মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৯

ভারতীয় রাজনীতির ‘চাণক্য’ প্রণব মুখোপাধ্যায়

এখানে শেয়ার বোতাম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: বেশ কয়েক বছর আগের কথা। ভারতীয় রাজনীতির ‘চাণক্য’ প্রণব মুখোপাধ্যায় তখন থাকেন দিল্লির ১৩ নম্বর তালকাটোরা রোডে তার প্রিয় বাংলোটিতে। কংগ্রেস তখন বিরোধী দলে, প্রণববাবুর হাতেও অখণ্ড সময়। ফলে দিল্লির বাঙালি সাংবাদিকরা সারাদিনের ‘বিটে’র কাজ সেরে অবধারিতভাবে গিয়ে সন্ধ্যাবেলা জড়ো হতেন প্রণববাবুর স্টাডিতে। চা, ঝালমুড়ির সঙ্গে তারপর চলত দেদার আড্ডা।

রাশভারী প্রণববাবু রোজ যে আড্ডায় যোগ দিতেন তাও কিন্তু নয়। ভারী কোনও বইয়ে মুখ গুঁজে বা চুরুট টানতে টানতে মাঝে মাঝে দুচারটে মোক্ষম মন্তব্য করতেন। দারুণ মুডে থাকলে ভারতীয় রাজনীতির নানা মারপ্যাঁচ সহজ করে ব্যাখ্যা করে দিতেন। সেই প্রাক-উইকিপিডিয়া যুগে যে কোনও ধন্দ কাটানোর জন্যও তিনি ছিলেন মুশকিল আসান।

তো সেই আড্ডাতেই একদিন এক বন্ধু সাংবাদিক হঠাৎ দুম করে প্রশ্ন করে বসলেন, ‘আচ্ছা প্রণববাবু, আপনি দেশের ক্যাবিনেটে এতদিন ধরে অলিখিত দুনম্বর ছিলেন- কিন্তু তবু আপনার কখনও প্রধানমন্ত্রী হওয়া হলো না। আফসোস হয় না?’

ঘরে হঠাৎ তখন পিনপতন নীরবতা। আমরা এর-ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি। প্রণববাবুর কিন্তু চোখের একটা পলক না ফেলে ঝটিকা জবাব দিলেন, ‘আমার যে প্রধানমন্ত্রী হওয়া হবে না, সে তো সাতচল্লিশ সালেই স্থির হয়ে গিয়েছিল! এখন সেটা নিয়ে আফসোসের আবার কী আছে?’

কিন্তু সাতচল্লিশেই স্থির হয়ে গিয়েছিল মানে?

প্রণববাবু এরপর ব্যাখ্যা করেন, ‘সাতচল্লিশে পূর্ব পাকিস্তান যখন ভারত থেকে আলাদা হয়ে যায় তখন সারা ভারতে বাঙালি অধ্যুষিত লোকসভা আসন রয়ে যায় টেনেটুনে গোটা পঞ্চাশেক। পশ্চিমবঙ্গে বিয়াল্লিশটা আর বাকি দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরও গোটা সাত-আটটা। পঁচাশিটা আসন নিয়ে উত্তরপ্রদেশ যেখানে দেশকে একের পর এক প্রধানমন্ত্রী উপহার দিয়েছে, সেখানে মাত্র পঞ্চাশটি আসন নিয়ে কোনও বাঙালি রাজনীতিবিদের কপালে শিকে ছেঁড়ার আশা করাটাই তো বাতুলতা!’

অথচ পূর্ব পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে থাকলে অবিভক্ত বাংলার লোকসভা আসন হতো প্রায় ১৩০টা। সেখানে হয়তো ভারতে একজন বাঙালি প্রধানমন্ত্রী পেতে আজ পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হতো না।

প্রণববাবুর এই যুক্তিতে ফাঁকও আছে অবশ্য। নইলে দেবগৌড়া, গুজরাল বা এমন কী নরসিমহা রাও, মনমোহন সিংয়েরও কখনও প্রধানমন্ত্রী হওয়া হতো না। কিন্তু রাজনীতিতে নিজের যাবতীয় সাফল্য ও ব্যর্থতাকে নিরাসক্ত ও নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখার এবং যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার যে অসাধারণ গুণ ছিল তার, এটা তারই একটা দৃষ্টান্ত।

প্রধানমন্ত্রী না হতে পারলেও রাজনৈতিক জীবনের উপান্তে এসে তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি ঠিকই হয়েছিলেন। পাঁচ বছর ধরে ছিলেন দেশের সাংবিধানিক প্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার।

১৯৬৯ সালে মেদিনীপুরে কৃষ্ণ মেননকে জিতিয়ে আনার কারিগর ছিলেন তরুণ প্রণব মুখোপাধ্যায়, আর ইন্দিরা গান্ধীর জহুরির চোখ এই প্রতিভাটিকে চিনে নিতেও ভুল করেনি। মিসেস গান্ধী নিজের গরজে রাজ্যসভায় জিতিয়ে আনেন তাকে, আর তারপর কংগ্রেস রাজনীতিতে উল্কার মতো উত্থান হয় প্রণববাবুর। অচিরেই তিনি হয়ে ওঠেন প্রধানমন্ত্রীর ইন্দিরার সবচেয়ে আস্থাভাজন নেতা ও ‘ট্রাবলশুটার’।

১৯৮৪তে ইন্দিরা গান্ধীর প্রয়াণের পর রাজীব গান্ধীর জমানায় ক্রমশ গুরুত্ব হারাতে থাকেন প্রণববাবু, একসময় বিরক্ত হয়ে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে নিজস্ব দল রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী পার্টিও গঠন করেন। যদিও বছর তিনেক পরেই কংগ্রেসে ফিরে আসেন। ১৯৯১-য়ে রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর নরসিমহা রাও প্রধানমন্ত্রী হলে পুরনো বন্ধু প্রণববাবুকে রাজনৈতিক পুনর্বাসন দেন তিনি। প্রথমে যোজনা কমিশনের দায়িত্ব দিয়েও পরে ক্যাবিনেটে ফিরিয়ে এনে।

ফলে রাজনৈতিক জীবনে নানা ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে গেছেন তিনি। বহুদিন ধরে তার একটা দুঃখ ছিল, রাজ্যসভায় বহু বছর ধরে এমপি হলেও কখনও মানুষের ভোটে জিতে পার্লামেন্টে আসা হয়নি। ২০০৪ সালে মুর্শিদাবাদ জেলায় বাংলাদেশ-লাগোয়া জঙ্গীপুর আসন থেকে জেতার পর সে দুঃখ ঘুচেছিল ঠিকই। কিন্তু সেবারই যখন ‘অন্তরাত্মার ডাকে’ সাড়া দিয়ে সোনিয়া গান্ধী নিজে প্রধানমন্ত্রী না হয়ে মনমোহন সিংকে সেই পদের জন্য মনোনীত করলেন, প্রণব মুখোপাধ্যায় যে কতটা হতাশ হয়েছিলেন সেটা তার ঘনিষ্ঠরা সকলেই জানেন।

প্রণববাবু যখন দেশের অর্থমন্ত্রী ছিলেন, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর হিসেবে মনমোহন সিং রিপোর্ট করতেন তার কাছেই। ডাকতেনও ‘স্যার’ বলেই। বহু বছর পরে যখন মনমোহন সিংয়ের ক্যাবিনেটেও প্রণববাবু আবার ‘নাম্বার টু’, তখনও কিন্তু সেই সম্বোধনই অব্যাহত ছিল। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আজীবন তাকে স্যার বলেই ডেকে এসেছেন।

প্রণববাবুর রাজনৈতিক জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে বাংলাদেশ। পারিবারিকভাবে তিনি শুধু নড়াইলের জামাতা-ই নন, নিজের আত্মজীবনীতেও তিনি পরিষ্কার লিখেছেন একাত্তরে বাংলাদেশের সৃষ্টি তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর অন্যতম উপদেষ্টা হিসেবে তিনি যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তার স্বীকৃতিতে বাংলাদেশ তাকে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননাতেও ভূষিত করেছে।

তবে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সঙ্গে প্রণববাবু যে পারিবারিক স্নেহ ও সৌহার্দের বন্ধনে বাঁধা পড়েছিলেন এবং প্রায় পাঁচ দশক ধরে সেই আত্মীয়তা অটুট ছিল—দুই প্রতিবেশী দেশে দুজন শীর্ষ রাজনীতিবিদের মধ্যে সে ধরনের সম্পর্কের আর কোনও দ্বিতীয় উদাহরণ আছে কিনা সত্যিই জানা নেই।

এই সম্পর্কের সূত্রপাত ১৯৭৫ সালে, যখন বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর শেখ হাসিনা সপরিবারে দিল্লিতে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করেন। ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে বাঙালি প্রণববাবুকেই পিতৃহীনা শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের স্থানীয় অভিভাবকের দায়িত্ব নিতে হয়। প্রণববাবুকে সেদিন থেকেই ‘কাকাবাবু’ বলে ডেকে এসেছেন শেখ হাসিনা। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অমলিন ছিল সেই স্নেহের সম্পর্ক। প্রণববাবুর স্ত্রী শুভ্রা মুখার্জির প্রয়াণের পর কয়েক ঘণ্টার জন্য দিল্লি ছুটে আসতেও দ্বিধা করেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রণববাবু বছরকয়েক আগে গল্পচ্ছলে বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক ব্যস্ততায় কখনও নিজের ছেলেমেয়েদের নিয়েও ছুটি কাটানোর সময় পাইনি। অথচ ম্যাডামের (ইন্দিরা গান্ধী) নির্দেশে হাসিনার ছেলেমেয়ে, জয় আর পুতুলকে নিয়ে দিল্লির উপকণ্ঠে দমদমা লেকে বোটিং পর্যন্ত করাতে নিয়ে গেছি!’ ভাগ্যিস সেই যুগে পাপারাৎজিরা ছিল না!

তবে সমালোচকরা আবার অনেকেই বলেন, ভারতের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠতা ছিল শুধু হাসিনা পরিবার তথা আওয়ামী লীগের সঙ্গেই। তিনি কখনও বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠতে পারেননি, বিএনপি-মনস্করা এই অভিযোগ বারে বারেই তুলেছেন।

২০০৬ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভারত সফরের সময় কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভুলে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রণববাবু দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাঝপথেই আঙুল উঁচিয়ে কর্কশভাবে বেগম জিয়াকে ধমকানি দিয়েছিলেন—এই অভিযোগ সে আমলের বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা অনেকেই করেছেন। কয়েক বছর বাদে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর প্রণব মুখোপাধ্যায় যখন তার প্রথম বিদেশ সফরে বাংলাদেশে গেলেন, হরতালের অজুহাত দিয়ে তৎকালীন বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়াও তার সঙ্গে দেখা করলেন না।

আত্মজীবনীতে প্রণববাবু খোলাখুলি লিখেছেন, বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ দিল্লিতে এলে কীভাবে তিনি তার সঙ্গে রফা করেছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে জেনারেল আহমেদ যে ‘রক্ষাকবচ’ পাবেন সেই আশ্বাসও তাকে দিয়েছিলেন প্রণববাবু। এই বিবরণ পড়ে বাংলাদেশে ও ভারতে অনেকেই প্রচণ্ড বিস্মিত হয়েছিলেন, একটা প্রতিবেশী দেশের রাজনীতিতে এভাবে হস্তক্ষেপের কথা যে খোলাখুলি লেখা যায় তা অনেকে ভাবতেই পারেননি।

তবে বাংলাদেশ নিয়ে খোলাখুলি মন্তব্য করাই হোক বা চিরকাল কংগ্রেসি রাজনীতি করেও নাগপুরে আরএসএস সদর দফতরে ভাষণ দিতে যাওয়া—প্রণববাবু বিতর্ককে ভয় পাননি কোনও দিনই। তার জীবনাবসানের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল!


এখানে শেয়ার বোতাম