শনিবার, মে ৮
শীর্ষ সংবাদ

ভেজাইনা ও পেনিস বিষয়ে একখানি বক্তৃতা

এখানে শেয়ার বোতাম

আফরোজা সোমা ::

(সাহিত্য সংগঠন ‘ঐহিক বাংলাদেশ’-এর বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে সংগঠনটি আয়োজন করেছিল আলোচনা ও কবিতাপাঠ অনুষ্ঠানের। সেখানে বক্তৃতা দিতে আমাকে আমান্ত্রণ জানানো হয়। বক্তৃতার বিষয় ছিল,‍‍ “ ‘নারী কবি’ হলে ‘পুরুষ কবি’ নয় কেন? স্রষ্টাকে নারী বা পুরুষে কম্পার্টমেন্টালাইজ করা কি পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির নিদর্শন নয়? ”। ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে বিকেল ৫টায় কাঁটাবনের কবিতা ক্যাফেতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দর্শকের সংখ্যা ছিল খুবই কম। একেবারে হাতে গোনা। কিন্তু উসখোস করা অনেক শ্রোতা-দর্শকের চেয়ে নিবিষ্টচিত্তের গোটাকয় শ্রোতা-দর্শকই যে অধীক প্রাণবন্ত হতে পারে সেটি এই অনুষ্ঠানে নতুনভাবে টের পেলাম।। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন কবি ফরিদ কবির, কবি জুয়েল মাজহার, কবি সাকিরা পারভীন, কবি আয়শা ঝর্না, কবি জুনান নাশিত ও কবি জাহানারা পারভীন। কবি ও সংগঠক মেঘ অদিতিকে ধন্যবাদ আমাকে আমন্ত্রণ জানাবার জন্যে। বক্তব্যটি লিখিতকারে এখানে জমা রাখছি। আগ্রহীদের পড়ার আমন্ত্রণ।

শুভ সন্ধ্যা।

আজকের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত সম্মানিত ‘পেনিস’ কবিদ্বয়, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ভেজাইনা কবিবৃন্দ এবং উপস্থিত সমবেত ভেজাইনা ও পেনিস পাঠক ও দর্শক সকল। সকলকে শারদীয় শুভেচ্ছা।

ঐহিকের বর্ষপূর্তিতে সংগঠকদের জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। সেই সাথে, আজকের অনুষ্ঠানে অতিথি ‘ভেজাইনা’ কবি হিসেবে আমাকে আমন্ত্রন জানাবার জন্য ঐহিকের প্রাণভোমরা মেঘ অদিতিকে জানাই ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

সম্মানিত উপস্থিতি, ‘পেনিস’ ও ‘ভেজাইনা’ শব্দ দু’টো ইংরেজীতে বলায় আমি ক্ষমাপ্রার্থী। অভ্যাগতদের প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে শব্দগুলো বাংলায় বলা থেকে বিরত থাকতেই ইংরেজীর আড়ালে আশ্রয় নেওয়া। এক্ষেত্রে ভাষা ল্যাপটপ বা মোবাইলের এডাপ্টারের মতন একটি ‘সেফটি মেজার’ বলতে পারেন।
আমি জানি, ‘পেনিস’ ও ‘ভেজাইনা’ সম্বোধন শুনে আপনাদের অনেকেরই উদ্ভট লেগেছে। কেউ-কেউ যে প্রবল অস্বস্তি বোধ করছেন, সেটি আপনাদের কোঁচকানো ভ্রু-ই বলে দিচ্ছে। কী জানি, শ্রদ্ধেয় কবি জুয়েল মাজহার বা প্রিয় কবি ফরিদী কবির হয়তো ভাবছেন, এগুলো কেমন কথা-বার্তা! অ্যাম নট অ্যা পেনিস! অ্যাম অ্যা পোয়েট! হয়তো কবি সাকিরা পারভীন ভাবছেন, নোহ! অ্যাম নট অ্যা ভেজাইনা! অ্যাম সাকিরা! অ্যাম অ্যা পোয়েট; অ্যা স্পিরিট।

শুধু ‘পেনিস’ ও ‘ভেজাইনা’ বলে অর্থাৎ শুধু লৈঙ্গিক পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে আপনাদেরকে সম্বোধন করার সময় আপনাদের কি মনে হচ্ছিলো যে, আপনাদের মনুষ্য জীবনের প্রধান পরিচয়কেই আমি খারিজ করে দিচ্ছি? আপনাদের কি মনে হচ্ছিলো, যে এরকম সম্বোধন ‘খন্ডিত’, ‘অপ্রাসঙ্গিক’? আপনাদের কি মনে হচ্ছিলো, কনটেক্সটকে বিবেচনায় না নিয়ে, এভাবে লিঙ্গের সাথে অপ্রাসঙ্গিকভাবে জড়িয়ে-প্যাঁচিয়ে নিয়ে মানুষকে খন্ডিতভাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গীটা সঠিক নয়?

এই সম্বোধনে যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, আমি আন্তরিকভাবে দু:খিত। কিন্তু আপনাদের এই অস্বস্তিটুকু উৎপাদন করতেই সম্বোধনের এই নাটকীয়তা আমার।

আজকের সম্মানিত উপস্থিতি, জী। একটু আগেই আপনারা যেমন অস্বস্তিতে পড়েছিলেন, আমারো ঠিক একই রকম অনুভূতি হয় যখন কেউ আমাকে হুট করে বলে ‘নারী কবি আফরোজা সোমা’। অথবা কেউ যখন আমার প্রশংসাচ্ছলে বলে— ‘নারীদের মধ্যে ভালো লেখে আফরোজা সোমা’, তখন সাথে-সাথেই প্রশ্ন আসে মনে, “ওহ! আচ্ছা! তাহলে আফরোজা সোমা পুরুষদের চেয়ে ভালো লেখে না?”

এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবে ব্যক্তিগত দু’টো ঘটনা মনে পড়ে গেলো। কিন্তু অনুরোধ করছি, এই ঘটনার উল্লেখকে অনুগ্রহ করে কেউ আত্মশ্লাঘার প্রকাশ ভাববেন না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে মাস্টার্সে আফরোজা সোমা প্রথম শ্রেনীতে প্রথম হয়ে স্বর্ন পদক পেয়েছিলেন।
ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় আর্টস থেকে তার কলেজে প্রথম হয়েছিলেন। ঘটনাচক্রে, শহরেরও সবচে’ ভালো রেজাল্ট ছিল সেটি। (যদিও আজকের বিবেচনায় খুব আহামরী কোনো রেজাল্ট নয়। আজকের বিবেচনায় বলা যায়, মন্দের ভালো।)
কিন্তু তখন তো ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সকলের মধ্যেই ভালো করেছিলেন তিনি।
নিশ্চয়ই আপনাদের ছেলে-মেয়ে-ভাই-বন্ধু অনেকেই আছে যারা ক্লাশে প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় হয়েছে? তারা কি লিঙ্গের জোরে প্রথম হয়েছিল?
ব্যক্তি মানুষ, ব্যক্তির কর্ম এবং ব্যক্তির লিঙ্গিয় পরিচয় আলাদা। আমরা যদি সেই ভিন্নতাকে বুঝতে না পারি, সেটি আমাদেরই অজ্ঞতা। কিন্তু মুর্খতা নিয়ে বড়াই করার মধ্যে কোনো মাহাত্ম আছে কিনা জানি না।

ঐহিক আয়োজিত আজকের এই চমৎকার আয়োজনে উপস্থিত সম্মানিত, কবি, লেখক, পাঠক ও দর্শকবৃন্দ। আজকে আলোচ্য বিষয়ের প্রধান অংশ দুইটি।

‘নারী কবি’ হলে ‘পুরুষ কবি’ নয় কেন?
-স্রষ্টাকে নারী বা পুরুষে কম্পার্টমেন্টালাইজ কী পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির নিদর্শন নয়?
আমি প্রথমে “ ‘নারী কবি’ হলে ‘পুরুষ কবি’ নয় কেন’? অংশটির দিকে সংক্ষেপে দৃকপাত করছি।
লৈঙ্গিক এই বয়ান বা ভাষার এই ফারাক একটি সাংস্কৃতিক নির্মাণ। নারীকে ‘নারী’ বানিয়ে তোলা এবং তার পরিচয়ের যে সামাজিক নির্মিতি এটি নিয়ে এক লাইনে সার কথা বলে গেছেন দার্শনিক সিমোন দা বোভেয়ার। সেটি হলো: “One is not born, but rather becomes, a woman.”
নারীর এই সাংস্কৃতিক নির্মাণ প্রসঙ্গেই এখানে ‘মিউটেড গ্রুপ থিউরি’র কথা মনে পড়ছে। মার্জিনালাইজড গ্রুপ বা কম ক্ষমতা ও সামর্থ সংবলিত গোষ্ঠীকে কিভাবে বোবাকরণের দিকে নিয়ে যাওয়া হয় বা কিভাবে একেবার মিউটেড গ্রুপে পরিণত করা হয় সেটিই এই তত্ত্বের আলোচ্য বিষয়। এই তত্ত্বটি বলে যে, একটি ডমিনেন্ট গ্রুপ বা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান গোষ্ঠী তাদের সুবিধার্তে ভাষাকে ব্যবহার কোরে, ভাষার ভেতর দিয়ে সাবোরডিনেট গ্রুপ বা অপেক্ষাকৃত দূর্বল গোষ্ঠীর উপরে চাপ তৈরি করে। দূর্বল গোষ্ঠীর জন্য বিবিধ আচার-আচরণ তৈরি করে সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা করে ক্ষমতায়িত গ্রুপ। চাপে পরে দূর্বল গোষ্ঠীও অনেক সময় কর্তৃত্ববাদী গোষ্ঠীর ‘ফ্রেমিংকৃত’ ভাষার আদলেই নিজেদেরকে বর্ণনা করতে থাকে।
এইভাবে দূর্বল গোষ্ঠী নিজের ভাব ও ভাষা হারিয়ে নিজেকে ক্ষমতাবানের চাপিয়ে দেয়া পরিচয়ের ভাব ও ভাষার লেন্স দিয়ে দেখতে শুরু করে।
এই প্রসঙ্গে ব্রিটিশ আমলে ভূভারতে ব্যবহৃত ‘ন্যাটিভ’ শব্দটির কথা মনে আনতে পারেন। ‘ন্যাটিভ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ আর সামাজিক ব্যাবহার ও প্রয়োগগত রাজনীতির বিষয়টি ভেবে দেখুন। অথবা ভিনদেশী কনটেক্সটে মনে করে দেখুন, ‘ব্ল্যাক’ শব্দটি। এগুলো কেবল শব্দ নয়। এই শব্দাবলির ভেতর দিয়ে প্রকাশ পায় সামাজিক বিন্যাস, সমাজের মনোভঙ্গি ও রাজনৈতিক শ্রেনী বিভাজন।

‘নারী কবি’ নামক শব্দবন্ধটিও ‘ন্যাটিভ’ বা ‘ব্ল্যাক’ বা ‘নিগার’ শব্দগুলোর থেকে কম বৈষম্যমূলক নয়। তবে এই বৈষম্যের মূল বিষয় বর্ণ বা ধর্ম নয়, লিঙ্গ।

লৈঙ্গিক প্রশ্নে সারা পৃথিবীতেই নারী ও পুরুষে বৈষম্য ছিল এবং আছে। তবে, অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশগুলো সেই বৈষম্য থেকে বের হয়ে আসবার লক্ষ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় রত এবং লৈঙ্গিক বৈষম্য দূরীকরণে অনেকাংশেই সফল।

কিন্তু ভারতীয় সামাজিক-বাস্তবতা ও সংস্কৃতিতে নারী মূলত নিস্পেষিত এবং বৈষম্যের শিকার। হোক সেটি অহল্যা, ইন্দ্র আর মুনি গৌতমের গল্প অথবা হোক তা অসুরদের দেবতা শুক্রাচার্যের সঞ্জীবনী মন্ত্র শেখানোর কাহিনী। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও সঞ্জীবনী মন্ত্রটি শুক্রাচার্য তার কন্যা দেবযানীকে শেখানোর কথা ভাবেননি। বরং তার পেটের মধ্যে পানাহারের সাথে মিশে যাওয়া শিস্য কচকেই শেখালেন।
বাংলা ভাষার প্রবাদগুলোর দিকে দেখুন। নারীই এখানে অধস্তন ও অবমূল্যায়িত।

খনার কথা মনে আনুন। তার জ্ঞানের সঙ্গে না পেরে কী কৌশলে কেটে নেয়া হয়েছিল তার জিভ।
বাংলা ভূখন্ডের সমাজ-মানসে, সংস্কৃতিতে ও আইনে— সবখানেই নারী নিপীড়িতের মধ্যেও নিপীড়িত। ২০১৯ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের উত্তারাধিকার আইন দেখুন, ছেলে আর মেয়েতে বৈষম্য প্রকট। কন্যা সন্তান বাবার স্বপ্ন ও চেতনার উত্তরাধিকারী হলেও সম্পদের বেলায় কন্যা পায় কম, ছেলে পায় বেশি। তালাক পরবর্তী সময়ে সন্তানের অভিভাবকত্বের প্রশ্নেও নারী ও পুরুষে বৈষম্য বিরাজমান।

ফলে, এটি নি:সন্দেহে বলা যায় যে, এদেশে কবি, লেখক ও সাহিত্যিকদের মনোজগতে লিঙ্গীয় যে বৈষম্য আসন গেঁড়ে আছে তা সংস্কৃতিজাত। অসুখ ও অসুস্থতা যে আছে সেটিকে আগে কবুল করতে হবে। তারপর আসে দাওয়াইয়ের প্রসঙ্গ। অর্থাৎ অনুধাবনের মাধ্যমেই শুরু হতে পারে আমাদের শোধন যাত্রা।

বাংলাভাষায় অনেক মহতী কবি ও লেখক আছেন। স্বীকার করতেই হবে, লৈঙ্গিক বিচারে তাঁদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই বেশি।
তবে, সংখ্যার এই লঘু-গুরু পরিস্থিতির পূর্বাপর বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতার দিকে।
নারী অধিকার প্রশ্নে পৃথিবীর গত একশ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস মনে করে দেখুন। কোনো কোনো কর্মী ও তাত্ত্বিক বলেছেন, প্রবল পিতৃতন্ত্র ও পুরুষতন্ত্রই হচ্ছে নারী নিগ্রহের প্রধান কারণ।
কেউ কেউ বলেছেন, না। শুধু পুরুষতন্ত্র নয় এর সাথে যোগ হয়েছে ক্যাপিটালিজম বা ধনতন্ত্র। নারী যতদিন না অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পাবে ততোদিন তার মুক্তি নেই।

কিন্তু পরবর্তীতে আরেকদল দেখিয়েছেন, অর্থনৈতিক মুক্তিও অনেকক্ষেত্রে নারীর জন্য মুক্তি আনতে পারে না। কারণ কট্টর ও রক্ষণশীল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সাংস্কৃতিক নির্মাণটাই এমনভাবে হয় যে, পদে-পদে নারী ঠোক্কর খায়; পদে-পদে পা আটকায়।
আমাদের সমাজের দিকেই তাকিয়ে দেখুন না, প্রবল মেধাবী নারীর সাফল্যকে খাটো, তুচ্ছ ও মিথ্যে করে দিতে আর কিছু নয়, আমাদের মতন সমাজে ‘নষ্ট চরিত্রের’ মেয়ে বলে দিলেই হয়।

আর যাকে খারিজ করা দেয়া হয় না, যাকে অস্বীকারের কোনো উপায় নেই তার বেলাতেও আমরা কৃপণ। ষোড়শ শতকের বাঙালি কবি, সেকালের রামায়ন রচয়িতা কবি চন্দ্রাবতীর কথা। তিনিও তো আজো ‘মহিলা কবি’র তকমাই বয়ে চলেছেন।
এইসব দেখে আজকাল ভাবি, নারী-পুরুষ লৈঙ্গিক পরিচয়ের বাইরে অন্যকোনো লিঙ্গের কবি যখন লিখতে আসবেন তাকে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কোন লিঙ্গে সম্বোধন করবে? তার পরিচয় দিতে গিয়ে কি বলবে, শিখন্ডী কবি? নাকি বলবো, হিজড়া কবি?
অথবা ধরুণ, আজকের আধুনিক পৃথিবীতে অনেক মানুষ, যারা নিজের প্রেফারর্ড সেক্স বেছে নিচ্ছেন তাদের বেলায় কী হবে? মানে যেই নারী জেন্ডার রিএসাইন করে পুরুষ শরীর বানাচ্ছেন, যে পুরুষ অপারেশানের ভেতর দিয়ে নারী শরীর বেছে নিচ্ছেন, তাকে কী বলা হবে?
বহুকাল ধরে পুরুষ কবিরা নারীর যোনী, স্তন, ঊরু ও জঙ্ঘার কামাতুর বর্ণনা দিয়ে কবিতা লিখছেন। সেগুলো কতখানি ফ্রয়েড বর্ণিত ‘লিবিডো তাড়িত’ অনুভূতির প্রকাশ আর কতখানি প্রেমের কবিতা বা প্রেয়সীর রূপবর্ণনা তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। হয়তো কন্টেট এনালাইসিস বা আধেয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেই বিতর্কের উত্তরও কিছু মিলতে পারে। রোকেয়া হল নিয়ে, ওড়না ছাড়া তরুনীর পিনোন্নত বক্ষ নিয়ে, জিন্স পরা যুবতীর আবেদনময়ী ঊরু দেখে যে পুরুষ কবিটির কামরস কবিতায় বেয়ে-বেয়ে পড়েছে সেটিকে কতখানি লিবিডো তাড়িত ‘পুরুষালি অনুভূতির প্রকাশ’ আর কতখানি নিটোল ‘কবিতা’, তা ভেবে দেখবার অবকাশ আছে বৈকি!
তাই বলে আবার কেউ এটা ভেবে বসবেন না যে, আমি কবিতায় প্রেম-কাম প্রকাশ বিরোধী।
‘গাঙের ঢেউয়ের মত বল কন্যা কবুল কবুল’ অথবা ‘প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর’ এর মতন পংক্তি তো অর্জুনের তীরের মতন— অব্যার্থ। মানুষের হৃদয়কে এমনভাবে এই পংক্তিগুলো এফোঁড় ওফোঁড় করে যে, এগুলো আমাদের হৃদয়কে নারী-পুরুষের কম্পার্টমেন্টাল বিভক্তির বাইরে গভীরতর এক অবগাহনে নিয়ে যায়।

কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, পুরুষালি ভাষা, বর্ণনা ও উপমায় ঠাসা এই কবিতাগুলোকে যদি ‘পুরুষালি কবিতা’র লেবেল এঁটে দেওয়া না হয়, তাহলে রুবি রহমান বা জাহানার পারভীন বা সাকিরা পারভীনের কবিতায় নারীর যাপিত জীবনের উপমা ও অনুষঙ্গ উঠে এলেই সেগুলোকে ‘নারীর বয়ান’ বা ‘নারী জীবনের অভিজ্ঞতা’ বলে আড়ালে-আবডালে-প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে উল্লেখ করা হবে কেন?
নাকি এটাও সেই সিগেরেট খাবার মতনই ঘটনা? সিগেরেট খেলে পুরুষের লাং নষ্ট হয়, আর নারীর হয় চরিত্র নষ্ট। 😉
নারী বা পুরুষ কেউ-ই তাদের লিঙ্গ দিয়ে কবিতা বা সাহিত্য রচনা করে না। তবু, এই যে ভাষা দিয়ে খারিজ করে দেবার প্রবণতা এটি আমাদের পুরুষদের অবচেতনে ঘাপটি মেরে থাকা পিতৃতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী মানসের প্রকাশ।
তবে, হ্যাঁ। কথা বাকি আছে। এ দেশে এখনো ৮৭ শতাংশ বিবাহিত নারী নির্যাতিত হয়। উল্টো করে বললে, বিবাহিত পুরুষদের ৮৭ শতাংশই নির্যাতক। উচ্চমাত্রায় নিপীড়ন জারি থাকা একটি সমাজের ‘নির্যাতক’ ও ‘নির্যাতিত’ গোষ্ঠীর সাহিত্যে অর্থাৎ নারী ও পুরুষের রচনার ভাষা ও কন্টেন্ট বা বিষয়বস্তুতে লৈঙ্গিক অভিজ্ঞতার কোনো ছাপ পড়েছে কিনা, পড়লে সেগুলো কী রকম, সেগুলোকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায় কিনা সেটি নিয়ে আলাপ তোলা জরুরী প্রসঙ্গ বটে। ফলে, এইই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যদি নারী ও পুরুষের অভিজ্ঞতা ভিত্তিক বিভাজন হয় সেটি অযৌক্তিক হবে না নিশ্চয়ই।
এবার আসুন, আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয়ের দ্বিতীয় অংশে। দ্বিতীয় অংশ বলছে: ‘স্রষ্টাকে নারী বা পুরুষে কম্পার্টমেন্টালাইজ কি পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির নিদর্শন নয়?’

এই বাক্যে দুটো ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গ রয়েছে।
১. ঈশ্বর প্রসঙ্গে ভাষা এবং
২. ঈশ্বর প্রসঙ্গে দর্শন
প্রথমেই ভাষা প্রসঙ্গে আসা যাক। বাংলা ভাষায় আল্লাহ বা খোদা বা ঈশ্বর বা প্রভুকে ইংরেজীর মতন ‘হি’ বা পুরুষবাচক সর্বনাম দিয়ে রেফার করা হয় না। কারণ ইংরেজী ভাষা সর্বনামের ক্ষেত্রে ‘হি’ বা ‘শি’ অর্থাৎ নারী বা পুরুষবাচক ছাড়া এই গত বছর তিন/চার আগ পর্যন্তও আর কোনো সর্বনাম ছিল না। তাই, ইংরেজী ভাষায় ঈশ্বরকে বোঝাতে গিয়ে চিরকাল পুরুষবাচক সর্বনাম ‘হি’ দিয়ে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু বাংলায় আমাদের আছে ইউনিসেক্স বা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল লিঙ্গকে নির্দেশ করার মতন নৈর্ব্যক্তিক সর্বনাম ‘সে’। এক্ষেত্রে বাংলাভাষা ইংরেজীর চেয়ে এগিয়ে। কারণ গত কয়েক বছর আগে ‘জি’ (ze) বলে একটি শব্দকে অক্সফোর্ড অভিধানে নুতন অর্ন্তভুক্তি দেয়া হয়েছে। এই ‘জি’ লেখা হয় ‘জেড’ এবং ‘ই’ বর্ণ দিয়ে। পুরুষ ও নারীবাচক সর্বনাম ‘হি’ আর ‘শি’ এর পাশাপাশি একটি ইউনিসেক্স সর্বনাম হিসেবে এই ‘জি’ সর্বনামের আবির্ভাব।
এবারে আসুন, দর্শন প্রসঙ্গে মনোযোগ দেয়া যাক। ‘হি’ এবং ‘শি’ এই দুটো সর্বনাম থাকতেও কেন ইংরেজী ভাষাভাষীরা ঈশ্বরকে শুধু পুরুষবাচক সর্বনাম ‘হি’ বলেই সম্বোধন করলো? কেন নারীবাচক সর্বনাম ‘শি’ বলে করলো না?
এই প্রশ্নেই আরেকবার প্রাসঙ্গিক মিউটেড গ্রুপ থিউরি। ডোমিনেন্ট গ্রুপ নিজের সবিধার্তে নিজের পছন্দে ভাষা তৈরি করে। সমাজের ক্ষমতা-কাঠামোয় যে পুরুষ নিজেকে রেখেছে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় সেই পুরুষ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং সর্বকিছুর নিয়ন্ত্রনকারী হিসেবে তার লিঙ্গের একজনকেই কল্পনা করবে এটাই স্বাভাবিক। তাই, এভাবেই ঈশ্বরের অস্বিত্ব বর্ণনায় তাকে নারী বা পুরুষ বা শিখন্ডি লিঙ্গের উর্ধে রাখা হলেও ভাষার সর্বনামের ভেতর দিয়ে ঈশ্বর লিঙ্গ প্রাপ্ত হন। অর্থাৎ, ঈশ্বরের লিঙ্গ একটি সোশাল কনস্ট্রাকশান বা সামাজিক নির্মিতি।
এখানেই আরেকবার সিমোন দা বুভোইয়ারের উক্তিটা মনে আনুন। নির্লিঙ্গ ঈশ্বর যেভাবে সমাজ মানসে ধীরে ধীরে পুরুষের শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে ভাষার মধ্যে অধিষ্ঠিত হন, ঠিক একই কায়দায় সামাজিক নির্মিতির কারণেই পুরুষ ‘প্রবল’ আর নারী ‘ম্রিয়মান’ বলে নির্মাণ ও নির্ণয় হতে থাকে।
তবে, ভারতীয় ও বাংলাদেশী সমাজে নারীর অবস্থান অধস্তন হলেও পুরাণের দিকে তাকালে আপনি আশাবাদী হতে পারেন। হিন্দু পুরাণের দিকে চেয়ে দেখুন। শিব সেখানে সবচেয়ে শক্তিমান বটে। কিন্তু স্বরস্বতী, দূর্গা ও কালীর মতন দেবীও রয়েছেন এই ভূখন্ডজাত পুরাণে।
একইরকমভাবে গ্রীক মিথলোজির দিকে দেখুন। দেবতা জিউসের পাশাপাশি সেখানে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দেবী এথিনা থেকে শুরু করে হেরা, আর্তেমিস, আফ্রোদিতি ও নেমেসিসসহ রয়েছেন আরো অনেকে।
জোসেফ ক্যাম্পবেলের সাথে যাদের পরিচয় আছে তারা জানেন যে, পুরাণের একেকটি চরিত্র ও গল্প ধরে মূলে ফিরে যেতে থাকলে আপনি সেই সমাজের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও আবহাওয়াগত বিন্যাসের ঠিকুজি-কুলুজির সন্ধান পেতে পারেন। তাই, মিথলজি গোঁড়ায় গিয়ে পাওয়া যায় কোনটি কৃষিজীবী সমাজ থেকে উদ্ভুত আর কোনটিতে মিশে আছে অরন্যাচারী মানুষের সমাজ-জীবনের সারৎসার।
তবে, একটি বিষয় আমাকে একটু অবাক করে। সেটি হলো, আমাদের ভারতীয় পুরান এবং ভারতীয় তথা বাংলাদেশী সমাজ-বাস্তবতা। ভারতীয় পুরানে দূর্গা আমাদের দুর্গতিনাশিনী মা, কালী আমাদের শক্তিদায়ী, স্বরস্বতীর কাছে আমরা বিদ্যার বর মাগী। অথচ ভারতীয় সমাজজীবনে নারীর অবস্থান এতোটা নিগৃহিত ও অধস্তন। কিন্তু এমন কেন? ভেবে পাই না।
একই রকম চরম বৈপরিত্যমূলক বাস্তবতা বাংলাদেশেও বিরাজমান। আমাদের দেশে গত তিন দশক ধরে নেতৃত্বের অগ্রভাগে রয়েছেন যারা, লিঙ্গীয় পরিচয়ে তারা নারী। রাষ্ট্র পরিচালনায় ও প্রধান দু’টো রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় নারীরা থাকলেও সামগ্রিক অর্থে আপামর নারীরা এখনো নিষ্পেষন ও বৈষম্য থেকে মুক্তি পায়নি। বরং এই দেশের ৮৭ ভাগ নারীই এখনো স্বামীর হাতে নির্যাতিত, ৮০ শতাংশের উপরে নারীই এখনো গণপরিবহণে যৌন নিপীড়নের শিকার এবং বৈষম্যের এই তালিকা আরো দীর্ঘ হতে পারে।
তাহলে এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এবার প্রশ্ন করুন, কারা সেই ৮৭ শতাংশ পুরুষ? যারা ঘরে-ঘরে স্ত্রী নির্যাতন করে? কারা সেই পুরুষ যারা, গণপরিবহনে নারীদের যৌন নিপীড়ন করে? যেই সমাজে নারী প্রশ্নে ‘বৈষম্যকেই বৈধ’ মনে করা হয়, সেই সমাজে কবি বা লিখিয়ে হিসেবে পরিচিতি পাওয়া পুরুষ-মানসের কাছে ‘কবি’ প্রশ্নে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভাষার সাম্য দাবী করাটাও একটু বেশিই হয়ে যায় বৈকি!
পুরুষতন্ত্রের জীবানু আমাদের মজ্জায় ঢুকে গেছে। এই দেশে মনে করা হয়, ‘পুরুষ হচ্ছে সোনার আংটি’। বলা হয়, বাঁকা হলেও এর মূল্য কমে না। অর্থাৎ, লৈঙ্গিক পরিচয়ের কারণেই পুরুষ শ্রেষ্ঠ। সে কর্তৃত্বপরায়। এই কর্তৃত্বপরায়নতা একটি মানসিকতা। এই পুরুষতান্ত্রিক রোগে অনেক নারীও আক্রান্ত হোন।
কম্পার্টমেন্টালাইজড ভাবনা মানুষের মধ্যে বিভক্তি রেখা টেনে দেয়। বিভাজন যে সবসময় ইতিবাচক বা কল্যাণকর হয়, এমন নয়। মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির একটি উক্তি আছে এরকম: “you are not a drop in the ocean/ you are the entire ocean in a drop”.
রুমি বলছেন, একটি ফোঁটায় তুমি ধরে আছো সিন্ধু অপার। অর্থাৎ, দেখতে তুমি এক ফোটা সামান্য হতে পারো বটে। কিন্তু তুমি তো এই ব্রক্ষাণ্ডের অংশ। এই ওয়াননেস বা একত্বকে বোধ না করলে তো তুমি আদতে অসম্পূর্ন।
ঠিক একই কথা বলা হয়েছে, সনাতন দর্শনে। সেখানে বলা হয়েছে ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’। মানে ‘আমিই বহ্ম’। মানে, আপনি শুধু একখন্ড মাংসপিণ্ড নন। আপনি এই বৃহত্তর কসমস বা মহাবিশ্বের অংশ। সবকিছুর সঙ্গেই আপনার সংযুক্তি রয়েছে।
এই দর্শনেরই প্রতিদ্ধনী পাবেন ‘ইকো ফেমিনিজমে’। ইকো ফেমিনিস্টরা বলছেন, নারী ও পুরুষ তারা উভয়ে উভয়ের সাথে সম্পৃক্ত। শুধু নারী-পুরুণ নয়, এই পৃথিবীর অপরাপর অন্য আরো যত জড় ও জীব রয়েছে; ধরিত্রীর সকল কিছুর সাথেই রয়েছে মানুষের সম্পর্ক।
নিজেকে লিঙ্গিয় কম্পার্টমেন্ট বা বাক্সের ভেতরে বন্দী করে যারা রাখেন তাদের জন্য আমার মায়া হয়। কষ্ট হয়। মনে হয়, আহা! এই বিশাল বহ্মান্ড থেকে সে কেমন ছিন্ন হয়ে আছে।
এই ক্ষুদ্রত্বকে কবুল করার মধ্যে মহত্বের কিছু নেই। দিনশেষে, মানুষ আসলে ‘এনার্জি’। মানে আমরা সবাই এই ব্রহ্মাণ্ডের মহাজাগতিক শক্তির অংশ। আর দিন শেষে মানুষ আসলে একটা ‘স্পিরিট’। স্পিরিট ও এনার্জির কোনো লিঙ্গ হয় না।
নারী-পুরুষের লৈঙ্গিক বিভাজন নির্বিশেষে, আমরা আদি পিতা ও আদি মাতার সন্তানেরা অনুবাদ করে চলেছি আমাদের চেতনা। আমরা অনুবাদ করে চলেছি আমাদের অভিজ্ঞতার সারৎসার। আমরা গেয়ে চলেছি, আমাদের অন্তরে বেজে ওঠা গান। মহাজাগতিক বিধান মেনে আমরা ধেয়ে চলেছি মহা প্রস্থানের দিকে। জন্মের প্রারম্ভে ভ্রূনের প্রথম অবস্থায় যেমন কোনো লৈঙ্গিক বিভাজন নেই, তেমনি মহা প্রস্থানের পর ব্রহ্মাণ্ডের চিরায়ত শক্তিতে রূপান্তর ঘটলে সেখানেও থাকে না আর কোনো লৈঙ্গিক বিভাজন।
আপনাদের সকলের কল্যাণ হোক।

লেখক: কবি, লেখক ও সহকারী অধ্যাপক, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

( লেখকের ফেইসবুক থেকে নেওয়া)


এখানে শেয়ার বোতাম