক সংকেত হিসেবে মনে করে এই সুপারিশ পেশ করেছেন। নারীরা ভেজা চুল নিয়ে কাজের জন্য বাইরে গেলে সেটি নারীদের পক্ষ থেকে পুরুষদের প্রতি একরকম যৌন আহ্বান বলেই গণ্য হয়। তাই কাজের সময় চুল থেকে পানি ঝরার ফলে পুরুষের মনে মারাত্মক ধরণের ধর্ষকাম জেগে উঠলে এতে পুরুষের কোন দায় নেই।
সে কারণে তার এই বিশেষ ফাইন্ডিংসটি তিনি ‘নারী সাংবাদিকদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধে রক্ষাকবচ’ হিসেবে একটি কর্মশালায় পাওয়ার পয়েন্টে উপস্থাপন করেন।

তবে এটি প্রকৃতই তার ডক্টরেট ডিগ্রীর বিষয়বস্তু কিনা তা জানার বিশেষ কৌতূহল জেগেছে মনে। অন্যথায় তিনি একজন ডক্টরেট ডিগ্রপ্রাপ্ত শিক্ষক গ্রামের মূর্খ ওয়াজ কারীদের মতো এরকম নারীবিরোধী ‘রক্ষাকবচ’ সুপারিশ করেন তা ভাবতে হতাশ লাগছে।নজ্রুল সাহেবের নারী সুরক্ষার এই রক্ষাকবচ দেখে মনে হচ্ছে আরে,এই বাণী কি হুজুর শায়েখ রাজ্জাক বিন ইউসুফের ওয়াজ থেকে নেয়া হয়নিতো?
ওয়াজে অনেক হুজুররা নারীর পোশাক নিয়ে বক্তব্য দিয়ে পেটে ভাতে বাঁচেন। ড.নজ্রুল এর এই সুপারিশ এ তাদের থেকে তাকে আলাদা করা যাচ্ছেনা। নারীদের প্রতি এই ‘রক্ষাকবচ’ তৈরির জ্ঞান পরিবেশ থেকে গবেষণা লব্ধ আহরিত, নাকি একান্তই নিজস্ব স্বকীয় অভিমত তা নিয়ে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। খুব সম্ভবত পরোক্ষভাবে তিনি নারীদের বোরখা পরারই সুপারিশ করছেন।যারা মনে করেন ‘ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাক দায়ী’ তিনি তাদের চেয়ে আলাদা কেউ নন।

দুর্ভাগ্য,বাংলাদেশের এরকম ছাত্রছাত্রীদের,যারা ক্লাসে ঘন্টার পর ঘন্টা এই ধরণের শুধুমাত্র নামের পাশে লাগানো ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বক্তব্য শুনে শুনে তাদের মনন গঠন করেন। পদ পদবী আর ডিগ্রী এদের জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য উপাদান।আর প্রকৃতপক্ষে এরা এক একজন ওয়াজী হুজুর।এরকম শিক্ষকরা যতো ধরণের উচ্চতর ডিগ্রীই অর্জন করুন না কেনো,তাদের মননের এই গঠন আসলে অনেক আগে থেকেই ওয়াজ দেখে দেখেই স্থায়ী হয়ে গেছে। নারীর শরীর এবং পোশাক নিয়ে দিনশেষে তাদের জাজমেন্ট,হাটে ঘাটে মাঠে ময়দানে প্রচারিত ওই ওয়াজ থেকেই প্রতিফলিত হয়।

লেখক : সাবেক ব্যবস্থাপক, বিমান এবং সোশাল এক্টিভিস্ট


এখানে শেয়ার বোতাম